১৯ জানুয়ারি ২০২২
`
প্রাচ্যতত্ত্ব ও ইসলাম

মোস্তফা সিবাঈর বোঝাপড়া

-

(দ্বিতীয় কিস্তি)
হাদিস প্রশ্নে প্রাচ্যবিদদের আপত্তির নিরসনে সিবাঈর অবতারণা মুসলিম জ্ঞানমার্গে এক অগ্রগণ্য সংযোজন। হাদিস ও সুন্নাহ নিয়ে তার মূল বিতর্কটা ছিল পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্তির বিপরীতে। যাদের অগ্রগণ্য হচ্ছেন হাঙ্গেরিয়ান পণ্ডিত ইগনায গোল্ডযিহার (১৮৫০-১৯২১)। মুসলিম স্টাডিজ গ্রন্থে তিনি হাদিস প্রশ্নে আপত্তির যে ফর্দ খাড়া করেন, এর অসারতা চিহ্নিত করার প্রামাণ্য সূত্র, যুক্তি, তথ্য-তত্ত্ব এবং প্রতিপত্তিশীল ভাষা লক্ষ করা যায় সিবাঈর আসসুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরিয়িল ইসলামি গ্রন্থে। (ইসলামী শরিয়াহ ও সুন্নাহ নামে বাংলায় অনূদিত, এ এম এম সিরাজুল ইসলামের অনুবাদে ১৯৮৯ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। ইংরেজি ভাষায় বইটি অনূদিত হয় The Sunnah and its role in islamic legislation নামে।) এ গ্রন্থ মূলত ছিল জামে আল আজহারে তার পিএইচডি গবেষণাপত্র। পরে একে গ্রন্থরূপ দেয়া হয়। এতে সুন্নাহর সংজ্ঞা, নবীযুগে হাদিসের সংরক্ষণ, মহানবী সা:-এর ওফাতের পরে সাহাবাদের হাদিস সংরক্ষণ, হাদিসের সুরক্ষায় সাহাবিদের আত্মত্যাগ ও সাধনা, জাল হাদিসের সূত্রপাত, কারা শুরু করে জাল হাদিস রচনা, জাল হাদিস তৈরির কারণগুলো, জাল হাদিস প্রতিরোধে উলামার পদক্ষেপ ও এর ফলাফল উঠে আসে সিবাঈর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। তিনি দেখান বিভিন্ন যুগে সুন্নাহর ওপর আপতিত সন্দেহ ও এর অসারতা। প্রাচ্যবাদী বয়ান হাদিসকে যেসব বিভ্রমের ওপর ভর করে অস্বীকার করতে চায়, সিবাঈ তার অস্থিসন্ধি আলগা করে সামনে আনেন। তিনি আক্রমণ করেন এমন সব মুসলিম লেখকের ভ্রান্তিকে, যারা পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার হাতে নিজেকে সঁপে দেন এবং ইসলামী জ্ঞানের মৌলিক উৎসসূত্রগুলোর শরণ নেন না। তারা ইসলামকে বুঝতে ও বোঝাতে চান ইসলামের নিজস্ব প্রমাণ ও আলোচনাপদ্ধতিকে উপেক্ষা করে। আধুনিক মুসলিম লেখকদের চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে এ অসুখের শিকার হয় প্রাচ্যবাদের প্রভাবে। যার ফলে কুরআন-সুন্নাহ, ফিকহসহ ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো তাদের সন্দেহ ও অভিযোগের দ্বারা বিক্ষত হয়। সিবাঈ মূলত এমন কিছু মুসলিম লেখকের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি জানান, ‘১৩৫৮ হিজরিতে পশ্চিমা চিন্তায় ঔপনিবেশিক কিছু মুসলিম লেখকের সাথে আমার বার্তা বিনিময় হয়, মতের আদান-প্রদান হয়। তাদের মন-মগজ পশ্চিমা অমুসলিম পণ্ডিতদের জ্ঞানীয় বিশ্লেষণের গোলকধাঁধায় বন্দী। এ বন্দিত্ব এত প্রগাঢ় যে, এর ঘোর ও আচ্ছন্নতাজাত কুহক সরাতে আমাকে বড্ড কষ্ট করতে হয়েছে। এ কারণেই আমি ‘আস সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরিয়িল ইসলামি’ গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নিই। তাতে সুন্নাতের মর্যাদা ও অবস্থানের ওপর যুক্তিপূর্ণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানগর্ভ আলোচনার অবতারণা করেছি এবং সুন্নাহ কিভাবে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে তার ঐতিহাসিক স্তর ও পর্যায়গুলো চিহ্নিত করেছি। ইসলামের উলামা ও হাদিসের হাফিজরা সুন্নাহের সুরক্ষার জন্য এবং হাদিস পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে যে অপরিসীম ও অচিন্ত্যনীয় সাধনা করেছেন তারও আলোকপাত করেছি। বর্তমান যুগে হাদিসের ওপর হামলাকারীদের সমালোচনার যুক্তিপূর্ণ জবাব দিয়েছি; যাতে সত্যের ওপর যে কালিমা লেপন করা হয়েছে, তা দূরীভূত হয়ে বাস্তবতা স্বচ্ছ হয়ে যায় এবং পবিত্র সুন্নাতের স্বরূপ জগদ্বাসীর সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।’

সিবাঈর জবাবী প্রয়াস পশ্চিমা দুনিয়ায়ও গ্রাহ্য হয়, শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। গোল্ডযিহার আপন চ্যুতি নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হননি আর। তার শাগরেদ জুসেফ শাখত (১৯০২-১৯৬৯) অবশ্য ইসলামী ফিকহ নিয়ে আপত্তিমুখর ছিলেন। হাদিসের প্রশ্নেও নীরব ছিলেন না। তার সাথে ঘটেছিল সিবাঈর সাক্ষাৎ। শাখতের ব্যক্তিগত লাইবেরিতে সেই সাক্ষাৎকারে আলোচনা হচ্ছিল গোল্ডযিহারের ভ্রান্তি নিয়ে। শাখত মানতে রাজি নন গুরুর ভ্রান্তি। সিবাঈ হাতে নিলেন গোল্ডযিহারের গ্রন্থ এবং পাঠ করে শোনালেন ভ্রমাত্মক কিছু আলাপ। এ গ্রন্থে ইবনে শিহাব যুহরিকে (৬৭১-৭৪১ খ্রি.) ভুলভাবে হাদিসের প্রথম সঙ্কলক বলে দাবি করা হয় এবং দেখানো হয়, উমাইয়াদের খুশি করতে গিয়ে তিনি তাদের পছন্দের হাদিসগুলোকে সঙ্কলনে স্থান দিয়েছেন।

জার্মান ইহুদি প্রাচ্যবিদ শাখত ছিলেন ইসলামী অধ্যয়নে বিশ্ববিখ্যাত। সিবাঈর সামনে স্পষ্ট ভুলটা অস্বীকার করা ছিল অসম্ভব। তিনি স্বীকার করলেন, হ্যাঁ, গোল্ডযিহার ভুল লিখেছেন। কিন্তু এমন ভুল কি মুসলিম আলেমদের হয় না? সিবাঈ বললেন, গোল্ডযিহার প্রাচ্যতত্ত্বচর্চায় ইসলাম অধ্যয়নের এক স্কুল অব থটের প্রতিষ্ঠাতা। এ স্কুলের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের আলোকে ইসলামের নিরীক্ষণ। ইমাম যুহরীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়ার সময় কেন গোল্ডযিহার এই মাপকাঠি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন? গোল্ডযিহার বলেছিলেন, ইমাম যুহরী আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের বিরুদ্ধে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে খুশি করতে মসজিদে আকসার ফজিলত সংবলিত জাল হাদিস তৈরি করেছেন? অথচ এটি স্বতঃসিদ্ধ, আবদুল মালিকের সাথে ইমাম যুহরীর সাক্ষাৎ হয়েছে ইবনে যুবাইর রা:-এর ইন্তেকালের কয়েক বছর পর। জোসেফ শাখত নিরুত্তর হয়ে গেলেন এবং আলোচনা ভিন্ন প্রসঙ্গে নিয়ে গেলেন।

আপন সময়ের প্রধান প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের সাথে সিবাঈ তর্ক জারি রাখতে আগ্রহী ছিলেন। তাদের গবেষণা কেন্দ্রগুলো ভ্রমণ করতেন এবং তাদের সাথে জ্ঞানালাপ এগিয়ে নিতেন। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইসলামিক অ্যান্ড এরাবিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের প্রধান এ জে আরবেরি, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের প্রফেসর রোবসন, সুইডেনের পাবলিক ইউনিভার্সিটি ইন উপসালার প্রফেসর নির্বাজের সাথে তার বিনিময় ছিল চমকপ্রদ।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসকো ইউনিভার্সিটির এরাবিক গবেষণা বিভাগ পরিদর্শন করেন সিবাঈ, ১৯৫৪ সালে। দেখেন, ইসলামের গুরুতর বিষয়গুলোর ওপর অধ্যাপনা করছেন এমন সব শিক্ষক, যাদের আরবি জ্ঞান ও ইসলাম অধ্যয়ন নামমাত্র।

১৯৫৬ সালে দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ড. সিবাঈ পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামিক স্টাডিজের রূপরেখা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ভ্রমণ করেন। তুরস্ক, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও প্যারিসের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ওরিয়েন্টালিস্টদের সাথে মতবিনিময় করেন।

ইউরোপে দীর্ঘ ভ্রমণের পর ইসলামলিপ্ত প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের সামগ্রিক যে চিত্র সিবাঈর চোখে স্পষ্ট হয়, তার সারসংক্ষেপ রচনা করেন তিনি। তিনি লক্ষ করেন-
১. প্রাচ্যবিদরা সাধারণত পাদ্রি, সাম্রাজ্যবাদী নয়তো ইহুদি হয়ে থাকেন। এই তিন শ্রেণীর বাইরে প্রাচ্যতাত্ত্বিক খুবই কম।
২. অসাম্রাজ্যবাদী দেশের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে প্রাচ্যচর্চার ব্যাপকতা রয়েছে।
৩. অসাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রাচ্যবিদদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদীদের মতো ইসলামবিদ্বেষ বা গোঁড়ামি নেই।
৪. প্রাচ্যবাদ মূলত গির্জা থেকে প্রেরণা পায়। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে গির্জা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে অপরের সহায়ক।
৫. সাম্রাজ্যবাদী দেশ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এখনো প্রাচ্যচর্চার প্রাচীন পদ্ধতিকে এগিয়ে নিতে চায়; কারণ ইসলামী জ্ঞানের বিকৃতি ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে দুর্নাম ছড়ানোতে এটি খুব কার্যকর।

প্রাচ্যবাদের ইতিহাস ও উপকরণ নিয়ে তার লেখা ‘আল ইসতিশরাক ওয়াল মুসতাশরিকুন’ গ্রন্থটি সমাদৃত। বাংলাদেশে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অনুবাদ হয়েছে। বইয়ে আলোচিত হয়েছে; প্রাচ্যবিদ ও প্রাচ্যতত্ত্ব, প্রাচ্যতত্ত্বের ইতিহাস, প্রাচ্যতত্ত্ব উদ্ভবের নেপথ্য কারণগুলো, প্রাচ্যবাদের উপকরণ, প্রাচ্যবিদদের লেখা বই, সম্পাদিত পত্রিকা, বিখ্যাত কিছু প্রাচ্যবিদের পরিচিতি, প্রাচ্যবিদদের গবেষণা ও নিরীক্ষণের মাপকাঠিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিষয়।

সিবাঈ আপন সময়ে প্রাচ্যতাত্ত্বিক অনুশীলনে যে বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করেন, তা পরবর্তীতে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রাচ্যতত্ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জ্ঞানগত যে আক্রমে সিবাঈকে দেখা যায়, তা পরবর্তীতে এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী অরিয়েন্টালিজম গ্রন্থরচনাকে প্রণোদিত করে। সাঈদ মুসলিম ছিলেন না, আরব ছিলেন। আরবি ভাষায় সিবাঈর অবতারণাগুলো পশ্চিমা আধিপত্যের মোকাবেলায় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হতো মেধাবী ও স্বাধিকারচেতা তরুণ আরবদের কাছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে পটভূমি সাঈদকে দ্রোহী ও লড়াকু বানায়, সিবাঈ সেই পটভূমিতে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একজন।

পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের প্রতি নির্বিচার আস্থা ও ভক্তিকে টলিয়ে দেয়ার জ্ঞানগত চেষ্টা সিবাঈর অন্যতম স্বাতন্ত্র্য। এ ক্ষেত্রে তিনি কঠোরতার আদেশে আপন ভাষাকে নির্মোহ থাকতে দেননি প্রায়ই। একধরনের যুদ্ধরত অবস্থা উদযাপন করেছে তার বর্ণনাভঙ্গি, যা অ্যাকাডেমিক হিসেবে তার পরিচয়কে আহত করলেও প্রতিবাদী হিসেবে তাকে করেছে উচ্চকিত। যেসব মুসলিম স্কলার প্রাচ্যতাত্ত্বিক বয়ানে সমর্পিত ছিলেন, সিবাঈ তাদের মোকাবেলায় ছিলেন তেজিয়ান। এমনতরো পণ্ডিতদের অন্যতম ছিলেন ড. ত্বহা হোসাইন (১৮৮৯-১৯৭৩ সাল)। তিনি ছিলেন একজন আরবি সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ। ড. ত্বহা হোসাইন ওরিয়েন্টালিস্টদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন; তার ওপর প্রাচ্যবিদদের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। তিনি তার বই ‘আল আদাবুল জাহিলি’র ভূমিকায় লিখেন, ‘আরবি সাহিত্যিক বা বিশেষজ্ঞকে পশ্চিমা জ্ঞানের সেই অগ্রসরমান অবস্থানটি দেখতে হবে, যা তারা প্রাচ্যের বিভিন্ন ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্যে অর্জন করেছে। যতকাল আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে না পারি এবং ইতিহাসের ওপর তাদের বৈজ্ঞানিক আধিপত্যের অবসান না ঘটাই, তত দিন তাদের থেকেই আমাদের জ্ঞান (ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য) অন্বেষণ করতে হবে।’ তার উত্তরে ড. সিবাঈ লিখেছেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি আমাদের চিন্তাগত দাসত্বের একটি বহিঃপ্রকাশ। এর আগে আমরা আমাদের চিন্তা ও গবেষণাগত উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য এ পথ বহুবার অতিক্রম করেছি। ফলাফল যা অর্জিত হয়েছে, তা হলো দাসত্বের অধিকতরো বিস্তার।’ ত্বহা হোসাইনের গ্রন্থ ‘আল আদাবুল জাহিলি’কে তিনি নতুন চিন্তাভাবনাহীন এবং মার্গোলিয়োথের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্ধ অনুকরণ বলে আখ্যায়িত করেন।

পশ্চিমা চিন্তাধারার সাথে সমন্বয়কারী আরব চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক আহমদ আমিনের (১৮৮৭-১৯৫৪ সাল) সমালোচনায় সিবাঈ লিখেন, “তার বই ‘ফাজরুল ইসলাম’ ও ‘দুহাল ইসলাম’ এ পশ্চিমা বয়ানের অনুকারিতা ফুটে উঠেছে।” সেসব অনুকারিতাকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তিনি জবাবী প্রয়াস চালান। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিকহ বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী হাসান আবদুল কাদের সিবাঈর সমালোচনার সম্মুখীন হন। তার গ্রন্থ ‘নজরাতুন আম্মাহ ফি তারিখিল ফিকহিল ইসলামি’কে গোল্ডযিহারের ‘দিরাসাতুল ইসলামী’ ও ‘আল আকিদাহ ওয়াশ শরয়িয়্যাহ ফিল ইসলাম’-এর ‘সমন্বয়কারী’ বলে আখ্যায়িত করেন। অধ্যাপক আহমদ আমিনের মতো তিনিও প্রাচ্যতাত্ত্বিক মতামতকে নিজের মতো হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। সিবাঈর সমালোচনা অধ্যাপক আবু রাইয়াহ-এর বিভ্রান্তিও উন্মোচিত করে। তিনি হজরত আবু হুরায়রা রা:-কে নিয়ে যেসব বিভ্রান্তির বিস্তার ঘটান, সিবাঈ তার জবাব দিয়েছেন বিস্তারিতভাবে।

সিবাঈর লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশের কোঠায়। ১৯৬৪ সালে তার ইন্তেকালের আগে আপন চিন্তা ও কর্মধারার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজপথ নিশ্চিত করেন তিনি। তিনি যে সংস্কৃতির প্রস্তাবক ছিলেন, এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রূপায়ণের ছবি আঁকার চেষ্টা করেন সিবাঈ। এ যেহেতু নতুন কিছু ছিল না, ফলে ইসলামের ইতিহাস থেকেই তিনি নিয়ে আসেন আমাদের আপন সংস্কৃতির চিত্রধারা।

ইসলামী সংস্কৃতি সভ্যতার বিকাশকে কেন্দ্র করে তিনি লিখেছেন ‘মিন রাওয়ায়ি হাজারাতিনা’। (স্বর্ণযুগে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, হাফেজ মুনীরুদ্দীন আহমদ অনূদিত, আল কুরআন একাডেমি লন্ডন) পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রাণশক্তি ও ইসলামী সভ্যতার স্বাতন্ত্র্য, মুসলিমদের সাংস্কৃতিক অধঃপতন, ইসলামে সাম্যের সর্বজনীনতা, ইসলামে ধর্মীয় সহনশীলতা, যুদ্ধবিষয়ক নৈতিকতা, মুসলিমদের জনকল্যাণবিষয়ক প্রতিষ্ঠানসহ সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতিটি অধ্যায় বয়ান করেছেন ড. সিবাঈ। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা স্পেন ও অন্যান্য মুসলিম দেশের আরব সংস্কৃতিকেন্দ্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ড. সিবাঈর সমসাময়িক মদিনা মুনাওয়ারার বিখ্যাত আলেম ড. শায়খ হামিদাহ বলেন, ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা ও তার আপাত বস্তুবাদী সাফল্য দেখে যুগপৎ প্রভাবিত ও প্রতারিত তরুণদের এই বই বিশেষভাবে অধ্যয়ন করা উচিত।’

আসলে কেবল এ বই নয়, সিবাঈর গোটা জীবনধারা ছিল মুক্তিকামী মুসলিম সভ্যতার জ্ঞান, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতির বি-উপনিবেশায়নের বিরতিহীন লড়াই। এক দিকে ইসরাইলি আধিপত্য ও ব্রিটিশ-আমেরিকান-রাশিয়ান প্রভাবের বিপরীতে তার রাজনৈতিক লড়াই ছিল জনতাকে নিয়ে। অন্য দিকে পশ্চিমা মস্তিষ্কশাসন ও চিন্তাগত হেজিমনির বিপরীতে তিনি লড়ে গেছেন বুদ্ধিবৃত্তির ভাষায়, জ্ঞানের বিক্রমে। সিবাঈর আবেদন তাই এ সময়ে আরো প্রাসঙ্গিক, আরো জীবন্ত।

লেখক : কবি, গবেষক
ইমেইল : 71.alhafij@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement