১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

গণতন্ত্রায়ন

গণতন্ত্রায়ন - ছবি : নয়া দিগন্ত

যেকোনো আদর্শের দু’টি দিক রয়েছে। তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক। সে রকমই গণতন্ত্র। গ্রিক নগররাষ্ট্র থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার বছর থেকে গণতন্ত্র জনপ্রিয় আদর্শ হিসেবে অনুসৃত হয়ে আসছে। এর তাত্ত্বিক দিক হচ্ছে- ‘সকলের তরে সকলে আমরা’। আর বাস্তবিক দিক হচ্ছে- ‘আমার ভোট আমি দেবো; যাকে খুশি তাকে দেবো’। উভয় ক্ষেত্রেই অনুকরণ, অনুসরণ ও অনুশীলনের বিষয়টি- এটি আকস্মিক নয়। এমনি এমনি হয় না। এটি কোনো ট্যাবলেট নয় যে, খাইয়ে দিলেন আর ফল পেতে শুরু করলেন। বরং বলা যেতে পারে, এটি ফলগাছের মতো। গাছ যেমন রোপণ করতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়, সেটিও তেমনি। গাছের আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। গরু-ছাগলে যাতে না খেয়ে ফেলে, সে জন্য বেড়া দিতে হয়। সার দিতে হয়। তবেই গাছ তরতর করে বেড়ে ওঠে । গণতন্ত্রের যত্ন করলে একসময়ে ফলে ফুলে সুশোভিত হয়। তখন ছায়া দেয়, কাঠ দেয় এবং সুমিষ্ট ফল দেয়। এসব কথার মানে হচ্ছে- গণতন্ত্র একটি প্রক্রিয়া। প্রথমত জীবনাচার এবং দ্বিতীয়ত পদ্ধতি এর প্রতিষ্ঠা দেয়। তখনই পরিপূর্ণ গণতন্ত্রায়ন ঘটে।

গণতন্ত্রায়ন গণতন্ত্রে পৌঁছানোর একটি প্রক্রিয়া। লর্ড ব্রাইস ১৮৮৮ সালে ‘গণতন্ত্রায়ন’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। মনে করা হয়, ফরাসি বিপ্লবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে ব্রাইস গণতন্ত্র বাস্তবায়নের প্রথা-পদ্ধতির কথা চিন্তা করেছিলেন, যদিও গ্রিক নগররাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্রের সূচনা।

এর প্রতিষ্ঠানিকতা ও পদ্ধতিগত অনুসরণ শুরু হয় ফরাসি বিপ্লবের পর। প্রথমত ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলোতে। পরে আমেরিকায়। ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে গণতন্ত্রের জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯০ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত উন্নত জাতিগুলোয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা পরিপূর্ণতা লাভ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে গণতন্ত্রায়নের ‘প্রথম তরঙ্গ’ বলে অভিহিত করেন। এর গতি ছিল মন্থর কিন্তু প্রতিষ্ঠা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোসহ পৃথিবীর সর্বত্র গণতন্ত্রের জয়জয়কার লক্ষ করা যায়। একে গণতন্ত্রায়নের ‘দ্বিতীয় তরঙ্গ’ বলে অভিহিত করা যায়। মার্কিন শান্তিবাদী প্রেসিডেন্ট উইড্র উইলসন তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রায়নে গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করেন।

উল্লেখ্য, যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা-পরবর্তী ১০০ বছরের তাদের এখন প্রদর্শিত সাম্রাজ্যবাদী কুৎসিত ভূমিকা ছিল না। মনরো ডকট্রিনের ঘোষিত নীতিমালার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, আমেরিকা আমেরিকানদের। এর ফলে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগিজরা তাদের পশ্চিম গোলার্ধের উপনিবেশগুলো পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এর অবধারিত তরঙ্গ আছড়ে পড়ে পূর্ব গোলার্ধে। ক্রমে ক্রমে স্বাধীনতা লাভ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো। স্বাধীনতা লাভ করে ব্রিটিশের সবচেয়ে বৃহৎ ও সমৃদ্ধ উপনিবেশ ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালে। স্বাধীনতা লাভের পর এসব দেশে গণতন্ত্রায়নের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। তবে সব দেশে সমানতালে এর বিকাশ ঘটেনি। যেমন- ভারতের নেতৃত্ব রাজনীতিকদের হাতে থাকার ফলে গণতন্ত্রায়ন সহজ হয়। অপর দিকে একই সাথে স্বাধীনতা লাভ করলেও পাকিস্তানের নেতৃত্ব সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে থাকার কারণে গণতন্ত্রায়ন ব্যাহত হয়। পরবর্তীকালে এই আমলাতন্ত্রের প্রভাব বাংলাদেশেও পরিলক্ষিত হয়েছে। ফ্রিডম হাউজের এক সমীক্ষা মোতাবেক ১৯৭০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্রায়নে আরেকটি ‘তরঙ্গ’ লক্ষ করা যায়। এই সময়ে বাংলাদেশে সামরিকতন্ত্রের পতন হলে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে।

এ সময়ে ফ্রিডম হাউজের হিসাব মোতাবেক ৬৩ শতাংশ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, এই সময়ে ১৯৭৪ সালে পর্তুগালে, ১৯৭৩ সালে স্পেনে এবং ১৯৭৬ সালে গ্রিসে সামরিকতন্ত্রের পতন ঘটে। ১৯৯০ সালে হান্টিংটন কথিত আধুনিক ‘তৃতীয় তরঙ্গে’ দেশে দেশে গণতন্ত্রের প্রবল তরঙ্গ অনুভূত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের এই চরম বিজয় ঘটে। পৃথিবী সর্বত্র এই তরঙ্গের অভিঘাত ঘটে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয়ের কথা আগেই বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে ২০২০ সালে ঘটে যুগান্তকারী ‘আরব বসন্ত’। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া এই বিপ্লবে আরব বিশ্বে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। মিসরের শক্ত স্বৈরাচারী মোবারকের পতন ঘটে। লিবিয়ায় ‘সুশাসক স্বৈরাচার’ গাদ্দাফির করুণ পরিণতি ঘটে। মরক্কো, জর্দান, কুয়েত প্রভৃতি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয়। নড়েচড়ে বসে সৌদি রাজতন্ত্র। এই গণতন্ত্রায়ন কোনো কোনো দেশে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। ১১ বছর ধরে সিরিয়ায় স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণযুদ্ধ চলছে। ইয়েমেন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধ্বস্ত এক দেশ। লিবিয়া গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। আলজেরিয়ায় গণতন্ত্র এখনো পরিপূর্ণতা লাভ করেনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নে বিপ্লবের কাল থেকে গণতন্ত্রায়ন সম্পর্কে জোরদার হয়েছে। এই অধ্যয়নের মূল কথা হচ্ছে- যেকোনো দেশে গণতন্ত্রায়ন হচ্ছে ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিসরে পরিব্যাপ্ত। বিষয়টি সর্বস্পর্শী এবং সর্বগ্রাসী। দৃশত রাজনৈতিক বাস্তবে এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাদের বিশ্লেষণে গণতন্ত্রায়নে অনেক পূর্বশর্তও উল্লেখ করেন। তাদের সম্মত প্রপঞ্চ হচ্ছে- দেশটি যত উন্নতির দিকে এগোবে ততই এগোবে গণতন্ত্রের পথে। অনত্র এই মন্তব্য সঠিক হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বেঠিক বলে গত এক যুগে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে সত্যিই যদি উন্নয়ন ঘটে থাকে, তবে গণতন্ত্রায়নের লক্ষণ পরিপূর্ণ হওয়ার কথা। তবে নিষ্ঠুর শক্তি প্রয়োগে সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে পারে। এটি একটি অপ্রিয় বাস্তবতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আরো বলেন যে, একটি দেশের গণতন্ত্রায়ন সে দেশের সমাজের গতি প্রকৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যে নিহিত। তারা বলেন, গণতন্ত্রের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। গণতন্ত্রায়নের হাইজাম্প-লংজাম্প নেই।

আরববিশ্বের উদাহরণ দিয়ে গবেষকরা স্বল্পস্থায়ী গণতন্ত্রে অসারতা প্রমাণ করেন। তবে বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের সংগ্রাম অনেক পুরনো ও দীর্ঘস্থায়ী। সুতরাং স্বল্পমেয়াদের স্বৈরতন্ত্র এ দেশে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক আপদ-বিপদ তথা জনরঞ্জন বাঁধের আপাত বিপদ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশাহত হওয়ার কারণ ঘটাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রায়নের পূর্বশর্তগুলোর দিকে বিশেষজ্ঞরা আলোকপাত করছেন। ডি. এ. রাস্ট্রোর মতে, গণগন্ত্র প্রতিষ্ঠার শর্তাবলি আর গণতন্ত্রের স্থায়ীত্বের শর্তাবলি এক নয়। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং সমাজের মূল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সমন্বয় হতে হবে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতা নির্ভর করছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর। গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ব্যাপকভাবে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ওপর গণতন্ত্রায়নের সফলতা নির্ভরশীল। বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়নের শর্তগুলো হচ্ছে- ক. জনমনস্তত্ত্ব; খ. জাতীয় নেতৃত্ব; গ. রাজনৈতিক দলের ভূমিকা; ঘ. ভৌগোলিক অবস্থান; ঙ. অতীত ইতিহাস; চ. গণতন্ত্রের ঐতিহ্য; জ. অর্থনৈতিক অবস্থান; ঝ. গণমাধ্যমের ভূমিকা ও সামগ্রিকভাবে; ঞ. পরিবেশ পরিচিতি। বাংলাদেশ অতীতে বিদ্রোহের দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র জনগণের চরিত্রে ও আকাক্সক্ষায় প্রতিষ্ঠিত। যেকোনো সময় বিস্ফোরণোন্মুখ এই জনগোষ্ঠী গণতন্ত্রের বিপ্লব ঘটাতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com



আরো সংবাদ