০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

বাংলাদেশের বিজয়গাথা

বাংলাদেশের বিজয়গাথা - ছবি : নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিগত ৫০ বছরে বেগম খালেদা জিয়ার মতো এমন উত্তাল সংগ্রামশীল জনজীবন আর কেউ অতিক্রম করেনি। সন্দেহ নেই সম্মোহনী নেতৃত্বের আবহ ছিল। সেখানে ছিল একই গতিপথ। একই রাজনৈতিক তরঙ্গ। যে জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার তিনি বহন করেন, সেখানেও ছিল শৃঙ্খলা। আরেক গতিময় জীবন। উভয় ক্ষেত্র থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ভিন্নতর, অথচ একই উৎস থেকে উৎসারিত। বলতে গেলে, তার জীবন বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসীন হওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে হয়তো আর নেই। রাষ্ট্রনায়ক স্বামীর প্রেক্ষাপটে নয়, নেতৃত্বের সঙ্কটে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা। এটিও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। রাজনৈতিক জীবনে তার ক্ষমতা দল, গোষ্ঠী, আমলা বা ষড়যন্ত্রের পথে বিস্তৃত নয়। এই ক্ষমতা জনগণ থেকে উৎসারিত। তার রাজনৈতিক আদর্শ, কর্মসূচি ও কর্মকৌশল আবর্তিত, বিবর্তিত ও পরিচালিত হয়েছে জনগণ নির্ভরতায়। তাই বলা হয়, খালেদা জিয়া হয়েছেন জনতার এবং জনতা হয়েছে খালেদা জিয়ার।

কোটি কোটি মানুষের এই মহীয়ষী নেত্রী এখন যে নিপীড়িত জীবনযাপন করছেন তাও পৃথিবীতে বিরল। নেলসন ম্যান্ডেলা অথবা নিকট অতীতের গান্ধী-নেহরু-মুজিব কারাবরণ করেছেন ঔপনিবেশিক অথবা অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের কাছে। আর খালেদা জিয়া বন্দী জীবনযাপন করছেন স্বদেশের সগোত্রের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে। তৃতীয় বিশে^ এই নির্যাতনের বিষয়টি অসম্ভব নয়। কিন্তু অসম্ভব হচ্ছে তার তীব্রতা-ব্যাপকতা। ঔপনিবেশিক আমলে ‘রাজবন্দী’র মর্যাদায় ও সীমাবদ্ধতায় ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। এখনকার ক্ষমতা কাঠামোয় তা দুরাশা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতায় পর্যবসিত হয়েছে। অবশেষে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন মৌলিক মানবাধিকার থেকে। যে খালেদা জিয়া জনতার, তিনি বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী। কোনো পর্যায় বা কোনোভাবেই কোনো নির্বাচনেই তিনি পরাজিত হননি।

জনতার আবেগমণ্ডিত সর্বোচ্চ ভালোবাসা অর্জন করেছেন তিনি। তার সেই জনতা এখন শক্তির শাসনে নিষ্পিষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, যেখানে জিয়ার শেষ, সেখান থেকেই খালেদা জিয়ার শুরু। দু’জনের জীবনের গতি এবং ছন্দ একইরকম। স্বাধীনতার যুদ্ধকালে জিয়াউর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। সে সময়ে শিশুসন্তান নিয়ে বন্দী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা সেখানেই শুরু। যে ঝুঁকি ও সাহস নিয়ে তিনি ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ অতিক্রম করেছিলেন, তা বিরল। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বন্দিদশা যদি মহিমান্বিত হয়, তাহলে খালেদা জিয়ার বন্দিদশাও ত্যাগের ও মহত্বের। বরাবরই মুক্তিযুদ্ধকে জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া শ্রেষ্ঠতম অর্জন মনে করেছেন এবং স্বাধীনতার চেতনায় অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে সবসময়। যখন তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেত্রী অথবা জাতির সর্বোচ্চ কর্ণধার তখনো কাজে কর্মে লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে উদ্ভাসিত হয়েছে স্বাধীনতার চেতনা। রাজনীতি করেছেন জনতার জন্য। সে রাজনীতিতে মুখ্য হয়ে উঠেছে জনগণের জীবন স্বাধীনতা ও উন্নয়ন। জিয়াউর রহমান যেমন সচেষ্ট ছিলেন জনগণের জীবনকে নৈতিক ও কর্মচঞ্চল করে তুলতে, তেমনি খালেদা জিয়া সবসময় ছিলেন সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সুদৃঢ়।

জিয়াউর রহমান জনতার ঐক্যে বিশ^াস করতেন। জাতীয় ঐক্য গড়নে একের পর এক সমন্বয় ও ঐক্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। সেখানে বাদ সাধেনি ডান অথবা বাম। মুজিবনগরীয় অথবা অমুজিবনগরীয় বিরোধের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি। পূর্ব পশ্চিম অথবা লাল-নীলে বিভক্ত করেননি সমাজকে। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতার বাইরে অথবা ভিতরে কখনো ভেদ-বুদ্ধিকে প্রশ্রয় দেননি। অভিন্ন জাতীয় ঐক্যের দ্বারা অর্জন করতে চেয়েছেন অভীষ্ট লক্ষ। দু’জনের ঐক্যের সুর ও ছন্দ ছিল একই রকমের। আরেকটি বিষয়ও দু’জনের অপূর্ব মিল পাওয়া যায়। বলা যেতে পারে সঙ্কটের নেতা তারা। জিয়াউর রহমান যেমন পেশাগত নেতা না হয়ে দেশপ্রেমের অপূর্ব তাগিদে ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীনতা, আবার ৭ নভেম্বরের সঙ্কটসময় সময়ে দিয়েছিলেন জাতির নেতৃত্ব, তেমনি বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। আর এখনো বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন নিরন্তর। অবশ্যই এ লড়াই জনতাকে নিয়ে, জনতার জন্য এবং জনতার লক্ষ্যে। কাকতালীয় হলেও এটিই বাস্তব সত্য যে, গণতন্ত্রের সংগ্রামেও জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া পালন করেছেন অভিন্ন ভূমিকা। জিয়াউর রহমান একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থাকে বাতিল করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। খালেদা জিয়া জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিধ্বনি করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্র। ‘আমাদের জাতীয় জীবনে এখন পর্যন্ত যা কিছু গৌরবজনক অর্জিত হয়েছে তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই রয়েছে তার এবং তার পরিবারের স্পর্শ’ (এমাজউদ্দীন আহমদ, ২০১৮:১৩)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি ব্যতিক্রমী বিষয় হলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রবর্তন করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এটি জাতির জন্য একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য রক্ত ঝরালেন, তারাই ওই ব্যবস্থা বাতিল করলেন। ক্ষমতায় থাকতে এক, আবার ক্ষমতায় না থাকতে আর এক। ‘সত্যিই সেলুকাস কী বিচিত্র এ দেশ’। বিচিত্র ছলনাময় সে রাজনীতি (আকবর আলি খান)।

বেগম খালেদা জিয়া তার কর্ম আদর্শের মধ্য দিয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ রাজনীতির প্রধান চরিত্র। আন্দোলন-সংগ্রাম অতিক্রম করে যখন তিনি ক্ষমতার পাদপীঠে উত্থিত হলেন, তখন তা নিবেদিত হলো জনতার জন্য। তার রাজনীতি শুধু ক্ষমতার জন্যই ছিল না, তা ছিল জনগণের জীবন, স্বাধীনতা ও উন্নয়নের জন্য। বাংলাদেশের জনগণের বিশ^াস ও জীবনবোধ প্রতিফলিত ছিল তাদের জীবনে। বাংলাদেশের মানুষ মধ্যপন্থী। তারা মোল্লাতন্ত্রে বিশ^াস করে না। নাস্তিকতন্ত্রেও না। জনগণের নাড়ির টান অনুভব করেছিলেন জিয়াউর রহমান। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন, আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ^াস স্থাপন ও মুসলিম বিশে^র সাথে বিশেষ সম্পর্কের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সংযোজন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। বেগম খালেদা জিয়া তার সেই ইসলামী মূল্যবোধের ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতিকে কুসুমিত করেছেন, সুশোভিত করেছেন। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি যে জাতীয়তাবাদ, তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলনে। এই জনপদের ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে সবার ঐক্যের প্রতিফলন ঘটেছে ইতিহাসের ক্রমধারায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক সত্তায়। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে জাতির পরিচিতির সঙ্কটের সুষম সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বেগম খালেদা জিয়া জনগণের এসব বিশ^াসকে লালন-পালন ও ধারণ করেন।

জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে ধনিক-বণিক শ্রেণীর হাত থেকে তুলে দিতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। আমি রাজনীতিকে কঠিন করে তুলব কথার অর্থ ছিল- শহুরে, আয়েশি, বিলাসী এবং গণবিরোধী রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতিকে আসলেই কঠিন করে তুলব। রাজনীতিতে সততা, সাহস ও নৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তিনি। রাজনীতি মানেই ছল-চাতুরী, এ কথায় বিশ^াস করতেন না জিয়াউর রহমান। বেগম খালেদা জিয়াও তার রাজনৈতিক কৌশলে সহজ-সরল পথ বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে যখন তার প্রতিপক্ষ স্বৈরাচারের সাথে আপস করে নির্বাচনে যায়, তখন খালেদা জিয়াকেও বস্তা বস্তা টাকা ও ক্ষমতার লোভ দেখানো হয়েছিল। তিনি লোভ ও ভীতিকে অস্বীকার করে অবশেষে বন্দী জীবন বেছে নিয়েছিলেন। আবার একই সত্যের স্ফুরণ দেখি ১/১১ নাটকের অবশেষে। একইভাবে একই প্যাকেজ দিয়ে দেয়া হয়েছিল উভয় নেত্রীকে। কেউ তা গ্রহণ করেছিলেন, কেউ তা গ্রহণ করেননি। সেই অন্যায় অনিয়মকে মেনে না নেয়ার পরিণতিতে তিনি পরাজিত হলেন। সেই একই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে তিনি বিশ^াস করেছিলেন সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৮ সালে তার প্রতিপক্ষ বলেছিলেন, ‘আমায় বিশ^াস করুন।’ তিনি এবং তার দল এখন বিশ^াসের পরিণতি ভোগ করছেন। পরবর্তীকালে যখন বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে রাজনীতি পরিত্যাগ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তিনি তা গ্রহণ না করে মামলার মোকাবেলা করেছিলেন। মামলার মোকাবেলা করে তিনি অন্যায় দণ্ড মাথা পেতে নিলেন। কারাগারে যাওয়ার সময় নেতাকর্মীদের শান্ত থাকতে বললেন। নিয়মতান্ত্রিকতার দীক্ষা দিলেন। তার বিশ^স্ত মানুষেরা তার বিশ^াসকে ধারণ করেছে। নেতানেত্রীরা সরকারের লোভ-লালসা ও নিপীড়ন নির্যাতন সত্ত্বেও বিভাজিত হননি। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকেছে এক ও অভিন্ন। এমনকি তৃণমূলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরাও হাজার হাজার মামলার ৩৫ লাখ আসামি হওয়া সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করেননি।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ইতিহাসেও বেগম খালেদা জিয়া একটি অনন্য নাম। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হয়। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক সমাধানের লক্ষ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ষষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বেগম জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি জাতিকে প্রদত্ত ওয়াদা মোতাবেক আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে সব মত ও পথকে সমন্বিত করে বেগম খালেদা জিয়া যথার্থ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেন। তার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও চারদলীয় জোট বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম খালেদা জিয়া। এই দুই সময়কালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। প্রাথমিক শিক্ষার পরিসর সম্প্রসারিত হয়।

নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অভিযান পরিচালিত হয়। মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়। এই সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে দূরশিক্ষণের প্রবর্তন ঘটে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। একটি সময়োপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। চারদলীয় সরকারের শাসনামলে মাদরাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটে। বেগম জিয়ার শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী চেষ্টার মধ্যে নারী শিক্ষার প্রচলনে উপবৃত্তি ব্যবস্থা প্রচলন অন্যতম। এ সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারে মাধ্যমিক স্তরে বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। এই সময়কালে নকলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফলতা অর্জিত হয়। কম্পিউটার শিক্ষার প্রচলন করা হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা প্রদান করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ৩% নারী কোটা বরাদ্দ ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধিত হয়। অব্যাহতভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লোকসানের বোঝা কমানোর জন্য বেসরকারীকরণ কমিশন গঠন করা হয়। বেসরকারি খাতে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণিত হয়। তথ্য ও প্রযুক্তি উন্নয়নসংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালা গৃহীত হয়। বিনিয়োগ বোর্ড গঠিত হয়। পুঁজিবাজার সংস্কারের লক্ষ্যে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠিত হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প (পিআরএসপি) গৃহীত হয়। সে সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ঋণের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংককে সব সহায়তা দেয়া হয়। এসব কাজের ফলে দারিদ্র্যসীমা কমে আসে। ১৯৯০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৭%। ২০০০ সালে সেটি ৪৯% নেমে আসে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার আরো কমে গিয়ে হয় ৪০%। বাংলাদেশের এই বিস্ময়কর সাফল্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ছবিসহ টাইম ম্যাগাজিন ‘বাংলাদেশ পুনর্গঠন’ শিরোনামে কভারস্টোরি করে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের রিপোর্টে বাংলাদেশ একটি অতি অগ্রগতিসম্পন্ন দেশরূপে চিহ্নিত হয়। বিশে^র সবচেয়ে প্রাচীনতম রবিবাসরীয় সংবাদপত্র দ্য অবজার্ভার বেগম খালেদা জিয়াকে বিশে^র অন্যতম প্রভাবশালী নারী হিসেবে উল্লেখ করে। দেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবদান এখন সুদৃঢ়। এর সূচনা ঘটে শহীদ জিয়ার মুক্ত অর্থনীতি প্রবর্তনের ফলে। বেগম জিয়া তার শাসন আমলে আরো উদার ও কার্যকর করে তোলে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে ডাল-ভাত কর্মসূচি জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

গত কয়েক দশক ধরে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আত্মিক ও জাগতিক উন্নয়নের জন্য অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিএনপি এর দায়িত্বভার গ্রহণকাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি যে সাহসী ও সমন্বয়ধর্মী নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, তার ফলে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল মধ্যপন্থী মুসলিম জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। গণমাধ্যম কখনো কখনো তাকে ‘জাতীয়আত্মা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার সময়কালে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের লালন-পালন ও অর্জনে এই অভিধা আরো যৌক্তিক প্রমাণিত হয়েছে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলা হলেও বেগম খালেদা জিয়া ও তার সরকার সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করেছেন। তার ১০ বছর সময়কালে তেমন কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা হাঙ্গামা ঘটেনি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যতিক্রম ঘটে তখনই বেগম খালেদা জিয়া অনুসৃত নীতির প্রমাণ্য উদাহরণ সৃষ্টি হয়। তার ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ আন্দোলন সমগ্র জাতির প্রতি ও তার জনতার প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য ও প্রতিজ্ঞার উদাহরণ। দেশের মানুষ অর্থাৎ খালেদা জিয়ার জনতা তাকে ভালোবাসে। তাই দেশজুড়ে আবেগময় ভালোবাসার প্রমাণ মেলে সর্বত্র। আবার তিনিও যে তার জনতাকে ভালোবাসেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়, এই সঙ্কট-সঙ্কুল সময়ে তার সাহসী উচ্চারণে। তার নেতৃত্ব ‘আকাশের মতো উদার, সমুদ্রের মতো গভীর এবং মাটির মতো সহিষ্ণু’। তাই আপামর জনতার প্রার্থনা ‘যুগ যুগ জিও তুমি খালেদা জিয়া’।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com

 


আরো সংবাদ


premium cement