২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

না হয় একটু ফষ্টিনষ্টি করেছেনই ...

-

জামালপুরের প্রাক্তন ডিসি আহমেদ কবির না হয় একটু ফষ্টিনষ্টি করেছেন। সেটি তেমন কী দোষের! তিনি তার অফিসের এক অধস্তন নারী কর্মীর সাথে অনৈতিক যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ ধরনের সম্পর্ককে সাধারণ বাংলায় ফষ্টিনষ্টি বলা হয়। জামালপুরের ডিসি তার অধস্তন সহকর্মীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় কোনো জোর জবরদস্তি করেননি। অন্তত সেরকম কিছু ভাইরাল হওয়া দীর্ঘ ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়নি। তবে ব্ল্যাকমেইল করে থাকতে পারেন। তারও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভিডিও ক্লিপের অধস্তন কর্মচারী মেয়েটিও সেরকম কোনো অভিযোগ করেননি। এমনকি তিনি এমন কথাও বলেননি যে, জেলা প্রশাসক আহমেদ কবির তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মেয়েটি বরং বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি নন।

ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে সরকার ডিসি আহমেদ কবিরকে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করে ফেলে রেখেছিল। এখন তার শাস্তির ব্যবস্থা হয়েছে। এ রকম বড় ধরনের নৈতিক স্খলনের জন্য সবাই আশা করেছিল যে, তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। কিন্তু না, শাস্তি হয়েছে বটে, তবে চাকরি যায়নি। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আহমেদ কবিরকে নিম্ন পদে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি আর কখনো পদোন্নতি পাবেন না, উপসচিবই থাকবেন। গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের গুরুদণ্ড হলে কর্মজীবনে আর পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। বিভাগীয় মামলায় আহমেদ কবিরের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের প্রস্তাবিত তিন বছরের জন্য নিম্ন বেতন কাঠামোতে অবনমিতকরণের গুরুদণ্ড দেয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সম্মতি জানিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কোনো বকেয়া সুবিধা পাবেন না। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বরখাস্তকাল সাধারণ ছুটি হিসেবে বিবেচিত হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে জামালপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আহমেদ কবিরকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন কবির। ওই বছরের ২৫ আগস্ট তাকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয়। ওই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির কাছে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জবাব দিয়ে আহমেদ কবির ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। তার দেয়া লিখিত ও মৌখিক জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পুনঃতদন্ত হয়। তার প্রতিবেদনে আহমেদ কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

তাতে ডিসি আহমেদ কবিরের বেতন কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। সেই সাথে তিনি তার চাকরি জীবনে আর কোনো পদোন্নতি পাবেন না। উপসচিব হিসেবে বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডে বেতন পান একজন কর্মকর্তা। শাস্তি হওয়ায় আহমেদ কবিরের বেতন ধরা হবে ষষ্ঠ গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে। মূল বেতন ৭০ হাজার টাকা থেকে কমে এখন হবে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। তবে অন্যান্য ভাতা বহাল থাকবে। তিন বছর পর তিনি অবশ্য পূর্ণ বেতন ফিরে পাবেন।

তবে নৈতিক চরিত্রের এ ধরনের স্খলনের জন্য সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যে এ ধরনের প্রবণতা নেই, তা তো বলা যাবে না। কিন্তু যখন তা প্রকাশ্য রূপ পায়, তখন শাস্তি অবধারিত হয়ে ওঠাই তো স্বাভাবিক। এর আগে সোনারগাঁও জাদুঘরের পরিচালক রবীন্দ্র গোপ নারী কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়েছিলেন। তার নষ্টামির ভিডিওও ভাইরাল হয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানা যায়নি। তিনি কেবল তার চুক্তিভিত্তিক চাকরিটি হারিয়েছেন। অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য তাকে আটক করা হয়েছিল বটে, তবে শিগগিরই ছেড়ে দেয়া হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আগে গোপ প্রশাসনিক ক্যাডারে চাকরি করতেন। তবে রবীন্দ্র গোপকে যদি চাকরিচ্যুত করা হয়ে থাকে, তবে একই অপরাধে ডিসি আহমেদ কবিরকে কেন চাকরিচ্যুত করা হবে না? কেন তিনি চাকরিতে বহাল থাকবেন?

এ রকম ব্যবস্থা পুলিশের ক্ষেত্রেও আছে। পুলিশ অপরাধ করলে তারা যে গ্রেফতার হয় না, এমন নয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের শাস্তি হলো এই যে, তাদের ক্লোজড করা হয় কিংবা বদলি কিংবা সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। এর সবই লোক দেখানো, কোনোটাই শাস্তি নয়। ক’দিন পর তাদের ভিন্ন থানায় বদলি করে দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে তারা দ্বিগুণ উৎসাহে একই অপকর্ম করতে থাকে।

তা ছাড়া পুলিশ সম্পর্কে সরকার যা বলে, তার মধ্যেও সবসময় সত্যতা থাকে না। গত বছর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে খুন হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে কক্সবাজারে কর্মরত পুলিশের সব সদস্যকে তিন দফায় অন্য জেলায় বদলি করার কথা জানানো হয়। জেলার পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৭০৪ জনকে বদলি করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। তবে ১ মার্চ অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা লুটের ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর জানা গেল, আসলে সবাইকে বদলি করা যায়নি। গত বছর মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের সময় জেলার চকরিয়া থানায় কর্মরত ছিলেন উপপরিদর্শক এসআই নূরই খোদা ছিদ্দিকী। কয়েক দিন আগে চকরিয়া থেকে বদলি হয়ে কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়িতে আসেন। কী উপায়ে তিনি বদলি ঠেকিয়ে এই জেলাতেই রয়ে গেলেন, তা অবশ্য এখনো জানা যায়নি।

গত সোমবার শহরের মধ্যম কুতুবদিয়াপাড়ায় তিন লাখ টাকা লুটের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া তিন পুলিশ সদস্যের মধ্যে এই নূরই খোদাও রয়েছেন। গ্রেফতার অন্য দু’জন হলেন কনস্টেবল মমিনুল আমিন ও মামুন মোল্লা। তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এসআই নূরই খোদাকে ‘লুকানো লোক’ উল্লেখ করে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনীরউল গিয়াস বলেন, গতকাল মঙ্গলবার তিনজনকে দ্রুত বিচার আদালতে সোপর্দ করে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত দু’দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত লুটের টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কক্সবাজার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী রিয়াজ আহমদের বসতবাড়িতে গত সোমবার বিকেলে টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। বিকেল ৪টার দিকে সিএনজি অটোরিকশা করে সাদা পোশাকে পুলিশের পাঁচ সদস্য রিয়াজ আহমদের বাড়িতে যান। এরপর পুলিশের পরিচয় দিয়ে রিয়াজের স্ত্রী রোজিনাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা লুট করেন।

রোজিনার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে টাকা নিয়ে পুলিশ সদস্যরা অটোরিকশা করে পালানোর চেষ্টা করেন। জনতা ধাওয়া দিয়ে একজন কনস্টেবলকে ধরে ফেলেন। বাকি চারজন পালিয়ে যান। পরে ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। রাতে অভিযান চালিয়ে আরো দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এ ব্যাপারে রোজিনা কক্সবাজার সদর থানায় দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেন। কক্সবাজার পুলিশ সুপার মো: হাসানুজ্জামান বলেন, গ্রেফতার সদস্যদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আসলে প্রশাসন ও পুলিশ নিয়ে সরকার এমন ইঁদুর-বিড়াল খেলাই খেলছে। ডিসিরাই বা প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ও পুলিশই আগের রাতের ভোট করে সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। সে কারণে তাদের বড় অপরাধেও দেয়া হয় লঘু শাস্তি, পদোন্নতি হবে না- ধরনের। বরখাস্ত করা হয় না। পুলিশের ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতি নয়, সাময়িক বরখাস্ত। পুলিশ এত ব্যাপকভাবে ডাকাতি- ছিনতাইয়ে জড়িত হয়ে পড়ছে যে, লোম বাছতে কম্বল উজাড় হতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাজা দিলে ওই ক্যাডারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই লঘু দণ্ড। হয়তো কোনো দিন আমাদের দৃষ্টির অগোচরে জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবিরের এ সাজা মওকুফ হয়ে যাবে। তিনি ফের বুক ফুলিয়ে তার অপকর্ম চালিয়ে যাবেন না- কে বলতে পারে!

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement