১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

রোবোটিক্স ও প্রযুক্তির নতুন বিপ্লব

রোবোটিক্স ও প্রযুক্তির নতুন বিপ্লব - ছবি- সংগৃহীত

রোবোটিক্স বা রোবোট বিজ্ঞানে প্রতিদিনই নতুন নতুন আবিষ্কার করা হচ্ছে এবং তা মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর করার ক্ষেত্রে প্রভূত অবদান রাখছে। রোবোট নিয়ে হলিউড ও জাপানি বিভিন্ন অ্যানিমেশন চিত্র থেকে আমাদের অনেকেরই এমন ধারণা হয়েছে যে, রোবোট মানেই মানুষের আকৃতির একটি যন্ত্র যা মানুষের মতোই হাঁটাচলা করে এবং মানুষের মতো কথা বলে। বছর তিনেক আগে বাংলাদেশ ঘুরে গেল ‘সোফিয়া’ নামের মানুষ আকৃতির একটি রোবোট। হংকংয়ের ডেভিড হ্যানসনের উদ্ভাবিত এই রোবোট মানুষের মতো কথা বলতে, চিন্তা করতে ও বিভিন্ন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে। অর্থাৎ হলিউডি চলচ্চিত্র স্টার ওয়ারস-এ যে ধরনের আর-২-ডি-২ রোবোট ব্যবহার করে ছোট ছোট স্পেসশিপগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করা হতো, কল্পনার সেই যন্ত্রই এখন বাস্তব রূপ পেয়েছে। কথার পিঠে কথা বলতে পারা অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারার কারণে ‘সোফিয়া’ অনন্য একটি আবিষ্কার। একটি দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। এ ধরনের রোবোট গণযোগাযোগে ও বৈরী পরিবেশে মানুষের সেবাদানে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক মিডিয়ায় বিশেষ করে টিভি চ্যানেলে রোবোট সংবাদ পাঠক নিয়োগের খবর আমরা জানি। বৈরী পরিবেশে কাজ করতে পারার সক্ষমতা থাকছে বলে আগামী দিনে রোবোটের কদর বাড়বে। যেমন ধরুন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মানুষে মানুষে দূরত্ব রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক চিকিৎসক কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, এখনো যাচ্ছেন। এ সময় যদি রোগীর চিকিৎসায় রোবোট ব্যবহার করা যেত, তাহলে অনেক মানুষ চিকিৎসকের জীবন রক্ষা পেত (বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এ মারা গেছেন প্রায় দেড় শ’ চিকিৎসক)। যুদ্ধক্ষেত্রে রোবোট ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও আমরা জানি। এ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চালিত রোবোট যুদ্ধাস্ত্র এরই মধ্যে কোনো কোনো দেশের সামরিক বাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে। সুতরাং রোবোটিক্স এমন এক প্রযুক্তি যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে আমরা মানুষের আকৃতির রোবোট নিয়ে বলতে চাচ্ছি না। আমরা ব্যবসায়-বাণিজ্যে অর্থাৎ অর্থনৈতিক খাতে ব্যবহার উপযোগী রোবোটের সাম্প্রতিক উন্নয়ন নিয়ে কিছু বলতে চাই।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে কল-কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার আমরা দেখি। রেবোটিক হাত কারখানায় গাড়ির যন্ত্রাংশ সংযোজন করছে কিংবা খাদ্যসামগ্রীর কারখানায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য টিন বা বোতলজাত করছে- এমন দৃশ্য আমাদের কাছে এখন আর খুব নতুন নয়। রোবোটিক্সবিষয়ক আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের এক রিপোর্টে জানা যায়, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পেশাদার কাজে সহযোগিতায় সক্ষম রোবটের বিক্রি বিশ্বজুড়ে ৩২ শতাংশ বেড়েছে। আর ২০২০ সালে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর এ ধরনের রোবটের ব্যবহার আরো বেড়ে গেছে। মহামারীর সময় যে ‘নতুন বিপ্লব’ আসতে যাচ্ছে রোবোটিক্সে সেটি অভিনব। বড় বড় ওয়্যারহাউজ বা গুদামে মানুষের পরিবর্তে রোবোট ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। বলা যায়, নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। অ্যামাজন, নাইকি, আলিবাবার মতো বৃহৎ কোম্পানির একেকটি গুদামে হাজার হাজার রোবোট কাজ করছে। খুব সম্প্রতি হংকংয়েই একটি ওয়্যারহাউজে নতুন একদল রোবোট কাজ শুরু করেছে যেগুলো স্বয়ংচালিত। এগুলো দিনরাত টানা কাজ করতে পারে এবং কোনো সাপ্তাহিক ছুটিরও দরকার হয় না তাদের। শুধু তাই নয়, যন্ত্রগুলো যত বেশি কাজ করে ততই সে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা নিজের ভেতরে সঞ্চয় করে নিতে পারে। তার মানে হলো, যন্ত্রটি নিজে নিজেই আরো বেশি চৌকস হয়ে উঠতে পারে। সেই সাথে গবেষকরা তো আছেনই। তারা যন্ত্রের কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনমতো সেগুলোর প্রোগ্রামিং ভাষার (অ্যালগরিদম) উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছেন; যন্ত্রটিকে আরো নিপুণভাবে কর্মক্ষম করে তুলছেন।

চীনের ‘গিকপ্লাস’ (এববশ+) নামের একটি নতুন প্রতিষ্ঠান এই স্বচালিত রোবোট উদ্ভাবন করেছে। এই রোবোটগুলো ওয়্যারহাউজের ভেতরে নিজে নিজে চলতে পারে ঘরের মেঝেতে বসানো কিউআর কোডের নির্দেশনার মাধ্যমে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তারা কোনদিকে যেতে হবে, কী কাজ করতে হবে; আবার কোন পথে নিজের জায়গায় ফিরে আসতে হবে তা বুঝে নিতে পারছে। গিকপ্লাস এরই মধ্যে এ ধরনের দেড় হাজার রোবোট তৈরি করে ত্রিশটির বেশি দেশে সরবরাহ করেছে। এ রোবোটগুলো কী কাজ করছে? তারা নানা ধরনের পণ্য তা কে সাজিয়ে রাখছে, অর্ডার এলে সেখান থেকে সংগ্রহ করে আনছে, ডেলিভারি ভ্যানে তুলে দিচ্ছে, পণ্যের হিসাব রাখছে এবং সবচেয়ে বড় যেটা, ‘মানবিক ভুল’ করছে না। এর ফলে পণ্য সরবরাহ দ্রুততর হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর বিপুল অর্থ বেঁচে যাচ্ছে মানুষ কর্মীদের বেতন-ভাতা, চিকিৎসা, বোনাস, বিনোদন ইত্যাদি নানা খাতে। অনেক কোম্পানির জনবল ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রাথমিকভাবে কিছু বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় ওয়্যারহাউজ অটোম্যাশনের কাজে। রোবোটের কাজের সুবিধার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় এবং পুরো কর্মপদ্ধতি ও সরঞ্জাম সেভাবেই তৈরি করে নিতে হয়।

গিকপ্লাস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিট ফাং বলেছেন, সবাই নিজেদের ওয়্যারহাউজে এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করার জন্য মুখিয়ে আছে। বাংলাদেশে এ ধরনের ওয়্যারহাউজ আছে কমই। একেকটি ওয়্যারহাউজের আয়তন একটি ফুটবল মাঠের চেয়ে কয়েক গুণ বড়। সেখানে বহু মানুষকে কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই বহু মানুষের কাজ করে দিচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকটি রোবোট। সুতরাং বিস্ময়ের কিছু নেই যে, দলবেঁধে কাজ করতে এবং নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম রোবোটদের দিন শুধু আসছে না, বরং বলতে হবে, এসে গেছে।

সিএনএন-এর এক রিপোর্টে বলা হয়, রোবোটের পাল দারুণ কাজ দেখিয়েছে। হংকংয়ের সে ওয়্যারহাউজ গত চার মাসে ১০ লাখের বেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করতে পেরেছে। একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের অনলাইন সুপার মার্কেট ওকাডোতে তিন হাজার রোবোট অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের কাজ করে চলেছে। একটি অর্ডার এসে পৌঁছে সাথে সাথে রোবোটগুলো সচল হয়ে ওঠে এবং যে পণ্যের অর্ডার এসেছে সেটির দিকে রওয়ানা হয়।

জাপানের নতুন কোম্পানি টেলিএক্সিসটেন্স-এর (ঞবষবীরংঃবহপব) তৈরি করা সাত ফুট উঁচু মডেল রোবোট টেকিওর দুটি বৃহত্তম ওয়্যারহাউজে তাকে পণ্য সাজিয়ে রাখার কাজ করে থাকে। এসব রোবোটের সাথে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও নানা ধরনের সেন্সর লাগানো আছে। এদের হাতে তিনটি করে আঙুল আছে যেগুলো দিয়ে ড্রিঙ্কস-এর বোতল, ক্যান বা চালের গামলা তোলা বা জায়গা মতো রাখতে পারে। দূর থেকে বা বাড়িতে বসে মানুষ কর্মচারীরা এসব রোবোটকে নিয়ন্ত্রণ করে। ‘হ্যান্ডেল’ নামে এক ধরনের রোবোট বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ডায়নামিক্স। এই কোম্পানি রোবোটিক্সের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। তাদের হ্যান্ডেল ৩০ পাউন্ড ওজনের বাক্স তুলতে এবং স্থানান্তর করতে পারে।

এ ছাড়াও কত ধরনের রোবোট কত রকমের কাজ যে করছে তার ইয়ত্তা নেই। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটি একটি কোম্পানির সাথে মিলে এমন এক রোবোট বানিয়েছে যেটি মেঝে পরিষ্কারের কাজ করে। চার হাজার বর্গফুটের একটি ওয়্যারহাউজের মেঝে সেটি পরিষ্কার করে মাত্র আধ ঘণ্টায়। তার মানে, ১০-২০ জন মানুষের কয়েক ঘণ্টার কাজ একাই করে দেয় ওইটুকু সময়ের মধ্যে। কিন্তু এ রোবোটটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বিকিরণজাত ফোমের সাহায্যে পুরো মেঝে জীবাণুমুক্ত করে থাকে। ভয়াবহ বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে এটা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

শুরুর দিকে যে সোফিয়ার কথা বলেছি সেটির উদ্ভাবক এবং ‘হ্যানসন রোবটিক্স’ নামের কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ডেভিড হ্যানসনের বক্তব্য, করোনা মহামারীর এই সময়ে মানুষকে নিরাপদ রাখতে আরো বেশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রয়োজন। তার মতে, মহামারীর এই সময়ে রোবট কেবল স্বাস্থ্যসেবাই নয়, খুচরা পণ্যবিক্রির দোকান থেকে শুরু করে এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রি এবং অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতে পারে। তাতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারবে।

একটি ভিন্ন বিষয় দিয়ে আলোচনার উপসংহারে যাই। খুব সম্প্রতি এক দিন সাংহাইয়ের আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল দেড় হাজার ড্রোন। সেটি ছিল চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয় জাপানি ভিডিও গেম প্রিন্সেস কানেক্ট! রি ডাইভের প্রথম রিলিজের প্রথমবার্ষিকী। ড্রোনগুলো নগরীর আকাশে বিশালাকারের কিউআর কোড তৈরি করে। কিউআর কোড হলো কুইক রেসপন্স কোডের সংক্ষেপ। এটি সাঙ্কেতিক পদ্ধতিতে তথ্য প্রদর্শনের একটি উপায়- অনেকটা পণ্যের মোড়কে ছাপানো বারকোডের মতো। এতদিন কিউআর কোড ছিল কাগজে ছাপা বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের পর্দায় দেখার জিনিস। এবার সেটি আকাশে প্রদর্শিত হলো। যে কেউ তার মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলে কিউআর কোডের তথ্য জানতে পারেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্বে আরেকটি বিপ্লবের দুয়ার কিন্তু খুলে গেল। সেটি হলো, বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ভবিষ্যতে আর রেডিও, টিভি, অনলাইন, পত্র-পত্রিকা বা হোর্ডিং, বিলবোর্ড কোনো কিছুরই প্রয়োজন হবে না। আকাশই প্রচার করবে যাবতীয় পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন।

সাংহাইয়ের ড্রোনগুলো কিউআর কোডের পাশাপাশি প্রিন্সেস কানেক্ট ভিডিওচিত্রের কয়েকটি চরিত্রের ছবিও এঁকেছে আকাশে। সেসব কিউআর কোড স্ক্যান করলে সাথে সাথে আপনি যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন প্রিন্সেস কানেক্টের ওয়েবসাইটের হোম পেজে। এমনকি যে ড্রোনগুলো ওই কোড বা চরিত্রের ছবি এঁকেছে সেই ড্রোনের ছবি স্ক্যান করলেও আপনি যুক্ত হচ্ছেন ওই হোম পেজে। কী সব অদ্ভুত ঘটনা! সম্ভবত এটিই হচ্ছে ‘বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ’। প্রযুক্তি এভাবেই নতুন বিপ্লবের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। যখন একটি অদ্ভুত বিশ্বে আমরা বসবাস করব কেবলই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে, প্রযুক্তির সহায়তায়। সেই সাথে একটি নতুন চিন্তার কারণও ঘটাচ্ছে এই প্রযুক্তি। সেটা হলো, বিপুলসংখ্যক মানুষকে কি বেকার হয়ে যেতে হবে? বিষয়টি উদ্বেগের। তবে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী এবং তারা যেকোনো সমস্যার সমাধানে অপারগ নয়। ভবিষ্যতে বেকারত্ব দেখা দিলে নতুন নতুন কাজের দিগন্ত যে উন্মোচিত হবে না, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
mujta42@gmail.com



আরো সংবাদ