২৪ জুলাই ২০২১
`

‘এশিয়ার ডাস্টবিন’ এখন কোথায়

-

দেড় শ’ বছর আগে ‘গুপ্ত কবি’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বলে গেছেন, ‘রাতে মশা, দিনে মাছি;/এ নিয়ে কলকাতায় আছি।’ আর তখনকার ঢাকা প্রসঙ্গে উৎকট সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত একটি কথা হচ্ছে, ‘কাক কুকুর নেড়ে,/ এই তিনে ঢাকা বেড়ে।’ বলা নিষ্প্রয়োজন, এখানে ‘নেড়ে’, বা মাথা কামানো বলতে যে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়কে (অনেকে মাথা কামিয়ে ফেলতেন সুন্নত হিসেবে) বুঝানো হয়েছে, তা সবাই জানেন। বিশেষত, ১৯৪৭-এর পরে গত পৌনে এক শতাব্দীতে ঢাকার ‘নেড়ে’র অপবাদ কেটে গেছে অনেকটা। এখন ‘রাতে মশা দিনে মাছি’ কথাটা বেশি প্রযোজ্য হচ্ছে ঢাকার বেলায়। অন্য দিকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যে কলকাতা ছিল ‘এশিয়ার ডাস্টবিন’তুল্য অপরিচ্ছন্ন সে নগরী এখন অনেকটাই এ দুর্নাম কাটিয়ে উঠছে। মনে রাখা দরকার, অতীতের ‘মসজিদের নগরী’ ও বর্তমানের ‘মশকের নগরী’ ঢাকা স্বাধীন-সার্বভৌম এক রাষ্ট্রের রাজধানী। আর কলকাতা অতীতের কেন্দ্রীয় রাজধানীর অভিধা হারিয়ে বর্তমানে ভারতের এক প্রদেশের প্রধান শহর মাত্র। ঢাকায় এখন রাতে মশার কামড় আর দিনে মাছির উৎপাত সইতে হয়। বিশেষত মধ্যরাতের ঢাকায় রাস্তাঘাটে পুলিশ, পশু (কুকুর) ও পসারিণী বা রূপোপজীবীনী ছাড়া অন্যদের কমই দেখা যায়। এর মধ্যে পুলিশকে জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। কুকুর আর পসারিণীর দৌরাত্ম্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীন্য বা ব্যর্থতার দলিল। যা হোক, বারবার শুনতে হচ্ছে ঢাকা এখন ‘পৃথিবীর অন্যতম প্রধান অবাসযোগ্য শহর’। আর সেখানেই অন্তত কোটিখানেক মানুষের বসতি। তদুপরি দিন দিন বর্ধিত হচ্ছে- সংখ্যায় ও আকারে। বলা হচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক কিংবা কাবুল ছাড়া ঢাকার চেয়ে দুনিয়ার সব শহরের অবস্থাই উন্নত। কথাটা ক্ষোভজাত ও অতিরঞ্জিত হতে পারে; তবে এটা পুরো ভিত্তিহীন হোক, এটাই আমাদের কাম্য।

যে ঢাকা পবিত্র ‘আজানের শহর’, যে ঢাকা ‘প্রাচ্যের রহস্য নগরী’ যেখানে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ অবস্থিত, যে শহরে দেখার ও শেখার আছে বহু কিছু, সে ঢাকাকে কেন আজো অপবাদ শুনতে হবে? ঢাকা নগরের বাসিন্দারা যদি সচেতন না হন, তা হলে শুধু দু’ভাগ নয়, শতভাগে বিভক্ত করা হলেও ঢাকানগর নানা সমস্যায় ঢাকা পড়ে থাকবে; এখানকার মানুষের মুক্তি ও মর্যাদা মিলবে না।

মনে পড়ছে, প্রায় দু’দশক আগে আমরা কয়েকজন বাংলাদেশী সাংবাদিক সরকারের উদ্যোগে বায়ুদূষণ নিরীক্ষার কাজে উপমহাদেশের কয়েকটি নগরে গিয়েছিলাম। তখন দেশের বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, আমাদের প্রিয় শহর ঢাকা যেন বায়ুদূষণের দরুন একটা ‘গ্যাস চেম্বার।’ দূষিত বায়ুর অবাঞ্ছিত উত্তাপ এমনটা মনে করার কারণ। তবুও আমরা ফিরেছি চিরচেনা এ নগরীর কোলে।

একে নীরোগ-নির্মল ও স্বাস্থ্যপ্রদ বানানোর দায় আমাদের সবার- সরকার, এনজিও, মিডিয়া, সুশীল সমাজ, এলিট শ্রেণী ও জনগণ নির্বিশেষে সবার। ছোটবেলায় ভাবতাম, ঢাকার মাটি আমাদের এলাকা বা আমাদের মফস্বল শহরটার মাটির চেয়ে আলাদা। এখন দেখছি, এই শহর ঢাকার দশা কেবল দেশের আর সব স্থানের মতোই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরো খারাপ । এ জন্য রাজধানীর রাজপথে কোমর সমান নোংরা পানি ভাঙতে ভাঙতে অথবা এখানে কোনো রাস্তার নোংরা গর্তে পড়ে হাত-পা ভেঙে অনেকে মনের দুঃখে না বলে পারেন না, ‘অজপাড়াগাঁয়েও এত বাজে রাস্তা নেই ঢাকার মতো।’ কথাটা সত্যি হলেও ঘুরে ফিরে আনতে হয় ‘আমারি ঢাকা’তে। এ শহরকে ‘আপন’ করা এবং ‘পর’ মনে করা- দু’টিই কঠিন। অবশ্য গোটা দেশের রক্ত আজ ঢাকার চেহারায় ফুটিয়ে তোলার অবাঞ্ছিত কোশেশ চলছে।

সম্প্রতি বহুলালোচিত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) বিশ্ব বসবাসযোগ্য শহরগুলোর যে তালিকা করেছে, এতে আমাদের ঢাকা মহাগরীর অবস্থান প্রায় তলানিতে। আমরা এতে আছি বাসযোগ্য শহরের তালিকার নিচ থেকে চতুর্থ স্থানে। অনেকের অভিযোগ, ঢাকা অবাসযোগ্য হয়ে পড়ার একটা বড় কারণ এর অপরিচ্ছিন্নতা। এটি কিন্তু এ যাবৎ বিশ্বের বড় মহামারীগুলোরও একটি প্রধান কারণ। আমার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ কেউ সিঙ্গাপুর থাকেন। সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর খুব জোর দেয়া হয়ে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে- বাংলাদেশের যারা স্বদেশে এ বিষয়ে তেমন মনোযোগী নন, তারা পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের মতো জায়গাগুলোতে গেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এটা কেন ও কিভাবে সম্ভব? আসলে কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ি নিয়মিত থাকলে সবাই আইন মেনে চলতে বাধ্য। এর একটা প্রমাণ হলো, ১৯৫৮ সালে এ দেশে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানের পর বছর দুয়েক সরকার দৃশ্যত পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে জোর দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য যা-ই হোক, তখন আমরা নিজেরাও সাধ্যমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চলার চেষ্টা করেছিলাম। আজো সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশে ও নগরে আইনি কঠোরতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন চলার চেষ্টা করতে দেখা যায়। এর কারণ প্রধানত আইনি কঠোরতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন চলার অভ্যাস গড়ে তোলা। এটা জাতির দৈহিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।
ইউরোপ প্রবাসী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবার ঢাকার বাসযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আমাদের প্রিয় শহর ঢাকা আজ বসবাসের প্রায় অযোগ্য একটি শহর। নিচের দিক থেকে প্রিয় শহরটিকে চার নম্বরে আবিষ্কারের পর বারবার আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার কথা মনে আসছিল। দেশটির রজাধানী কিগালি। আমাদের কি জানা আছে, এটা আফ্রিকার সবচেয়ে পরিষ্কার শহর? পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে ইউরোপ-আমেরিকার যেকোনো শহরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অবস্থায় এটা পৌঁছে গেছে।’


আলোচ্য লেখাটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘রুয়ান্ডা তো সেই দেশ যারা মাত্র দেড় দশক আগেও নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করছিল। হুতি আর তুতসিদের মধ্যে কী ভয়ঙ্কর সঙ্ঘাত হয়েছিল, তা আমাদের অনেকের জানা। সেই রুয়ান্ডার রাজধানীকে এখন বলা হয় ‘আফ্রিকার সিঙ্গাপুর’। আরো উল্লেখ রয়েছে- ‘মাত্র ১২ বছর আগেও কিগালি ছিল আফ্রিকার অন্য শহরগুলোর মতোই অগোছালো, অপরিচ্ছিন্ন। একটা সময়ে দেশটির সরকার সিদ্ধান্ত নিলো পুরো শহরকে (আসলে পুরো দেশকে) তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ফেলবে। শহরের সব বস্তি ভেঙে ফেলা হলো। তাদের জন্য ওই শহরেই অ্যাপার্টমেন্ট বøক তৈরি করা হলো। তারা সেখানেই এখন থাকে। শহরের সব রাস্তাঘাট ঢেলে সাজানো হলো। ট্রাফিক সিস্টেম নতুন করে তৈরি করা হলো। রাস্তাগুলোর নতুন সাইন বসানো হলো। ... সাধারণ জনগণ যাতে এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়ার একটা অংশ হতে পারে, এ জন্য ‘কমিউনিটি ক্লিনিং’ প্রোগ্রাম চালু করা হলো। ...এ কাজ দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক। দেশের সব মন্ত্রী-এমপি-প্রেসিডেন্টও প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার রাস্তায় বের হয়ে নিজ এলাকা পরিষ্কার করতে বাধ্য। ...রুয়ান্ডার মাথাপিছু আয় মাত্র ৮৮৩ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দু’হাজার ডলারের বেশি। অথচ বসবাসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শহরগুলোর একটি হচ্ছে ঢাকা।’

ঢাকার কথা উঠলে অনেকেই দুঃখের সাথে উল্লেখ করেন, ‘আমরা নিকৃষ্ট এক শহরে বাস করছি, যা কেবল দামেস্ক কিংবা কাবুলের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের চেয়ে এগিয়ে।’ সঙ্গত ক্ষোভ থাকলেও অভিযোগটার ব্যাপক ভিত্তি আছে। ক্রমবর্ধিত ঢাকার মানবসৃষ্ট সমস্যার অন্ত নেই। যদিও প্রধানত সরকারকে এ নিয়ে দায়ী করা যায়। আবার এটাও সত্যি, কেবল সরকার নয়, সবাইকে সচেতন হতে হবে, বিশেষত চলমান মহামারী থেকে জরুরি শিক্ষা নিয়ে। সরকারের পাশাপাশি সমাজ, জনগণ, মিডিয়া, প্রেসার গ্রæপ, বুদ্ধিজীবী, এলিট-সুশীলÑ সবার কর্তব্য আছে দেশের প্রতি, জাতির প্রতি। সে কর্তব্য সাধন না হলে করোনার চেয়েও বড় বিপদ চেপে বসতে পারে আমাদের সবার ওপর। আমরা নিস্তার পাচ্ছি না অবকাঠামো ঘাটতি, আবর্জনা, জলাবদ্ধতা, যানজট থেকে শুরু করে অন্যায়, জুলুম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বৈষম্য, শোষণ প্রভৃতি থেকে। আর প্রকৃতির নানাবিধ বিরূপতা তো আছেই। আমরা এত কিছুর পর এখনো শিক্ষা না নিলে কখন নেবো? আজো বাংলাদেশে প্রতিদিন মহামারী করোনায় শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে; প্রাণ দিচ্ছে। অপর দিকে- এখনো চলছে রাজনৈতিক হানাহানি ও খেউর, অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা, সামাজিক অন্যায়-অবিচার ও অশান্তি প্রভৃতি। এসব দিকে দেশের মধ্যে ঢাকাই এগিয়ে। তা হলে কি ঐতিহ্যময় এ শহর বাসযোগ্য হবে না কোনোদিন? কথায় বলে- ‘পুরো দেহের রক্ত মুখে উঠে আসা স্বাস্থ্য নয়, রোগের লক্ষণ।’ তেমনি প্রধানত ঢাকাকে ‘তিলোত্তমা’ করাই যথেষ্ট নয়। এর সাথে পুরো দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি থাকতে হবে।

কথা হলো, রাজধানীকে দেখেই বিদেশীরা কোনো দেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তাই ঢাকার এত বেশি গুরুত্ব। এ দেশকে মানুষের বাসযোগ্য করার কাজ শুরু হোক, ঢাকা শহর দিয়েই। আসুন, সবাই আজই এ লক্ষ্যে ব্রতী ও তৎপর হই। না হয়, সবার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার।



আরো সংবাদ