২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

শিক্ষকের আর্তনাদ শুনতে কী পাও?

-

শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় তাহলে শিক্ষক নিশ্চয়ই তার মাথা। মেরুদণ্ড কাজ করে না যদি মাথা-মস্তিষ্ক ঠিক না থাকে। মাথা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা তার সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। একজন মানুষের শরীর সুস্থ না থাকলে তার মাথা, মন, মগজ কিছুই কাজ করে না। সে হয়ে পড়ে অসুস্থ ও অস্বাভাবিক। সুতরাং শিক্ষাকে সহজ, সুন্দর ও সাবলীল রাখতে হলে শিক্ষকের শারীরিক, মানসিক ও পারিপাশির্^ক সুস্থতা প্রয়োজন। শিক্ষক সম্পর্কে আমাদের সমাজে উচ্চ সম্মানবোধ রয়েছে। মানুষ গড়ার কারিগর বলে আমরা তাদের সম্মানিত করি। মহাজ্ঞানী, মহাজনরা শিক্ষক সম্পর্কে অতি উচ্চ বাক্য রচনা করেছেন। কবি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শিক্ষক মোরা শিক্ষক/মানুষের মোরা পরম আত্মীয়, ধরণীর মোরা দীক্ষক’। কবি কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি ছোট সময়ে অনেকেই পড়েছেন।

মূলত ‘শিক্ষকরা আলো জ্বালেন সব প্রাণে, নতুন পথে চলতে শেখান জীবনের সন্ধানে’। তারা অপরের জন্য অকাতরে জীবন নিঃশেষ করেন। আল্লামা ইকবালের কথায়- ‘একজন শিক্ষক হচ্ছেন প্রকৌশলী, যিনি গঠন করেন মানবাত্মা।’ শিক্ষা এবং শিক্ষকের এই দুর্ভিক্ষের সময়ও আমাদের সমাজে শিক্ষকসমাজের মর্যাদা, স্বাতন্ত্র্য ও উঁচু স্থান কমবেশি তেমনই আছে। আমরা শিক্ষক শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে যে চিত্রকল্পটি ধারণ করি তা মহান। সুতরাং তাদের প্রতি যখন কোনো অপমান, অসম্মান ও অমর্যাদার বিষয় আসে তখন সমাজ ক্ষুব্ধ হয়। সমবেতভাবে মানুষ তার প্রতিবাদ করে। সমাজের সব ক্ষেত্রে অবক্ষয়ের মতো শিক্ষা ক্ষেত্রেও চরম বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন শিক্ষককে অসম্মান করে তখন প্রতিবাদের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ ঘটনা হচ্ছে খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ সেলিমের মর্মান্তিক মৃত্যু।

সংবাদপত্রের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-কুয়েটের শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ সেলিম ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতনে অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন। ওই ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে উত্তাল হয়েছে কুয়েট। ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করেছেন শিক্ষকরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তাদের প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। রহস্যজনক কারণে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া গ্রহণ করার পরিবর্তে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। আন্দোলন প্রশমনের জন্য অথবা অপরাধীদের আড়াল করার জন্য এই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কি না তা প্রশ্ন আকারে উত্থাপন করা যায়।

অবশ্য পরবর্তীকালে আন্দোলনের ঠেলায় ছাত্রলীগের নেতাসহ ৯ জনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।

অপর দিকে, ঘটনা তদন্তে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করে। এর আগে যে তিনজনের কমিটি গঠন করা হয়েছিল তাদের দু’জনই তদন্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। এই অপারগতার কারণ ভীতি অথবা প্রীতি হতে পারে। ক্রমে ক্রমে আমাদের শিক্ষকদের মেরুদণ্ড এতই বাঁকা হয়েছে যে, তারা স্বাধীনতা বা স্বীয় ইচ্ছায় আত্মসমর্পণ করছেন। ভয়-ভীতিকে অতিক্রম করার সাহস দেখাচ্ছেন না। তবে আশার কথা, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে শিক্ষকসমাজের একাংশ সেখানে এবং দেশের অন্যত্র সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন। মূলত কুয়েট শিক্ষকদের বলিষ্ঠ ভ‚মিকার কারণেই বহিষ্কারাদেশ আসে। অপরাধীরা নিজেদের অপরাধ ঢেকে রাখার জন্য নানা ধরনের চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রফেসর সেলিম হত্যার নেপথ্যে ঘটনাটি হলো- কুয়েটের প্রশাসনে ছাত্রলীগের অবৈধ ও অন্যায় হস্তক্ষেপ। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, কুয়েটের হলে ডাইনিং ম্যানেজার নিয়োগ নিয়ে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর মানসিক নিপীড়নে প্রফেসর সেলিমের মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন বাসায় ফেরার পথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাস্তায় তার সাথে দুর্ব্যবহার করে।

ফুটেজে তার প্রমাণ মিলেছে। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রফেসর সেলিমকে তার বিভাগের কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বাসায় ফিরে গিয়ে এই শিক্ষক অবশেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সুতরাং মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নেই যে তার মৃত্যু হয়েছে এটি প্রমাণিত। প্রফেসর সেলিমের পরিবার একই অভিযোগ করেছে। ওই ঘটনায় কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান-ই মূল ভ‚মিকা পালন করে বলে প্রতিবেদনে জানা গেছে।

আওয়ামী শাসনের বিগত এক যুগে শিক্ষক নিপীড়নের ঘটনা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনিতেই তারা দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অলিখিত দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করেছে। কুয়েটের ওই ঘটনা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে তখন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ছাত্রলীগের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে অনুরূপ ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগ শিক্ষাঙ্গনের কর্তৃত্ব নিয়েই খুশি থাকেনি, তারা বারবার শিক্ষকের গায়ে হাত দিয়েছে। তাদেরকে অপমান-অপদস্থ করেছে। ২০১৮ সালে টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে ও দোষীদের বিচার দাবিতে এক সাথে ৫৬ জন শিক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনে আটক নেতাদের মুক্তি চেয়ে মানববন্ধন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয়, এ সময় মানববন্ধনে সংহতি জানাতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করা হয়।

অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক আসিফ নজরুলের সাথে তারা বিরূপ আচরণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনা ঘটে। তারা এ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তার কক্ষের দরজায় ও দেয়ালে পোস্টারও সাঁটিয়ে দেয়। সিরিজ বোমা হামলা দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই কাণ্ড ঘটায়। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতারাও তালা মারা কক্ষে আরেকটি তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর আগে আসিফ নজরুল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন। যেখানে তিনি বলেন ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কাবুল বিমানবন্দর ধরনের দৃশ্য বাংলাদেশেও হতে পারে’। ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় শহীদ মিনারের সমাবেশে আসিফ নজরুলের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনাকে আবারো বলছি, আপনার যদি পাকিস্তানে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, পাসপোর্ট করে পাকিস্তান চলে যান। বাংলাদেশে থেকে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করার সুযোগ ছাত্রলীগ দেবে না।’

এর আগে ভিন্নমত পোষণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষক মোর্শেদ হাসান খানকে চাকরিচ্যুত করে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জ্যোতির্ময় জিয়া’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেন মোর্শেদ হাসান খান। ওই লেখায় বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য থাকার অভিযোগ তোলে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে ছাত্রলীগ তখন বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও ওই নিবন্ধের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। এর মাঝে মোর্শেদ হাসান খান দুঃখ প্রকাশ করে লেখার আপত্তিকর অংশ প্রত্যাহার করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়নি। ওই বছরের ২ এপ্রিল মোর্শেদ হাসান খানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক মোর্শেদকে অবশেষে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০০৯ সালের দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে একই কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবমাননা করেছেন, অকল্যাণ কামনা করেছেন।

শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায় নয়, ছাত্রলীগের অন্যায়-অত্যাচারের কবলে প্রায়ই নির্যাতিত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। কয়েক মাস আগের একটি খবরে দেখা যায়, ছাত্রলীগের ছেলেরা কলেজ অধ্যক্ষকে অপমান-অপদস্থ করে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। এ ছাড়া নকল করতে না দেয়ার কারণে ছাত্রলীগের ছেলেরা কত শিক্ষককে যে পিটিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রায়ই এ ধরনের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কথায় উঠতে-বসতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা। প্রায়ই তারা অপমান, হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। গত বছর নারায়ণগঞ্জে একজন হিন্দু প্রধান শিক্ষককে কান ধরে উঠ-বস করান ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতা। শিক্ষকরা দেশের সর্বত্র এভাবে নীরবে নিভৃতে অপমান, অপদস্থ হচ্ছেন। এসব খবর গণমাধ্যমে খুব কমই আসে।

বলতে গেলে সারা দেশে শিক্ষকদের নীরব আর্তনাদ চলছে। ক্ষমতাসীন সরকারের সর্বাত্মক দলীয়করণের কারণে শিক্ষকরা অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বেসরকারি স্কুল-কলেজে সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি ও সরকারি সহায়তা থেকে ভিন্ন মতাবলম্বীরা দীর্ঘ এক যুগ ধরে বঞ্চিত। ভেতরে ভেতরে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে শিক্ষকদের। লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃশেষ হচ্ছে তাদের জীবন।

জাতির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও সুবিধার দাবিদার যে শিক্ষকসমাজ, তার পারিপাশির্^ক অবস্থা দেখলেন। সারা দেশে শিক্ষা যে একটি ফরমায়েশি ও কাগজি বিষয়ে পরিণত হয়েছে তা সবারই জানা কথা। সমাজজীবনের আর সব অবস্থার মতো শিক্ষা ও শিক্ষকতার দলীয়করণই হচ্ছে এর প্রধান কারণ। স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-নেত্রী, এমপি ও মন্ত্রীদের একাধিপত্য শিক্ষক নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকসমাজের আত্মমর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বিগত ৫০ বছরে সব সরকারের আমলে শিক্ষকরা অব্যাহতভাবে অবহেলার শিকার হয়েছেন। শিক্ষকরা যেহেতু শক্তি প্রয়োগের কলাকৌশলের ধারক ও বাহক নন, সে জন্য শক্তি প্রয়োগের সরকার তাদের নিগ্রহ করতে দ্বিধাবোধ করে না। তাই আজ শিক্ষকসমাজের উচ্চারণ হোক কবিগুরুর সেই অমোঘ বাণী, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর’।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement