০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

আফগানোত্তর চীন-মার্কিন যুদ্ধখেলা

-

আফগানিস্তান তালেবান বিজয়ের পর এখন বৈশ্বিক যুদ্ধ-খেলায় নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কল্পনা বাস্তব রূপ নিতে শুরু করবে বলে মনে হচ্ছে। আফগানিস্তানে আমেরিকা ও ন্যাটো সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে সেখানে তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই সরকার বৈশ্বিক দ্ব›দ্ব-সঙ্ঘাতে নিজেকে না জড়িয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন ও জাতিগঠনে মনোনিবেশ করবে বলে তালেবান নীতিপ্রণেতাদের বক্তব্যে মনে হয়েছে।

তবে তালেবানের দুই দশকের যুদ্ধ যেহেতু আমেরিকা ও ন্যাটো বিরোধী ছিল সেহেতু কৌশলগতভাবে তারা চীন রাশিয়া পাকিস্তান ইরানের অধিকতর নিকটবর্তী হতে পারে। অবশ্য আমেরিকান প্রত্যাহারের বিষয়টি কাতারের মধ্যস্থতা এবং একটি চুক্তির মাধ্যমে হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর তালেবান সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে আগ্রহী হতে পারে এবং এটি হলে ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলো নতুন আফগান সরকারকে স্বীকৃতি দেবে। তবে আফগানিস্তানের সাথে চীন-রাশিয়া অথবা পাশ্চাত্যের সম্পর্ক ভবিষ্যৎ চীন-আমেরিকা সঙ্ঘাতে মৌলিক কোনো বিষয় নাও হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলগত ডকট্রিনে পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবেই কি আমেরিকা নিজেকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়েছে? নতুন ডকট্রিনে আমেরিকার প্রধান প্রতিপক্ষ ইসলাম নয় বলেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের যে ধারা চলতি শতকের গোড়া থেকে আমেরিকা শুরু করেছিল সেখান থেকে সরে এসে বৈশ্বিক নীতিতে দেশটি নতুন বিন্যাস আনবে বলে মনে হয়।

আমেরিকান নীতি বিশ্লেষক ও উপদেষ্টাদের বক্তব্যেও সেই ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে। আমেরিকান বিশ্লেষক রবিন রাইট লিখেছেন, ‘আমেরিকার [আফগানিস্তান থেকে] মহাপশ্চাৎপসরণ কম করে হলেও ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রত্যাহারের মতোই অপমানজনক, যা সোভিয়েত সাম্রাজ্য এবং কমিউনিস্ট শাসনের অবসানে অবদান রেখেছিল। বড় দুই শক্তিই পরাজিত হয়ে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।’ একটু ভিন্ন মাত্রার হলেও একই কথা বলেছেন সাবেক মার্কিন উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ক্ল্যাড। তবে তিনি আমেরিকার ভিন্ন এক প্রতিপক্ষের ব্যাপারে ইঙ্গিতও দিয়েছেন। জন লি এন্ডারসনকে পাঠানো এক ই-মেইলে জেমস ক্ল্যাড আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের উল্লেখ করে বলেছেন, “এটি একটি ক্ষতিকর আঘাত, কিন্তু সাম্রাজ্যের ‘শেষ’ এখনো হয়নি, সম্ভবত দীর্ঘ মেয়াদেও নয়। মারাত্মক পরাজয় আমেরিকার প্রতিপত্তি ক্ষুণœ করেছে; তবে, আমাদের মুখে ভ‚-রাজনৈতিক ডিমের সমতুল্য সরবরাহ করছে।... বিস্তৃত বিশ্বে, আমেরিকা এখনো তার অফশোর পাওয়ার-ব্যালেন্সিং ফাংশন ধরে রেখেছে। আর কিছু উত্তপ্ত সাংবাদিকতা সত্তে¡ও, কোনো অপরিবর্তনীয় সুবিধা আমাদের প্রাথমিক ভ‚-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ চীনকে দেয়া হয়নি।”

নতুন ডকট্রিনে মার্কিন প্রতিপক্ষ কে?
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমেরিকান কৌশলগত বিন্যাসে চীন এবং রাশিয়াই হচ্ছে প্রধান প্রতিপক্ষ; যদিও প্রতিপক্ষ হিসেবে সক্ষমতা বিচারে রাশিয়ার বৈশ্বিক নেতৃত্বে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করার সামর্থ্য যতটা, তার চেয়ে চীনের অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ ক্ষমতা অনেক বেশি। আফগানিস্তানে দীর্ঘ সময় কাজ করা সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী, ইয়েলের জ্যাকসন ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো ররি স্টুয়ার্ট বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকার এখন আর আফগানিস্তানের মতো জায়গায় নয়, বরং চীনের সম্প্রসারণের মোকাবেলায় নিবেদিত।’

চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র যে, তাদের প্রতিপক্ষ করতে যাচ্ছে সেটি জানে। গত সপ্তাহে সরকারি মুখপত্র গ্লোবাল টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ‚-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রস্তুত; কিন্তু এটা স্পষ্ট যে ওয়াশিংটনের বেশির ভাগ পদক্ষেপই হয় বস্তু ছাড়া নিছক ধোঁকাবাজি। যুক্তরাষ্ট্র যা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তা হলো চীনের ধারাবাহিক বিকাশের ক্ষমতা। চীনের অর্থনৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে শক্তির সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে এবং এমনকি তা অতিক্রম করবে। সে সাথে চীনের সামরিক শক্তি অন্যের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চীনের এই গতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যকে ভেঙে ফেলার প্রবণতা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন স্বপ্ন দেখছে- চীন তার উন্নয়ন গতি হারাবে, আর তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের উন্নয়ন গতিশীলতা অর্জন করবে।’

পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে আমেরিকা আধুনিক বিশ্বে তার ধ্বংসাত্মক শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকছে। এর পরিবর্তে এটি হবে একটি টার্নিং পয়েন্ট, যা দেখায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘মন্দ কাজ’ করার পরবর্তী লক্ষ্য খুঁজে পাবে। আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করার জন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দায়বদ্ধ করা হয়নি। যুদ্ধকে দীর্ঘ দিন ধরে একটি ভুল হিসেবে দেখা হয়েছে; কিন্তু সব সময়ই এটিকে অভিনব শব্দবাজি করে বৈধতার মোড়ক দেয়া হয়েছে।... যুক্তরাষ্ট্রে সুদিনের সময়, জর্জ ডবিøউ বুশ প্রশাসনের বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘গণতান্ত্রিক মডেল’ স্থাপনের একটি অহংকারী পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু পরিকল্পনাটি ইরাক থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। কিছু মার্কিন অভিজাত এখন চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা সম্পদ ব্যবহার করতে চাইছেন। তারা চীনা জাতির নবজীবনের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এবং চীনের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য আরো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে আসতে চান।”

নতুন পরিস্থিতিতে চীনা আধিপত্য খর্ব করতে চারটি ক্ষেত্রে আমেরিকা তার মিত্রদেরকে নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- দক্ষিণ চীন সাগরসহ চীনের চারপাশে একটি বৈরী শক্তির বলয় তৈরি করা। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান উপক‚লে আমেরিকান নৌ শক্তিকে ব্যাপকভাবে জোরদার করা।
এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকবে দক্ষিণ চীন সাগরের একক মালিকানা চীনের দাবি করার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ চীন সাগর সংযুক্ত দেশগুলোকে কোয়াডের বলয়ে নিয়ে আসা অথবা ভিন্ন কোনো জোট তৈরি করা; এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুর ইন্দোনেশিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক বাড়ানো; জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে আরো বেশি সক্রিয় করে তোলা; কোয়াডের অংশীদারদের মধ্যে ভারতকে চীনের ব্যাপারে অধিকতর সক্রিয় করে তোলা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাতে না পারলেও অন্তত একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ অবস্থানে নিয়ে আসা।

আমেরিকার চীনবিরোধী লড়াইয়ের দ্বিতীয় ক্ষেত্র হতে পারে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যক্ষেত্রগুলোকে বাধাগ্রস্ত করা। এ ক্ষেত্রে আমেরিকান ও তার মিত্রদের যেসব বিনিয়োগ করপোরেশন রয়েছে, তাদের স্থাপনা পর্যায়ক্রমে চীন থেকে সরিয়ে এনে এশিয়ায় অন্য দেশগুলোতে স্থাপন। এর সাথে চীনা পণ্যের প্রবেশে আমেরিকান বাজারে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাণিজ্যিকভাবে চীনকে কোণঠাসা করা। ট্রাম্পের আমলে বন্ধ করা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য দেয়া বাণিজ্য সুবিধাগুলো ফিরিয়ে এনে মিত্রদের আস্থা অর্জন করা।

চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকার তৃতীয় লক্ষ্য এলাকা হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগানো। রাশিয়া ও অন্য চীনা মিত্রদেশগুলোকে সাথে নিয়ে বিকল্প মুদ্রা ও লেনদেন প্রক্রিয়া তৈরির চৈনিক প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করা। এ জন্য বিশ্বব্যাংক আইএমএফ গ্রæপের কঠোর ঋণদান ব্যবস্থাকে উদার করে চীনা অর্থায়নসূত্রকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে চীনের ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট’ উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বিশেষভাবে টার্গেট করা। একই সাথে, নতুন সিল্ক রোডের এই উদ্যোগ যাতে সফল হতে না পারে তার চেষ্টা করা।

চীনের বিরুদ্ধে সঙ্ঘাতের আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে জিংজিয়ান হংকং ও তিব্বতসহ বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ অঞ্চলগুলোর অধিকার আন্দোলনে সমর্থন দেয়াকে। জিংজিয়ান সহায়তার জন্য আফগান অঞ্চল থেকে আমেরিকার প্রত্যাহার কৌশলগত বিপত্তি তৈরি করলেও মধ্য এশিয়ার কোনো দেশকে দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করার প্রচেষ্টা। হংকংয়ে চীনের মূল ভ‚খণ্ডের আইন ও রীতি-নীতি চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ রয়েছে সেটিকে চাঙ্গা করে তোলা। একই সাথে হংকং ও উইঘুর-এর মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করা। ঠাণ্ডা হয়ে আসা তিব্বত ইস্যুটিও আবার বৈশ্বিক দৃষ্টির মধ্যে নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে কোয়াড মিত্র ভারতকে কাজে লাগানোর বিশেষ প্রচেষ্টা চালানো।

মিয়ানমার-বাংলাদেশ ফ্যাক্টর
চীনের স্যাটেলাইট ধরনের রাষ্ট্র হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্যতম টার্গেট। এ ক্ষেত্রে সেনা অভ্যুথানের মধ্যে ক্ষমতা দখলকারী মিয়ানমারের জান্তাশাসকরা লক্ষ্যস্থলের প্রথমে রয়েছেন। সামরিক অভ্যুত্থানের পর জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো সেখানে সশস্ত্র লড়াই জোরদার করেছে। অন্য দিকে বিকল্প রাজনৈতিক সরকার গঠন করা হয়েছে নির্বাচনে জয়ী ন্যাশনাল লিগ অব ডেমোক্র্যাসি-এনএলডির নেতৃত্বে। অনেক রাষ্ট্র তাদের বিকল্প মিশন খোলার অনুমতিও দিয়েছে। সশস্ত্র লড়াই এবং রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা- সবটাই একযোগে চাঙ্গা করা হচ্ছে। মিয়ানমারে জান্তা সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব না হলেও তাদেরকে পাশ্চাত্যের সাথে সমঝোতায় বাধ্য করার প্রচেষ্টা চলতে পারে অথবা দেশটিকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হতে পারে।

মিয়ানমারকেন্দ্রিক এই উদ্যোগে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে। বাংলাদেশে সরকার পররাষ্ট্র কৌশলের ক্ষেত্রে এত দিন চীন-রাশিয়া ও ভারত-আমেরিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আসছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রান্তিক অবস্থান নেয়ায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভারসাম্য বজায় রাখা। এই ইস্যুতে চীন কার্যকর কোনো সহযোগিতা না দিলেও রাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তার প্রবাহ বজায় রাখতে চীনের দিকে সরকার মাঝে মধ্যে ঝুঁকে পড়ছে। আবার পাল্টা পক্ষ ভারত-আমেরিকান চাপ এলে তখন উল্টো দিকে যাত্রার ঘটনা ঘটে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশকে চীনের নেতৃত্বাধীন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য পদ দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে বাংলাদেশে চীনা নাগরিকদের গুপ্তহত্যার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে আটক ভিন্ন এক দেশের গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আয়োজন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। এটিকে ঢাকার ‘যেদিক থেকে সজোর বৃষ্টি সেদিকে ছাতা ধরার’ কৌশল হিসেবে অনেকেই দেখছেন।

কিন্তু আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর বঙ্গোপসাগর ও মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ নজর দেয়া শুরু করলে ঢাকাকে পররাষ্ট্র কৌশলে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ঢাকার নীতিপ্রণেতারা এ ক্ষেত্রে খুব বেশি সময় নিতে পারবেন বলে মনে হয় না।

পালাবদলের হাওয়া ও পাল্টা প্রস্তুতি চীন বলয়ের
বিগত দশকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ডকট্রিন পাল্টানোর ব্যাপারে কাজ শুরু হয়। এটি পরিণতি লাভ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। ইরাক এবং সবশেষে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের সাথে এই ডকট্রিনের সম্পর্ক রয়েছে, যার কারণে অনেকখানি অগোছালোভাবে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারে দেশে বিদেশে সমালোচনার পরও প্রেসিডেন্ট বাইডেন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে দৃঢতা দেখাচ্ছেন। তিনি আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে, সিরিয়াসহ অন্য সব স্থান থেকেও আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের গৃহযুদ্ধে আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না বলেও তিনি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে উল্লেখ করেছেন।

পশ্চিমা অনেক প্রভাবশালী গণমাধ্যমে এই প্রত্যাহারের সমালোচনা করা হচ্ছে এবং মন্তব্য করা হচ্ছে আমেরিকান সুরক্ষার ব্যাপারে আর কোনো দেশ ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা রাখতে পারবে না। কিন্তু আমেরিকান গভীর ক্ষমতা বলয়ের সূত্রগুলো বলছেন, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমেরিকা বড় কিছু করার জন্য আফগানিস্তান থেকে নিজেকে পরিকল্পিতভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটি কয়েক মাস সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করবে।

আমেরিকার ডকট্রিন পরিবর্তনের বিষয়টি চীন-রাশিয়া বলয়ের অজানা নয়। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান প্রত্যাহারের জন্য প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে চীন-রাশিয়া নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করলেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহারের আয়োজন সম্পন্ন করে আনলে আসে ভিন্ন বক্তব্য। বেইজিং ও মস্কো দুই দেশই অরক্ষিত রেখে আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের সমালোচনা শুরু করে। কারণ তারা জানে আফগান যুদ্ধ শেষ হওয়া মানে, লড়াইয়ের গতি চীনমুখী হওয়া।

আমেরিকার নতুন কৌশলগত যুদ্ধের বিষয়ে চীন একাধিক ফ্রন্টে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিং ঠিক কি চায় তা স্পষ্ট নয়। মাঝে মধ্যে সামরিকভাবে তাইওয়ানকে একীভ‚ত করার হুমকি দেয়। আবার দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের একাধিক নৌবহর পাঠানোসহ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার পর চুপ হয়ে যায়। চীন সম্ভবত এভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে তাইওয়ানকে চীনা কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করতে চায়।

দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি চীনের বার্তা হলো, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আপস-মীমাংসায় আসা। তাদেরকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যাপারে বেইজিং অফার করছে। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত কোন পদক্ষেপ বেইজিং গ্রহণ করলে তা তৃতীয় মহাযুদ্ধ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে হয়।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের মোকাবেলায় চীন রাশিয়া ও অন্য মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক মুদ্রা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল মাধ্যম চালুর মতো কিছু পদক্ষেপ এগিয়ে নিচ্ছে চীন। বিশ্বব্যাংক গ্রæপের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংককে আরো শক্তিশালী ও সক্রিয় করতে চাইছে বেইজিং। এ ব্যাপারে রাশিয়াসহ অনেক দেশের সহায়তা পাচ্ছে চীন। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের বাইরে, মালয়েশিয়া ফিলিপাইন ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি কাউন্টার করার জন্য আকর্ষণীয় কিছু অফার তৈরি করতে চাইছে বেইজিং। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ ও পাল্টা সরকার গঠনের বিপরীতে চীন বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সাথে যোগসূত্র তৈরি করছে, অন্য দিকে সামরিকভাবে রাশিয়ার সাথে সমন্বয় রেখে মিয়ানমারকে শক্তিমান করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চীন রোহিঙ্গাদের বিপরীতে, জান্তা সরকারের সাথে আরাকান আর্মির সমঝোতা করিয়ে দেয়ার ব্যাপারেও উদ্যোগ নিয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র কৌশলে সর্বাত্মকবাদী, শক্তিমান ও বৈধতার সঙ্কটে থাকা সরকারগুলো অগ্রাধিকার লাভ করে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো ইস্যু নিয়ে বেইজিং মাথা ঘামায় না বলে এই ধরনের সরকারগুলোও চীনা মৈত্রীতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। চীনের সাথে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তা চুক্তিতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে অর্থকড়ির প্রয়োজন হয় তা সহজে সরানো যায়। এতে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুর্বল হয়ে গেল কি না তা নিয়ে বেইজিং ভাবে না।

বেইজিংয়ের কৌশলবিদরা মনে করেন, নতুন পরিস্থিতিতে চীনা জনগণকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার নিজস্ব বিষয়গুলোতে মনোনিবেশ করতে হবে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সক্ষা এবং ‘হাইপার অ্যাক্টিভিটি’ এর কারণে ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপের জন্য চীনকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

ঝাঁকুনি এশিয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যেও পরিবর্তনের সঙ্কেত
সব কিছু মিলিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে আমেরিকা ও মিত্রদের সাথে চীন-রাশিয়া বলয়ের যে লড়াইয়ের আলামত স্পষ্ট হচ্ছে তাতে সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনিতে পড়তে পারে এশিয়া, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া। পরাশক্তিগুলোর নতুন যুদ্ধ খেলায় অনেক দেশে শাসন পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটতে পারে। এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কী অবয়ব নেয় তা দেখতে খুব বেশি সময় সম্ভবত অপেক্ষা করতে হবে না। তবে একটি বিষয় অনুমান করা যায় যে, নতুন বৈশ্বিক লড়াইয়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নামে ইসলামী দেশগুলোকে অস্থির ও ধ্বংস করার প্রকল্প সম্ভবত থাকছে না। বরং ভারসাম্য স্থাপনকারী শক্তি হিসেবে দু’পক্ষের কাছে এসব দেশের কদর বাড়বে।

এ কারণে ইসরাইলের সাবেক প্রেসিডেন্ট শিমন প্যারেজ কয়েকদিন আগে এক টুইটার বার্তায়, তার দেশকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক ইসলাম ও ইরানের মতো যেসব দেশ ও শক্তি ইসরাইলের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল তারা আমেরিকার সামনে আগামী দিনে শত্রু হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে তার নতুন কৌশল প্রণয়নে এগিয়ে যেতে হবে। জেরুসালেমে ফিলিস্তিনবিষয়ক আমেরিকান মিশন খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত এর একটি সঙ্কেত হতে পারে। বিপরীতে ইসরাইলের কৌশল কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। 
mrkmmb@gmail.com



আরো সংবাদ


ইসরাইলকে ইরানে গোয়েন্দা অভিযান চালাতে নিষেধ করল যুক্তরাষ্ট্র (১৪২৯২)‘ওমিক্রন’ থেকে বাঁচাতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করলেন চিকিৎসক (১১০২৯)ইরান ইস্যুতে আমেরিকা একঘরে হয়ে পড়েছে : ব্লিঙ্কেনের স্বীকারোক্তি (১০২১৩)এরদোগানকে হত্যার চেষ্টা! (৮০৯০)রুশ অস্ত্র কিনলে নিষেধাজ্ঞা, ভারতকে বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের (৭৯১৫)বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না (৭৮৩৪)পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হেরেও খুশি পাপন (৭২৬৯)যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি : প্রতিবেশীর ঘরে অস্ত্র ঢোকালে যুদ্ধ বাধবে (৬৫০৭)‘বুথে নয়, নৌকার ভোট হবে টেবিলের উপরে, পুলিশ প্রশাসনকে সেভাবেই দেখবো’ (৬০০১)জ্বর নেই, স্বাদ-গন্ধও ঠিক আছে! ওমিক্রন চেনার সহজ উপায় (৫৮২৬)