০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

আর্থিক খাতে জালিয়াতি


বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণেই দেশে অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। রাষ্ট্রাচারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর্থিক খাতগুলোও এ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। বিশেষ করে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির কবলে পড়েছে ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও সুশাসনের অভাবেই ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা হলেও সেগুলোর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে জড়িতরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। জালিয়াত চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় নতুন করে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১৩৫টি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্ত করে দ্রুত মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নয়টি গ্রুপ, দু’টি ব্যাংক ও এক ব্যক্তির নামে ৩১ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, অ্যানন টেক্স গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, সিটিসেল, সানমুন গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ, ইমাম গ্রুপ এবং পিকে হালদার। এ ছাড়াও ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে দু’টি। ব্যাংক দু’টি হচ্ছে বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংক। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দাবি করেছে, মামলায় বিচার ত্বরান্বিত করতে সার্বিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু দুদকের দাবি, কথামালার ফুলঝুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকেও বিভিন্ন ঋণ জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে দুদকে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। দুদক সেগুলোর আলাদা আলাদা ঘটনা পুনরায় অনুসন্ধান করে মামলা করছে। ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৫টি মানিলন্ডারিং মামলার অনুসন্ধান করেছে দুদক। এর মধ্যে ৩৫টির কাজ শেষে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অনেক মামলায় আসামিরা সাজা পেয়েছেন। কিন্তু মামলার সংখ্যা ও অপরাধ অনুযায়ী সাজার ঘটনা মোটেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের নয়।

সূত্র জানায়, হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকসহ ২৬টি ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে ব্যাংক। এদিকে জালিয়াতির ঘটনায় অনুসন্ধান করে ২০১৩ সালে ৪০টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ফান্ডেড বা সরাসরি ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ৩৮টি এবং নন-ফান্ডেড বা পরোক্ষ ঋণের জন্য দু’টি। ২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ৩৮ মামলার চার্জশিট দেয় সংস্থাটি। এগুলোতে হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের আত্মীয় ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ এবং সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দায়ী ৩৫ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে। প্রায় আট বছরে ৪০টি মামলার মধ্যে নিম্ন আদালতে রায় হয়েছে মাত্র একটি মামলার। এতে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন-হলমার্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্যারাগন নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম রাজা, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ও সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলার কর্মকর্তা সাইফুল হাসান।

বাকি মামলাগুলো এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় এক হাজারের বেশি সাক্ষী রয়েছে। মামলার শুনানির দিন সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না বলে বিচারকার্য বিলম্বিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। দায়েরকৃত মামলায় হলমার্কের চেয়ারম্যান, এমডি ও জিএমসহ কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ূন কবীরসহ অনেকে পলাতক। হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় তিন বছরের জেল হয়েছে যা পর্বতের মুষিক প্রসব বলেই মনে করা হচ্ছে। জানা গেছে, হলমার্ক গ্রুপের নন-ফান্ডেড এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার তদন্ত করছে দুদক। তদন্ত শেষ হলে আরো মামলা হবে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে বা আদৌ শেষ হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় দেখা দিয়েছে। ফলে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

বিসমিল্লাহ গ্রুপ ২০১৩ সালে পাঁচটি ব্যাংক থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পুরো অর্থই বিদেশে পাচার করেছে। এসব ঘটনায় দুদক ১২টি মামলা করেছে। সবক’টি মামলার আসামি গ্রুপের এমডি খাজা সোলেমান চৌধুরী। এর মধ্যে একটির রায় হয়েছে। এতে গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাসিব, ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলেমান চৌধুরীসহ ৯ জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে। একই সাথে দ্বিগুণ অর্থ জরিমানা করা হয়েছে। এর পরিমাণ ৩০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। বাকি মামলাগুলো বিচারাধীন থাকলেও আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো অগ্রগতি নেই।

একটি সরকারি ব্যাংকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের তিন হাজার ৯০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও তাদের সরকারি বিকল্প নগদ সহায়তাসহ পরোক্ষ ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রুপের কর্ণধার এম এ কাদেরসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা দায়ের করে দুদক। বাকি অর্থের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে বলে দাবি করা হলেও তা নামকাওয়াস্তে।

অ্যানন টেক্স গ্রুপের নামে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসএ গ্রুপ ১৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি করেছে। এর দায়ে গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক ও দুদক ১৪টি মামলা করেছে। চেক জালিয়াতির দায়ে মামলা করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক।

ঋণ জালিয়াতির দায়ে সাউথইস্ট ও ন্যাশনাল ব্যাংক মিলে আরো ব্যাংক পাঁচটি মামলা করেছে। ব্যাংক এশিয়ার একটি মামলায় এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলমকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। পরে তিনি জামিনে বের হয়েছেন। ওইসব মামলা বিচারাধীন থাকলেও আশাবাদী হওয়ার মতো অগ্রগতি নেই।

এবি ব্যাংকের গ্যারান্টিতে বেসরকারি খাতের ১২টি ব্যাংক থেকে সিটিসেল এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে একটি ঘটনায় ২০১৭ সালে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

সানমুন গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৬ সালে গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ আটজনের বিরুদ্ধে দুদক একটি মামলা করেছে। ১০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ওই মামলা করা হয়। এ ছাড়া ঋণের টাকা আদায়ে অগ্রণী ব্যাংকও একটি মামলা করেছে। বেসিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর কিছু নবায়ন করা হলেও ফের খেলাপি হয়ে গেছে। এসব কারণে বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতির পুরো অর্থই এখন খেলাপি।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬টি এবং পরের বছর আরো পাঁচটি মামলা করে দুদক। ছয়টি মামলার বিচারের রায় হয়েছে। এতে ৩৬ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ৬৬ জনের জেল-জরিমানা হয়েছে। বাকিগুলো বিচারাধীন। চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপ ২২টি ব্যাংক থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে যার পুরোটাই এখন খেলাপি। ২০১৪ সালে সোনালী ব্যাংক চেক জালিয়াতির একটি মামলা করেছে গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে।

ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ কমার্স ব্যাংক একটি মামলা করেছে। ২০১৬ সালে চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি জামিনে বের হন। অগ্রণী ব্যাংকের ২৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ২০১৯ সালে দুদক নূরজাহান গ্রুপের এমডি-চেয়ারম্যানসহ তিন ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালকরা ৫০০ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। ওইসব ঋণ এখন খেলাপি। ২০২০ সালে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

২০১৯ সালে ৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল চিশতির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনটি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আরো ১৩টির তদন্ত চলছে। একটি সরকারি ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখা ও মহিলা শাখায় জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া ঋণের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আদায়ে ব্যাংক মামলা করেছে।

পিকে হালদার একটি ব্যাংক ও পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মহল থেকে ৩০টি মামলা করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখা থেকে কয়েকটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এর বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক মামলা করেছে। ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে বলে দাবি করা হলেও তা দায়সারা গোছের বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ঋণ জালিয়াতির তুঘলকি কাণ্ড কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।

মূলত, ঋণ জালিয়াতদের কাছে দেশের ব্যাকিং খাতসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছে। ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দায়সারা গোছের মামলা দেয়া হলেও অপরাধীদের শাস্তির হার অপরাধের তুলনায় খুবই প্রতীকী। ফলে ব্যাংকিংসহ আর্থিক খাত অনেকটাই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় বিচারাধীন মামলাগুলো সক্রিয় করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনা গেলে ঋণ জালিয়াতদের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না; শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না আর্থিক খাতেও।
smmjoy@gmail.com



আরো সংবাদ