১৬ জুন ২০২১
`

মুক্ত গণমাধ্যম ও আমাদের দায়িত্ব

মুক্ত গণমাধ্যম ও আমাদের দায়িত্ব - ছবি : সংগৃহীত

সংবাদপত্রের খবর, ‘বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম সূচকে গত বছরের চেয়ে আবার এক ধাপ পেছাল বাংলাদেশ।’ এটি একটি বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংগঠন আরএসএফের (রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স) স্থিরীকৃত ও ঘোষিত সূচক। তাদের নামের অর্থ হলো- ‘সীমানার ঊর্ধ্বে যে রিপোর্টার’ বা সাংবাদিকরা। তাদের মতে, জরিপ করা ১৮০টি দেশের মধ্যে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে এ দেশ।

আরএসএফ গত দুই দশক ধরে অর্থাৎ ২০০২ থেকে নিজস্ব সূচকে মুক্তগণমাধ্যমের বিষয়টি তুলে ধরছে। তাদের বক্তব্য, এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নির্দেশক। বিভিন্ন দেশের সরকার আপত্তি জানিয়ে বলেছে, এটি ‘অগ্রহণযোগ্য’। ২০১৩ সাল থেকে আরএসএফ সূচকে বাংলাদেশের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রথম থেকেই এ বিষয়ে সরকার ও অন্যদের প্রতিক্রিয়া এক নয়। দেশের মানুষ সাক্ষী গণমাধ্যমের বিদ্যমান স্বাধীনতা প্রসঙ্গের। সরকার বারবার বলেছে, তারা সেন্সরশিপে বিশ্বাসী নয়। এ দিকে জনগণ দেখছে, মিডিয়া ‘যে কারণেই হোক’, সেলফ সেন্সর বা আত্মনিয়ন্ত্রণের বাস্তবায়ন করে চলেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশে গণতন্ত্রের অবস্থা ‘ভালো নয়’ বলে মিডিয়াও ভালো থাকার কথা নয়। এভাবেই বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে।

আবার আরএসএফের মিডিয়া ইনডেক্সের প্রসঙ্গ। তারা দাবি করেছেন, বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। কারণ ২০১৯ সালে এ দেশ ‘মুক্ত’ সাংবাদিকতার বেলায় ছিল ১৫০তম স্থানে। পরের বছর এক ধাপ পিছিয়ে যায়। এবারো এর পুনরাবৃত্তি পরিলক্ষিত হলো।

আমাদের মিডিয়া মানের চেয়ে পরিমাণে বা সংখ্যায় এগিয়ে- এমন একটি বিশ্বাস অনেকের। কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট মিডিয়ার সংখ্যায় আর আত্মনিয়ন্ত্রণে (যা কারো কারো দৃষ্টিতে ‘আত্মসংযম’)। মিডিয়ামালিক অনেক ক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট হলেও কারণটা বলতে চান না, পাছে ‘কোনো ঝামেলা হয়’। দেশের সাধারণ মানুষ কার্যত রাজনীতিহীন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। তাদের কাছে, মিডিয়ার মরণদশার চেয়ে নিজেদের জীবন-জীবিকার কী দশা, সেটি অধিক গুরুত্ববহ।

আরএসএফের বক্তব্য, সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ‘মুক্ত গণমাধ্যমের বেলায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো নয়।’ কথা হলো, সার্কের দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কোনটিতে গণতন্ত্রের অবস্থা ভালো? ভারতকে বিশ্বের ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ’ বলা হলেও সেখানেও গণতন্ত্র ক্রমেই বিপন্ন হচ্ছে উগ্রতার কবলে পড়ে। গণতন্ত্র মানসম্মত না হলে মিডিয়ার মানও ভালো থাকে না। বিকৃত বা ‘হাইব্রিড’ গণতন্ত্র স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে পারে না। একটি দেশে নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হলেই তাকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলা যায় কি? সেটি নির্বাচিত হলে ‘গণতন্ত্রী’ হতে পারে, ‘স্বেচ্ছাচারী’ও হওয়া অসম্ভব নয়।

আরএসএফের প্রদত্ত সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ যেখানে ১৫২তম, সেখানে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ভুটান (৬৫তম); এরপর মালদ্বীপ (৭৯) ও নেপাল (১০৬), তার পর যথাক্রমে আফগানিস্তান (১২২), শ্রীলঙ্কা (১২৭), মিয়ানমার (১৪০), ভারত (১৪২) এবং সবশেষে পাকিস্তান (১৪৫)। এই মানক্রম নিয়ে কিছু কথা। ভুটানে বাস্তবে বেসরকারি মিডিয়া নেই। মালদ্বীপের সাম্প্রতিক অস্থিতিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা সবার জানা। সে দেশে চীনপন্থী বনাম ভারতপন্থীদের বিরোধের খবর আর গোপন নয়। নেপালের রাজনৈতিক কলহকোন্দল এখন ব্যাপক।

আফগান পরিস্থিতি কতটা গণতান্ত্রিক, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিককালে নির্বাচিত স্বৈরাচারের জাতীয়তাবাদী উগ্রতা এবং জনতুষ্টিবাদ ও গরিষ্ঠতাবাদী অপশাসনের অভিযোগ উঠেছে। মিয়ানমারে নির্বাচিত পার্লামেন্ট বাতিল করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা জবরদখল এবং অল্প কিছু দিনেই প্রায় ৮০০ বিক্ষোভকারীর হত্যা আর হাজার হাজার মানুষের গ্রেফতার প্রমাণ করে, সেখানকার পরিস্থিতি কেমন। ভারতের মিডিয়ার দীর্ঘ দিনের সুনাম ক্ষুণœ করছে সাম্প্রদায়িক ও কট্টরপন্থী ক্ষমতাসীন মহল। আর পাকিস্তানে হ-য-ব-র-ল দশা এবং নানামুখী সন্ত্রাসের তাণ্ডব তো বিশ্ববিদিত। তাই যেভাবে আরএসএফ এসব দেশের ক্রমিক অবস্থান নির্ধারণ করেছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আরএসএফের অনেক ভূমিকাই প্রশংসনীয়। মুক্ত গণমাধ্যমের বিষয়ে হয়তো পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তাদের তৈরি করা তালিকা নিয়ে কথা উঠছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, এখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং গণতন্ত্রের চলমান অবস্থা সবার জানা। হয়তো কেউ বলেন; কেউ চুপ থাকেন এ নিয়ে।

আরএসএফ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলছে, ২০২০ সালের মহামারী কোভিড এবং লকডাউনের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশ ও বেসামরিক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান মহামারী এবং সমাজে এর প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন লেখায় অনেক সাংবাদিক, ব্লগার, কার্টুনিস্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তারা বিচারের সম্মুখীন। বিশেষ উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ রাখতে সরকারের অস্ত্র হলো ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন বলে, নেতিবাচক প্রচারণার দায়ে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ফলে মিডিয়ায় অভূতপূর্ব সেল্ফ সেন্সর দেখা যায়। ২০১৯ সালে আবার নির্বাচিত হয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে গণমাধ্যমের ব্যাপারে। অভিযোগ, দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে সাংবাদিকরা সহিংসতার শিকার। তাদের নির্বিচারে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ওয়েবসাইট করা হয়েছে ব্লক। আরএসএফ আরো বলেছে, ‘যে সাংবাদিকরা দুর্নীতি কিংবা স্থানীয় অপরাধী চক্র নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন, তারা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার। এতে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে।’

প্রকৃতপক্ষে শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন যেমন পুরো গণতন্ত্র নয়, তেমনি কেবল মুক্তমিডিয়া গণতন্ত্রকে বাঁচাতে পারে না। এ জন্য সরকার ও বিরোধী দলসমেত রাজনৈতিক অঙ্গনে, সমাজ ও জনগণ, এনজিও এবং বুদ্ধিজীবী-বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় সহায়তা প্রয়োজন। মিডিয়ার গণতান্ত্রিক ভূমিকা দেখে জনগণের অনুকূল কোনো শক্তির ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও সরকারেরই ইমেজ উন্নত হবে। আর যদি মিডিয়ার কেউ কোনো অন্যায় করে থাকেন, সে জন্য তো যথারীতি প্রতিবিধানের ব্যবস্থা আছেই। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন ক্ষমতার অপব্যবহার হবে না। এটি নিশ্চিত করার দায় কার? যারা ক্ষমতাবান, তাদেরও উপলব্ধি দরকার। শুধু একপক্ষ আত্মনিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; সবার কর্তব্যবোধ ও দেশপ্রেম থাকতে হবে। অন্যথায় দায়িত্ব, অধিকার, ক্ষমতা ও আইনসহ সব কিছুর অপপ্রয়োগের শঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণপত্রে মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্যের কথা বলা হয়েছিল। আসুন, সবাই সে মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হই এবং সর্বদা নিয়োজিত থাকি মানবতার কল্যাণে।



আরো সংবাদ