০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

তাকাই উটের দিকে

তাকাই উটের দিকে - ছবি : সংগৃহীত

মরুর জাহাজ উট। বালুবেলায় পথ চলছে। ১৭০ থেকে ২৭০ কেজি ওজন বহন করে মরুভূমি পাড়ি দিতে পারে আরামেই। তীব্র গরম বা প্রবল শীতে তার সমস্যা নেই। তার দেহের তাপমাত্রা ৩৪-৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেখানে মানবদেহের তাপমাত্রা ৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরম হোক ৫৩ ডিগ্রি, শীত হোক মাইনাস ১ ডিগ্রি, উট অনায়াসে চলতে পারে। ধু-ধু বালিয়াড়ি, কঙ্করময় ময়দান কিংবা টিলা ও পাথুরে পাহাড় মাড়িয়ে সে চলে শত শত মাইল পথ। যাত্রা তার ক্লান্তিহীন। সভ্যতার অজানা অতীত থেকে সে মরুভূমির এপার-ওপারে সুগম করে চলছে জীবনের যোগাযোগ।

তার দেহগঠন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রাণিবিজ্ঞানের এক বিস্ময়!

মরুভূমির পানিসঙ্কটের সাথে তার দেহশৃঙ্খলা ও আচরণের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। বাইরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে তার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। মরুভূমির চরম আবহাওয়ায় উটের শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামা করে। যখন সকাল, উটের শরীরের তাপমাত্রা থাকে ৩৪ ডিগ্রি। ধীরে ধীরে আবহাওয়া গরম হয়। যখন উত্তাপ প্রচণ্ড আকার নেয়, তখন উটের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ৪১ ডিগ্রি অবধি চলে যায়। এর পরই ঘামতে থাকে তার শরীর। এর আগে নয়। ভীষণ উত্তাপ সহ্য করার উপযোগ রয়েছে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংগঠনে।

মরুভূমির প্রাণীরা নিঃশ্বাসের সাথে প্রচুর পানি বাষ্পাকারে বের করে দেয়। কিন্তু উটের নিঃশ্বাসে খুব কমই পানি বের হয়। তার নাসাপথ বেশ পেঁচানো, নাকের ছিদ্রে আছে মাংসল আবরণী, তার নাকের ঝিল্লি নিঃশ্বাসে নিহিত জলীয়বাষ্প আটকে দেয় অনেকটাই, ফলে নিঃশ্বাসে যে পানি নিহিত থাকে, তা নাসিকাপথের নানা ধাপে শোষিত হয়ে যায়। যখন সে পানিশূন্যতার সম্মুখীন হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস কম নিতে থাকে। শরীরের মোট ওজনের ২৫ শতাংশ কমে না যাওয়া পর্যন্ত উট পানির অভাব সহ্য করে নিতে পারে। অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ১২-১৫ শতাংশ ওজন কমলেই পানির অভাব তীব্রভাবে বোধহয় এবং হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

উটের কিডনি খুবই শক্তিশালী। প্রস্রাবে পানি খুব কম বের হয় এবং তা ঘন সিরাপের মতো।

মলও হয় পানিশূন্য। এত শুকনা যে তা দিয়ে আগুন জালানো যায়।

উটের আছে প্রায় ৩০ ইঞ্চি উঁচু কুঁজ। একটি বড় আকারের কুঁজের ওজন ৪০ কেজির অধিক হতে পারে। এ কুঁজে জমা থাকে তার খাদ্যভাণ্ডার; যার পুরোটাই চর্বি। যখন খাদ্যের অভাব হয়, উট এই কুঁজ থেকে চর্বি ভেঙে খাদ্যের অভাব মেটায়। জমানো চর্বি দিয়ে প্রায় এক মাস পর্যন্ত খাদ্যের অভাব মেটানোর সক্ষমতা আছে তার। কুঁজের চর্বি ভেঙে উৎপন্ন হয় শক্তি আর বাড়তি পাওনা হিসেবে প্রচুর পানি।
উটের রক্ত অন্য প্রাণীদের চেয়ে আলাদা। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের লোহিত কণিকা গোলাকার। উটের লোহিত কণিকা ডিম্বাকৃতির, যা পানিশূন্য অবস্থায় রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। তার রক্তকোষে আছে এমন আবরণ, যা প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারে। ফলে তার দেহের পানি ব্যবস্থাপনা যথাযথ থাকে। সে যখন পানি পান করে, দানবীয় ব্যাপার ঘটে। ১০ মিনিটের মধ্যে পান করে ফেলে প্রায় ১৩০ লিটার পানি; যা অন্য কোনো প্রাণী পান করলে রক্তে মিশ্রিত হবে মাত্রাতিরিক্ত পানি ও অভিশ্রবণ চাপে রক্তের কোষ ফুলে ফেঁপে ফেটে যাবে। কিন্তু উটের রক্তকোষে আছে সুরক্ষা প্রাচীর, চাপসহনীয় ক্ষমতা; যা তাকে বিপুল পানি ধারণের সামর্থ্য দেয়। মনে করা হয়, সে পানি জমিয়ে রাখে কুঁজে। উট আসলে পানি জমিয়ে রাখে লোহিত রক্তকণিকা, পরিপাক নালী ও পেশি কোষে।

পরিশ্রম না থাকলে উট খাবার ছাড়া এক মাস কাটিয়ে দিতে পারে, পানি ছাড়া থাকতে পারে সর্বোচ্চ ৩৪ দিন। উটের এমন সামর্থ্য না থাকলে সে মরুর জাহাজ হতে পারত? না খেতে খেতে তার ওজন ৩৩ শতাংশ অবধি কমতে পারে। তবুও সে চলতে পারে দিব্যি। কিন্তু একজন মানুষের ওজন ৮ শতাংশ অবধি কমে গেলে তার মৃত্যু হতে পারে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই।

তার শরীরে রোগপ্রতিরোধ সিস্টেম বিস্ময়কর। গরু বা ছাগলের চেয়ে সে কমই রোগাক্রান্ত হয়। রোগপ্রতিরোধে ব্যতিক্রমী সিস্টেম তার মধ্যে কিভাবে কাজ করে, এ নিয়ে গবেষণা করে এখনো কিনারা করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিকরা।

তার পায়ের প্রতি তাকানো যাক। শরীরের চেয়ে চিকন, কিন্তু খুবই শক্তিশালী পা, যা এক হাজার পাউন্ড ওজন বহন করতে পারে। দিনে হাঁটতে পারে ১০০ মাইল অবধি। ঘণ্টায় ২৫ মাইল বেগে পারে দৌড়াতে। সে হাঁটে দু’টি শক্ত আঙুলের ওপর ভর করে। পায়ের তলায় আঙুলের সাথে যুক্ত আছে চর্বিযুক্ত চারটি বল। হাঁটার সময় তা ছড়িয়ে পড়ে এবং স্পঞ্জ জুতোর মতো কাজ করে। উটের পাকে কাঁটা ফোটার হাত থেকে রক্ষা করে। বিরাট ওজনের দেহকে বালুর ভেতর আটকে যাওয়া থেকে বাঁচায়। তার চলার ভঙ্গি অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা। এক দিকের দুই পা একই সময় সামনে যায়, তার পর অন্য দিকের দুই পা সামনে যায়; যা মরুভূমির বালুতে চলতে সহায়ক। উটের বুকে ও হাঁটুতে বিশেষ ধরনের শক্ত প্যাড থাকে। ফলে এরা খুব সহজে মরুভূমির গরম বালুর ওপর বসে থাকতে পারে।

তার চামড়া লক্ষ করুন। তা খুবই পুরু ও শক্তভাবে নিচে টিস্যুর সাথে সংযুক্ত। চামড়ার উপরে আছে ঘন লোম। উটের লোম আলো বিকিরণ করে এর ত্বককে সূর্য থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যখন গ্রীষ্ম আসে, আলো বিকিরণের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। তার চামড়ার পুরুত্ব মরুভূমির প্রচণ্ড তাপ থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। তার চামড়ার নিচে থাকে না কোনো চর্বি। কিন্তু কেন?

যেখানে বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর চর্বি সারা দেহে ছড়ানো থাকে, সেখানে উট কেন আলাদা হবে? সে আলাদা, কারণ চামড়ার নিচে চর্বির অনুপস্থিতি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে খুব সহায়ক। সে সহায়তা করে ঘাম নিঃসরণেও। উটের জন্য যা একান্ত দরকার।

মরুঝড় আসে, উদ্দাম ও ভয়াবহ। উটকে তো ঝড়ের কবলে পড়তেই হয়। বালুঝড়ে চোখ, নাক সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু তার নাকের গ্রন্থি সে ইচ্ছামতো খুলতে ও বন্ধ করতে পারে। এটি খুব মাংসল। দীর্ঘক্ষণ তা বন্ধ রেখে মরুঝড়ে ধুলাবালু প্রতিরোধ করে সে। তার চোখে রয়েছে দুই স্তর পাপড়ি। দ্বিতীয়টি খুবই স্বচ্ছ। একে বলা হয় ‘নিকটিটেটিং মেমব্রেন’।

এ যেন চোখের উপরের চশমা; যার কারণে মরুভ‚মিতে ধূলিঝড়ের মধ্যেও চোখ খোলা রাখতে পারে। ঝড় যদি স্পর্শ করে, চোখের উপরের চশমাকে স্পর্শ করে। রোদ যখন প্রবল ও প্রখর, তখন উপরের এ আবরণ চোখতে রৌদ্রতেজ থেকে রক্ষা করে। সেই আবার আড়াআড়ি, বাঁকা; যেন চোখের দিকে আসা ধুলাবালুকে বিশেষভাবে আটকাতে পারে।

বড় বড় তার চোখ। অনেক দূরে দেখতে পারে। চার দিকে তাকাতে পারে দ্রুত। কানগুলো ছোট। মরুভ‚মিতে কানের চেয়ে চোখ দিয়ে বেশি শুনতে হয়। চোখের ভ্রু খুব ঘন এবং দুই স্তরের লম্বা আইল্যাশ, যা চোখকে মরুভূমির বালু থেকে রক্ষা করে। বিরাট দেহটার জন্য চাই প্রচুর খাদ্য। কিন্তু মরুভূমিতে উপাদেয় ঘাস-তরুলতা কোথায় পাবে? যে গাছ সেখানে আছে, তাও কাঁটাযুক্ত, শক্ত ক্যাকটাস। অতএব উটের মুখে কোনো গ্রন্থি নেই। মুখের অভ্যন্তর খুব জটিল। সেখানে ছোট ছোট শক্ত আঙুলের মতো ব্যবস্থা রয়েছে, যা কাঁটার আঘাত থেকে মুখের ভেতরকে রক্ষা করে। তার জিভকে ফুটো করতে পারে না ক্যাকটাসের কাঁটা।

কাঁটাদার খাবার খেলেও ক্ষতবিক্ষত হয় না তার মুখ। তার উপরের ঠোঁট বিভক্ত। একে আলাদাভাবে খোলা যায়, মেলানো যায়। এর মাধ্যমে উট বেছে নিতে পারে ক্যাকটাস ও তার কাঁটা। ঘোড়া বা ছাগলের মতো উট তৃণ ভোজন করতে পারে না সহজে। উঁচু গাছের পাতা-পল্লব তার খাওয়া চাই। এর অনুকূলে আদর্শ একটি ঘাড় আছে তার। যথেষ্ট লম্বা ও বাঁকা। শত্রুকে খুব কাছে আসার আগেই কামড়ে দেয়ার জন্যও সহায়ক।

উট আসলে মরুজীবনের আশীর্বাদ। মরু অঞ্চলের মানুষের জন্য দুধ, গোশত ও বাহনের কাজে উট একান্ত উপকারী জন্তু হিসেবে বিবেচিত। উটের চামড়া, খুর থেকে শুরু করে সব কিছুই তাদের বিচারে ঔষধি। উটের সব কিছুই মানুষের উপকারে আসে, যেমন কাজ করেছে, এখনো করছে নানাভাবে। ধরুন তার দুধের কথা। মরুচারী মানুষের একান্ত পানীয় উটের দুধ। তা এখন সাদাসোনা নামে খ্যাতি পাচ্ছে; কারণ এর ভোক্তা কেবল মরুচারীরা নয়, বিশ্বময় অগণিত মানুষ। এখন তা হয়ে উঠেছে সুপারফুড। এর দাম গরুর দুধের চেয়ে অনেক বেশি। এ দুধে ফ্যাট যেমন কম, তেমনি তাতে রয়েছে বহু ঔষধি গুণাগুণ। এতে আছে পটাসিয়াম, আয়রন ও গরুর দুধের চেয়ে তিনগুণ ভিটামিন-সি। পানিশূন্য অবস্থায় মরুভ‚মিতে দীর্ঘ পথ চলার পরও উটের দুধে পানির পরিমাণ হ্রাস পায় না। উট শাবক যথেষ্ট দুধ পান করার পরও উটনী ৪ থেকে ৯ লিটার অতিরিক্ত দুধ দিয়ে থাকে।

কিন্তু কেন? এতে কী কাজ করছে সৃষ্টিকর্তার এমন পরিকল্পনা, যা মানুষকে এর উপকারে স্বাভাবিক অংশীদার করতে চায়? বস্তুত উটের গঠন ও আচরণ আমাদেরকে নিপুণ শিল্প ও অনন্য পরিকল্পনার এক বিপুল কারিগরির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ এতে আমাদের দৃষ্টিপাত করতে বলেন, যেন সত্যরহস্যের নাগাল পেতে পারি।

আল কুরআনের ঘোষণা, ‘উটের দিকে তাকিয়ে দেখেছ, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?’ (সূরা গাশিয়াহ, আয়াত-১৭)

লেখক : কবি, গবেষক



আরো সংবাদ


রিসোর্টে নিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ করলেন টিকটকার (১০৫৯৯)ভয়াবহ বিস্ফোরণে কাঁপল বাড়ি, ছিন্নভিন্ন ৩ জনের দেহ (৭৫৯০)তুরস্কের অর্থনৈতিক সঙ্কট, বাংলাদেশে শঙ্কা (৭৫৫৯)'কোনো রকমের পূর্বশর্ত ছাড়াই এনপিটিতে যুক্ত হতে হবে ইসরাইলকে' (৭৫১৭)ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘জাওয়াদ’, চলতি সপ্তাহেই ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস (৬৪৪৪)সামরিক হামলার ভীতিই ইরানকে পারমাণবিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখবে : ইসরাইল (৫৮৮৩)দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলেন কাটাখালীর মেয়র আব্বাস (৫৩৮২)টানা ৬ষ্ঠবারের মতো নির্বাচিত চেয়ারম্যান ফজু (৫০৩৭)হাইকোর্টের দ্বারস্থ সেই তুহিনারা, হিজাব পরায় বসতে পারবে না এসআই পরীক্ষায়ও! (৪৫৪০)করোনা শেষ ওমিক্রনেই ! (৩৬০৯)