১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

পরাজয়ের চুক্তিতে মার্কিনিদের মুক্তির দিশা


২০১১ সালে আলকায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে কথিত হত্যার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচন পূর্ববর্তী ক্যারিশমা প্রদর্শনে সফল হওয়ার পর থেকেই আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। অন্য দিকে ব্যাপক অর্থ ও জনবল ক্ষয়ের ভয়াবহতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য মার্কিন প্রশাসন পথ খুঁজতে থাকে। তারই অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেনাদের একটি বড় অংশ ফিরিয়ে নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ ফেব্রæয়ারি ২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহাতে আফগানিস্তানে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়ার কথা বলে একটি শান্তিচুক্তি হয়।

দীর্ঘ দিন ধরে শান্তি আলোচনার পরিণতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠাতা তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের তৎকালীন ডেপুটি মোল্লøা আবদুল গনি বারাদার এবং আফগানিস্তান-বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ। চুক্তির শর্তানুযায়ী তালেবানরা আফগানিস্তানে ‘আইএস’ ও ‘আলকায়েদা’কে আশ্রয় দেবে না, তাদের সখ্যতা পরিত্যাগ করবে এবং আফগান সরকারের এক হাজার বন্দী সেনাকে তালেবানরা মুক্তি দেবে। বিনিময়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধরত ১৪ হাজার মার্কিন সেনা নিজ দেশে ফিরে যাবে এবং আফগান সরকার পাঁচ হাজার বন্দী তালেবান যোদ্ধাকে মুক্তি দেবে। তালেবানরা শর্ত মেনে চললে পরবর্তী ১৪ মাসের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করা হবে।
বিশ্ববাসীও চেয়েছিল চুক্তিটি বাস্তবায়িত হোক এবং আফগানিস্তানে উভয় পক্ষের নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে শান্তি ফিরে আসুক; কিন্তু এই চুক্তির ভেতরেই মার্কিনিদের পরাজয়ের বীজ বপন হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। চুক্তিটির ব্যাপারে দূতিয়ালি করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ এবং তিনিই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন; কিন্তু মার্কিন উচ্চ পর্যায়ের কেউ এতে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান সরকার এক যৌথ ঘোষণায় জানায়, তালেবান চুক্তি মানলে আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। আবার ট্রাম্প বলেছিলেন, তালেবান যেন কথা রাখে, সে দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হবে। অন্য দিকে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিও বলেছেন, ‘চুক্তির সবকিছুই শর্তাধীন। শান্তিচুক্তির সাফল্য তালেবানের প্রতিশ্রুতির ওপরই নির্ভর করছে।’ (দৈনিক প্রথম আলো : ১ মার্চ ২০২০)

যদিও একজন শীর্ষ তালেবান নেতা এতে স্বাক্ষর করেছিলেন; কিন্তু সব তালেবান এই চুক্তির প্রক্রিয়ার সাথে একমত হতে পারেনি। আর চুক্তিতেই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে, যদি তালেবানরা চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলে তবে শান্তি আসতে পারে। তার মানে মার্কিনিদের মনে তালেবানদের ব্যাপারে বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল বা অজানা ভয় ছিল। অন্য দিকে তালেবানদেরকে তখন আফগান সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিল যদিও তারা তৎকালীন আফগান সরকারকে অবৈধ বলে মনে করত। তালেবানদের মধ্যেও অনেক ভিন্ন মতাবলম্বী রয়েছে এবং আফগানরা সংস্কৃতিকগতভাবেই অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও নিজের মতের বাইরে অন্য কিছু গ্রহণ করতে অভ্যস্ত নয়। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি আফগান সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না তাতে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কারণ এরই মধ্যে আফগানিস্তানে দু’জন (আশরাফ গনি এবং আবদুল্লাহ) প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন এবং প্রত্যেকেই নিজেকে আফগানিস্তানের বৈধ প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করছিলেন। অন্য দিকে আফগানিস্তানে প্রতিবেশী দেশগুলোরও বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ জড়িত হয়ে রয়েছে। ওই স্বার্থান্বেষী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ব্যাহত হতে দেখলে কোনো না কোনোভাবে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ার সমূহ সন্দেহ ছিল মার্কিন প্রশাসনের।

আফগানিস্তানে প্রথম থেকেই পাকিস্তান জড়িত ছিল। আর তালেবান পরবর্তী সময়ে ভারত সেখানে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল, যদিও এই প্রভাব ভারতের স্বার্থপরতার অভ্যাস মতো শুধু সরকারি পর্যায়েই ছিল। কাজেই আফগানিস্তানেও পাক-ভারত দ্বন্দ্বের একটি খেলা শুরুর আশঙ্কা ছিল। অন্য দিকে ইরান হাজারা সম্প্রদায়ের শিয়াদের আফগানিস্তানে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সুন্নি অধ্যুষিত আফগানিস্তানে। স্থিতিশীল আফগানিস্তানের বিষয়ে চীন বিচলিত ছিল এই আশঙ্কায় যে, তালেবান সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার উইঘুরের নির্যাতিত মুসলমানদের গোপন সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। আবার রাশিয়াও ভেবেছিল একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান থেকে পুনরায় চেচেনরা উজ্জীবিত হওয়ার উপাদান ও রসদ পেতে পারে। অন্য দিকে ‘আইএস’-এর সাথে তালেবানদের দ্ব›দ্ব থাকায় তালেবানদের চুক্তিবিরোধী অংশকে ‘আইএস’ কাছে টানার বড় একটা সম্ভাবনা ছিল। আবার আলকায়েদা প্রথম থেকেই তালেবানদের মেন্টর হিসেবে কাজ করেছে। এই আলকায়েদাকে তালেবানরা ত্যাগ করার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সন্দিহান ছিল।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে শান্তি আলোচনা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ঠিক আগে আগে চুক্তিটিকে একটি পরিণতির দিকে নিয়ে আসাটা খুবই রহস্যময় মনে করেন বিশ্লেষকরা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার নির্বাচনী ইশতেহারে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নিয়ে আসার ওয়াদা করেছিলেন। তিনি সেই ওয়াদা পূরণের চুক্তি সম্পন্ন করেছেন বলে তার নির্বাচনী প্রচারণায় এ ব্যাপারে যথেষ্ট মার্কেটিং করতে পেরেছিলেন। ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘নাইন-ইলেভেন’-এর হৃদয়বিদারক সন্ত্রাসী আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি তার ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য তার এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রক্রিয়া মহৌষধ হিসেবে কাজে দিয়েছে। ঠিক এভাবেই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জেনারেল কাশেম সোলাইমানি এবং ‘আইএস’ নেতা আবু বকর আল বাগদাদিকে হত্যার মাধ্যমে তার নিজের অভিশংসন প্রক্রিয়াকে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছেন এবং এই আফগান চুক্তিকে তার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এটিই বড় অর্জনের বিষয় ছিল বলে মনে হচ্ছে। নইলে এই স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্ব বা সদিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজটি তারা করেননি। অবশ্য যদিও এটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় তবুও মার্কিনিরা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি এমন নজির নেই। অথচ প্রেসিডেন্ট বুশ একতরফাভাবে একটি স্বাধীন আফগানিস্তানে আক্রমণ করে দখল করে নিয়েছিলেন।

বুশ আফগানিস্তানে অবস্থানরত ওসামা বিন লাদেনকে ‘নাইন-ইলেভেন’-এর আক্রমণের অপরাধে হস্তান্তর করার আহ্বান জানালে মোল্লা ওমরের আফগান সরকার বলেছিল, লাদেনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রমাণ হাজির করলেই তবে লাদেনকে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু কোনো ধরনের বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ হাজিরের পরিবর্তে বরং স্মরণকালের ভয়াবহতম আক্রমণ চালিয়ে একটি হতদরিদ্র দেশকে তছনছ করে ফেলা হয়। এ দিকে আফগান সরকার চুক্তিমতো পাঁচ হাজার বন্দী তালেবান যোদ্ধাকে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে টালবাহানা করলে তালেবানদের হামলা জোরদার হতে থাকে সরকারি বাহিনীর ওপর। এতে করে মার্কিন বাহিনীও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়লে চুক্তি কার্যকর করার বিষয়টি আরো যৌক্তিক হয়ে পড়ে। কাজেই সমালোচকরা মনে করেন চুক্তি করে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজাটাও ট্রাম্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সময়ের অভাবে বাস্তবায়নের ব্যাপারে তার তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, ২৪ শ’ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে ও ২১ হাজার আহত হয়েছে এবং প্রায় প্রতিদিনই তাদের সেনা হতাহত হচ্ছে; চুক্তির মাধ্যমে মার্কিনিদের জানমালের এই ক্ষয়ক্ষতি বন্ধ করার প্রক্রিয়ার সংবাদেই আসন্ন নির্বাচনে মার্কিন জনগণের সহমর্মিতা পাওয়া সম্ভব হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে সক্ষম হয়েছিল, আফগান যুদ্ধ একটি সীমাহীন যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১৯ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ ৫০ হাজারেরও বেশি আফগান বেসামরিক নাগরিক (নারী-শিশুসহ) নিহত হয়েছে। প্রায় ৫৮ হাজার আফগান সরকারি সেনা নিহত হয়েছে। ফলাফলবিহীন এই যুদ্ধে তারা দুই ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। একজন মার্কিন সেনার পেছনে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হচ্ছে। সত্যিকারার্থে প্রচুর জনবল ও সীমাহীন আর্থিক খরচের ভার মার্কিন জনগণ আর বইতে পারছে না। তালেবানরাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, আর আফগান জনগণ শান্তির জন্য আকুতি করছে। কারণ যুদ্ধের বেশির ভাগ শিকার এই নিরীহ জনগণই।

অবশ্য এই যুদ্ধ আফগানরা বা তালেবানরা কখনো চায়নি। তারা কখনো কোনো দেশ আক্রমণও করেনি। তাদের ওপর এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তালেবানরা প্রকারান্তরে মার্কিনিদেরই সৃষ্টি। আফগানিস্তানে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া এক লাখ সেনা পাঠিয়ে দখল করে নিলে আফগান জনগণ গোত্রভিত্তিক দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে রাশিয়ান সেনাদের মোকাবেলা করতে থাকে। অন্য দিকে, রাশিয়ার এই আগ্রাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারেনি। কারণ আগফানিস্তান দখল করার অর্থ এশিয়ার হৃৎপিণ্ডে রাশিয়ানরা পৌঁছে যাবে। তারা আফগানিস্তানকে মার্কিনিদের মতো সোভিয়েত রাশিয়ার ভিয়েতনাম বানানোর পরিকল্পনা করে। তাই তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা এবং পাকিস্তানের ভ‚মি ব্যবহার করে আফগানদেরকে রাশিয়ান সেনা তাড়ানোর জন্য উপযুক্ত শক্তিশালী করে তোলে। আফগানদেরকে তারা জিহাদের মন্ত্র শিখিয়ে মুজাহিদ বাহিনী তৈরি করে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক মারণাস্ত্রসহ যুদ্ধের মাঠে প্রেরণ করে। সাথে সাথে অবারিত লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে থাকে।

এই যুদ্ধ সমন্বয় করার জন্য তারা সৌদি তরুণ ধনকুবের ওসামা বিন লাদেনকে উড়িয়ে নিয়ে আসে আফগানিস্তানে। ফলে দীর্ঘ ১০ বছরের যুদ্ধে সোভিয়েতরা পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায় এবং পরিণতিতে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সফল হয়। এতে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান এবং এর শতধাবিভক্ত নাগরিকদের তাদের নিজেদের ভাগ্যের ওপর ফেলে চলে যায়। ফলে আফগানিস্তানে শুরু হয় ক্ষমতার লড়াই, চলে বিভিন্ন মুজাহিদ গ্রুপগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ। এই পটভ‚মিতে মূলত আফগান পশতুন গোত্রের লোকেরা সুসংগঠিত হয়। এদের বেশির ভাগই যুদ্ধকালীন সময়ে সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোতে লেখাপড়া করছিল। ‘তালেবান’ পশতুন শব্দ যার অর্থ ছাত্র। পাকিস্তান আফগানিস্তানের এই অস্থিতিশীল অবস্থার সুবাদে এই পশতুন ছাত্র অর্থাৎ তালেবানদের সুসংগঠিত করে এবং সহযোগিতা করে। আর আর্থিক সাহায্য আসে সৌদি আরব থেকে এবং সবুজ সঙ্কেত পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই তালেবানরা তখন আফগানিস্তানে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। অল্পদিনের মধ্যেই তারা সফলতা পায়।

তাদের ন্যায়পরায়ণ আচরণ, কঠোর ধর্মীয় অনুশীলন এবং সুশৃঙ্খলতার জন্য আফগান সাধারণ জনগণ তাদেরকে স্বাগত জানায়। ফলে ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারা হেরাত প্রদেশ দখলের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় আরোহণ শুরু করে। ১৯৯৮ সালে তারা পুরো আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চল শাসন করা শুরু করে। তাদেরকে খুব দ্রুতই পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বীকৃতি দেয়। ফলে তাদের শাসন চলতে থাকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। তারা কঠিন শরিয়াহ আইনের মাধ্যমে আফগানিস্তানকে তাদের নিজস্ব গোত্রতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক স্টাইলে শাসন করতে থাকে, যেখানে তাদের বেশ কিছু ভুল-ভ্রান্তিও পরিস্ফ‚টিত হওয়া শুরু করে। আর এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা এবং সমর্থনের মাধ্যমে তালেবান স¤প্রদায় বা রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ৭ অক্টোবর মার্কিন সেনা আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তালেবান রাষ্ট্রের পতন ঘটায়। এরপর ২০১০ সাল নাগাদ আফগানিস্তানে যুদ্ধরত মার্কিন সেনা সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখ। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেনা সংখ্যা কমিয়ে আনলেও এই যুদ্ধ চলমান রাখেন। এতে শুধু অর্থ এবং রক্তক্ষয় ছাড়া মার্কিনিরা আর কিছুই পায়নি। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় আলকায়েদা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করলে সেখানেও আলকায়েদার সৃষ্টি হয়। সেই আলকায়েদা থেকেই পরবর্তী সময়ে মার্কিনিদের সহায়তায় ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের দমনের জন্য ‘আইএস’ সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্র আবার এই ‘আইএস’ দমনের জন্য ইরাক ও সিরিয়ায় আরেকটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সত্যিকারার্থে এভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জন্ম দেয়া এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মাধ্যমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।

তারা তাদের প্রয়োজনে যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং বিপদে পড়ে তাদের প্রয়োজনেই শান্তিচুক্তি করেছে। কাজেই তালেবানদের সাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা এই ঐতিহাসিক চুক্তি কার্যকর করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মার্কিন বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিলেও দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট বাইডেন একটি অন্তহীন যুদ্ধের সুগভীর চোরাবালিতে আটকে যাওয়া মার্কিন সাম্র্রাজ্যকে বের করে এনেছেন এবং আরো কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অপচয় ও সম্ভাব্য হাজারো মার্কিনির জীবন রক্ষা করেছেন বলে গবেষকরা মনে করেন। মার্কিনিদের এই পরাজয়মূলক পশ্চাদপসরণে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
E-mail: maksud2648@yahoo.com



আরো সংবাদ