২২ মে ২০২২
`

দেশের আড়াই কোটি লোক জলবায়ু উদ্বাস্তু হতে পারে


যে বিষয়টি নিয়ে এত শঙ্কা ও ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেন যেন আমাদের মনমস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে! তবে আমরা এটাও মনে করি না যে, সেই ভাবনায় কাতর হলেই সব বিপদ থেকে উদ্ধার বা মুক্তি পাওয়া যাবে কিংবা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। চিন্তার সাথে যদি কর্ম ও উদ্যোগের সংযোগ ঘটে তবে কিছু একটা হতে পারে। সে দুর্যোগ থেকে বাঁচার চেষ্টা হিসেবে পথ বের করতে উপযুক্ত, সক্ষম ব্যক্তিদের আলোচনা অনুসন্ধান গবেষণা এবং বিশ্বের বিজ্ঞ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ মতবিনিময় প্রশ্নাতীতভাবে এখন জরুরি, যা অনুক্ষণ মনে জাগিয়ে রেখে কাজ করার স্পৃহা ও গতিকে দ্বিগুণ ত্রিগুণ বাড়িয়ে নিতে হবে। আসলে প্রশ্নটি জলবায়ু সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে।

নিকট অতীতে বিশ্বের শতাধিক বিজ্ঞানী গবেষকের কাছ থেকে সতর্কবাণী ঘোষিত হয়। বিশ্বে উষ্ণায়নের কারণে জমাট বাঁধা বরফ গলে সমুদ্র মহাসমুদ্রগুলোর পানি স্ফীত হয়ে বিশ্বের শতকোটি মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র্য, প্রাণিকুল, বন-বনানী, হাজারো জাতের গুল্মলতা বলতে গেলে, কোটি কোটি বছরের মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে যাচ্ছে। মানুষকে বুদ্ধিমান ও শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন বটে, তবে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে মানুষকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন, মানুষ সেই অলঙ্ঘনীয় সীমা তার নির্বুদ্ধিতা এবং স্বার্থান্বেষিতার কারণে অতিক্রম করে যা করছে, সে কারণে বনাঞ্চল নিধন এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে অসংখ্য শিল্প গড়া, এসব বেহিসাবি কাজ মানুষ করেছে। সে কারণে বিশ্ব উষ্ণ হয়ে জমাট হয়ে থাকা বরফ গলতে থাকার ফলে সব সাগর মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সেই ভবিষ্যৎ খুব দূরে নয়, যখন সমুদ্রের মধ্যে ভাসমান বহু দ্বীপদেশসহ অনেক অপেক্ষাকৃত নিচু জনপদ সমুদ্রবক্ষে বিলীন হয়ে যাওয়া অবধারিত হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের খ্যাতিমান প্রথিতযশা শতাধিক বিজ্ঞানী, জলবায়ুবিশারদ, গবেষক অনেক আগেই এমন সতর্ক করে দিয়েছিলেন মানব সম্প্রদায়কে। ‘ক্ষণকাল দাঁড়াও। যা করছ তা বন্ধ করো। পরিবেশ আবহাওয়ার যতটুকু ক্ষতি করে ফেলেছ তার প্রতিবিধান করো, পরামর্শ শোনো।’ কথায় বলে, ‘চোরায় না শোনে ধর্মের বাণী’ তেমনি বিশ্বের ধনী, লোভাতুর, কর্তৃত্ব করার অভিলাষী হাতেগোনা কয়েকটি দেশ তাদের শিল্প স্থাপনা থেকে অনবরত কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ করে বিশ্বকে উত্তরোত্তর উষ্ণতার পথে ঠেলে দিচ্ছে যার পরিণতি আসন্ন প্রায়টা; সেই মহাদুর্যোগ, প্রলয় বললেও তা ভুল হবে না।

বিশ্বের সাত শতাধিক কোটি মানুষের সাথে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তায় শঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল বটে। তার প্রতিফল দেশের মিডিয়ায় বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্যে দেখা গেছে। আসলে মানুষের স্মৃতি খুব খাটো। বিশেষ করে যেখানে শিক্ষা, বোধ বিবেচনার ঘাটতি প্রচুর সেখানে মানুষের স্মৃতি খাটো হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা শুনেছি দেশের সরকার দুর্যোগ মোকাবেলায় পরিকল্পনা রচনা করছে। এ নিবন্ধে এ সম্পর্কে কথা বলব। কিন্তু এখন তো বেশি জরুরি সর্বস্তরের মানুষকে এ দুর্যোগ সম্পর্কে সজাগ করা, বিপদের ব্যাপারে সম্যক অবহিত করা। সংশ্লিষ্ট এলাকা তথা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে মানুষের যতটুকু করণীয় তা তাদের বুঝিয়ে দেয়া। এই সমস্যাটা আসলে জাতীয় পর্যায়ের, তাই সবাই হাত ধরাধরি করে চলাই উচিত। যার যতটুকু সাধ্য সক্ষমতা তাদের বিপদ থেকে বাঁচার জন্য রয়েছে তা দিয়ে চেষ্টা করা উচিত।

উপরে বলেছি ‘কিছু কথা পরে বলব,’ আসলে কথাগুলো হচ্ছে আমাদের কৃষিমন্ত্রীর জলবায়ু সম্পর্কিত বক্তব্য নিয়ে। সে কথা নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের সমস্যার স্বরূপ সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়োজন। আমরা যতটা জানব ঠিক ততটাই তার আলোকে প্রস্তুত হতে পারব। মহান স্রষ্টা পৃথিবীটা স্বর্গের মতো সুন্দর করে গড়েছেন এই বিশ্বের সৌন্দর্যও কম নয়। এখানে মানুষের বসবাস করার জন্য সব আয়োজনই তিনি করে দিয়েছেন। মানুষ গ্রহান্তরে অনুসন্ধান চালাচ্ছে; কিন্তু কোথাও এ পর্যন্ত এই গ্রহের সমতুল্য কিছু খুঁজে পায়নি।

যাক ফিরে যাই পৃথিবীর পূর্বে উল্লিখিত বিপদের কথায়। পূর্বে উল্লেখ করেছি, বিশ্বের চরম উষ্ণায়নের কথা যার ফলে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে পৃথিবীর আবহাওয়া মণ্ডল। হাজার বছর থেকে বৃষ্টিপাতের যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিল, তা এখন তছনছ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও অনাবৃষ্টি, উষ্ণতা, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, আকাশ থেকে বরফ ঝরা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, সুনামি, ভূমিকম্প, ভয়ঙ্কর রোগ-শোক, এখন তো গোটা বিশ্বে চলছে কোভিডের অতিমারী। সারা বিশ্বের শান্তি আনন্দ ফিকে হয়ে পড়তে চলেছে।

দুর্যোগের যে ঘণ্টাধ্বনি এখন বাজছে দেশ ভেদে তার মাত্রা কম বেশি হতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশে এই দুর্যোগের ছোবলের মাত্রা ভয়ানক। যেসব দেশ এ নিয়ে বেশি বিপদের মুখে তার যে তালিকা গবেষক ও বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন তাতে বাংলাদেশের নাম উপরের দিকেই রয়েছে। এই বিপদ নিয়ে দেশে খুব একটা গবেষণা হয়নি। তাই এ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পরিসংখ্যান দেয়া এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। তবে সাধারণভাবে উপলব্ধি করছি, দেশের এখন গরম বেড়েছে, তাপমাত্রা আগের মতো আর নেই, কোথাও খরা হচ্ছে, কোথায়ও অতিবৃষ্টিজনিত কারণে অসময়ে প্রবল বন্যা হচ্ছে, নদীভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে, অকাল বন্যায় মাত্রাতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ফসলহানি, বাড়িঘর প্লাবিত হওয়া, গ্রামীণ পথঘাট, সড়ক-মহাসড়ক, নানা জনপদ, স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। মানুষের উন্নত জীবন রচনার যত স্বপ্ন প্রচেষ্টা সব এখন হুমকির মুখে। সর্বোপরি আবহাওয়ার চরম খেয়ালিপনা সব কিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে আমাদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তা তুলে ধরব। কেননা এই দুর্যোগ সম্পর্কিত আলোচনা- পর্যালোচনা সম্পর্কে অবহিত থাকা সবার জন্য জরুরি। তেমনি আরো বেশি জরুরি এই বিপদ নিয়ে অনুসন্ধান, গবেষণা করে বেশি জানা ও সবাইকে জানানো যাতে সবাই হালনাগাদ থাকতে পারে; এই বিপদ মোকাবেলায় সাধারণের কিছু করার আছে কি না। আসলে বিষয়টা এতই উচ্চমাত্রার যে, জাতিসঙ্ঘের সংশ্লিষ্ট শতাধিক গবেষক ও বিজ্ঞানীর দল এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই প্রলয় থেকে বাঁচার জন্য উদ্যোগ নিতে কালবিলম্ব করা যাবে না। সবাই আমরা জানি, যেখানে পানি সেখানেই জীবন এবং তাতেই সব কিছুর জাগরণ ঘটে। অথচ পানি এখন মহাবিপদ হয়ে আসছে, যা কল্পনাতীত ছিল। বিজ্ঞানীরা আর বিশ্বের ওয়াকিবহাল মহল এখন ভীতসন্ত্রস্ত এবং বিচলিত। বিচলিত না হয়ে উপায়ইবা কোথায়? সেখানে বিশ্বের সাত শতাধিক কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রশ্ন, প্রশ্ন মানবসভ্যতার অস্তিত্ব নিয়ে।

উপরে বলেছি, পানি নিয়ে বিপদের সম্মুখীন গোটা বিশ্ব। তবে বিপদের সম্মুখভাগে রয়েছে আরো কিছু দেশসহ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর মাত্র ১ মিটার (৩৯.৩৭ ইঞ্চি) বাড়লে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের ১৭.২০ শতাংশ স্থলভাগ পানিতে তলিয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর জাতীয় কৌশলনীতি অনুসারে, এর ফলে আড়াই কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সীমিত সম্পদের কারণে পরিবেশ উদ্বাস্তুদের অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ, তা থেকে যদি ১৭.২০ শতাংশ স্থলভূমি পানিতে তলিয়ে যায় তবে ক্ষুদ্র আয়তনের আমাদের এই মাতৃভূমির আয়তন আরো কত ক্ষুদ্র হয়ে পড়বে আর সেখানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য কতটা স্থান বসবাসের জন্য অবশিষ্ট থাকবে? এখন তো বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে সরকারি তথ্য অনুসারে এক হাজার ১১৬ জনের বাস। বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। তার ওপর এখন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৩ শতাংশ। ১৭.২০ শতাংশ ভূমি যদি জলমগ্ন হয়ে যায়, তবে জনসংখ্যার চাপ কী পরিমাণে বাড়বে তা কল্পনার অতীত। আর কৃষির অবস্থা কী দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে হারের কথা উল্লেখ করেছি, তা দেশে সামাজিক অর্থনীতি ও শান্তিশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে সবার জন্য খাদ্য অপরিহার্য হলেও সে পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন করা কিভাবে সম্ভব হবে! স্বাভাবিক কারণে অর্থাৎ নতুন বসতি স্থাপনের জন্য চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। তার ওপর ১৭ শতাংশের মতো জমি যদি জলমগ্ন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী ভয়াবহ রূপ নেবে? তাতে অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যুর হার বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে প্রাপ্ত বয়স্কদের স্বাস্থ্যের হানি ঘটবে। দেশে এখন শিশুশিক্ষার সুযোগ যথেষ্ট নয়। তারও অবনতি ঘটবে। কেননা আমাদের দেশের যে আর্থিক সঙ্গতি, সে ক্ষেত্রে শিশুশিক্ষার জন্য যে অধিক অর্থের প্রয়োজন, তা পূরণ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া জনগোষ্ঠীর বসবাসের ব্যবস্থা কঠিন হবে। সেই সাথে আরো বহু সমস্যা দেখা দেবে। বিশেষ করে খাদ্যঘাটতিজনিত কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্য সমস্যা হলে তারা হীনবল হয়ে পড়বে। একটি স্বাস্থ্যবান জাতিগঠনের ক্ষেত্রে সেটি ক্ষতিকর হবে। এ দিকে দেশে আড়াই কোটি মানুষ যদি জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে যায়, তবে তাদের মাথাগোঁজার ঠাঁই করতে বহু কৃষিজমি ও বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাবে। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চলের পরিমাণ মোট ভূমির মাত্র ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটা খুবই কম। কোনো দেশের মোট স্থলভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকাটা আদর্শিক অবস্থান, দেশের অনুক‚ল আবহাওয়ার জন্য তা অপরিহার্য।

কপ-২৬ শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যে কয়টি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তার মধ্যে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বন নিধন বন্ধ করা’ সম্পর্কিত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এটা কপ-২৬-এর বড় একটি বিবেচনার বিষয়; পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় একটি অগ্রগতি। অথচ পরম পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, যা নিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষার সাথে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সংস্থা এর তীব্র নিন্দা করেছে যেখানে বাংলাদেশ পরিবেশ বিপর্যয়জনিত কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে। যে গাছ পরিবেশের পরম বন্ধু, অথচ এ দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ আদর্শিক অবস্থানের অনেক নিচে। এ জন্য কপ-২৬ বন নিধন চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা শুধু বিস্ময়েরই নয়, বনখেকো দুরাচারীদের জন্য ওজিএল দেয়ার শামিল। বাংলাদেশের এমন ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে বন খেকোদের উৎসাহিত করা এবং তারা বন উজাড় করার কুকর্মে অতীতের চেয়ে আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে উৎসাহিত হবে।

বন মানুষ ও পরিবেশের কত বড় বন্ধু তা বলে শেষ করা যাবে না। বিশেষ করে যে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে তা জলবায়ুর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ। গাছ সেই কার্বন কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

গাছ নিয়ে বিশ্বস্রষ্টার এবং প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর যেসব কথা রয়েছে তা গাছের গুরুত্বকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বিশবারের বেশি বৃক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন। সূরা নাহলের ১০ নম্বর আয়াতের এক স্থানে রয়েছে, ‘গাছপালা জন্মায় যাতে তোমরা পশু চরিয়ে থাকো।’ সূরা নামলের ৬০ নম্বর আয়াতে রয়েছে ‘না তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ ও পৃথিবী, আর আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বারি বর্ষণ করেন, তারপর তা-ই দিয়ে সৃষ্টি করেন মনোরম উদ্যান, যার গাছপালা গজাবার ক্ষমতা তোমাদের নেই?’ সূরা ইয়াসিনের ৮০ নম্বর আয়াতে রয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য সবুজ গাছ থেকে আগুন উৎপাদন করেন ও তোমরা তা দিয়ে আগুন জ্বালো।’ এসব আয়াতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ধন ও মানুষের জীবনের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। আর ভারসাম্যপূর্ণ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বৃক্ষের। বৃক্ষ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্যই নয়; বরং ধর্মীয় কারণেও মানুষের বৃক্ষরোপণ করা দরকার। মহানবী সা: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও তার পরিচর্যার কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন হাদিসে উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে পৃথিবীর মোট উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যকার ২৫ শতাংশই বৃক্ষ। বৃক্ষ ছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ কল্পনা করা অবাস্তব। সঙ্গত কারণেই ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণে জনসচেতনতা তৈরি করতে উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছে।

বৃক্ষরাজি ও প্রকৃতি নিয়ে পবিত্র কুরআনের বর্ণনা : আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ হিসেবে ফলবান বৃক্ষরাজি ও সবুজ-শ্যামল করেছেন। বনভূমির মাধ্যমে বিশ্বকে সুশোভিত ও অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে তাই ঘোষণা এসেছে, ‘আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি ও তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদগত করেছি। আর আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা উদ্যান ও পরিপক্ব শস্যরাজি উদগত করি যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়।’ (সূরা কাফ, আয়াত ৭-৯)

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির কিছু দৃশ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে যেন মানুষ প্রাকৃতিক বিচিত্র, প্রকারভেদ, বর্ণ গন্ধ ও সৌন্দর্য দেখে পুলকিত ও অভিভূত হয়। সব কিছুর উন্নতি, অগ্রগতি ও সক্রিয়তা দেশে দেশে আল্লাহর শক্তিমত্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বৃক্ষরাজি যে কত বড় নেয়ামত, পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতের মাধ্যমে তা প্রতীয়মান করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তারা কি লক্ষ করে না, আমি ঊষর ভূমির ওপর পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদগত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদিপশু ও তারা নিজেরা আহার গ্রহণ করে?’ (সূরা সাজদা, আয়াত ২৭)

বৃক্ষরোপণের ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহ ও নির্দেশনা এসেছে এবং তা থেকে মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা (দান) স্বরূপ গণ্য হবে (বুখারি : ২৩২০, মুসলিম : ১৫৬৩/১২)। এ হাদিসটি আরো স্পষ্ট করে অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বৃক্ষরোপণ করে তা ফল দান হওয়া পর্যন্ত তার পরিচর্যা ও সংরক্ষণে ধৈর্য ধারণ করে; তার প্রতিটি ফল যা নষ্ট হয়, তার বিনিময়েও আল্লাহ তায়ালা তাকে সাদকার নেকি দেবেন।’ (মুসনাদ আহমদ : ১৬৭০২) পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বৃক্ষের কথার সাথে সন্নিবেশিত রয়েছে আরো। অন্য বর্ণনায় মহানবী সা: এরশাদ করেছেনÑ কিয়ামত এসে গেছে এমন অবস্থায় তোমাদের কারো হাতে যদি ছোট একটি খেজুরগাছ থাকে, তাহলে সে যেন গাছটি রোপণ করে দেয়। (মুসনাদে আহমদ; হাদিস : ১২৯০২) আমরা তো প্রতিনিয়ত বিনা কারণে বৃক্ষ নিধন করে চলেছি অথচ তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। বিনা কারণে গাছ কাটার শাস্তি অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (বায়হাকি, হাদিস ৬/১৪০)

এ বৃক্ষের অর্থনৈতিক মূল্য কত? গাছবিহীন এক মুহূর্তও বাঁচা অসম্ভব। মানুষের যাপিত জীবনে গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ বছরে যে পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করে, তা ১০ জন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের অক্সিজেনের চাহিদা মিটায়। ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টি এম দাস ১৯৮৯ সালে পূর্ণবয়স্ক একটি বৃক্ষের অবদানের আর্থিক মূল্যের বিবেচনা করে দেখান যে, ৫০ বছর বয়সী একটি বৃক্ষের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার ডলার। (সূত্র : ইন্ডিয়ান বায়োলজিস্ট, ভলিয়ম-১১, সংখ্যা ১-২)

মাত্র কিছুকাল আগে কৃষিমন্ত্রীর জলবায়ুর বিপর্যয় রোধ নিয়ে একটি বক্তব্য সবাইকে বিস্মিত করেছে। মন্ত্রী মহোদয়ের সেই বক্তব্য পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে মন্ত্রী বলেছেন, জলবায়ুজনিত ক্ষতি সম্পদ ব্যয় করে আমরা নিজস্ব অর্থে মোকাবেলা করতে পারব। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ও অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, ৭০০ কোটি টাকার জলবায়ু ফান্ড গঠনসহ ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সেগুলো সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। এ নিয়ে কোনো ‘হার্ম’ মন্তব্য করতে চাই না, তবে মন্ত্রীর এই তথ্য প্রকাশ করায় মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। প্রথমত আসন্ন এই সঙ্কটের গ্র্যাভিটি তথা ব্যাপকতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দেয়া এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কি কোনো আলোচনা পর্যালোচনা করে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছেন? গৃহীত কর্মসূচির কাজ শুরু হয়েছে। সে সম্পর্কে কোনো ‘কনক্রিট’ ধারণা দেয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো দলিল-দস্তাবেজ প্রকাশ পায়নি বা খবরের কাগজে বা অন্য কোনো মিডিয়ায় দেখিনি ও শুনিনি। আমরা দেখে আসছি এমন বৃহৎ প্রকল্প পূর্বনির্ধারিত অর্থে ও সময়ে শেষ করা যায়নি। বারবার সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে; সাথে সাথে প্রকল্প ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। জলবায়ুজনিত যে ভয়াবহ সমস্যায় দেশ পড়তে যাচ্ছে তার যতটুকু আমরা গবেষণা করে জেনেছি তাকে সম্মুখে রেখে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সে যাই হোক, আমরা তো সব কাজেই কচ্ছপগতিতে চলি এবং দক্ষতা সক্ষমতা নিয়েও খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছি না। তবে মন্ত্রী যে ডিসক্লোজার দিয়েছেন তাতে তিনি পরিষ্কার করেছেন, জলবায়ু-সংক্রান্ত কাজগুলো আওয়ামী লীগের নেতাদের দেয়া হবে। এতে মনে বহু প্রশ্ন উদয় হলেও মাত্র কয়েকটি প্রশ্ন তুলতে চাই। এসব কাজ তো কারিগরি জ্ঞান, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের ব্যাপার। আওয়ামী লীগ নেতারা এসব জ্ঞানগরিমার অধিকারী কি? এ ক্ষেত্রে আর্থিক সততা ও স্বচ্ছতায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের প্রয়োজন, সেসব নেতা এ ক্ষেত্রে কতটা পরীক্ষিত? এসব ব্যাপারে রাজনীতি ও দলের ঊর্র্ধ্বে ওঠাটা কি প্রয়োজন ছিল না? এই দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ‘ইনভলভ’ করা দরকার ছিল না? এসব বিষয়ে কোনো ধারণা দেয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে পুরো তদারকিটা কারা করবে।’’

জলবায়ু নিয়ে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে রয়েছে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ভূমিকা। তাদের কলকারখানা থেকে যে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে সেটাই বিশ্বে উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। তাতে আবহাওয়া বৈরী হওয়া, সমুদ্রবক্ষ স্ফীত হয়ে উঠেছে। কপ-২৬ সম্মেলনে অনুন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ জন্য ক্ষতিপূরণের জন্য অর্থ দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সে দাবি নিয়ে উন্নত দেশগুলো গড়িমসি করছে; তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গত বছর নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটি কক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু-সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তৃতাকালে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত অধিবাসীদের দায়িত্ব বিশ্বকে অবশ্যই ভাগ করে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, উন্নত দেশগুলো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর বিশেষ মনোযোগ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার অবশ্য পূরণ করতে হবে।
[বাকি অংশ আগামীকাল]
ndigantababor@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement