০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

কোন পথে লিবিয়া, নির্বাচন কি হতে পারবে?

-

মধ্যপ্রাচ্যের একসময় সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত লিবিয়ায় অস্থিরতা নতুন এক পর্বে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেশটিতে শেষ পর্যন্ত আগামী ২৪ ডিসেম্বর নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন কি অনুষ্ঠিত হতে পারবে? সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি এবং খলিফা হাফতার ডিসেম্বরে নির্ধারিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেয়ার পর সৃষ্ট বিতর্ক লিবিয়ায় এক জটিল দৃশ্যের অবতারণা করেছে। অন্তর্বর্তী জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী আবদেল হামিদ আল দাবাইবা এবং তব্রুক-ভিত্তিক সংসদের স্পিকার আকুলা সালেহও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ঘোষণা করেছেন। গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত ও বিভক্ত লিবিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় একটি জাতীয় নির্বাচনের পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন একভাবে হয়ে গেছে। ২৪ ডিসেম্বর একই দিন প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় ঠিক করা হয়েছে। নির্বাচনের প্রক্রিয়া এর মধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। কিন্তু হাফতার বা সাইফুলের মতো যেসব প্রার্থী নির্বাচনে আসতে চাইছেন তারা কি নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন? নাকি এ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে আবারো দু’টি সমান্তরাল সরকার লিবিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে ও লিবিয়ার এসব কিছুর অনেকখানি বিদেশী খেলোয়াড়দের ইচ্ছা ও পরিকল্পনায় হচ্ছে, যার কারণে অনিশ্চয়তা খানিকটা বেশিই থেকে গেছে। এর মধ্যে দেশটিতে জাতিসঙ্ঘের মিশন এক বছর বাড়ানোর ব্রিটিশ প্রস্তাব আটকে দিয়েছে রাশিয়া। এখানে সক্রিয় রয়েছে তুরস্ক ফ্রান্স মিসর আমিরাত ও ইসরাইলের মতো রাষ্ট্রও। প্রশ্ন হলো, বিদেশী রাষ্ট্রগুলো আসলেই কী চাইছে লিবিয়ায়? তাদের স্বার্থের সঙ্ঘাতের মধ্যে শান্তি ও স্থিতি কি আসবে লিবিয়ায়?

স্বল্প লোকের তেলসমৃদ্ধ দেশ
লিবিয়া উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চলের একটি দেশ, যার উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে মিসর, দক্ষিণ-পূর্বে সুদান, দক্ষিণে শাদ, দক্ষিণ-পশ্চিমে নাইজার, পশ্চিমে আলজেরিয়া, উত্তর-পশ্চিমে তিউনিসিয়া ও মাল্টা আর গ্রিসের সাথে রয়েছে সামুদ্রিক সীমানা। সার্বভৌম এই রাষ্ট্রটি ত্রিপোলিটানিয়া, ফেজান এবং সাইরেনাইকা এই তিনটি ঐতিহাসিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত। প্রায় সাত লাখ বর্গমাইল আয়তনের লিবিয়া হলো আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম দেশ, আরব বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ১৬তম বৃহত্তম দেশ। লিবিয়ায় বিশ্বের ১০তম বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদ আছে। দেশটির ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে ৩০ লাখ বসবাস করে রাজধানী ত্রিপোলিতে। ১৫৫১ সালে অটোমান শাসন শুরু হওয়া থেকে ইতালো-তুর্কি যুদ্ধ পর্যন্ত দেশটিতে উসমানীয় শাসন অব্যাহত ছিল। এই যুদ্ধে লিবিয়া ইতালির দখলে চলে যায় এবং রোম ইতালীয় ত্রিপোলিটানিয়া এবং ইতালীয় সাইরেনাইকা (১৯১১-১৯৩৪) দুটি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। পরে ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইতালীয় লিবিয়া উপনিবেশে একীভূত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, লিবিয়া ছিল উত্তর আফ্রিকা অভিযানের একটি যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধের পর ১৯৫১ সালে লিবিয়া স্বাধীন হয়। ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির নেতৃত্বে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে রাজা ইদ্রিস ক্ষমতা থেকে উৎখাত হন। এরপর দেশটি গাদ্দাফি শাসিত একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত না হওয়া পর্যন্ত গাদ্দাফি লিবিয়া শাসন করেন। এরপর ক্ষমতা জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেসের কাছে হস্তান্তরিত হয়। ২০১৪ সাল নাগাদ দুটি প্রতিদ্ব›দ্বী কর্তৃপক্ষ লিবিয়াকে শাসন করার দাবি করে। লিবিয়া তব্রুক এবং ত্রিপোলি-ভিত্তিক সরকারের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। সর্বশেষ, দুই প্রধান যুদ্ধরত পক্ষ ২৩ অক্টোবর ২০২০-এ একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করে এবং একটি ঐক্য সরকার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। দেশটির সরকারী ধর্ম হলো ইসলাম এবং জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ সুন্নি মুসলিম।

টানাপড়েন ও উদ্বেগ বাড়ছে
লিবিয়াকে নিয়ে ভেতরে বাইরে যত টানাপড়েন বাড়ছে ততই বাড়ছে নির্বাচন ও স্থিতি নিয়ে ভয় ও উদ্বেগ। নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কট জটিলতার নতুন এক অধ্যায় হয়ে দেখা দেয়ার ভয়ও বাড়ছে। লিবিয়ান এবং অ-লিবিয়ান একাধিক পক্ষই তাদের এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। লিবিয়ায় নিযুক্ত সাবেক আন্তর্জাতিক দূত তারেক মিত্রির কথাটি লিবিয়ার সঙ্কটের প্রকৃত প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়। তিনি বলেন, ‘সবাই লিবিয়াতে নির্বাচন চায় বা দাবি করে, কিন্তু ক্ষমতা ভাগাভাগি ও শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সমঝোতা দেশের ঐক্য ও শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ কোটারি প্রতিরোধকারী জাতীয় লক্ষ্য একটি নতুন সামাজিক চুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের চুক্তির জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিস্থাপন করে না।’

লিবিয়ায় নিযুক্ত অন্য এক দূত ঘাসান সালামেহ বলেছেন যে, ‘নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা এবং সহিংসতার মাধ্যমে তা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টার চেয়ে গণতন্ত্রের জন্য খারাপ আর কিছু নেই। এর উদাহরণ আজ ইরাক এবং ইথিওপিয়া। আর এর আগে এমন অনেক দেশের দৃষ্টান্ত রয়েছে, যাদের ব্যালট বাক্সে পরাজিতরা শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল আর এতে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধে তাদের দেশ ছিনভিন্ন হয়ে গেছে অথবা বিভক্ত শাসনে ছিটকে পড়েছে। এতে স্টেডিয়াম ধ্বংসের মাধ্যমে শেষ হওয়া ম্যাচে সবাই হেরে গেছে।’

লিবিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার বর্তমান সূচি নির্ধারণের আগে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে এর জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল; কিন্তু ‘যুদ্ধবাজ’ হিসেবে পরিচিত খলিফা হাফতার পশ্চিম লিবিয়া দখলের অভিযান চালানোর কারণে এটি বিলম্বিত হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে এ সংক্রান্ত মূল চুক্তিতে সম্মত হওয়া চারজন হলেন : ফয়েজ আল সাররাজ (ন্যাশনাল অ্যাকর্ড সরকারের প্রধান), খলিফা হাফতার (লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রধান), আকুলা সালেহ ঈসা (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের প্রধান), এবং খালিদ আল মিসরি (হাইকাউন্সিল অব স্টেটের প্রধান)। এটি সমর্থিত হয়েছিল লিবিয়ার জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক পর্বের জন্য সেন্টার ফর হিউম্যানিটারিয়ান ডায়ালগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দ্বারা, যেখানে বলা হয় যে, পরামর্শমূলক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী লিবিয়ানরা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্লান্তি এবং হতাশা প্রকাশ করেছে। আর তারা একটি অথবা অন্যান্য বৃহত্তর পরিসরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছে।

লিবিয়ান নির্বাচন নিয়ে হতাশার কারণ শুধু পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে লিবিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে অব্যাহত বিভাজনই নয়, নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য বিবদমান লিবিয়ার দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্যের অনুপস্থিতিও এর কারণ। আইনগতভাবে এই নির্বাচনগুলির জন্য একটি সাংবিধানিক ভিত্তির অনুপস্থিতিও রয়েছে, সেই সাথে এই নির্বাচন নিয়ে এখনো বহু কঠিন প্রশ্ন রয়ে গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর লিবিয়ান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হানান সালাহ এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে কয়েকটির কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে, লিবিয়ান কর্তৃপক্ষ কি ভোটার, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জবরদস্তি, বৈষম্য ও ভয়ভীতি মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে? যেহেতু নির্বাচনের নিয়ম নির্বিচারে সম্ভাব্য ভোটার বা প্রার্থীদের বাদ দিতে পারে, কর্তৃপক্ষ কিভাবে ভোটকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে? ভোটকেন্দ্রের জন্য কি একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের রয়েছে? বিচার বিভাগ কি নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম?

নির্বাচনের সংগঠকরা কি নিশ্চিত করতে পারেন যে, স্বাধীন পর্যবেক্ষক নিবাচনে থাকবে? এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ভোটদানের জায়গায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যাবে কি? উচ্চ জাতীয় নির্বাচন কমিশন কি ভোটার রেজিস্টারের একটি স্বাধীন ও বাইরের নিরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে? তিনি এসব প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, লিবিয়ার এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করা হলে এর সবই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হবে।

প্রয়োজন বিদেশী পক্ষের আন্তরিকতা
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, লিবিয়ার পরিস্থিতির পেছনে যেহেতু বাইরের দেশের ব্যাপক হস্তক্ষেপ রয়েছে তাই নির্বাচনের একটি অনুকূল পরিস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য বিদেশী পক্ষগুলোর আন্তরিক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ আন্তরিকভাবে লিবিয়ার পরিস্থিতির একটি সমাধান চাইছে বলে মনে হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ইতালি বা জার্মানি লিবিয়ার সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করে বলে মনে হয়। কিন্তু লিবিয়ায় অন্য যেসব পক্ষ এর সাথে যুক্ত তার মধ্যে বিশেষভাবে রাশিয়া ফ্রান্স মিসর বা ইসরাইল-আমিরাত তাদের স্বার্থ নিশ্চিতভাবে পূরণের গ্যারান্টি চায়। নতুন সরকার যদি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার নিশ্চয়তা দেয় তাহলে ইসরাইল লিবিয়ার শান্তিপূর্ণ রূপান্তরকে সমর্থন করবে। আর মুসলিম বিশ্বে ইসরাইলের নীতি বাস্তবায়নের টুলস-দেশ হিসেবে আমিরাতের এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। মিসর তার নিকট প্রতিবেশী এই দেশে বিশেষত লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে তার স্বার্থের গ্যারান্টি চায়। এটি প্রত্যাশিত ছিল যে, মিসরীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দাবাইবা এবং হাফতার মিলিত হবেন, তবে হাফতার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। দাবাইবার উত্থানে হাফতারের প্রভাবের ক্ষেত্রগুলোতে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। আর মিসর যে বৈঠকের আয়োজন করতে চেয়েছিল তা যদি হয় তবে হাফতার সরকারকে বেনগাজিতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে বাধা দিতে পারবে না। তবে দাবাইবা সরকারের সাথে মিসরের অর্থনৈতিক সুবিধার বেশ কয়েকটি চুক্তি লিবিয়ার সঙ্কটের প্রতি মিসরীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়।

ত্রিপোলির সাথে সম্পর্ক সুসংহত করা এবং অর্থনৈতিক চুক্তির অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে বিগত বছরগুলোতে মিসর লিবিয়ার পূর্বে তার মিত্রদের যে সমর্থন দিয়েছিল, তার আপেক্ষিক পতন বিভিন্ন পরিবর্তন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথমটি ছিল আমেরিকান প্রবণতা। এই অঞ্চলে সঙ্ঘাত শান্ত করার ক্ষেত্রে মিসরীয়-তুর্কি সমঝোতা এবং তুরস্ক ও কাতারের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় ফ্রন্টের বিচ্ছিন্নতা, কিন্তু আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক অবস্থানে এই উন্নয়ন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরে একটি ভিন্ন রুশ অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরাইল যেন হয়ে উঠেছে সেই গেটওয়ে যেখান দিয়ে আরব দেশগুলোতে শাসন করতে আগ্রহীদের যেতে হবে। খলিফা হাফতারের ছেলে ইসরাইলের ইহুদিবাদী কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করার জন্য তেল আবিবে গিয়েছিলেন ক্ষমতার লড়াইয়ের তার পিতার জন্য সমর্থনের নিশ্চয়তা পেতে। যখন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় যে তিনি ক্ষমতায় পৌঁছানোর পরে ইসরাইলকে লিবিয়ায় পরিচালনা করার জন্য একটি ফাঁকা চেক দেবেন। একই সাথে গাদ্দাফি জুনিয়রের একই পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না যে, কারণ তার পিতার সময় থেকে বেশ কিছু ইসরাইলির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ছিলেন গাদ্দাফি সিনিয়র এবং জায়নবাদীদের মধ্যে যোগসূত্র।

লিবিয়ার জন্য এটা লজ্জাজনক এবং অসম্মানজনক যে প্রত্যেক শাসককে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে তেল আবিব যেতে হবে ইসরাইলের আশীর্বাদ পেতে এবং জায়নবাদীদের কাছে নতজানু হতে হবে। ইহুদিবাদী সত্তার প্রতি আনুগত্য ও আনুগত্যের অঙ্গীকার করাই তাদের অবস্থান রক্ষা করা এবং তাদের চেয়ার রাখার একমাত্র উপায় যেন হয়ে উঠেছে।

লিবিয়ায় এখনো দুটি শিবিরের মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ বিভাজন রয়ে গেছে। বিদেশী বাহিনী এবং ভাড়াটে সৈন্যরা লিবিয়ার মাটি ছেড়ে যায়নি। বাইরের একটি পক্ষের লক্ষ্যই হলো, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে গণতন্ত্র বা নিয়মতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা বা চলমান থাকতে না দেয়া। গণতন্ত্র সফল হলে তা রাজতন্ত্র বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলোর জন্য সঙ্কট নিয়ে আসতে পারে। এই শক্তিটি মিসরে হস্তক্ষেপ করে সামরিক একনায়কত্ব ফিরিয়ে এনেছে। সিরিয়া ইয়ামেনে ক্ষতবিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াতে ভ‚মিকা পালন করেছে। তিউনিশিয়ায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে একনায়কত্ব ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছে। সুদানে সামরিক বাহিনীকে দিয়ে আরেক দফা অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছে। লিবিয়া শাসনের জন্য খলিফা হাফতার প্রকল্প তাদেরই নেয়া। এখন গাদ্দাফিপুত্র বা খলিফা হাফতারকে নির্বাচনের দৃশ্যপটে নিয়ে আসা তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের কেউ কেউ একটি ভীতিকর ধারণা ছড়িয়ে দিতে চায় যে, একটি লৌহমুষ্টি ও একনায়ক ধরনের ব্যক্তির নেতৃত্বই লিবিয়ায় স্থিতি আনতে পারে।

বিদেশী শক্তিগুলো কী চায়?
অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে, নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় জাতিসঙ্ঘ মিশনের মেয়াদ এক বছরের জন্য রিনিউ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রিটেনের তৈরি করা একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে ব্রিটিশ-রাশিয়ান বিরোধে শুধু চলমান কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিরোধটি যুদ্ধাপরাধীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বিদেশী বাহিনী ও ভাড়াটে সৈন্যদের প্রস্থান সংক্রান্ত বিষয়টি প্রস্তাবে থাকার উপর ভিত্তি করে দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশ খসড়া প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন রুশ অবস্থানের কঠোরতা বোঝা যায়, সাইফ গাদ্দাফির রাজনৈতিক ভূমিকার বিরোধিতা করার আমেরিকান অবস্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি হয়েছে বলে মনে হয়। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সাইফ গাদ্দাফির প্রার্থিতা বিশ্বের জন্য একটি সমস্যার প্রতিনিধিত্ব করে আর রাশিয়া তার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্ড হিসেবে বাজি ধরছে যার মাধ্যমে লিবিয়ায় তার আগের প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে চায় মস্কো। বিশেষ করে হাফতারের ভূমিকার পতনের সাথে সাথে রুশ প্রভাব যে কমেছে সেটিকে পুনরুদ্ধার করতে চায় তারা।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নিয়ন্ত্রণকামীদের কাছে লিবিয়া এক আকর্ষণীয় দেশ। জনসংখ্যা ৭০ লাখেরও কম; কিন্তু আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল-গ্যাসের রিজার্ভ আছে এখানে। এর অবস্থান ইউরোপের ঠিক উল্টো দিকেই। এখানকার হাইড্রোকার্বন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সরাসরি রফতানি হতে পারে। অন্যদিকে উপসাগরীয় এলাকার প্রতিদ্বন্দ্বী তেল-গ্যাস উৎপাদকদের জাহাজগুলোকে আসতে হয় বিপজ্জনক সমুদ্রপথ দিয়ে।

সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সেররাজকে সমর্থন করছে তুরস্ক, কাতার ও ইতালি। জেনারেল হাফতারকে সমর্থন করে আরব আমিরাত, জর্দান, মিসর, রাশিয়া ও ফ্রান্স। এখন দৃশ্যত সব পক্ষই ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে, যার মাধ্যমে একটি একক সরকার লিবিয়ার কর্তৃত্ব গ্রহণের কথা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র একেক সময় একেক রকম রাজনৈতিক সঙ্কেত দেয়। কখনো ত্রিপোলির সররাজ, কখনো বেনগাজির জেনারেল হাফতারকে উৎসাহ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার হওয়ার পর জাতিসঙ্ঘের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগকে বাইডেন প্রশাসন সমর্থন করছে বলে মনে হয়; যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ভয় রয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো লিবিয়ায় নিজের প্রভাব কায়েম করবেন, ঠিক যেভাবে তিনি সিরিয়ায় করেছেন।

২৪ ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে খলিফা হাফতারকে এক সময় রাশিয়া আমিরাত মিসর ফ্রান্স সবাই সমর্থন করেছিল। এখন রাশিয়া সাইফুল ইসলাম গাদ্দাফি, মিসর আকুলা সালেহ এবং ইসরাইল-আমিরাত খলিফা হাফতারকে সমর্থন করছে বলে মনে হয়। আঙ্কারা সম্ভবত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফাতিহ বাসাংঘা প্রেসিডেন্ট হলে বেশি স্বস্তি অনুভব করবে। তুরস্ক অবশ্য কোনোভাবেই চাইছে না খলিফা হাফতার ক্ষমতাশালী হয়ে উঠুক আবারও।

প্যারিস সম্মেলনের বার্তা
লিবিয়া নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্যারিস সম্মেলনও নির্বাচন অনুষ্ঠান বা স্থগিত করার গিঁট খুলতে সক্ষম হয়নি। এতে লিবিয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল। গত ১২ নভেম্বর দুই ডজনেরও বেশি নেতার একটি দল ঘোষণা করেছে, লিবিয়া জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যার অর্থ উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে ছয় বছরের গৃহযুদ্ধের পর স্থিতিশীলতা আসবে।

ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লিবিয়ার পরিকল্পিত নির্বাচনকে ট্র্যাকে রাখার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বৈঠকের জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলসহ অন্য নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানান। এই সম্মেলনে বিশ্ব শক্তিবর্গ বলেছে যে, তারা ২৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া লিবিয়ার নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। অবশ্য একই দিনে সংসদীয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানানো থেকে তারা বিরত থাকে। লিবিয়ায় জাতিসঙ্ঘ মিশনের মধ্যস্থতায় অক্টোবরের একটি যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় চুক্তির সরকার এবং বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির মধ্যে লড়াই থামিয়ে দেয়। দেশব্যাপী নির্বাচনের জন্য দেশকে প্রস্তুত করতে ফেব্রুয়ারিতে একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী এবং তিন সদস্যের রাষ্ট্রপতি পরিষদ নির্বাচিত হয়। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় জোরপূর্বক এবং ভয়ভীতি ছাড়াই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে।

প্যারিস সম্মেলনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তি বা সত্তা, লিবিয়ার অভ্যন্তরে বা বাইরে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাধা দেয়া, দুর্বল করা, কারচুপি বা মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে তারা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নেবে। ১২ নভেম্বরের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের এক ভিডিও বার্তায়, জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস লিবিয়ার কর্মকর্তাদের তাদের নিজস্ব স্বার্থের চেয়ে জাতির মঙ্গলকে এগিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যেকোনো পক্ষ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি নষ্ট করে বা নাশকতা করে, তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

শঙ্কা কোথায়?
লিবিয়া যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে পারে তা হলো, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা এর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আবারো দেশের পূর্বে একটি সরকার এবং পশ্চিমে আরেকটি সরকার গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই দ্বৈধতা মুছে ফেলা হয়েছিল আবদেল হামিদ আল দাবাইবার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য সরকারের মধ্য দিয়ে। এর ব্যত্যয় ঘটলে আবারো লিবিয়ার তেল রফতানি বন্ধের হুমকি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে যদি বিদেশী বাহিনী এবং ভাড়াটেরা এই বা সেই দলটিকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। আর সাইফুল গাদ্দাফি এবং হাফতারের মতো সমস্যাযুক্ত প্রার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে একটি সহিংস গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও একেবারে অমূলক হবে না। তাদের প্রার্থীরূপে ঘোষণার পরে হাই ইলেক্টোরাল কমিশনের কয়েকটি দফতরে যে হামলা হয় তা কেবল এমন একটি ভীতিকর সম্ভাবনার পূর্বাভাস দিয়েছে, যা উপজাতীয় ও আঞ্চলিক সংবেদনশীলতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

কেউ কেউ ভাবেন, নির্বাচন পেছানো হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হলো বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যেহেতু এর সততার সমস্যাগুলো মোকাবেলার জন্য সময় খুব কম। এসব শঙ্কা অনুমানের মধ্যে, লিবিয়ান এবং এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোও যারা তাদের ভালোবাসে তাদের শ্বাস আটকে আছে একরাশ অনিশ্চয়তায়।

mrkmmb@gmail.com



আরো সংবাদ


ঢাকা টেস্ট : ২য় দিনের খেলা শুরু শৈলকুপায় আমগাছে ঝুলন্ত স্কুলছাত্রীর লাশ, পরিবারের দাবি হত্যা ভোলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২ পাইকগাছায় জাওয়াদের প্রভাবে দু'দিনের অব্যাহত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত ইন্দোনেশিয়ার সেমেরু আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত, মৃত ১৩ বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্ক যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো : রাষ্ট্রদূত লাভজনক কবুতর পালনে আগ্রহী শায়েস্তাগঞ্জের যুবকরা! সুদানে নির্বাচনের পর রাজনীতি ছাড়বে সেনাবাহিনী : বুরহান পদ্মায় নাব্যতা সঙ্কট, শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি নৌরুটে চালু হচ্ছে না ফেরি চলাচল চট্টগ্রামে হাফ ভাড়া ১১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর নোয়াখালীতে ট্যাংকারের চাপায় গৃহবধূ নিহত

সকল

ইসরাইলকে ইরানে গোয়েন্দা অভিযান চালাতে নিষেধ করল যুক্তরাষ্ট্র (১৪২৯২)‘ওমিক্রন’ থেকে বাঁচাতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করলেন চিকিৎসক (১১০২৯)ইরান ইস্যুতে আমেরিকা একঘরে হয়ে পড়েছে : ব্লিঙ্কেনের স্বীকারোক্তি (১০২১৩)এরদোগানকে হত্যার চেষ্টা! (৮০৯০)রুশ অস্ত্র কিনলে নিষেধাজ্ঞা, ভারতকে বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের (৭৯১৫)বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না (৭৮৩৪)পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হেরেও খুশি পাপন (৭২৬৯)যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি : প্রতিবেশীর ঘরে অস্ত্র ঢোকালে যুদ্ধ বাধবে (৬৫০৭)‘বুথে নয়, নৌকার ভোট হবে টেবিলের উপরে, পুলিশ প্রশাসনকে সেভাবেই দেখবো’ (৬০০১)জ্বর নেই, স্বাদ-গন্ধও ঠিক আছে! ওমিক্রন চেনার সহজ উপায় (৫৮২৬)