১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

রোল মডেল মারকেল ও মমতা


সমসাময়িক রাজনীতির বিশ্বে, জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মারকেল ও ভারতের মমতা ব্যানার্জির কথা উপেক্ষা করার মতো নয়। উভয় নারীই নিজ নিজ ক্ষেত্রে রোল মডেল। যদিও মারকেল ১৬ বছর ধরে জার্মানির চ্যান্সেলরের পদে অধিষ্ঠিত আছেন আর মমতা ব্যানার্জি ২০১১ সাল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উভয় নারীরই এমন অনেক গুণ রয়েছে যে কারণে ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিশ্ববাসী তাদের স্মরণ করবে।

ফোর্বস ২০১৮ সালের এক জরিপ প্রকাশ করে, বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারীর তালিকায় মারকেল সবার প্রথম। জার্মানের লোকজন তাকে ‘মুট্রি’ বা মা বলে ডাকে। তাকে জার্মানির রানী আবার কেউ কেউ ইউরোপের সম্রাজ্ঞী বলে থাকেন।

চ্যান্সেলর হিসেবে চতুর্থ মেয়াদ পাওয়ার পর মারকেল পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, যা তার ভক্তরা ও আগামী প্রজন্মের জন্য অতুলনীয় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মারকেলকে ‘আয়রন লেডি’ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবেও অভিহিত করা হয়। তিনি তার সরলতা, কঠোরতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি, সততা ও উচ্চ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। ইউরোপের পাওয়ার হাউজ এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির চ্যান্সেলর হিসেবে মারকেল তার নম্রতা, অধ্যবসায়, সাহস ও বিচক্ষণতার জন্যও সমাদৃত হয়েছেন। বিজ্ঞান থেকে রাজনীতিতে স্থানান্তর তাকে কঠিন সময়ে নিজ দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করেছে; কারণ একই সময়ে উদ্ভূত একাধিক চ্যালেঞ্জ যেমন- ইউরোপকে স্থিতিশীল করা এবং অভিবাসী সঙ্কট পরিচালনা করার বিষয়ে দেশের চ্যালেঞ্জকে তিনি শান্তভাবে মোকাবেলা করেছেন। পরবর্তীতে তার সিদ্ধান্তই যে সঠিক ছিল, সেটি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

মারকেলের ব্যক্তিত্ব ও উজ্জ্বলতার প্রশংসা করছেন মার্কিন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়েন্ডি আর শেরম্যান । সুন্দরভাবে বলেছেন, ‘তিনি অসাধারণ, তিনি জানেন তিনি কে। তিনি অন্য কিছু হওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি একজন খাঁটি নেতা, তার কাজের আলোচনা-সমালোচনা করা যায় কিন্তু নিন্দাবাদ জানানো যায় না। তার শক্তিশালী মূল্যবোধ রয়েছে এবং তিনি জার্মানির ইতিহাসকে খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন; কারণ তিনি পূর্ব জার্মানি থেকে এসেছেন। সে জন্য তার বিশেষ এক নির্দিষ্ট নম্রতা রয়েছে, যা তার জীবন থেকে এসেছে। তিনি দেশের জন্য এবং তার মানুষের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তিনি বিশ্লেষণাত্মক, তিনি কখনো উগ্র, কিন্তু তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ রাজনীতিবিদ। তিনি জানেন কিভাবে বিশ্বমঞ্চে কাজ করতে হয়, যা কোনো সহজ বিষয় নয়।’

তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইকন এবং ইউরোর একজন অ্যাডভোকেট হিসেবে, তার ইউরোপীয় সমকক্ষদের সাথে ব্রেক্সিট মোকাবেলা ও ইউরোপে জনসংখ্যার উত্থানের সাথে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেছিলেন। জার্মানিতে সমালোচনামূলক বিষয়গুলো পরিচালনা করার সময় তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেছিলেন, যেমন- ‘অল্টারনেট ফর ডয়েচল্যান্ডের’ নেতৃত্বে অতি-ডানপন্থীদের উত্থান। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লেগার্ড তরুণ মহিলাদের রোল মডেল হওয়ার জন্য মারকেলকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বিশেষভাবে Annalena Baerbock যিনি সবুজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর জার্মান নির্বাচনে চ্যান্সেলর নির্বাচনের জন্য দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

বিদায় বক্তব্যে মারকেল একটি দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী অভিবাদন গ্রহণ করেন, লোকজন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে করতালি দিতে থাকে। জার্মান জনসাধারণ তার নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার জন্য উষ্ণ সাধুবাদ জানান। তার পুরো মেয়াদে, মারকেল কখনোই দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হননি। তিনি অনুগ্রহ ও মর্যাদার এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা জার্মান জাতির জন্য একটি সম্মান। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে তিনি বেশি কষ্ট পেয়েছেন মনে হয়। ২০১৫ সালে উদ্বাস্তু পদক্ষেপ নিয়ে মারকেল ঘরে-বাইরে নানা প্রতিবন্ধকতা ও সমালোচনার শিকার হন।

সংসার জীবনে অসুখী সন্তানহীন এই মহিলা লাখ লাখ উদ্বাস্তুর জন্য জার্মানির সীমান্ত খুলে দেন। উদ্বাস্তু বিষয়ে ‘খোলাদ্বার’ নীতির প্রবক্তা মারকেল। তার নীতি ও জার্মানির ভিশন প্রচারের জন্য তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। যুক্তি দিয়ে তার কাজকে জনসম্মুখে তুলে ধরেছেন। বিরোধী দল বারবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে মারকেলকে অপদস্থ করতে। পশ্চিমা বিশ্ব এ জন্য তাকে কোনো বাহবা দেয়নি। সমালোচনা করা হলেও উদ্বাস্তু সমস্যার সহজ সরল কোনো সমাধান ছিল না, এখনো নেই। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বাস্তু সমস্যার সুরাহা করতে গিয়ে ফার রাইট, উগ্রপন্থী ও ইউনিয়ন প্ল্যানারদের বিপক্ষের অবস্থানে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি উদ্বাস্তু বিষয়ে যেভাবে কাজ করেছেন সেটি যদি কোনো মার্কিন নেতা করতেন তা হলে বিশ্ব হয়তো তাকে প্রশংসা করে রাজার আসনে বসাত, অথচ উদ্বাস্তুদের দেশে আশ্রয় দিয়ে মারকেল সম্রাজ্ঞীর আসনে বসতে পারেননি।

১০ লাখের চেয়ে বেশি উদ্বাস্তু তিনি দেশে আশ্রয় দিয়েছেন। জার্মানির সাপ্তাহিক ‘দেই জেই’ সম্প্রতি এক নিবন্ধে বলছে- ২০০০ সাল থেকে যে নারী সম্রাজ্ঞীর মুকুট মাথায় নিয়েছেন তিনি উদ্বাস্তু সমস্যার কারণে মুকুটহীন হয়েছেন। হাঙ্গেরিতে যেসব উদ্বাস্তু আটকা পড়ে যায়, তাদের ত্রাতা হিসেবে তিনি আবির্ভ‚ত হয়েছিলেন। টাকার অভাবে হেঁটে যারা সীমান্তে পৌঁছেছে; তাদের ফুল, পানি, খাবার দিয়ে গ্রহণ করেছেন। সিরিয়া-ইরাক থেকে যারা গেছেন তারাও সেখানে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। তারা মারকেলকে আরবিতে ‘মামা মারকেল’ বলে ডেকেছেন। মারকেল খুবই বাস্তববাদী এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে পথ চলেন না। উদ্বাস্তুদের মারকেল যে শুধু আশ্রয় দিয়েছিলেন তা নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য তাদের জরুরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এরই ফলে গত ৭০ বছরের ইতিহাসে ২০১৭ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি খারাপ ফল করে মারকেলের দল।

মারকেল বড় মাপের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন আরব বসন্তের সময়। বসন্তের পরিণতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা যেন তিন আঁচ করতে পেরেছিলেন। সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে বারাক ওবামার সাথে তিনি একমত হননি। তার চরিত্রের কঠিন ব্যক্তিত্বের কারণে ওবামা মারকেলকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নারীবাদী প্রবক্তা হিসেবেও মারকেল সমাদৃত।

‘মুক্ত বিশ্ব ধারণা’র বড় নেত্রী হিসেবেও তিনি পরিচিত। তিনি সব মানুষের জন্য সুন্দর বসবাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করেছেন। সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ ও ইসলামফোবিয়া তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। চলার পথে সমমনার কোনো বৈশ্বিক নেতা পাননি এগিয়ে যাওয়ার মতো। এমন হলে হয়তো তার ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এনচ পাওয়েল বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরা চলার পথে সুখের সময়ে যদি কেটে না পড়েন, তবে তাদের শেষ পরিণতি হয় দুঃখের। মারকেল সুখের সময়ই সরে দাঁড়াচ্ছেন।

মারকেলের মতো মমতা ব্যানার্জিও সততা, কঠোরতা, সরলতা ও মর্যাদার জন্য পরিচিত। মারকেলের বিপরীতে, ব্যানার্জি জন্মগত রাজনীতিবিদ ছিলেন- তিনি তার যৌবনে কংগ্রেস পার্টির ছাত্র শাখায় যোগ দিয়েছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যার পর তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। ব্যানার্জি এখন তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির (টিএমসি) প্রধান। তিনি এখনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্ত রয়েছেন। তার অনুসারী ও সমর্থকদের মধ্যে তিনি ‘দিদি’ নামে পরিচিত। মারকেলের মতো তিনিও সরল জীবনযাপন করেন। তুলনা করলে জীবনের সরলতায় মারকেলকেও ছাড়িয়ে যায়। তিনি একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, নিজের কাজ নিজে করেন এবং করদাতাদের খরচে সুযোগ-সুবিধা নেননি। ‘দিদি : একটি রাজনৈতিক আত্মজীবনী’ বইয়ে মনোবিনা গুপ্ত লিখেছেন, ‘যখন লিঙ্গের লেন্স দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, তখন ব্যানার্জির গল্প অন্যান্য শক্তিশালী সমসাময়িক নারী নেতার বর্ণনা থেকে আলাদা।’ সাবেক টিএমসি সংসদ সদস্য কৃষ্ণা বসুকে উদ্ধৃত করে গুপ্ত বলেন, ‘মমতা বিধবা, স্ত্রী, মেয়ে বা কারো সঙ্গী হননি।’ সেই অর্থে, ভারতে ‘ব্যানার্জির গল্প অন্যান্য শক্তিশালী রাজনীতিবিদ যেমন- সোনিয়া গান্ধী, মায়াবতী বা মৃত জে জয়ললিতার গল্প থেকে অনেক আলাদা ও উঁচু মাপের।’

বিজেপির তীব্র বিরোধিতা ও রাজনৈতিক কৌশল সত্তে¡ও, ব্যানার্জি তার জনপন্থী পদ্ধতির কারণে এ বছর আবার নির্বাচিত হন। মোদি নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, ‘দিদি আপনি এক মাস ক্ষমতায় আছেন। আপনি কিছু বললেও তা আমরা কিছু মনে করব না।’ কিন্তু নানা চাপ সত্তে¡ও জনসমর্থন আবারো তাকে ক্ষমতায় এনেছে। ভোট ও আদালতের রায়কে নিয়ে সমালোচনা করায় তিনি এবার আদালতের রোষানলে পড়েন। কিন্তু মমতা সেসব উপেক্ষা করেছেন। তার ব্যাপক জনসমর্থন তার কল্যাণ কর্মসূচি এবং নারী মুক্তির সমর্থন থেকেও উঠে আসে। মারকেলের মতো ব্যানার্জি হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচারকারী অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। মমতা বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, ‘আসাম থেকে মুসলমানদের বের করে দিলে তাদের আমি জায়গা দেবো।’ গরুর গোশত খাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হিন্দু ধর্মে কোথায় লেখা আছে গরুর গোশত খাওয়া যাবে না? আমি নিজে গরুর গোশত খাই।’ এমন আক্রমণ সত্তে¡ও গোরক্ষক সমিতি তার বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি।

যদিও মারকেল ও ব্যানার্জি দু’টি ভিন্ন সমাজের, তবুও তারা একই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলিতে পুষ্ট, যা তাদের রোল মডেল হিসেবে উন্নীত করেছে। তাদের ভাগ করা গুণগুলোর মধ্যে রয়েছে- সততা, দক্ষতা, সরলতা, কঠোর পরিশ্রম ও ভিভিআইপি সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা। নারীর ক্ষমতায়নের চেষ্টা করার সঙ্কল্প নিয়ে উভয় নারীই শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। তাদের লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তারা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তারা ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার লোভের পরিবর্তে মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছেন।

মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এর পর থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় আছেন। পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুর উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। গত ৩ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, সাথে হলফনামাও।

হলফনামায় যাবতীয় সম্পত্তির হিসাব দিয়েছেন। দেখা যায়, ব্যাংকে তার জমা আছে ১৩ লাখ এবং ১০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণালঙ্কার।

এ ছাড়া মমতার নামে কোনো বাড়ি, গাড়ি, চাষযোগ্য জমি ও পৈতৃক সম্পত্তি নেই। আবার তার নামে কোনো বকেয়া কর বা ঋণও নেই বলে উল্লেখ করা হয় হলফনামায়। তিনি একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। কলকাতার হাজরা এলাকার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে মমতা ব্যানার্জির জন্ম ১৯৫৫ সালে।

‘রাজনীতিবিদ হিসেবে তার এ সাফল্যের পেছনে কিন্তু একটি প্রতিভা কাজ করে’- বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি।

ভারতের সাবেক মৃত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি লিখে গেছেন, ‘মমতা ব্যানার্জির একটি ক্যারিশমা বা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে।’ মমতা ইন্দিরা গান্ধীর অনুরাগী ছিলেন এবং তার প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে সিনিয়র কংগ্রেস নেতা ও পরে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ছায়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং যোগেশচন্দ্র কলেজ থেকে আইনের ডিগ্রি নেয়ার পর মমতা ব্যানার্জির প্রথম পেশা ছিল স্কুল শিক্ষকতা; তবে রাজনীতি শুরু করেছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই। ‘মমতা ব্যানার্জির একটি বিশেষত্ব হলো- তার প্রচণ্ড লড়াকু মনোবৃত্তি এবং তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা’- বলছিলেন শিখা মুখার্জি। মহিলা কংগ্রেসের নেতা হওয়ার পরই তিনি একজন উদীয়মান রাজনীতিবিদ হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নজরে পড়েছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রতীচী ট্রাস্ট্রের সমন্বয়কারী সাবির আহমেদ বলেন, ‘ছোট ছোট অনেক ঘটনা আছে, যার মধ্য দিয়ে তিনি তখনকার কংগ্রেসের বড় নেতাদের নজরে এসেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো- ১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো প্রবীণ সিপিআই (এম) নেতাকে হারানো। প্রবীণ নেতাকে হারিয়ে ভারতের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।

নিজ দলের বিরুদ্ধে সিপিআইএমকে সহায়তার অভিযোগ আনা, পার্লামেন্ট ভবনে পেট্রোলিয়ামের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, একজন এমপির সাথে হাতাহাতি, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে রেলমন্ত্রীকে শাল ছুড়ে মারা এবং এমপি পদ থেকে ইস্তফা প্রভৃতি ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত ও আলোচিত করেন মমতা। বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি রক্ষার জন্য গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয় তৃণমূল কংগ্রেস। নন্দীগ্রামে কৃষকদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা ব্যানার্জি হয়ে ওঠেন রাজ্যের জনপ্রিয় নেতা।

মমতা ব্যানার্জির সরকার রাজ্যের দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য নানা রকম জনকল্যাণ প্রকল্প চালু করেছে। মমতা ব্যানার্জির ব্যক্তি ইমেজই তৃণমূলের শক্তি মনে করা হয়।

‘কন্যাশ্রী’, ‘সবুজ সাথী’, ‘স্বাস্থ্য সাথী’- এরকম প্রকল্পগুলো এক দিকে প্রশংসিত হয়েছে আর ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু বিশেষ করে ‘মুসলিম তোষণের’ অভিযোগ এনে বিজেপি রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করেছিল।

‘হজ হাউজ ও ইমাম প্রশিক্ষণের মতো কিছু প্রতীকী প্রকল্প ছাড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ রাজ্যে মুসলিম সমাজের সাধারণ পশ্চাৎপদতার ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।’ সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা এবং তাদের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা- এটি তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সাফল্যের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মমতা ব্যানার্জির এক বিরল ক্ষমতা রয়েছে মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারার। ‘মমতা ব্যানার্জির সাফল্যের কারণ হলো নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত গুণ, আর মানুষ তাকে দূরের কেউ হিসেবে দেখে না- তাকে পাশের বাড়ির মেয়ের মতো নিকটজন হিসেবে দেখে।’

রাজনীতিবিদরা মারকেল ও ব্যানার্জির সাফল্য থেকে তিনটি পাঠ শিখতে পারেন- প্রথমত, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের অবশ্যই ভিভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতি ও কর্তৃত্বের অপব্যবহারে লিপ্ত না হয়ে জনসাধারণের কল্যাণে কাজ করতে হবে। মারকেল ও ব্যানার্জি উভয়েই জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন, যা সুশাসনের প্রধান বিষয়। দ্বিতীয়ত, সময়ের শেষে, বিদায় বেলায় যা গণনা করা হয় তা হলো বিভিন্ন বিষয়ের অধীনে থাকা ব্যক্তিদের উত্তরাধিকার। মারকেল, চ্যান্সেলর হেলমুট কোহলের পর জার্মানির দ্বিতীয় দীর্ঘতম মেয়াদে চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যানার্জি এখনো ক্ষমতায় আছেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অনুকরণীয় ভূমিকা পালন করছেন।

তৃতীয়ত, উপনিবেশ-পরবর্তী বিশ্বে ক্ষমতার প্রতি আসক্তি এক সাধারণ বিষয়। ক্ষমতাবান নেতাদেরকে মারকেল ও ব্যানার্জির কাছ থেকে শিখতে হবে, বিশেষ করে যারা জনকল্যাণে শক্তি ব্যবহারের কঠোর নীতি অনুসরণ করেন। বুঝতে হবে, এ দু’জন রোল মডেল। তারা শক্তির কারণে নয়; ক্যারিশমা, আন্তরিকতা ও বিতরণ করার সামর্থ্যরে কারণে সম্মানিত। উভয় নারীই তাদের স্বদেশে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ভালো সেবার জন্য দীর্ঘকাল ধরে স্মরণীয় থাকবেন। বিশ্বব্যাপী উচ্চাকাক্সক্ষী যেসব নেতা রয়েছেন তারা উভয়ের কাছ এসব দর্শন শিখে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে পারেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



আরো সংবাদ


সকল

মেয়ের চিকিৎসায় ১০ দিন ধরে ঢাকার হাসপাতালে থেকেও মন্দির ভাঙার আসামি (১২৯০৫)‘বাতিল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প’ (১২২০৬)প্রধানমন্ত্রী মোদি কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন (৯৫৬৯)কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ভারতের তালেবানভীতি থেকে? কেন সেই ভীতি? (৯৪১৪)কাশ্মিরে এক অভিযানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সেনা নিহত (৮০৩৮)৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতেই হবে : তথ্য প্রতিমন্ত্রী (৬৬০০)সঙ্কটের পথে রাজনীতি (৫৯৭৭)গ্রাহকদের উদ্দেশে কারাগার থেকে যা বললেন ইভ্যালির রাসেল (৪৮৯৫)পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণ (৪৮৬২)কিছু ‘বিভ্রান্তিকর খবরের’ পর বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ভারত (৪৮২৯)