২৩ এপ্রিল ২০২১
`

মার্কিন বিদেশনীতির অগ্রাধিকার ইরান

মার্কিন বিদেশনীতির অগ্রাধিকার ইরান -

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন কোনো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে। আমরা মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইরানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের উচ্চাভিলাষজনিত সমস্যাগুলো নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় রয়েছি।’ আর প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শাসন শুরুর পর বিদেশের মাটিতে মার্কিন বাহিনীর প্রথম আক্রমণ হয়েছে ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে ইরানপন্থী প্রতিরোধযোদ্ধাদের ওপর। এই হামলার বৈধতা নিয়ে এরই মধ্যে কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এ হামলা চালানো হয়। সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য সিনেটর টিম কাইন বলেছেন, মার্কিন নাগরিকদের জানার অধিকার আছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কিভাবে এ ধরনের হামলা করা হলো এবং এ ব্যাপারে প্রশাসনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা কী?

ইরান বলেছে, এই হামলা, ওয়াশিংটনের ‘সঙ্ঘবদ্ধ সন্ত্রাসবাদের নতুন ধাপ’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, এটি ইরানের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তারা যেন দায়-দায়িত্বহীনভাবে কোনো কাজ না করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সাফাই, সিরিয়ায় যাদের ওপর হামলা করা হয়েছে তারা ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক মিশনে হামলার সাথে জড়িত। সিরিয়া এ হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ অভিহিত করে ‘জঙ্গলের আইন’ অনুসরণ না করতে আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সে আহ্বান কানে তোলার লোক সম্ভবত নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হলে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া হামলা চালাতেন না। ট্রাম্প নির্বাচনে পরাস্ত হয়েছেন বটে তবে উত্তরসূরির মধ্যেও তারই ছায়ামূর্তি যেন স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রতিদিন কত মিথ্যা বলতেন তার হিসাব রাখত একটি গ্রুপ। পত্রিকায় রিপোর্টও বেরুত। এখন বলা হচ্ছে, বাইডেনও মিথ্যা বলেন, তবে ট্রাম্পের চেয়ে সংখ্যায় কম। এই যা তফাত দু’জনের। অর্থাৎ অভিযোগ মতে, আইন-কানুন না মানার তথা জঙ্গুলে আইনে চলার প্রবণতা আছে এই ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টের মধ্যেও।

বাইডেন ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের মধ্যে মিল আছে। বিদেশনীতিতে ইরানই তাদের প্রথম টার্গেট। মনে হচ্ছে, এবার তারা ইরান ইস্যু নিয়েই কোমর বেঁধে নামবেন। সেই আলামত স্পষ্ট হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেশ কিছু ঘটনা একযোগে ঘটতে শুরু করার মধ্য দিয়ে।

ব্লিঙ্কেন-বাইডেনের অ্যাকশনের পরই ইসরাইলের একটি কার্গো জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে কেউ হতাহত হয়নি। জাহাজের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। এদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর গলায় ঘোষণা করে দিয়েছেন, এটা স্পষ্টই ইরানের কাজ। বলেছেন, ‘ইরান হলো ইসরাইলের সবচেয়ে বড় শত্রু। আমি তাদের হামলা থামিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। আমরা পুরো অঞ্চলজুড়ে ইরানকে আক্রমণ করব।’ তার ঘোষণার আগেই সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে ইসরাইলি বিমানবাহিনী অনেকবার হামলা চালিয়েছে। ইসরাইল বলেছে, ‘ইরানি টার্গেটে হামলা চালানো হয়েছে এবং তা তাদের জাহাজে হামলার বদলা হিসেবেই।’ কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে জাহাজে হামলার যে অভিযোগ তারা তুলেছেন তার পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করার প্রয়োজন বোধ করেননি নেতানিয়াহু। ধরে নেয়া যায়, ইরাকে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেমন মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করিয়েছিল তেমনই একটি ছক আবারো যেন আঁটা হচ্ছে।

সর্বশেষ জানা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএকে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাব পাস করানোর প্রক্রিয়া চলছে। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ ২০ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এই প্রস্তাব নিতে পারে আইএইএ গভর্নিং বোর্ড। এর পেছনে মার্কিন প্রশাসনের ইঙ্গিত রয়েছে। বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রকে আবারো ‘আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি মেনে চলা একটি বিশ্বশক্তি’ হিসেবে দেখাতে চান। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যোগ দেয়ার কথা বলেছেন। ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে একযোগে কাজ করার কথা বলেছেন এবং ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই চুক্তিতে যোগ দেয়ার জন্য তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের দিয়ে ইরানের সাথে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের একটি প্রস্তাব দেন। ইরান সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, “জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের নীতি-অবস্থানে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। বাইডেন প্রশাসন সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের’ নীতিই অনুসরণ করে যাচ্ছে।” ইরান আরো বলেছে, ‘আমেরিকাকে অবশ্যই অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসতে হবে। এ জন্য কোনো আলোচনা বা নিরাপত্তা পরিষদে নতুন প্রস্তাব পাসের প্রয়োজন নেই।’

ইরান যে যুক্তি দিচ্ছে তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কারণ দেশটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ইরানের ওপর অন্যায়ভাবে অবৈধ অবরোধ আরোপ করেছে। এখন আলোচনায় বসতে হলে অবরোধ তুলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। তার আগে কোনো আলোচনা হতে পারে না। এই সদিচ্ছার প্রমাণ না পেলে কোনো দেশ কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একসাথে কাজ করবে?

ইরান আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। তবে উভয় পক্ষ পরমাণু চুক্তি মেনে চলবে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছার ব্যাপারে কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছে। অনেকের মতে, এটি হলো বাইরের লোকদেখানো বক্তব্য। তলে তলে হয়তো ওয়াশিংটন ভিন্ন ঘুঁটি চালছে আইএইএকে দিয়ে। ইরানের পার্লামেন্ট গত ডিসেম্বরে একটি বিল পাস করেছে, যাতে বলা হয়- ‘২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যদি ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অবৈধ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া না হয়, তাহলে ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ইরান স্বেচ্ছায় যে সম্পূরক প্রটোকল বাস্তবায়ন করে আসছে সরকারকে তা বন্ধ করে দিতে হবে।’ দেশের আইন অনুযায়ী ইরান সেটাই করেছে। এর ফলে আইএইএ এখন আর পূর্বঘোষণা ছাড়া ইরানের পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারবে না। ইরানের এই পদক্ষেপের নিন্দা করে আইএইএতে প্রস্তাব পাস করাতে চায় বাইডেন প্রশাসন। ইরানি আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএর গভর্নিং বোর্ড যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব পাস করে, তাহলে এর ‘উপযুক্ত জবাব’ দেয়া হবে।

ইরান এই যে, এককভাবে জোরালো অবস্থান ধরে রেখেছে তার পেছনে আরো কথা আছে। ট্রাম্প যখন আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যান তখন তিন ইউরোপীয় দেশ (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি) তেহরানকে চুক্তি থেকে বেরিয়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। তারা কথা দিয়েছিলেন, আমেরিকা সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় তেহরানের যে ক্ষতি হয়েছে তা তারা পুষিয়ে দেবেন। কিন্তু ইরান এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও এই তিন দেশ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এরপরই তেহরান পরমাণু সমঝোতায় নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে কিছুটা সরে আসে। এর মাধ্যমে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এমনটা বলার সুযোগ থাকে কি?

গত চার দশকের মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের কারণে ইরান অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপন্ন। প্রধান রফতানি পণ্য তেলের রফতানি প্রায় শূন্যে। যেটুকু বাণিজ্য অবশিষ্ট আছে সেটুকুও স্বাভাবিক ও অবাধ নয়। কিন্তু পুরো ব্যাপারটিই ঘটানো হয়েছে বিদ্বেষী মনোভাব থেকে এবং অন্যায়ভাবে। আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও রীতি-নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানের কোনো ব্যর্থতা কেউ খুঁজে পাননি। বরং আমেরিকা ও তার মিত্র ইসরাইলই আইন লঙ্ঘন করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। এখন আমেরিকার অবরোধ মানতে চাইছে না ইরানের মিত্র দেশগুলো। রাশিয়া মার্কিন অবরোধ তুলে নিতে বলেছে আগেই। চীন কিছু কিছু বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ, ইরাক ঘোষণা করেছে, তারা তাদের কাছে আটকেপড়া অর্থ ইরানকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। ইরাকের ট্রেড ব্যাংকের চেয়ারম্যান সালেম সালাবি বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তার ব্যাংকে আটকেপড়া ইরানি অর্থ তেহরানকে ফেরত দিতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। এছাড়া, ইরাক সরকার ইরানের কাছ থেকে কেনা প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম পরিশোধের জন্য ট্রেড ব্যাংকে কয়েক শ’ কোটি ডলার জমা রেখেছে। সেই গ্যাসের দামও ইরান পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এভাবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ কার্যত ব্যর্থ হতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়।

মার্কিন নতুন প্রশাসন ইরানকে ঘায়েল করার নতুন নতুন সুযোগ খুঁজতে এবং তা ব্যবহার করতে সবসময়ই সচেষ্ট আছে এবং থাকবে। চলতি সপ্তাহেই তুরস্কের সাথে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে ইরান। তুরস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ পিকেকের সদস্যরা ‘এখন ইরানে আশ্রয় নিয়েছে’ বলে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্যে অসন্তুষ্ট ইরান। এই ঘটনায় দুই দেশই পরস্পরের দূতদের তলব করে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। আমাদের বিশ্বাস, আমেরিকার মতো দেশ যাদের কমন শত্রু, তাদের এসব ছোটখাটো বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা এবং এক কাতারে দাঁড়ানো উচিত।

ইরান বুদ্ধিমত্তার সাথে সঠিক কূটনীতি অনুসরণ করেছে বলেই বিজয় অর্জন করেছে। পাঁচ বিশ্বশক্তির সাথে পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছতে পারা যেমন তার বিজয়, তেমনই যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর এখন ফিরে আসতে চাওয়াটাও ইরানের ‘বড় বিজয়’। অপর দিকে এটা বলা যায়, বুদ্ধির অভাবে মার খেতে যাচ্ছে সৌদি আরব। মিত্রতার নামে কারো ধামাধরা হলে সে তার সুযোগ নেবেই। যুক্তরাষ্ট্র যে সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী আদনান খাশোগি হত্যার দায় সৌদি যুবরাজের ওপর চাপাতে যাচ্ছে তার লক্ষ্য তো সুদূরপ্রসারী। বাইডেন প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে না বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিয়ে নেবে। সেই পরিকল্পনা ট্রাম্প-কুশনারের ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’র আঙ্গিকে, নাকি কোনো নতুন রূপে আসবে কি না সেটা জানতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা নিশ্চিত, এতে করে ফিলিস্তিনের ভাগ্য আরো অন্ধকারে ডুবে যাবে এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হতে পারে। সৌদি আরবের হওয়ার কথা ছিল মুসলিম উম্মাহর নেতা। কিন্তু দেশটির রাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব সেই যোগ্যতা কতটা রাখেন?

mrkmmb@gmail.com



আরো সংবাদ