২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী : সত্যের প্রতি অবিচল এক রাহবার

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী : সত্যের প্রতি অবিচল এক রাহবার - ফাইল ছবি

মাত্র এক সপ্তাহ আগে মাসিক মুঈনুল ইসলামের নির্বাহী সম্পাদক মুহতারম মুনির ভাইয়ের মোবাইল থেকে ফোন করে শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হুজুর আমার করোনাজনিত অসুস্থতার খবর নিয়েছেন এবং আরোগ্য কামনা করে বিশেষ দোয়া করেছেন। তখনও জানতাম না যে, সাত দিন পর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন চিরতরে আল্লাহর রহমতের ছায়ায়। ১৯ আগস্ট দুপুরে ৬৮ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বড্ড দুঃসময়ে জাতি তাকে হারিয়ে ফেলল। তার ইন্তেকালে দেশের কওমি অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। নেতৃত্ব দেয়ার মতো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব এখন খুব চোখে পড়ে না। বহুমাত্রিকতায় মরহুমের জীবন ছিল বর্ণাঢ্য ও কর্মমুখর। তিনি একাধারে মুহাদ্দিস, গবেষক, সংগঠক, লেখক, বক্তা, প্রশাসক ও সমাজচিন্তক। তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির, দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষাসচিব ও শায়খুল হাদিস, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালিমুল কুরআন বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাসিক মুঈনুল ইসলামের প্রধান সম্পাদক, নাজিরহাট বড় মাদরাসার মুতাওয়াল্লি, জিরি মাদরাসার পরিচালনা পরিষদের সদস্য, মাসিক দাওয়াতুল হকের পৃষ্ঠপোষক এবং ইনসাফ২৪ ডটকম ও কওমিভিশন ডটকমের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। লেখক ও সাংবাদিকদের তিনি বেশ পছন্দ করতেন। কারণ তাদের মাধ্যমে বক্তব্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ তথা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে।

সব সময় তার অকৃত্রিম স্নেহ ও দোয়া পেয়েছি। সময় পেলে হাদিস বিষয়ে বেশ কিছু জটিল প্রশ্ন আমি তাকে করতাম; কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই তাৎক্ষণিক জবাব দিতেন। এতে হাদিসশাস্ত্রে তার গভীরতা ও পারঙ্গমতার পরিচয় মেলে। উর্দু ভাষায় তার লিখিত ‘শরিয়তের দৃষ্টিতে দাড়ি’ বাংলায় অনুবাদ করেছি। তিনি বলেন, মূল লেখক হিসেবে আমার নাম এবং অনুবাদক হিসেবে আপনার নাম থাকায় পাঠকপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। তিনি চাইতেন কলেজ থেকে অবসর নেয়ার পর আমি যেন কোনো মাদরাসায় হাদিসের দরস দেই। বর্তমানে আমি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন মাদরাসা জিরি জামিয়া আরাবিয়ায় হাদিসের খিদমত করছি, এটি বাবুনগরী হুজুরের অবদান। তিনি ছিলেন মূলত সমাজ সচেতন ও উম্মাহর দরদি এক মনীষী। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমন এক রাহবার যার ওপর আস্থা রাখা যায়; যাকে সাধারণ মানুষ ভালোবাসেন। পদলোভ, অর্থলিপ্সা ও ক্ষমতার অভিলাষ তার ছিল না। সারা জীবন জ্ঞানচর্চা, ধর্মপ্রচার ও সমাজ পরিবর্তনের মেহনত করে গেছেন। চাপ বা আপস তাকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। সারল্য ও অনাড়ম্বরতা তার জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

দেশের বিভিন্ন মাহফিলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সর্বদা বলতেন, ‘হকের ওপর যেন থাকতে পারি, হকের ওপর যেন মরতে পারি, হকের ওপর থাকলে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়। আমার বিরুদ্ধে অনেক মামলা। আমিও জেল খেটে এসেছি।’ তিনি যখন বোখারি শরিফের পাঠদান করতেন, দারুল হাদিসে তিল ধারণের ঠাঁই থাকত না। এমনকি ছাত্ররা বারান্দা ও সিঁড়িতে কিতাব নিয়ে বসে যেত তার জ্ঞানলব্ধ তাকরির শোনার জন্য। ছাত্রদের কাছে ছিলেন অতিপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ওস্তাদ।

হেফাজতের আমির ও শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ: আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ:-এর হাতে গড়া শিষ্য এবং স্থলাভিষিক্তযোগ্য প্রতিনিধি। তিনি তাকে বাবুনগর মাদরাসা থেকে এনে হাটহাজারী মাদরাসায় থিতু করেছেন; হেফাজতের মহাসচিব বানিয়ে প্রশিক্ষিত করেন, যাতে পরে সংগঠনের হাল ধরতে পারেন। ইলমের উত্তরাধিকার বহন করতে পারেন। তিনি কিছু দিন হাটহাজারী মাদরাসার সহযোগী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমৃত্যু শিক্ষা পরিচালক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী শিক্ষক ও প্রথিতযশা মুহাদ্দিস। উচ্চতর হাদিসশাস্ত্রে তার বিদেশী গবেষণা ডিগ্রি রয়েছে। তার বাবা হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দিস হজরত আল্লামা আবুল হাসান চাটগামী রহ: লিখিত ‘তানজিমুল আশতাত’ নামক মিশকাত শরিফের ভাষ্য বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। অনেক চড়াই উতরাই ও ঘাত অভিঘাত অতিক্রম করার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল তার। ওস্তাদ আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ:-এর মতো তারও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না। আলাপচারিতায় বোঝা যায়, রাজনীতির ক‚টচাল ও ক‚টনীতির মারপ্যাঁচের সাথে তিনি পরিচিত নন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ:-এর ইন্তেকালের পর তিনি হেফাজতে ইসলামের আমির নির্বাচিত হন।

২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে আমার এক প্রশ্নের জবাবে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী জানিয়েছিলেন, ‘আমি সরকারবিরোধী নই, সরকারের শত্রæ নই এবং সরকারের পক্ষও নই, সরকার সমর্থকও নই। কারো অন্যায্য চাপ বা প্রভাবের সামনে মাথা নত করব না। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে নামানো আমার অ্যাজেন্ডা নয়। যেহেতু হেফাজত রাজনৈতিক দল নয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে আমাদের কোনো প্রার্থিতাও নেই, প্রপাগান্ডাও নেই। ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তাহজিবের বিকাশ এবং নাস্তিক্যবাদের প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাবো। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ধর্ম অবমাননা ও কটূক্তির সব প্রয়াস বন্ধ করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। হেফাজত তার সুনির্দিষ্ট রূপপ্রকল্প নিয়ে এগোবে। সরকার সরকারের কাজ করুক, আমরা আমাদের কাজ করি। কিন্তু নাস্তিক্যবাদী শক্তি যদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে, এতে সরকার যদি কোনো অ্যাকশন না নেয়, অথবা সরকার যদি নিজের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় যা শরিয়াহ পরিপন্থী; তা হলে ঈমানের তাগিদে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।’ আপস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারকে নসিহত করা বা সৎ পরামর্শ দেয়া একটি মহৎকর্ম। এ কাজটি হতে হবে নিঃস্বার্থ। অতীতেও বুজুর্গানে দ্বীন করেছেন। এতে ব্যক্তিস্বার্থ যদি প্রাধান্য পায় তা হলে নসিহত ফলপ্রসূ হবে না। ভারতের মুজাদ্দিদে আলফে সানি ও তুরস্কের শায়খ আফিন্দি নকশবন্দীর মতো মানুষ তো এখন আর নেই’ (নয়া দিগন্ত, ঢাকা, ২৮ জুলাই, ২০২০; ২৩ নভেম্বর,২০২০)।

একটি ব্যাপার লক্ষ করা যায়, সময়ে সময়ে যেসব মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও যখন হাটহাজারী মাদরাসায় এসেছিলেন, তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে কারো সাথে দেখা করতে যাননি। খুব সম্ভবত ‘দরবার ও সরকার’ থেকে দূরত্বে অবস্থান করাকে তিনি নিরাপদ মনে করেছেন। তিনি আসলাফ ও আকাবিরদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পছন্দ করেন। বিত্তশালীদের তোয়াজ করা ও ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না এবং আগ্রহীও ছিলেন না। ঐতিহ্যগতভাবে এ ধাতে তিনি গড়ে ওঠেননি। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সামরিক সচিব মেজর জেনারেল জয়নাল আবেদিন তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার সময় প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। পৃথিবীর যে দেশে আপনি চিকিৎসা করাতে চান রাষ্ট্রীয় খরচে প্রধানমন্ত্রী সে ব্যবস্থা করবেন।’ কিন্তু আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী উত্তরে বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার সালাম। প্রস্তাবের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা আমার আছে।’

এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি কওমি অঙ্গনের আলেম ওলামার নেতৃত্বে আসীন হন। শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদী আলেমদের ইন্তেকালে কওমি অঙ্গনের ওলামা মাশায়েখদের নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দেয়। সরকারের শিক্ষা ও নারীনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে নাস্তিক্যবাদী শক্তির আস্ফালন, বøগার ও সুশীল নামে পরিচিত একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য ও মন্তব্য যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন শাহ আহমদ শফী রহ:-এর হাতে গড়া ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ নামে অরাজনৈতিক সংগঠনের হাল ধরেছেন। সে সময় তার চেয়ে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো ব্যক্তি সামনে ছিলেন না। আলেম ওলামা তাকেই আমির হিসেবে বেছে নেন। তিনি হয়ে ওঠেন নবজাগরণের প্রতীক।

১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামের এক ইলমি খান্দানে তার জন্ম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়ালেখা বাবুনগর মাদরাসায় শেষ করে হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হন এবং দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনের সর্বত্র তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৬ সালে করাচিতে অবস্থিত জামিয়া বিননুরিতে উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন। দুই বছর হাদিস নিয়ে গবেষণা করে তিনি আরবি ভাষায় ‘সিরাতুল ইমামিদ দারিমি ওয়াত তারিখ বি শায়খিহি’ (ইমাম দারিমি ও তার শিক্ষকদের জীবনবৃত্তান্ত) শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। করাচিতে তার উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা মুহাম্মদ ইউসুফ বিননুরী, মুফতি ওয়ালি হাসান টুঙ্কি, মাওলানা ইদরিস মিরাঠি, মাওলানা আবদুল্লাহ ইউসুফ নোমানি প্রমুখ। ১৯৭৮ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করে বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা। ২০০৩ সালে তিনি দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় যোগ দেন। পরে তিনি হাটহাজারী মাদরাসার সহযোগী পরিচালক নিযুক্ত হন। সারা জীবন তিনি শিক্ষকতা করেন এবং তার কাছে হাদিস পড়েছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০ হাজারেরও বেশি।
বাংলা, উর্দু ও আরবি ভাষায় হাদিসের শরাহসহ ৩০টির বেশি গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেন। তার বেশ ক’টি বক্তৃতার সঙ্কলনও বেরিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সিরাতুল ইমামিদ দারিমি ওয়াত তারিখ বিশায়খিহি, বিশ্ববরেণ্য মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ইমাম আবু হানিফা রহ:, তালিমুল ইসলাম, বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির কবলে শবেবরাত, ইসলামে দাড়ির বিধান, তাওহিদ ও শিরক : প্রকার ও প্রকৃতি, মুকাদ্দিমাতুল ইলম : তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, ফতোয়া, দারুল উলুম হাটহাজারীর কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র, আকাবিরে দেওবন্দের সিলসিলায়ে সনদ, জুনায়েদ বাবুনগরীর রচনাসমগ্র, ইলমে হাদিসের ভ‚মিকা, খুতবার ভাষা, মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা:, ইসলাম আওর সায়েন্স, নাস্তিক মুরতাদের শরয়ি বিধান, জাল হাদিস, সূরা ফাতিহা, মুকাদ্দামায়ে তানজিমুল আশতাত, খতমে নবুওয়ত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়, সিয়াম সাধনা, ইতেকাফ ও ঈদ মোবারক, মিলাদ কিয়াম ও সুন্নাত-বিদআত, হক বাতিলের লড়াই, সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব ও ফজিলত, ইসলাম বনাম সমকালীন মতবাদ, প্রচলিত জাল হাদিস : একটি তাত্তি¡ক আলোচনা এবং ইসলামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা।

বাংলাদেশের নন্দিত আলেমে দ্বীন খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ:কে অত্যন্ত মুহাব্বত করতেন বাবুনগরী হুজুর। তার বাবা মিশকাত শরিফের ভাষ্যকার আল্লামা আবুল হাসান রহ: ছিলেন হাটহাজারী মাদরাসায় মাওলানা ছিদ্দিক আহমদের ছাত্র। এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘১৩৭৯ হিজরি সনের কথা। তখন আমি জামিয়া ইসলামিয়া বাবুনগরের ছাত্র। স্থানীয় ফকিরহাট বাজারে একটি ইসলামী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে অসংখ্য লোকের সমাবেশ ঘটে। তখন সকলের মুখে একটি নাম শুনতে পাই। পুরো সম্মেলনই তার জন্য অপেক্ষমাণ। সবাই প্রহর গুনছিল কখন তাশরিফ আনবেন এই মহামান্য মেহমান। তিনি আর কেউ নন, এ দেশের ইসলামী আন্দোলনে অন্যতম সিপাহসালার খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ:। বিশিষ্ট এ বুজুর্গকে সেদিন সর্বপ্রথম দেখার সৌভাগ্য হয়। প্রথম সাক্ষাতেই তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জমে ওঠে। ক্রমেই তা বাড়তে থাকে। পরে যখন উম্মুল মাদারিস দারুল উলুম হাটহাজারীতে অধ্যয়ন শুরু করি তখন খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ:কে আরো কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়। তিনি দারুল উলুম হাটহাজারীতে প্রায় আসতেন। এটিই তাকে পাওয়ার বড় সুযোগ। আমার শ্রদ্ধেয় নানাজান হজরত মাওলানা মুহাম্মদ হারুন বাবুনগরী রহ: ও আমার শ্রদ্ধেয় বাবা মিশকাত শরিফের ভাষ্যকার আল্লামা আবুল হাসান রহ:-এর নিসবতে আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একবার স্নেহ করে বললেন, ‘তুমি ভালোভাবে শিক্ষা সমাপন কর, দাওরায়ে হাদিস থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তোমার বাবাকে বলে তোমাকে আমার সাথে রেখে দেবো।’ একবার ফটিকছড়ি তালিমুদ্দিন মাদরাসায় তার সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি তাকে একটি রুমাল হাদিয়াস্বরূপ দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। পরে আমার নানাকে বলেন, এটি আমাকে জুনায়েদ হাদিয়া দিয়েছে, সে আমাকে খুব ভালোবাসে। শিরক ও বিদআতের মোকাবেলায় খতিবে আজম শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ও তার প্রাণপ্রিয় ওস্তাদ মুফতিয়ে আজম বাংলাদেশ আল্লামা মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ:-এর স্মৃতিকে তাজা করে দেন। বাহাস ও মুনাজারার ময়দানে তিনি দ্বীনের গভীর ও সূক্ষè তত্ত্বগুলো উপস্থাপন করে তার বিরোধী গ্রুপকে খামোস করে দিতেন। তখন আমাদের স্মরণ হতো ইমাম গাজ্জালি ও ইমাম শাহওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভির কথা’ (ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন সম্পাদিত ‘খতিবে আজম স্মারকগ্রন্থ’)।

রাত সাড়ে ১১টায় অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শোকার্ত মানুষের অংশগ্রহণ মরহুমের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করেছেন। শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বেঁচে থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে হাদিসের ওস্তাদ হিসেবে। ইসলামী শিক্ষার বিকাশ, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, হকের আওয়াজ বুলন্দ করার সংগ্রাম এবং নাস্তিক্যবাদ বিরোধী গণ-আন্দোলনে তার নিরাপস ভ‚মিকা জন্য তিনি মাইলফলক হয়ে থাকবেন ইতিহাসে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম নসিব করুন এবং দারাজাত বুলন্দ করে দিন, আমিন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com



আরো সংবাদ


যশোরে নির্বাচনী সহিংসতায় ১ জনের মৃত্যু আগামী সপ্তাহে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ মোহাম্মদ হানিফ মানুষের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকবেন : প্রধানমন্ত্রী ইকো সম্মেলনে অংশ নিতে তুর্কমেনিস্তান গেলেন এরদোগান কারা অর্থ পাচার করে জানি না, একটি তালিকা আমাকে দেন : অর্থমন্ত্রী কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার সরকার রূপসী বালিকার মতো শুধু প্রশংসা শুনতে চায় : রুমিন ফারহানা গোয়ালন্দে ৬ দিন আটকে রেখে যুবককে নির্যাতন, পলাতক ইউপি সদস্য ইরাকে সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বাগদাদে বিক্ষোভ কাফনের কাপড় পরে মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সমর্থকরা পাবলিক আমাদের সরকারের ‘দালাল’ বলে : জাপা মহাসচিব

সকল