০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

স্মরণীয় মেজর এম এ গণি

-

একজন বাঙালি বীর সেনানীর কথা লিখছি, যার দেশপ্রেম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্মের সাথে জড়িয়ে আছে। যে সেনাবাহিনী আজ পৃথিবীর সর্বত্র বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে উড্ডীন করেছে । এ সেনাবাহিনীর যারা বীজ বপন করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি।

পাকিস্তান থেকে আমাদের স্বাধীনতার জন্য এক দিকে যেমন রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছেন নেতারা; তেমনিভাবে পাকিস্তান কায়েম হওয়ার বহু পূর্ব থেকেই তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে বাংলা ও আসামের অবহেলিত মুসলমানদের জন্য ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরিরত দুঃসাহসী কিছু বাঙালি মুসলমান সামরিক অফিসার এ ভূখণ্ডের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ে ও সামরিক বাহিনীতে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এসব বীর সূর্য সন্তানদের অন্যতম হলেন মেজর আবদুল গণি। তিনি ‘টাইগার গণি’ নামেই বেশি পরিচিত।

১৯৪৭ সালের আগে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের সেনাবাহিনীতে বড় বড় সব জাতিগোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে তাদের জাতির বা এলাকার নামে সামরিক রেজিমেন্ট ছিল । যেমন পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, আসাম রেজিমেন্ট, ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট, বালুচ রেজিমেন্ট, শিখ রেজিমেন্ট, হায়দরাবাদ রেজিমেন্ট প্রভৃতি। ছিল না বাঙালি জাতির কোনো রেজিমেন্ট। বাংলার আকাশ যখন ঘন কালো মেঘে অন্ধকারাচ্ছন্ন, এক দিকে ব্রিটিশ বেনিয়াদের দুঃশাসন, শোষণ, নীলকরদের অত্যাচার; অন্য দিকে এ দেশী ও হিন্দু জমিদারদের দৃষ্টিতে ম্লেছ বা অচ্ছুৎ মুসলমান জাতি নিগৃহীত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, ঘোর দুর্দিনে ও সঙ্কটে নিপতিত। ওই সময় মেজর গণি ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে বাঙালি মুসলমানদের অংশীদারিত্ব বাড়ানো ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে এ প্রচেষ্টা আলোর মুখ না দেখলেও পাকিস্তান কায়েম হওয়ার সূচনালগ্নেই তা বাস্তবায়িত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল।

১৯১৫ সালের পয়লা ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নাগাইশ গ্রামে মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণির জন্ম। বাবা মোহাম্মদ সরাফত আলী ছিলেন কৃষিজীবী ও মা জোবেদা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী। জন্মের আড়াই বছর পরেই তার মমতাময়ী মা ইন্তেকাল করেন। সৎভাই মো: সিদ্দিকুর রহমানসহ তারা ছিলেন দুই ভাই ও দুই বোন।

ইসলামী সংস্কৃতি ও জীবনধারার মধ্যেই শৈশব, কৈশোর জীবন অতিবাহিত করেন। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী তাকে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়; যা তার বাকি জীবনের প্রতিটি কাজে এর প্রতিফলন ঘটে। কিছু দিন তিনি স্কুলেও পড়াশোনা করেন। স্থানীয় শিদলাই জুনিয়র মাদরাসায় পড়াশোনা শেষ ও চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করার পর তাকে চট্টগ্রামে ইসলামিয়া হাই মাদরাসায় ভর্তি করানো হয়। মাদরাসায় পড়াশোনা করার সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিতেন এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শৈশবেই তার মধ্যে সমাজসেবা, খেলাধুলা ইত্যাদির প্রতি প্রবল আকর্ষণ লক্ষ করা যায় এবং এর মাধ্যমে তার নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার সময়েই তিনি স্থানীয় ছাত্রদের সঙ্ঘবদ্ধ করে খেলাধুলা, কুচকাওয়াজ, জনসেবা প্রভৃতি কর্মকাণ্ড নিয়ে মেতে থাকতেন। চট্টগ্রামে ইসলামিয়া হাই মাদরাসায় অধ্যয়নকালে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে মহানবীর সা: ‘হিলফুল ফুজুল’-এর অনুকরণে গড়ে তোলেন ‘সবুজ কোর্তা’ নামে সমাজসেবামূলক এক সমিতি। ‘সবুজ কোর্তা’কে তিনি এমন একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যার মাধ্যমে তরুণদের সামরিক রীতিনীতির ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে একে আধা সামরিক বাহিনীতে পরিণত করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি সামরিক নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে থাকেন।

এম এ গণির ছাত্রজীবন কেটেছে আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। আর্থিক অভাবের সময় এগিয়ে আসেন চট্টগ্রামের মহকুমা প্রশাসক হামিদ হাসান নোমানী, যিনি ছিলেন অবাঙালি ও অত্যন্ত উঁচু মানের মানবহিতৈষী ব্যক্তিত্ব। গণিকে তিনি তার ছেলের সাথে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি করে এবং নিজ বাড়িতে জায়গির হিসেবে থাকা-খাওয়া, ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে দেন। এরই মধ্যে জনাব নোমানীর খুলনা জেলায় বদলি হওয়ায় গণিকেও তিনি সাথে নিয়ে নিজ ছেলের সাথে খুলনা জিলা স্কুলে ভর্তি করে দেন।

১৯৩৬ সালে এ স্কুল থেকেই তিনি এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং এখানেও তার আর্থিক সঙ্কট ছিল। তার মামা ডাক্তার সোবহান বার্লিন ইউনিভার্সিটি থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করে কলকাতায় চলে আসেন এবং এগিয়ে আসেন ভাগ্নের সহযোগিতায়। ইসলামিয়া কলেজ থেকে তিনি ১৯৩৮ সালে আইএ ও ১৯৪০ সালে বিএ পাস করেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ইসলামিয়া কলেজে বিএ অধ্যয়নকালে এম এ গণির সহপাঠী ছিলেন।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপ্রাণ প্রচেষ্টায় ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করা হয়, ইতিহাসে যা ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিত। ফলে মুসলমানরা উজ্জীবিত হয়ে নতুন জীবন লাভ করার মতো পরিবেশ পেতে শুরু করে। ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির উন্নতি ও প্রসার হতে থাকে। এতে হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতা ম্লান হতে থাকে, হিন্দু জমিদারদের প্রভাব কমতে থাকে ও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। প্রজাকুল মুসলমানদের এ উন্নতি হিন্দু জমিদার ও জাতীয়তাবাদী উগ্রপন্থীরা কোনোক্রমেই সহ্য করতে পারছিল না। তাই ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ করার জন্য হিন্দু জনগোষ্ঠী সম্মিলিত ভাবে তীব্র গণ-আন্দোলন শুরু করে । কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন।
তিনিও ‘বঙ্গভঙ্গ’ তথা মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। কেননা কুষ্টিয়ার শিলাহদহে তার ছিল বিশাল জমিদারি। মুসলমান প্রজাদের শোষণ করার মাধ্যমেই তার জমিদারি গড়ে ওঠে। তার নেতৃত্বে ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ আন্দোলন আরো বেগবান হয় এবং একসময়ে তা অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত হয়। অবশেষে ইংরেজ শাসকরা হিন্দুদের আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে ১৯১১ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ ঘোষণা করে। সেই সময়ে হামিদ নোমানীর মতো সরকারি কর্মকর্তা ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিত্ব এগিয়ে না এলে এম এ গণির প্রতিভা হয়তো আলোর মুখ কখনো দেখত না। অতএব, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে মেজর গনি তার সব ক্ষমতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবহেলিত মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য সাহসিকতার সাথে কাজ করে গেছেন।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন বেজে উঠল, এম এ গণি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিং কমিশন অফিসার পদে যোগদান করার জন্য আবেদন করলেন । সব পরীক্ষায় সফলতা অর্জন করার পর প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হলে তিনি ফায়ার ব্রিগেডের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে ভারতীয় পাইওনিয়ার কোরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে তিনি কমিশন লাভ করেন। শুরু থেকেই কর্তব্যপরায়ণ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী, তীক্ষè বুদ্ধিমান, নির্ভীক, বিনয়ী, কৌশলী গণি সিনিয়র ব্রিটিশ অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৪৩ সালে তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। এ সময় তাকে বার্মার আরাকানে জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন করার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তার পারফরম্যান্সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন সন্তুষ্ট। কিন্তু বিধিবাম। একসময় জাপানের একটি ডিভিশন ক্যাপ্টেন গণির ইউনিটকে আক্রমণ করে চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। বুদ্ধিমত্তা ও রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন।

মহাযুদ্ধ শেষ হলে ১৯৪৬ সালে ক্যাপ্টেন গণিকে ভারতের ঝালনায় কোর সেন্টারে বদলি করা হয়। এ সময়ে তিনি দাক্ষিণাত্যের বিশাখাপট্টম, হায়দরাবাদ, সেকান্দারাবাদ ও মুম্বাইতে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তির দায়িত্ব পালন করেন; যা তার জীবনে বড় ধরনের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগে। এখানে তিনি ১২৫৬ ও ১৪০৭ দু’টি পাইওনিয়ার কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ব্রিটিশ জেনারেল মেসারভি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। আগগে থেকেই তিনি ক্যাপ্টেন গণিকে চিনতেন মহাযুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য। সে সুবাদে তিনি জেনারেল স্যার মেসারভিকে বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে একটি রেজিমেন্ট গঠন করার অনুরোধ জানিয়ে একটি ডেমি অফিসিয়াল পত্র লিখেন। এ পত্রের সাথে তিনি সব তথ্য ও যুক্তি পেশ করে ২০ পৃষ্ঠার একটি স্মারকলিপিও পেশ করেন। মেসারভি এ প্রস্তাবকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছিলেন এবং এ পত্রের উত্তরে জানান, ‘আমি আশা করি বিশ্বকে তোমরা দেখাতে পারবে বাঙালি মুসলমান সৈনিকরা অন্যান্য সৈনিকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’ ঝালনার কোর সেন্টারের অধিনায়ক লে. কর্নেল মারিয়াটি বাঙালি রেজিমেন্ট গঠনের বিষয়ে ক্যাপ্টেন গণিকে পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ক্যাপ্টেন গণির অধীনে ১২৫৬ ও ১৪০৭ পাইওনিয়ার কোম্পানি দু’টি বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত ছিল বলে এগুলো পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধীনে প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ১৯৪৭ সালে ক্যাপ্টেন গণির নেতৃত্বে কোম্পানি দু’টি বিশেষ ট্রেনে মুম্বাই থেকে ঢাকায় আনা হয়।

পাকিস্তান জন্মলাভের শুরুতেই সরকার ক্যাপ্টেন গণি ও আরো অনেকের ইচ্ছানুযায়ী বাঙালি মুসলমানদের জন্য একটি রেজিমেন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; যার নামকরণ করা হয় ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। ১৯৪৭ সালে ক্যাপ্টেন গণি ও ক্যাপ্টেন এস ইউ খানকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে এ ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মেজর এ ডব্লিউ চৌধুরী ও মেজর সাজাউয়াল খানকে এ ইউনিটের দু’টি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ক্যাপ্টেন গণি ও অন্যান্য অফিসারের আপ্রাণ চেষ্টায় মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল গঠনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সেনা অফিসার লে. কর্নেল ভি. জে. ই, প্যাটারসনকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে নিয্ক্তু করা হয়। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলায় বাঙালি মুসলমানদের বহু প্রতীক্ষিত সে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয় । এ ঐতিহাসিক দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল। তিনি ভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানি সিনিয়র আর্মি অফিসারদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এর পরই ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালেই প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় এবং মেজর গণি হলেন এ অদৃশ্য আন্দোলনের মহানায়ক। ইস্ট বেঙ্গল থেকে তাকে বদলি করা হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড, দিনাজপুরে। সর্বশেষ তাকে ১৪ ডিভিশন হেডকোয়ার্টার, ঢাকায় বদলি করা হয়। যথাযথ মূল্যায়ন ও পদোন্নতি না হওয়ায় ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। অবসরকালীন সময়ে ক্যাপ্টেন গণিকে তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অবসরোত্তর (retrospective) ‘মেজর’ পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

মেজর গণির নতুন জীবন শুরু হয়। অযথা সময় ক্ষেপণ না করে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে কাজে লাগানোর জন্য তিনি রাজনীতিতে নেমে পড়েন। সহসা রাজনীতিতে উদীয়মান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, জুলুম, নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির পথ হিসেবে ইসলামী জীবনাদর্শকেই একমাত্র পথ হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। ইসলামকেই তিনি মানুষের জন্য একমাত্র প্রকৃত জীবনবিধান হিসেবে গণ্য করতেন। তাই তিনি একটি প্রকৃত ইসলামী দল গঠনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন; যার নাম দেয়া হয়েছিল ‘ইসলাম লীগ’।

১৯৪৩ সালে তার বড় মামার প্রথম মেয়ে আছিয়া খাতুনের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন তিনি। প্রথম ছেলে কর্নেল তাজুল ইসলাম গণি ও ছোট ছেলে লে. কর্নেল খালেদ গণি। উভয়েই তাদের বাবার সৃষ্ট ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ছিলেন। তার সন্তানরা সবাই সমাজে বাবার মতো আদর্শ মানুষ।

ক্ষণজন্মা এ নির্ভীক বীরপুরুষ, সামরিক অফিসার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাত্র ৪২ বছর এ নশ্বর দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন। ১৯৫৭ সালের ২৯, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড ভেটার্ন্স ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিতে জার্মানির বার্লিনে যান। এ সম্মেলনে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উদ্দীপনামূলক ভাষণ দেন। একপর্যায়ে তিনি আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১১ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার কাছে গমন করেন। তার লাশ দেশে আনার পর যথাযথ সামরিক মর্যাদায় কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসে দাফন করা হয়।
লেখক : সামরিক ইতিহাস ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email : hoque2515@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement