৩০ জুলাই ২০২১
`

সোনার মানুষের বিদায়

সোনার মানুষের বিদায় - ফাইল ছবি

একজন ‘সোনার মানুষ’ ছিলেন সরকারের সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নান। এবার জুন মাসের দ্বিতীয় দিনেই সর্বশক্তিমান পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় তার এ প্রিয় বান্দার ইহজীবন শেষ হয়ে গেল। শাহ হান্নান ছিলেন অন্য সচিবদের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করতে হয় যে, তিনি ‘সরকারের একজন সচিব ছিলেন’। তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন সত্যিকার সোনার মানুষ হারিয়েছে। এমন পূতপবিত্র জীবন ছাড়া সোনার দেশ ও আদর্শসমাজ গড়া অসম্ভব। তিনি পরিণত বয়সে চলে গেলেও তার মৃত্যুর ক্ষতি অপূরণীয়।

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকের এক রাতের কথা। দৈনিক নয়া দিগন্তে আমাদের তদানীন্তন একজন সহকর্মী, গোলাপ মুনীর ভাইয়ের একমাত্র সন্তানের বিয়ে হচ্ছিল। স্থান আজিমপুর ভিকারুন নিসা নূন স্কুলের কাছে একটি কমিউনিটি সেন্টার। মা-বাবার একমাত্র কন্যার বিয়ে; তাই বেশ আয়োজন ছিল বিয়েতে। দাওয়াত পেয়ে আমিও সস্ত্রীক গিয়ে হাজির। রাজধানীর ক্রনিক যানজট পেরিয়ে যখন সেখানে পৌঁছলাম, ততক্ষণে প্রথম ব্যাচের খানাপিনা শেষ হলে ঢোকার মুখেই দেখি, শাহ আব্দুল হান্নান সাহেব কয়েকজনকে নিয়ে বেরিয়ে আসছেন খাওয়া শেষ করে। তিনি আমাকে দেখেই স্নেহভরে জড়িয়ে ধরলেন। আমার স্ত্রী তো হতবাক। সে ভাবছিল, কে এই মানুষটা যিনি বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরেছেন।

আসলে হান্নান সাহেবের একটা বিশেষ গুণ ছিল মানুষকে আপন করে নেয়ার। তিনি যেভাবে জড়িয়ে ধরতেন এবং গায়ে মাথায় হাত বুলাতেন, তাতে মনে হতো তার চেয়ে বেশি ভালোবাসার কেউ এ দুনিয়ায় নেই। মানুষকে দরদ দিয়ে কাছে টেনে নেয়ার বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। সবাই ছিলেন তার আপন এবং তিনিও ছিলেন সবার আপনজন।

হান্নান সাহেব আদর্শনিষ্ঠ ও নীতিবান মানুষ ছিলেন। এ জন্য তাকে নানা কথা শুনতে হয়েছে; বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। ন্যায়নৈতিকতার কল্যাণকামী অভিযাত্রায় পিছুহটার মানুষ তিনি ছিলেন না। তিনি নিঃসন্দেহে একটা ধ্যান ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু দলীয় সঙ্কীর্ণতায় আচ্ছন্ন ছিলেন না কিংবা রাজনৈতিক গোঁড়ামিকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি এমন বুদ্ধিজীবী ছিলেন যিনি মনে করতেন, দল তার ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ নেবে; তাদের জ্ঞান গবেষণা দ্বারা উপকৃত হবে। কিন্তু এই বুদ্ধিজীবীরা কিছু পাওয়ার আশায় দলের পেছনে ঘুর ঘুর করবে না। শাহ আব্দুল হান্নান জীবনে কিছু পাওয়ার আশায় কাজ করেননি। তিনি স্বচ্ছ বিবেক নিয়েই চলতেন এবং তার এ চলা ছিল বুক ফুলিয়ে আর মাথা উঁচু করে। মনে আছে, আওয়ামী লীগের অতীতের এক শাসনামলে (সম্ভবত ১৯৯৯ সালের দিকে) অনেক বড় পদে থাকার সময়ে যখন তার নামে নানা অপবাদ দিয়ে সরকারের হাইকমান্ডের কান ভারী করে তোলা হচ্ছিল; যখন বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি আর বেশি দিন সরকারে থাকতে পারবেন না, তখন তিনি সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এক দিন মাথা উঁচু করে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছি, আবার এক দিন যেন মাথাটাকে উঁচু রেখেই এখান থেকে বিদায় নিতে পারি।’ তার অকপট এ কথায় সেদিন সব ষড়যন্ত্রী আর চালবাজের মুখ কালো এবং মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল।

শাহ আব্দুল হান্নানের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য সহজেই নজর কাড়ত। তিনি তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ধারারও বশংবদ ছিলেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই নিজের মতামত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে দ্বিধা করতেন না। মনে পড়ে, ১৯৯৮ সালের দিকে একজন লেবাননি-আমেরিকান মহিলা স্কলার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি মুসলিম না খ্রিষ্টান, ঠিক জানা নেই। তবে কোনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, তথা বুদ্ধিজীবী। হিজাব পরতেন না এবং ‘রাজনৈতিক’ ইসলামের একজন সমালোচক ছিলেন। ধানমণ্ডির কোনো এক মিলনায়তনে তার এক প্রোগ্রামে সভাপতিত্ব করেছিলেন অথবা বিশেষ অতিথি ছিলেন শাহ আব্দুল হান্নান। পেশাগত প্রয়োজনে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। মনে রাখা দরকার, সেটা এমন এক সময় যখন এ দেশের ‘ইসলামপন্থীরা’ স্বাভাবিকভাবেই আফগান তালেবান শাসনের ব্যাপারে কেবল উৎসাহী নন, তাদের একটা বড় অংশই ছিলেন কাবুলে তালেবান শাসনের সমর্থক। বিশেষত পাশ্চাত্য মহাশক্তির বিষম প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকা তালেবানরা ছিল এক ধরনের বিস্ময় ও ব্যতিক্রম। তখন ‘আমরা হবো তালেবান-বাংলা হবে আফগান’ স্লোগান দেয়ালে উৎকীর্ণ দেখেছেন অনেকেই। এমন প্রেক্ষাপটে শাহ আব্দুল হান্নান ওই সভায় বক্তৃতা দিতে উঠে প্রথমে ইসলামের সার্বিক আবেদন ও সর্বজনীনতা তুলে ধরলেন। এরপর প্রসঙ্গক্রমে বললেন, তালেবানদের উগ্রতা ও হঠকারিতা ইসলামের জন্য বদনাম বয়ে আনছে। তার কথা শুনে সেদিন অনেকেই হতাশা ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যা বলতেন, জেনে বুঝে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলতেন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ‘মধ্য রাতের নির্বাচন’ হয়েছিল বলে অভিযোগ বিরোধী দলের। দেশের মানুষ দেখেছে, সে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল। এই সংসদ নির্বাচনের আগের কিছু দিন মিডিয়ায় প্রাধান্য পেয়েছে ভোটাভুটির খবর। শাহ আব্দুল হান্নান সাহেবের ঘনিষ্ঠ মহলও ওই সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিল। তারা ক’টি আসনে প্রার্থী দেবেন কিংবা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, তা ছিল অস্পষ্ট। এ সময়ে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হান্নান সাহেবের অভিমত প্রকাশ করেছিল নির্বাচন সম্পর্কে। তিনি এহেন নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা প্রমাণ করে তার বক্তব্যের যৌক্তিকতা।

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গেও বলতে হয়। ১৯৯৫ সালের দিকে একদিন জানা যায়, আমার মরহুম বড় ভাই মোতাহেরুল করিমের নামে তার এক সাবেক সহযোগী মিথ্যা অভিযোগ করে তাকে বদলি করিয়ে দিয়েছে দেশের এক প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে। অভিযোগটি তদানীন্তন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে (ইঅঈ)। অবস্থা এমন ছিল যে, অনেকেই বলতেন- ‘ব্যুরো এমন ‘বুড়ো’ যে, তার পক্ষে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।’ সম্ভব কি অসম্ভব, সেটা পরের কথা। আগে অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই করা উচিত। বড় ভাইয়ের মামলার ব্যাপারে দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে লাভ হলো না। কয়েক দিন পর শুনলাম, আমার সে ভাইকে সৎ হিসেবে চিনতেন শাহ আব্দুল হান্নান এবং তিনিই ব্যুরোর পরিচিত মহাপরিচালককে বলেছেন যে, এ মামলার ভিত্তি নেই। অতএব, ‘মোকদ্দমা ডিসমিস’। ব্যাপার হলো, যে অভিযোগকারী এ বানোয়াট মামলায়, সে নিজেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত।

দৈনিক নয়া দিগন্ত ‘সত্যের পথে প্রতিদিন’ স্লোগানসহ দেশের বাজারে আসে ২০০৪ সালের ২৪ অক্টোবর। এর আগে জুন মাস থেকে প্রতিদিন এর ডামি বের করা হতো। আমরাও বিপুল উৎসাহে এবং বিনা ছুটিতে এই ৪ মাস এক নাগাড়ে কাজ করে গেছি। তখন পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতার জন্য উপসম্পাদকীয় সংগ্রহ করতে হতো সম্পাদকীয় লেখার পাশাপাশি। একদিন আমাদের এক সহকর্মী একটা বই কিনে আনল। ঘটনাক্রমে বইটি শাহ আব্দুল হান্নানের লেখা। এর একটা নিবন্ধে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন তার ছাত্রজীবনের। সেখানে অকপটে ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন দলমত নির্বিশেষে সহপাঠীদের কথা। বিগত শতাব্দীর গোড়ায় তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তার একই সময়ে ছাত্র, সহপাঠী ও সুপরিচিত ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ও কমরেড কাজী জাফরসহ অনেকেই। জাফর অবশ্য পরে জাপা নেতারূপে পরিচিত হন। বিশেষ করে উল্লেখ্য হচ্ছে, হান্নান সাহেব তার স্মৃতিচারণে নিরপেক্ষতার কোনো ব্যত্যয় ঘটাননি। তার একটি বই থেকে প্রবন্ধ ছাপা হচ্ছে নয়া দিগন্তে, এটা ছিল কাকতালীয় ব্যাপার। অথচ তিনি ছিলেন এ পত্রিকার অন্যতম পরিচালক। পরে তিনি প্রত্যেক বৃহস্পতিবার ইসলামের নানা দিক নিয়ে লিখতেন কলাম। তার একটা লেখার কথা বেশি মনে থাকবে। তা হলো, তিনি লিখেছেন, ঢাকার গোড়ান এলাকায় একদিন তিনি দেখতে পান যে, ‘মসজিদে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ’। এমনকি, মসজিদের পাশের একটা রাস্তা দিয়ে তাদের চলাও ‘নিষিদ্ধ’। এটা দেখে তিনি অবিলম্বে লিখেছিলেন ইসলামে নারীদের গুরুত্ব, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে। ইসলামের সঠিক শিক্ষা প্রচার করে বিভ্রান্তি নিরসন করতে তিনি ছিলেন সদা তৎপর।

বৃহত্তর ঢাকার পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ জেলায় অনেক কৃতী পুরুষের জন্ম। শাহ আব্দুল হান্নানের পৈতৃক নিবাসও এ জেলার কটিয়াদি উপজেলায়। তিনি স্বীয় প্রতিভাগুণে এবং নানামুখী অবদানে সারা দেশের অনন্য সম্পদ হয়ে উঠেছিলেন। নিজে এতবড় ব্যক্তিত্ব ও কর্মবীর হলেও তার সারল্য, বিনয়, সৌজন্য ও প্রচারবিমুখতার মতো মহাগুণাবলি তিনি কোনো দিন বিসর্জন দেননি। তাই অনেক গ্রন্থের প্রশংসাভাজন প্রণেতা হয়েও তিনি নিজের পরিচয়ে কখনো ‘গ্রন্থকার’ লেখেননি। অথচ আজকাল এক আধটা বই লিখে কেউ কেউ ‘গ্রন্থকার’; আবার ‘গোভেষক’- এমন ভুল বানানে কেউবা দাবি করেন যে, তিনি একজন গবেষক! অথচ শাহ আব্দুল হান্নান সাহেব কতবড় গবেষণাকারী ও লেখক ছিলেন, তা বলা বাহুল্য। তিনি ২৪ ঘণ্টাই ছিলেন ইসলামী জীবনাদর্শের আন্তরিক প্রচারক, অর্থাৎ ‘দায়ী ইলাল্লাহ’। যেখানেই যেতেন- সভাসমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত দাওয়াত, প্রভৃতি- সাথে কোনো বইপত্র (চটি বই হলেও) কিংবা কোনো আর্টিকেল বা নিউজের ফটোকপি রাখতেন বিলির জন্য। এমন পূত জীবনের অধিকারী ছিলেন শাহ আব্দুল হান্নান যে, মনে হয় তার মতো পবিত্র বান্দাদের উদ্দেশেই মহান আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ফাদখুলি ফি ইবাদি; ওয়াদখুলি জান্নাতি। অর্থাৎ আমার বান্দাদের মাঝে শামিল হয়ে আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরায়ে ফজ্বর, পারা ৩০)



আরো সংবাদ