১৩ মে ২০২১
`

ইরানের নাতাঞ্জে ইসরাইলের ‘পারমাণবিক সন্ত্রাস’

ইরানের নাতাঞ্জে ইসরাইলের ‘পারমাণবিক সন্ত্রাস’ - ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল সফরে যান। তার উপস্থিতিতে সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি কখনো ইরানকে পরমাণু শক্তিধর দেশ হতে দেবো না।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও বলেন, ‘ইসরাইলের নিরাপত্তাকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে থাকি।’ ইসরাইল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন সময়ে নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্রে ইসরাইল হামলা করে সেটিকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। যেমনটি করেছে ইরাক ও সিরিয়ার বেলায়। কার্যত দেখা গেছে, ইরানের নাতাঞ্জে হামলার পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রটি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

বহু বছর ধরে ইসরাইল ইরানে একটি সফল পরমাণু হামলা চালানোর পরীক্ষ-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। যার টার্গেট হলো ভূগর্ভস্থ পরমাণু স্থাপনাসহ ইরানি পরমাণুকেন্দ্রগুলো। এ পরীক্ষা এক ধরনের propulsion system যাতে পরমাণু বোমা ও মিসাইলকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তেলআবিবের পালমাসিন এয়ারবেসে এসব পরীক্ষা সতর্কতার সাথে চালানো হয়েছে। ইসরাইলি টেলিভিশন চ্যানেল আই ২৪ এসব তথ্য প্রচার করেছে। ইসরাইলের জেরিকো-৩ অ্যাটাক মিসাইল এক ধরনের ইন্টারসেপটিভ মিসাইল, যুদ্ধে ব্যবহারে এটি মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর হতে পারে। তা ছাড়া এই মিসাইল পারমাণবিক বোমা নিয়ে দুই হাজার মাইল পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম।

ইসরাইল ১৯৫০ সাল থেকে পরমাণু অস্ত্র বানানো ও উন্নয়ন করে আসছে। এটি বিশ্বব্যাপী এক ওপেন সিক্রেট। কোনো ইসরাইলি সরকার এনপিটি স্বাক্ষর করেনি এবং ধারাগুলোকেও পাত্তা দেয়নি। আইএইএ কর্তৃপক্ষকে কোনো দিন পরিদর্শনের অনুমোদনও দেয়নি।

Federation of American Scientists-এর মতে, ইসরাইল আকাশ, ভূমি, পানি বা যে কোনো সারফেস থেকে পরমাণু হামলা চালাতে পারে। ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থান। পরমাণু অস্ত্র ছাড়াও ইসরাইলের শতাধিক লেজার গাইডেড বাঙ্কার বাস্টার বোমা রয়েছে যা দিয়ে ভূগর্ভের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা যায়। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ১৯৬০ সালে ইসরাইলের পরমাণু কেন্দ্র ও পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেছে। সবাই জানলেও পশ্চিমারা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার নামে ইসরাইলের একটি পরগাছাও সরাতে সক্ষম হয়নি। অন্য দিকে, ইরানি ইউরেনিয়াম উৎপাদন কখনই পরমাণু অস্ত্র বানানোর জন্য নয় বরং শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য।

ইরানের পক্ষের শক্তি অবশ্য মনে করছে, নিরাপত্তার জন্য ইরানের পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলাই উচিত। ইরান এখন বুঝতে পারছে ‘বোকার ফসল পোকায় খায়’।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ও নির্মাণকেন্দ্র আইএইএকে পরিদর্শন করতে দেয়নি। অপর দিকে, ইরানি পরমাণু স্থাপনা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মনিটর ও পরিদর্শনের আওতায় রাখা হয়েছে এবং ইরানও আইএইএকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

ইরানেরও ব্যালিস্টিক, ক্রুজ ও অন্যান্য মিসাইল রয়েছে তবে সেগুলো সবসময়ই নিজের নিরাপত্তার জন্য। নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ সিদ্ধান্তের প্রতি ইরান সবসময় সম্মান দেখিয়ে আসছে। জাতিসঙ্ঘ বা আন্তর্জাতিক আনবিক সংস্থা কোনো অভিযোগ করতে পারেনি। পরমাণু বোমা পরিবহন করতে পারে এমন কোনো মিসাইল ইরান বানিয়েছে তার কোনো প্রমাণ নেই। নিজ দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি জাতসঙ্ঘের সনদের ৫১ ধারায় বিধৃত রয়েছে। তা ছাড়া যারা কোনো আক্রমণের সাথে জড়িত নয় তাদের সুরক্ষার বিষয়টি সব দেশ ও রাষ্ট্র মেনে চলার চেষ্টা করে। আমরা দেখেছি গত এক শতাব্দীতে ইরান কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি। অপর দিকে, ইসরাইল-ন্যাটোবলয় বিশ্বব্যাপী শত যুদ্ধ পরিচালনা করে দুনিয়াকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ইসরাইল বছর আগে ব্যালিস্টিক মিসাইলের পরীক্ষা চালায়। খোদ ইসরাইলি পত্রিকা টাইমস অব ইসরাইল লিখে, ‘ইসরাইল স্বীকার করে না যে, তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল আছে, ইসরাইলের পরমাণুবাহী ব্যালিস্টিক মিসাইলের পোশাকি নাম জেরিকো। মিসাইলটি পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাল্লার এবং এক হাজার কিলোগ্রাম ওজনের পরমাণু বোমা বহন করতে পারে। এই পরীক্ষার বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ জানান, ‘ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরাইল এসব পরীক্ষা করছে। অথচ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র কখনো ইসরাইলি পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে কিছু বলেনি। বরং এসব দেশ জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল গুতেরেসকে অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান ‘পরমাণুবাহী ব্যালিস্টিক মিসাইল’ প্রস্তুত করে নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নং সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করছে। জারিফ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জানান, ‘বিগত ১৮ মাসে চুক্তির একটি ধারাও আপনারা অনুসরণ করেছেন কি না দেখান।’

নাতাঞ্জ ইরানের মাঝখানে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণুকেন্দ্র। ইসরাইল সবসময় অভিযোগ করে আসছে যে, এই কেন্দ্রে পরমাণু বোমা বানানোর ইউরেনিয়াম গোপনে সমৃদ্ধ করছে ইরান। কেন্দ্রটি ধ্বংসের জন্য ইসরাইল সাইবার আক্রমণ শুরু করে। ২০০০ সালে আমেরিকায় সিআইএ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা বিভাগ একসাথে বসে স্টুক্সনেট ওয়ার্ম তৈরি করে। এটিকে মারাত্মক সাইবার অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেননা, এর সাহায্যে ভৌত অবকাঠামোগত ইউরেনিয়াম যন্ত্রপাতি যা কোনো প্রোগ্রামের সাহায্যে চালানো হয় তা ধ্বংস করে দিতে পারে। এটি তখনই ইরানের নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম প্রকল্পে ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। স্টুক্সনেট পারমাণবিক প্রকল্পের প্রভূত ক্ষতি করে। ২০০৬ সালে জর্জ বুশও ইরানের বিরুদ্ধে ‘অলিম্পিক গেম’ নামে অন্তর্ঘাতমূলক সাইবার হামলা চালায়। স্টুক্সনেট একটি আঘাতে নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে চলতে থাকে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সিস্টেমে বড় ধরনের ধ্বংস সাধন করতে পারে, সেন্ট্রিফিউজ ভেঙে যায়। ২০০৯ সালে ওবামাও একই কাজ জোরদার করেন। ২০০৯-১০ সালে ইরানের এই প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এক হাজার সেন্ট্রিফিউজ নষ্ট হয়। ওবামা প্রশাসনের হিসাব মতে, এই আঘাতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দুই বছর পিছিয়ে যায় বা বন্ধ থাকে। ২০১৯ সালের জুনে ইরানি আকাশসীমায় উড়ার কারণে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্লোবাল হক’ মডেলের অত্যাধুনিক মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করে যার দাম ১৩০ মিলিয়ন ডলার। তখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেও যুদ্ধ বাধেনি।

২০২০ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ইরানের পরমাণু কেন্দ্র, রিফইনারি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বড় বড় ফ্যাক্টরি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রহস্যজনক আগুনে পুড়ে যায়। যেমন- ২৬ জুন তেহরানের খুজির ও পারচিনে ব্যালিস্টিক মিসাইলের তরল ফুয়েল তৈরি কেন্দ্রে আগুন লাগে। সিরাজের বিদ্যুৎ প্লান্টে আগুন লাগায় পুরো এলাকা ব্ল্যাক আউট হয়। ৩০ জুন মেডিক্যাল ক্লিনিকে আগুন লাগায় ২৯ জন পুড়ে মারা যায়। ২ জুলাই নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ও আগুন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪ জুলাই ক্লোরিন গ্যাস প্লান্টে লিকেজ সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ও আগুন ধরা কোনো মাস্টার পরিকল্পনার অংশ। পারচিন ও খুজিরে কমান্ডো সেনাদের অবস্থান। ধারণা করা হয়, এখানে ইরানের কৌশলগত অস্ত্র লুকানো রয়েছে।

পরমাণু অস্ত্র বানাতে পরমাণু রড লাগে। সেটি আসে ইউরেনিয়াম আকরিক থেকে মাইনিংয়ের মাধ্যমে। ধাতুকে প্রসেস করে ইয়েলো কেক বানানো হয়। এটাকে পরিবর্তন করে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম বানানো হয়। এই ইউরেনিয়াম থেকে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম পিলেট তৈরি হয়। পিলেটকে জোড়া লাগিয়ে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর রড বানানো হয়। এটি শেষ ধাপ। এসব রড নানা কাজে ব্যবহার করা হয়, পরমাণু বোমা বানাতেও রড লাগে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পর্যন্ত বিশ্ববাসীর জানা। এই প্রসেস খুবই জটিল ও সময়ের ব্যাপার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেন্টিফিউজ ধ্বংস করা হয়েছিল। হিটলার জানতে চেয়েছিলেন, ঠিক করতে কত সময় লাগবে। জানানো হয় ‘দু-বছর’। হিটলার বলেছিলেন, ‘জার্মানিকে আর যুদ্ধ করতে হবে না।’

ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা সাম্প্রতিক এই আক্রমণের সাথে জড়িত মর্মে বিভিন্ন মিডিয়া সংবাদ দিচ্ছে। ১২ জন মোসাদ গোয়েন্দা আক্রমণের দায়িত্ব পালন করে। ইরানের সরকারবিরোধী কিছু লোকজনও জড়িত। এর মধ্যে নাশকতার সাথে জড়িত ইরানের রেজা কারিমিকে শনাক্ত করা হয়েছে।

আক্রমণে নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্রের খুব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেন্ট্রিফিউজ নির্মাণের কেন্দ্রস্থলে আগুন লেগে অনেক অংশ পুড়ে যায়। স্যাটেলাইট চিত্রে বিরাট এক অংশ পুড়ে যাওয়ার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ইরান বলেছে, আগুন লাগার কারণে কেন্দ্রের কাজে বিঘ্ন ঘটবে এতে সন্দেহ নেই। ইরানের পরমাণু বিশেষজ্ঞ বাহরুজ কামালভান্দি এ কথা বলেন। গত বছর ২৬ জুন মিসাইল সাইটেও বোমাবর্ষণ করে অনেক জায়গা পোড়ানো হয়, মেডিক্যাল ক্লিনিক পুড়িয়ে দেয়া হয়। ওই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়। ৩০ জুন তেহরান কেমিক্যাল প্লান্টেও বোমার আঘাতে বিরাট অংশ পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব অগ্নিকাণ্ডে ৭০ জন সাধারণ মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং আগুনের শিখা তেহরানের মানুষ অনেক দূর থেকে প্রত্যক্ষ করে।

ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান ফরিদুন আব্বাসী ১৪ এপ্রিল বলেন, ‘কিছু দেশদ্রোহী ভাড়াটের সহায়তায় ইসরাইল এই অন্তর্ঘাতমূলক আক্রমণ চালায়। গত বছরও তারা বিস্ফোরক দিয়ে কয়েক দফা ইরানে আক্রমণ করে ক্ষতিসাধন করে।’ তিনি মনে করেন, ‘বিস্ফোরকগুলো কেন্দ্রের ভেতরে সেন্ট্রিফিউজ টেবিলের নিচে বসানো হয়েছিল। নাতাঞ্জের বিদ্যুৎ হাবটি বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না। কিন্তু এমনই হয়েছে। শত্রুরা প্রচুর মেধা খরচ করে আক্রমণ পরিকল্পনা করেছে।’

গার্ডিয়ান পত্রিকা জানিয়েছে, ‘দেখা যায়, ইরানে ইসরাইল সাইবার হামলা চালিয়েছে।’ ইসরাইল এসব বিষয় সবসময় অস্বীকার করে। যেমন সিরিয়ার ব্যাপারে বলা হতো, ইসরাইল কখনো হামলা করেনি। অথচ ইসরাইল এখন জানাচ্ছে সিরিয়ার পরমাণু ও অন্যান্য স্থাপনায় ইসরাইলই হামলা চালিয়েছে। তারা আরো জানায়, ইসরাইল সিরিয়ায় কমপক্ষে এক হাজারবার হামলা চালায়। এর সাফাই হিসেবে বল হয় হিজবুল্লাহ দমনের জন্য হামলা করা হয়। হিজবুল্লাহ ইরানপন্থী ফোর্স।

এখন সমুদ্রে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ চলছে। আজ এই পক্ষের জাহাজ তো কাল ওই পক্ষের জাহাজ আক্রান্ত হয়। তা ছাড়া ইসরাইল বিশ্বের সাইবার শক্তির তালিকায় দশম স্থানের নিচে হলেও ইরানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সাইবার হামলা চালিয়ে আসছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এই লেখকের ‘ইরান-ইসরাইল সাইবারযুদ্ধ’ কলামে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। আমিরাত ও সৌদি আরবও চায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ক্ষমতাশালী হয়ে না উঠুক। এই নীতিতে অনেক আরব দেশ ইসরাইলের সাথে একমত।

১৪ জুলাই ২০১৫ সালে পাঁচ পরাশক্তির সাথে ইরানের পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন বা ইরান পরমাণু চুক্তি বা ইরান চুক্তি নামে বেশি খ্যাত। চুক্তিটি ভিয়েনায় সম্পন্ন হয়। চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির সাথে জড়িত। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী শক্তি, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০ মাস কঠোর শ্রম ও আলোচনার পর একটি সমঝোতায় উপনীত হয়। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ওই চুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তি করতে বললে ইরান বেঁকে বসে। শুরু হয় অবরোধের স্রোত।

এ বছর ৪ জানুয়ারি ইরান ২০ শতাংশ মানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ইরানি মজলিস মনে করে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু না করলে বৃহৎ শক্তি কোনো আপস রফায় আসবে না এবং অবরোধ প্রত্যাহার হবে না। জাভেদ জরিফ বলেন, ‘পরমাণু চুক্তির অনেক ধারা বিশ্বশক্তি অবজ্ঞা করেছে, তার প্রতিকারের জন্য সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছি এটি চুক্তির ৩৬ ধারায় ইরানকে ক্ষমতা দেয়া আছে। আইএইএকে বিষয়টি অভিহিত করা হয়েছে।’

ভিয়েনায় বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে আলোচনা পুরোদমে চলছে। এখনো পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। আলোচনা চলার এই সময়ে সমুদ্রে থেমে থেমে যুদ্ধ চলছে এবং পরমাণুকেন্দ্রে হামলা করা হলো। এতে ইরান নমনীয় না হয়ে বরং আরো বেশি উন্নত ক্ষমতার ইউরেনিয়াম বানানো শুরু করেছে। ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সেন্ট্রিফিউজগুলো আরো উন্নত ও শক্তিশালী সেন্টিফিউজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। ভিয়েনা আলোচনা তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য ইরান চাপ দিচ্ছে। ইরান বলেছে, ওবামা থেকে ট্রাম্প পর্যন্ত যত অবরোধ দেয়া হয়েছে তা কেস-টু-কেস তুলে নিতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে। অবরোধ তুলে নিলে তার কার্যকারিতা দেখার জন্য ইরানকে সময় দিতে হবে, তবেই ইরান প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যাবে। আলোচনা ব্যর্থ হোক বা সফল হোক, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটকে সামাল দিতে ইরান, চীন ও রাশিয়ার সাথে যে সামরিক ও নিরাপত্তা অক্ষ গড়ে তুলছে তাকে আরো পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



আরো সংবাদ