১১ আগস্ট ২০২২
`

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন

-

আজকের দিনে পৃথিবীজুড়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে আলোচিত তা হচ্ছে ‘মানবাধিকার’। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সর্বময় ব্যাপ্তি রয়েছে। পৃথিবীতে মানুষের আগমনের পর থেকে যখন মানুষ নিজের সম্পর্কে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই অধিকার শব্দটি চর্চিত হয়ে আসছে। কারণ মানুষের জীবন, অধিকার, সমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ সুবিধাগুলোই মানবাধিকার। মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংবিধিবদ্ধ আইন বা নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয়, যা মানবজাতির সদস্যদের আচার আচরণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় এবং যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত বা মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধর্তব্য।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষার যে সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে তার প্রথম অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে, ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমান সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।’ এই ঘোষণাপত্রের ভূমিকাতে লেখা আছে, ‘যেহেতু মানব পরিবারের সকল সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই হচ্ছে বিশ্বে শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি; যেহেতু মানব অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা এবং ঘৃণার ফলে মানুষের বিবেক লাঞ্ছিত বোধ করে এমন সব বর্বোরচিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং যেহেতু এমন একটি পৃথিবীর উদ্ভবকে সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষারূপে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সকল মানুষ ধর্ম এবং বাকস্বাধীনতা ভোগ করবে এবং অভাব ও শঙ্কামুক্ত জীবনযাপন করবে। মানুষ যাতে অত্যাচার ও উৎপীড়নের মুখে সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিদ্রোহ করতে বাধ্য না হয় সে জন্য আইনের শাসন দ্বারা মানবাধিকার সংরক্ষণ করা অতি প্রয়োজনীয়।’

আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোকে বাংলাদেশ সংবিধানেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং মানবাধিকারের সুরক্ষায় বিভিন্ন বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিশ্রাম ও চিত্তবিনোদন এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানবাধিকারগুলো এবং নাগরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানবাধিকারের বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ ও অলঙ্ঘনীয় হলেও সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই এ নিয়ে চলছে বাগি¦তণ্ডা ও দ্ব›দ্ব-সঙ্ঘাত। ক্ষমতাধর শাসকরা দেশে দেশে জনগণের স্বীকৃত অধিকারগুলো অবলীলায় হরণ ও দমন করে চলছে। আর দুর্বল জাতিগুলোর সাথে সবল জাতিগুলোর আচরণ আজকাল মানবাধিকারকে একটি উপহাসের বস্তুতে পরিণত করেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তা প্রতিরোধের জন্য নানা আইন তৈরি প্রাচীন ইতিহাসের অংশ। ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস দ্য গ্রেট নামে খ্যাত ব্যাবিলন আক্রমণ করেন। ব্যাবিলন আক্রমণের পর তিনি ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা নির্যাতিত দাস জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে দেন। তাদের নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনেরও ব্যবস্থা করেন। অতঃপর সাইরাসের নির্দেশে একটি সিলিন্ডার তৈরি করা হয়, যা সাইরাস সিলিন্ডার নামে অভিহিত। এতে সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা ও মানবাধিকার বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি এটিই বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার সনদ।

নৈরাজ্যকর আরব জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘মদিনার সনদ’। যে সময় মানুষের ন্যূনতম অধিকার ছিল না, ছিল না নারীর কোনো মর্যাদা, কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়াসহ গোত্রে গোত্রে রক্তপাত লেগেই থাকত- এমন একটি পরিবেশকে শান্তিময় করেছিল ‘মদিনা সনদ’। ৬২২ সালে মোহাম্মদ সা: কর্তৃক মদিনার সনদ ঘোষণার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর প্রথম লিখিত পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রকাশিত হয়েছিল। এই সনদের ৪৭টি অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলোতে মানবাধিকারের বিষয়গুলো সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করা হয়েছে। এরও পরে ইংল্যান্ডে তৈরি করা ম্যাগনা কার্টা (১২১৫), পিটিশন অব রাইটস (১৬২৮), বিল অব রাইটস (১৬৮৯) ইত্যাদি আইন তৈরি করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

মানবজাতির সম্মান ও মর্যাদার অধিকার, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি জীবনযাত্রার মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার, জীবনরক্ষণ ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, একতা, সঙ্ঘবদ্ধ ও সাম্যের অধিকার, নারী ও শিশুর অধিকার প্রভৃতি সব ব্যাপারেই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও কালজয়ী চিরন্তন আদর্শ হিসেবে ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্ট বিধিবিধান ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি পেরেছি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌল মানবিক অধিকারগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে? আমরা কি পারছি গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে? আমরা কি পেরেছি খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এই অধিকারগুলোকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে।

আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই দেখা যায় কোথাও মানুষের অধিকারকে পুরোপুরি মর্যাদা দেয়া হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশেই গত ১০ বছরে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ ও স্বাধীনতা যথেষ্ট খর্ব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের ওপর অর্পিত কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (২০১৫) তথ্য অনুযায়ী, ৭০% মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে আইনশৃঙ্খলা প্রণয়ন বাস্তবায়ন সংস্থার বিরুদ্ধে।

মানবাধিকার পদদলিত করার উদাহরণ শুধু বাংলাদেশেই নয়; তাবৎ দুনিয়ার সর্বত্রই ঘটছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো সাদাদের দ্বারা কালোরা নিগৃহীত হচ্ছে। এখনো সেই দেশে বর্ণবাদী হত্যা চলছে। কিছু দিন আগেও এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েড নিহত হন। অথচ এই সাদা-কালোর বৈষম্য দূর করার জন্য ম্যালকম এক্স, মার্টিন লুথার কিং, পল রবসন, অ্যাঞ্জেলা ডেভিস, জেসি জ্যাকসনসহ অসংখ্য মানুষ জোরালো আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। ১৮৬৩ সালে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায়, ‘গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’ শব্দ উচ্চারণ করে সাদা-কালো বৈষম্য দূর করার পক্ষে কথা বলেছিলেন। তার দুই বছর পর ১৮৬৫ সালে আততায়ীর হাতে তাকে জীবন দিতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়; আরেকজন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি প্রাণ দিয়েছিলেন সাদা-কালো বৈষম্য তুলে দিয়ে আইন প্রণয়ন করার জন্য।

ভারতে মুসলমানদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচার, নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ। খোদ শাসকের তরফ থেকেই মুসলমানদের অত্যাচার করার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের উসকে দেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারে মুসলিম রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়ে তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। তারা আজ বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। চীন তার দেশের উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্রের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তারা নাগরিক অধিকারসহ খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। তাদের অধিকারের ব্যাপারে খুব কম রাষ্ট্রের মাথাব্যথা আছে।

আমাদের দেশের কথা যদি বলি, আগস্ট ২০২০ এ একটি দেশীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, ৪৯ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন মানুষ এখন দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিস (২০১৭)-এর তথ্যমতে আনুমানিক ৩ লাখ ৮০ হাজার শিশুর রাতে ঘুমানোর সুনিশ্চিত স্থান নেই, খাওয়া পরার নিশ্চয়তা নেই আর নারী নির্যাতনের কথা তো বলাই বাহুল্য। ডিসেম্বর ২০১৯, ইউএনডিপির হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৩৫। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আমরা সবচেয়ে নিচে।

এই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা হলেও উত্তরণের জন্য শুধু বাংলাদেশেরই নয় পৃথিবীর অনেক দেশেরই আইনগত ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন দরকার, যেখানে তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যবহার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোকে পুনর্গঠন করা, ক্ষমতার বিভাজন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত, সব অনিয়মের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ আরো অন্য বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা যাতে করে ওই দেশগুলো তাদের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে মানবাধিকারের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা লঙ্ঘিত হতেই থাকবে।
harun_980@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement
সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বাণিজ্যিক ভবনে নজরদারি : বাতির ব্যবহার কমাতে নির্দেশনা বাংলাদেশে ৩ লাখ মেট্রিক টন গম রফতানি করতে চায় রাশিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু ১৬ আগস্ট ২ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে দোকান থেকে টাকা কেড়ে নেয়ার অভিযোগ এক বছরে অর্ধেক সম্পদ খুইয়েছেন এশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী! সুইস রাষ্ট্রদূত মিথ্যা বলেছেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা পদ্মায় গোসলে নেমে শিশুর মৃত্যু কাবুলের একটি মাদরাসায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ, আফগান নারী শিক্ষার অগ্রদূত নিহত যার মধ্যে নৈতিকতা নেই সে প্রকৃত মানুষ হতে পারে না : প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান

সকল