০১ মার্চ ২০২১
`

নেলি ম্যাসাকার ও বিচারহীনতার চার দশক

নেলি ম্যাসাকার ও বিচারহীনতার চার দশক - ছবি : সংগৃহীত

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ছিল নেলি গণহত্যার (Nellie massacre) ৩৮তম বর্ষপূর্তির দিন। ১৯৮৩ সালের এই দিনে এই গণহত্যা ঘটছিল মধ্য আসামের নওগাঁও জেলার ১৪টি গ্রামে। গ্রামগুলো হলো, আলিসিং, খোলাপাথর, বসুন্ধরী, বুুগডোভা বিল, বুগডোবা হাবি, বড়জোলা, বুতুনি, ডোঙ্গাবরি, ইন্দুরমারি, মাটি প্রভাত, মূলধারী, মাটি প্রভাত নম্বর ৮, সিলভিটা, বুরবুরি ও নেলি। এগুলো ছিল প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম।

ম্যাসাকার বলতে আমরা নির্বিচারে নৃশংস হত্যাকাণ্ড বুঝি। সে দিন এসব গ্রামে এমনটিই ঘটে। সরকারি হিসাব মতে, এই নির্বিচার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় এ ১৪ গ্রামের দুই হাজার ১৯১ জন মুসলমান। বেসরকারি হিসাব মতে, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। স্থানীয় অসমীদের দাবি, এরা সাবেক পূর্ববঙ্গ ও বর্তমান বাংলাদেশ থেকে আসামে যাওয়া অভিবাসী। তাদের ভাষায় ‘ফরেনার’; অতএব তাদের আসামে থাকার অধিকার নেই। এই ম্যাসাকারের সময় সেখানে উপস্থিত ভারতীয় সাংবাদিকদের দেয়া তথ্য মতে, স্থানীয় অসমী কৃষকরাই প্রধানত এই হত্যাযজ্ঞের সূচনা করে। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ। এরা দ্রুত পালাতে সক্ষম ছিল না। ফলে এরাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের সহজ শিকার। এ হত্যাকাণ্ড শুরু হয় সকাল ৮টায়, চলে পুরো ৬ ঘণ্টা ধরে। হত্যাকারীরা ছুরি ও বন্দুক নিয়ে দল বেঁধে এসব গ্রামের মুসলমানদের ওপর হামলা চালায়। অভিযোগ আছে, হামলাকারীরা ছিল প্রধানত তিওয়া তথা লালুং উপজাতির লোক ও অসমী হিন্দু। এরা এসব গ্রামের চার পাশ থেকে গ্রামবাসীকে ঘিরে ফেলে। তারপর ড্রাম বাজিয়ে মিছিল করে ‘লং লিভ আসাম’ স্লোগান দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড চালায়।

কেন এই নির্বিচার গণহত্যা, এই ভয়াবহ অমানবিকতা? এর কারণ বিশ্লেষণে যেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আসামে ‘ফরেনার-বিরোধী’ আন্দোলন শুরুর ইতিহাসে। তখন অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএসইউ) এবং আসাম গণপরিষদ এ রাজ্যে ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া ফরেনার-বিরোধী বিক্ষোভ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এটি ‘আসাম আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পায়। এ আন্দোলনের প্রধান দাবি অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। সেই সাথে তাদের নাম রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলগুলো এসব অবৈধ ভোটারের ভোটে নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে। প্রফুল্ল মেহতা তখন আসাম আন্দোলনের অন্যতম নেতা।

তিনি ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা তখন ছিলাম ছাত্রনেতা। তখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর, প্রধানত আসামের জনগণের উপলব্ধি ছিল, বাংলাদেশ থেকে লোক এসে আমাদের নিজ দেশে সংখ্যালঘুতে পরিণত করছে। এই বিক্ষোভের সৃষ্টি অসমী ও উপজাতীয়দের চাকরি, ভূমি ও রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থেকে। তাদের আশঙ্কা ছিল, সব ক্ষমতা চলে যাবে বাংলাদেশীদের হাতে।’

১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে স্বল্প সময়ে আসামে বেশ কয়েকটি সরকারের পতন ঘটে। জনতা পার্টি সরকারের পতন ঘটে ১৯৭৯ সালে বিভেদের জের ধরে। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সেখানে ক্ষমতায় আসে ১৯৮০ সালে। সে সরকার ছয় মাসের বেশি টেকেনি। এরপর আরোপিত হয় রাষ্ট্রপতির শাসন। ১৯৮২ সালে কেশব গগৈ-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় কংগ্রেসের এক নয়া সরকার। সে সরকারও ক্ষমতায় ছিল মাত্র দুই মাস।

পাশাপাশি অল আসাম মাইনোরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএমএসইউ) গঠিত হলে তারা দাবি তোলে, যারা ১৯৭১ সালের আগে আসামে এসেছে তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। এ দাবি ছিল এএএসইউ-এর অবস্থানের সরাসরি বিপরীত। তখন আসামের বিভিন্ন স্থানে কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। তখন কিছু আধা-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। অন্তহীন দ্বন্দ্ব ও এএএসইউসহ আরো বিভিন্ন গোষ্ঠীর ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৮৩ সালে আসামে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। তা ছাড়া সরকার ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ থেকে আসা ৪০ লাখ বাঙালি অভিবাসীর ভোট দেয়ার অধিকার আছে। কিন্তু আসাম আন্দোলনের নেতারা এই নির্বাচন বয়কটের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়।

এ দিকে বাঙালি মুসলমানরা এই নির্বাচন বয়কটে অংশ নেয়নি। অসমীদের দৃষ্টিতে এটি ছিল তাদের বড় অপরাধ, যে কারণে তাদের এই অমানবিক গণহত্যার শিকারে পরিণত হতে হয়। কিন্তু ভোটে অংশ নিয়ে ভোট দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ও নাগরিকত্ব লাভের প্রয়োজনেই তারা এই অবস্থান নিয়েছিল। নেলি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে নির্বাচন শুরু হয় ১৯৮৩ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি। অথচ তখন অব্যাহতভাবে চলছিল আসামের বিক্ষোভ আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের নির্বাচন বয়কটের প্রেক্ষাপটেই কার্যত বাঙালি মুসলমানদের ওপর চালানো হয় ১৮ ফেব্রুয়ারির নেলি ম্যাসাকার।

ইন্ডিয়া টুডে’র এক রিপোর্টে বলা হয়, নির্বাচন শুরু হওয়ার পর নির্বাচনবিরোধী বিক্ষোভকারীরা সাধারণ মানুষকে নির্বাচনের পক্ষে থাকা মুসলমানদের সমাজবহির্ভূত করার আহ্বান জানায়। সেই সাথে বলা হয়, যারা তাদের সাথে কোনো ব্যবসায়-বাণিজ্য ও লেনদেন করবে, তাদের ৫০০ রুপি জরিমানা করা হবে। ইন্ডিয়া টুডে’র রিপোর্টে আরো বলা হয়, নেলি ম্যাসাকারের দু’দিন আগে লুলাং উপজাতির পাঁচ শিশুকে নেলির কাছে লাহোরিগেট এলাকায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। লুলাংরা ছিল আসাম আন্দোলনের পক্ষে এবং নির্বাচন বয়কটের পক্ষে। খবরে প্রকাশ, এরা নেলি ও এর আশপাশের এলাকায় বাঙালিবিরোধী কয়েকটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।

সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারি নেলি উপজাতির লোকজন ও স্থানীয় অসমী হিন্দুরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঘটনার পর সরকার নেলি সরকারি স্কুলে প্রতিষ্ঠিত সরকারি শরণার্থী শিবিরে তাদের আশ্রয় দেয়া হয়। যার ফলে এটি নেলি ম্যাসাকার নামে পরিচিতি পায়। কয়েক সপ্তাহ পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জৈল সিং ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে নেলি যান। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী তাদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। তা সত্ত্বেও পুলিশ ৬৮৮টি এফআইআরের মধ্যে মাত্র ২৯৯টির ব্যাপারে চার্জশিট দেয়। কিন্তু এই ৩৮ বছর তথা প্রায় চার দশক পেরিয়েও একটি চার্জশিটের ক্ষেত্রেও মামলার নিষ্পত্তি করা হয়নি। ভবিষ্যতে করা হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে নিহত ও আহতদের নিকটাত্মীয়রা পাঁচ হাজার রুপি ও তিন হাজার রুপি করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার প্রতি দুই বান্ডিল করে টিন দেয়া হয়।

অপর দিকে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ১৯৮৩ সালে গঠন করা হয় তেওয়ারি কমিশন। এই কমিশন রাজ্য সরকারের কাছে ১৯৮৪ সালের মে মাসে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে। কিন্তু এ তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে আজ পর্যন্ত পরবর্তী কোনো বিচারিক পদক্ষেপ নেই। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না করার সরকারি প্রয়াসও ছিল। তবে ‘স্ক্রল ইন’-এর রিপোর্ট মতে, এই তদন্ত প্রতিবেদন শুধু তখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, যখন একটি আরটিআই (রাইট টু ইনফরমেশন) অ্যাক্টের আওতায় একটি পিটিশন দাখিল করা হয় সিভিল সোসাইটিগুলোর পক্ষ থেকে। তেওয়ারি কমিশনের তদন্তে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও সুনির্দিষ্ট তিন কর্মকর্তার অবহেলাকে। তবে এই প্রতিবেদন ছিল বৈপরীত্যে ঠাসা। তেওয়ারি কমিশন প্রতিবেদনের বেশির ভাগ অংশেই অভিযোগ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের অব্যাহতি দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। তেওয়ারি কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়: ‘দেয়ার ওয়্যার ল্যাপসেস অব ইন্ডিভিজুয়ালস বাট দ্য সিস্টেম ওয়ার্কড ওয়েল’।

অর্থাৎ কিছু ব্যক্তির ভ্রষ্টতা থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভালোভাবেই কার্যকর ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিশনের নিজস্ব বিবৃতিই এই বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আসামে প্রায় সব জেলায়ই বিরাজ করছিল একই ধরনের থমথমে অবস্থা। সমস্যার শুরু হয় এএএসইউর বয়কট ঘোষণা দেয়া ও চরমপন্থীরা সন্ত্রাসী কায়দায় বিক্ষোভ বাস্তবায়ন শুরু করার পর। সড়কগুলো ব্লক করে দেয়া হয়। বহু সেতু উড়িয়ে দেয়া হয়। ফোন লাইন কেটে দেয়া হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পুলিশ কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় যান ও যোগাযোগের অভাবে বড় ধরনের বিক্ষোভ মোকাবেলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এরপর তদন্ত রিপোর্ট কী করে বলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভালোভাবেই কার্যকর ছিল? সে প্রশ্ন তোলা হয় ‘স্ক্রল ইন’-এর রিপোর্টে।

সন্দেহ নেই, আসামের রয়েছে একটি জটিল ইতিহাস। সেখানে বিরোধ আছে এক উপজাতির সাথে আরেক উপজাতির, উপজাতির সাথে অ-উপজাতির, এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাথে আরেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের। মোট কথা বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতি-সম্প্রদায় এবং স্থানীয় ও অভিবাসী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত আসামের সমাজ। এটি সত্যি- ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাাদেশ আমলে আসামে বাঙালিদের অভিবাসন ঘটেছে। ব্রিটিশ আমলে আসামে যাওয়া অনেক বাঙালি পরিবার শত বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। ব্রিটিশ সরকারই প্রধানত সেখানে কৃষিকাজ ও চা বাগানে কাজের জন্য অনেক বাঙালি পরিবারকে নিয়ে যায়। সেখানে এরা বসবাস করছে শতাধিক বছর ধরে। এরপর উপমহাদেশ ভাগ হওয়ায় অনেক বাঙালি পরিবার আসামে গিয়ে বসবাস ঘরে তুলেছে, যাদের বেশির ভাগই হিন্দু। ১৯৭১ সালের পর সামান্যসংখ্যক বাঙালি বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়ে থাকতে পারে। এদের অনেকে আবার ফিরেও এসেছে। এখন আসাম আন্দোলনকারীদের দাবি মতে, যারা ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আসামে গেছে, তাদের বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে।

আসামের এনআরসিতেও একই কথা বলে। কিন্তু এনআরসি বাস্তবায়ন নিয়ে আছে নানা জটিলতা। ১৯৭১ সালের আগে যেসব বাঙালি পরিবার আসামে গিয়েছিল, তারা নানা জটিল প্রক্রিয়া ও কঠিন শর্তের কারণে তাদের দাবির সমর্থনে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করতে পারছে না। সব মিলিয়ে এসব আইনি জটিলতা ও সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা আসামে বসবাসরত গোটা বাঙালি সমাজকে তাদের শত শত বছরের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়ার হুমকির মুখে ফেলে। এদের মধ্যে রয়েছে সেসব বাঙালিও, যারা আসামের অনেক এলাকায় চা-বাগান ও কৃষিকাজের সূচনা করেছিল এসব এলাকায় অনেক অসমীদের বসবাস গড়ে তোলার বহু আগেই। এই সময়ে এনআরসির মতো নানা আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে অসমীরা কার্যত এরাসহ সব বাঙালিকে আসাম ছাড়া করার চক্রান্ত করছে। অনেক জনপ্রিয় গায়ক, কবি-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রাভিনেতা, বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, আমলা তাদের কর্মের মাধ্যমে অভিবাসী বাঙালিদের উপস্থাপন করছে আসামের এক ‘বিপদ’ হিসেবে, ‘দৈত্য’ হিসেবে। বলা হচ্ছে, এদের আসাম থেকে তাড়াতে হবে, নয়তো বন্দিশিবিরে পাঠাতে হবে। এদের রাজনীতির সব পর্যায় থেকে নির্বাসিত করতে হবে। আসলে এদেরই সৃষ্টি নেলি ম্যাসাকার।

কিন্তু বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন, শুধু সম্প্রদায়গত ভিন্নতার কারণে আসাম থেকে বাঙালি খেদাও আন্দোলনকারীদের নেলি ম্যাসাকারের মতো হত্যাযজ্ঞ চালানো কতটা যুক্তিযুক্ত? আর এ ঘটনার পর প্রায় চার দশক পার হতে চলেছে, এই হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ীদের কেনই বা বিচারের মুখোমুখি করা হলো না? কেন দশকের পর দশক সময় চলে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ আদালতে শুরুই করা হলো না। ভারতের শাসকরা মনে করে, মানুষ এ ঘটনা এক সময় ভুলে যাবে? আসলে এ ধরনের নৃশংস অমানবিক ঘটনা কি ভুলে থাকা যায়? হতে পারে এ ঘটনার বিচার আগামী দিনে কখনোই হবে না। তবে আসামে তা রয়ে যাবে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে। আর আগামী প্রজন্ম তাদের ঘৃণার চোখেই দেখবে, যারা এ ঘটনার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। সেই সাথে যারা এ ঘটনার বিচারহীনতার জন্য দায়ী, তাদের জন্য এটি থেকে যাবে এক কলঙ্ক তিলক হিসেবে।

নেলি ম্যাসাকারের অন্যতম দায়ী একটি পক্ষ হচ্ছে আসাম আন্দোলনকারীরা। আসাম আন্দোলনের মূলমন্ত্র অসমী জাতীয়তাবাদ। আর এই অসমী জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সেখানকার মধ্যবিত্ত বর্ণহিন্দুদের একটি কালচারাল প্রজেক্ট। এরা বরাবর আওয়াজ তুলেছে তাদের কথিত ‘ফরেনারদের’ আসাম ছাড়া করার। এই মধ্যবিত্ত বর্ণহিন্দুরাই আসামে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘ঘৃণার সংস্কৃতি’ চালু করে। আর অসমীদের জনমনে এই ঘৃণার মনস্তাত্ত্বিক আবহ সৃষ্টি করে রেখেছে। যারাই এর বিরুদ্ধে যাবে তাদেরই এরা অসমী সংস্কৃতির শত্রু বিবেচনা করে; ধরে নেয় এরাই একদিন অসমী সংস্কৃতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আসাম আন্দোলনকারীরা অসমী কালচারাল প্রজেক্টের বিন্দুমাত্র সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ।

এ ধারণা-তাড়িত হয়েই এরা মাঝে মধ্যেই নেলি ম্যাসাকারের মতো ভয়াবহ অমানবিক ঘটনার জন্ম দেয়। ঠিক যেমনটি করে হিন্দুত্ববাদীরা, যখন এর বিরুদ্ধ কেউ কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলে। এদের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি, আত্মহত্যার ঘটনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনার মধ্যে। নেলি ম্যাসাকার ও এনআরসি হচ্ছে তাদের কালচারাল প্রজেক্টের অবলম্বিত প্রক্রিয়া। এর পরও আসাম আন্দোলনের নেতারা বরাবর অস্বীকার করে চলেছেন নেলি ম্যাসাকারের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা।



আরো সংবাদ