২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
`

অভিভাবকের দায় এবং সরকারের দায়িত্ব

অভিভাবকের দায় এবং সরকারের দায়িত্ব - ছবি : সংগৃহীত

ইদানীং এমন সব ঘটনা ঘটছে যা নাগরিক হৃদয়কে বিচলিত করে তুলছে। বিষায়িত হয়ে উঠছে সমাজ। সারা দেশে সামগ্রিকভাবে যে ধ্বংসের লীলাখেলা চলছে তাতে করে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে এই দেশ। জনগণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ভীতির রাজ্যে বসবাস করছে তারা। মানুষের অনুভূতি যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। আগেকার দিনে একটি মৃত্যুই আলোড়ন সৃষ্টি করত। এখন মৃত্যু নিত্যদিনের বিষয়। অতীতে একটি অন্যায়ে তোলপাড় হতো এলাকা। এখন লোকেরা ভাবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সে বিপদে পড়তে পারে।

ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি নির্ধারক নয় নীতি বা আদর্শ। রাজনীতি হচ্ছে সবকিছুর নিয়ামক। সে রাজনীতি আবার পক্ষ-বিপক্ষের নয়; এক পক্ষের। একসময় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাকশাল কায়েম করেছিল আইনের মাধ্যমে। এখন অঘোষিত বাকশাল চলছে বেআইনিভাবে। এর প্রভাব অনুভূত হচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে; ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সচিবালয়ে। সমাজের সর্বত্র অনুভূত হচ্ছে ক্ষমতার দাপট। ক্ষমতা যদি একীভূত হয়, ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা দলে তা সর্বাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ‘অ্যাবসুলেট পাওয়ার করাপটস অ্যাবসুলেটলি’। মানে, সর্বাত্মক ক্ষমতা সর্বাত্মকভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে। কথাটি ব্যক্তির বেলায় যেমন সত্য তেমনি কোনো গোষ্ঠী, দল বা সরকারের বেলায়ও সত্য। অফিসের কর্তাব্যক্তি যদি ঘুষখোর হন- পিয়ন, দারোয়ান, কেরানি ও ছোট কর্তা সবাই ঘুষ ভাগাভাগি করে নেন। আজকাল বাংলাদেশের সব অফিসেই ‘পার্সেন্টেজ’ নির্ধারিত আছে। এই উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি, ক্ষমতা বা সর্বাত্মক ক্ষমতার প্রভাব, প্রতিপত্তি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয় সমাজের সর্বত্র। পুরনো প্রবাদ আছে এরকম- ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়’। এটির আধুনিক সংস্করণ হতে পারে ‘নেতা দোষে নীতি নষ্ট-নাগরিক যন্ত্রণায়’। নেতা সে ছোট হোক বড় হোক, তার প্রভাব প্রতিফলিত হয় তার নিজস্ব বলয়ে। একসময় শিক্ষা ভবনে চাকরি করতাম। একজন বড় কর্তা এলেন নামাজে। দেখলাম, জোহরের নামাজে তার পাশে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ নেতৃত্বের প্রভাব প্রতিক্রিয়া অনস্বীকার্য। কোনো চেয়ারম্যান যদি সৎ হন, তার মেম্বাররা অসৎ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে যদি আপনি জানেন- আপনার বস দুর্নীতিবাজ, আপনি তাকে হয়তো দৃশ্যত সম্মান করবেন, অদৃশ্যে অবশ্যই অসম্মান করবেন। এটাই স্বাভাবিক। যে সব দেশে একদলীয় সরকার থাকে, অন্য দল থাকে নিষিদ্ধ; একই আদর্শের ধারক হওয়া সত্ত্বেও সামান্য ভিন্নমত পর্যন্ত পছন্দ করা হয় না। এখনই বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে এরকম উদাহরণ দেয়া যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুবাদে ছাত্র-যুবা, কৃষক-শ্রমিক, পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী সব ক্ষেত্রেই শাখা-প্রশাখা প্রসারিত সরকারি দলের। একদলীয় প্রবণতার কারণে তাদের আধিপত্যও একক। বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন, তেমনি প্রতিটি সেক্টরে ওই প্রবণতা প্রতিফলিত। দেশ-জাতি-রাষ্ট্রে বিরোধী দল অপরিহার্য এ জন্য যে, সরকারি দলের ক্ষমতার রশি টেনে ধরেন তারা। আর যদি ব্যবস্থাটি ‘বাকশাল’ না একদলীয়, তাহলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হয় না।

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার সর্বত্র ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের বশংবদরা এমনভাবে জেঁকে বসেছেন যে, টুঁ শব্দটি করার জো নেই। সর্বত্র যা শিক্ষাঙ্গনেও তা। শিক্ষাঙ্গনে তাদের তাণ্ডব তীব্রভাবে অনুভূত হওয়ার কারণ, অন্যত্র নেতৃত্বের মধ্যে দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা, ভদ্রতা ও সৌজন্যের সীমারেখা একটু-আধটু থাকলেও শিক্ষাঙ্গনে তা অবারিত, অযাচিত এবং অবধারিত। সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো, বাধাবন্ধনহীন বেপরোয়া অবস্থা। দেশে এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই যা তাদের তাণ্ডববহির্ভূত। স্কুলেও শাখা খুলতে চেয়েছিলেন তারা। বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি। পারলে তারা প্রাইমারি স্কুলেও শাখা খুলে দেন। দৃশ্যমানভাবে স্কুলে শাখা খুলতে না পারলেও কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে তারা স্কুলের ছেলেদের অপরাধ জগতে টেনে এনেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন মাস্তানরা। এরা শিক্ষককে অপমান করেছে। নিয়োগ-বাণিজ্যে ভাগ বসিয়েছে। প্রতিটি প্রকল্প থেকে বখরা নিয়েছে। কোনো নির্মাণকাজই তাদের ‘পার্সেন্টেজ’ না দিয়ে করা যায়নি। একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসিকে যখন তারা বাদ দেয়নি, তখন তাদের ঔদ্ধত্যের মাত্রা বুঝা যায়।

সবচেয়ে সর্বনাশের, লজ্জা ও দুঃখ-ক্ষোভের কারণ হলো- দেশে সাম্প্রতিক নারী লাঞ্ছনায় তাদের একরকম একাধিপত্য। যেখানেই ধর্ষণ সেখানেই তারা। বিরোধীরা বলছেন- এ যেন ধর্ষণ লীগ।’ এর প্রধান কারণ হলো- ১. ক্ষমতাসীনদের আধিপত্যের মাত্রায় তারা একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন; ২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা, শিক্ষকরা ও প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করা। সিলেট এমসি কলেজের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ; ৩. এর সবচেয়ে বড় কারণ সবার ভাষায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মামলা হয়, বিচার হয় না। যারা বিচার চায় তাদের উল্টো অপমান-অপদস্থ হতে হয়। ধর্ষণের বেলাগাম আধিক্য দেখে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষকের বিপক্ষে, নৈতিকতার সপক্ষে সরকার বা ক্ষমতাসীন দল একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। যখনই এরকম ঘটনা তাদের গোচরীভূত করা হয়েছে, তখনই তারা ‘ব্যক্তিগত’, ‘বিচারাধীন বিষয়’ ও ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল বা সরকার বা প্রশাসন নীতিগতভাবে ধর্ষণের পক্ষে নয়। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব যদি থাকে নিশ্চুপ, এত বড় ধরনের সর্বনাশের পরও দলীয় পর্যায়ে না থাকে দীক্ষার আয়োজন অথবা যখন উচ্চারিত হয় না হুঁশিয়ারি, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই প্রকাশ পায়। তারা যদি ব্যবহৃত হয় ক্ষমতায় থাকা না থাকার বাহন হিসেবে, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব শাসনের নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলে। একজন শিক্ষক সে দিন বলছিলেন, ‘ছাত্র যুক্তি দিচ্ছে সরকার যদি দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে থাকে, তাহলে তাদের নীতিকথা কে শুনবে?’ তারা সারা দেশে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, তা অভিভাবক নাগরিক সাধারণ ও শিক্ষকদের অসহায় করে তুলেছে।

কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। পত্রিকায় অথবা চ্যানেলে ঘটনার নির্মমতা জেনে ক্ষুব্ধ হয় মানুষ। বাদ-প্রতিবাদ মানববন্ধনে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে। রাজধানীর কলাবাগানে গত ৭ জানুয়ারি এরকম একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দুপুরে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ কলাবাগান থানায় ফোন করে জানায়, এক তরুণ জনৈকা কিশোরীকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় এনেছেন। কিশোরীর শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। তখন নিউ মার্কেট পুলিশ ওই তরুণকে আটকে রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে। পরে পুলিশ তরুণকে আটক করে। খবর পেয়ে ওর তিন বন্ধু হাসপাতালে গেলে পুলিশ তাদেরও আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত তরুণ স্বীকার করে, মেয়েটি তার বান্ধবী। বাসার সবাই ঢাকার বাইরে থাকার সুযোগে সে তার বান্ধবীকে নিজের ফ্লাটে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে সে তাকে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে আসে সে। সুরতহাল প্রতিবেদনে মেয়েটির শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। ধর্ষিতার মা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘গতকাল বেলা ১১টার দিকে মেয়ে আমাকে ফোন করে বলে- ‘মা আমি বান্ধবীর বাসায় নোট শিট আনতে গেলাম।’ বেলা ১টার দিকে দিহান ছদ্মনামে এক তরুণ ফোন করে বলে, আপনার মেয়ে অচেতন হয়ে গেছে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। আপনি আনোয়ার খান মডার্নে আসেন’। মেয়েটির মা বলেন, ‘বখাটে ছেলের সাথে কথা বলার পর আর বুঝতে বাকি থাকে না, কী ঘটেছে। তিনি জানতে পারেন, তার মেয়েকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। তার কাপড়চোপড় রক্তে মাখা। এ ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে বরাবরের মতো সর্বত্র ক্ষোভ ও ক্রোধের সৃষ্টি হয়। এ দিকে ওই স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ফারদিন ইফতেখার ওরফে দিহান দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দেয়। পরে ফারদিনকে কারাগারে পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, ধর্ষিতা ও ধর্ষক উভয়ই ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র-ছাত্রী। ফারদিনের বাবা সাবেক ভূমি রেজিস্ট্রার। আর মেয়েটির মা সিটি করপোরেশনে চাকরি করেন। তার বাবা ব্যবসায়ী। মেয়েটির গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তাকে দাফন করা হয় গ্রামেই। দাফন শেষে হাজারো মানুষ রাস্তার দুই পাশে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে যান। কিশোরীটিকে হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকায়ও। রাজধানীর ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে অভিভাবক, শিক্ষক ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। তারা ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির দাবি জানান। গণমাধ্যম সর্বত্র মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ লক্ষ করা যায়। মেয়েটির মা বলেন, অভিযুক্ত ছেলেটিকে আগে তিনি কখনো দেখেননি। হয়তো ফেসবুকে যোগাযোগ করে কৌশলে মেয়েকে বাসায় নিয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমার অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েকে কৌশলে নিয়ে তারা হত্যা করেছে। এটা অপহরণ ও ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড।’ তিনি মামলাটি দ্রুত বিচার আদালতে নিয়ে যাওয়ার আবেদন জানান। মেয়েটির বাবা অভিযোগ করেন, তিনি ফারদিন ও তার তিন বন্ধুকে আসামি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মামলা দুর্বল হয়ে যাবে, এমন কথা বলে পুলিশ শুধু ফারদিনকে আসামি করে। মেয়ের বয়স নিয়ে নিউ মার্কেট পুলিশ তাকে বিড়ম্বনায় ফেলেছিল। তিনি আরো অভিযোগ করেন, শুধু ফারদিন নন, তার তিন বন্ধুও ঘটনার সাথে জড়িত। তবু পুলিশ তাদের গ্রেফতার না করে ছেড়ে দিয়েছে। এর পেছনে কারো প্রভাব রয়েছে।

রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র এরকম ঘটনা ঘটছে অহরহ। একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, রাজধানীর ৫০টি থানায় গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫২৫টি। এসব ভুক্তভোগীর ৪৫ শতাংশ শিশু-কিশোরী।

করোনার প্রদুর্ভাবের মধ্যেই বিগত বছরের দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬২৬ শিশু। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এমজেএফ’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি-২০২০’ শীর্ষক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে গত সপ্তাহে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। আটটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত শিশু অধিকারবিষয়ক সংবাদে আধেয় বিশ্লেষণ থেকে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই সংস্থার পর্যালোচনায় বলা হয়, গত বছর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৬ জন শিশুকে। ১৩-১৮ বছরের কমবেশি শিশুরাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেশি। এ ছাড়া ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, হত্যা, অপহরণ, নিখোঁজ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে আরো ১৪৫টি শিশু। এসব তথ্য পরিসংখ্যান বলে, বিষয়টি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি দু’টি পক্ষের সংশ্লিষ্টতা প্রবলভাবে প্রমাণিত হয়। প্রথমত, সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন অংশের সংশ্লিষ্টতা। যেমন- বিচারের ক্ষেত্রে নিম্নআদালত এবং আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা। এই নিবন্ধের প্রাথমিক অংশে যে প্রেক্ষাপটের কথা বলা হয়েছে, প্রতিদিন সংবাদপত্রে তার প্রমাণ আসছে। ওই স্কুলছাত্রীর ঘটনায় ক্ষোভ প্রশমিত হতে না হতেই পাশাপাশি খবর আসে, ‘ভিজিএফ কার্ডের কথা বলে ধর্ষণের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার’। প্রতিদিনই এরূপ খবর আসছে। সুতরাং শাসক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রমাণযোগ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ তথা শিক্ষকদের ভূমিকা। এ দিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক-আইজিপি বলেছেন, ছেলে বা মেয়ে কোথায় যায় কী করে, সেই খোঁজ অভিভাবকদের রাখতে হবে। সন্তানের ওপর অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাবা-মায়েদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, ‘সন্তান জন্ম দিয়েছেন, দায়দায়িত্ব নিতে হবে। তা না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘কিশোরদের বিপথগামী হতে দেয়া যাবে না। কিশোর গ্যাং নামে কোনো দৌরাত্ম্য চলতে পারে না। এ ধরনের যেকোনো দৌরাত্ম্য মোকাবেলা করতে হবে। এটা পরিবারের সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। সন্তানদের মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধের সঞ্চার করার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের।’

সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব একক নয়। এই দায়িত্ব সামগ্রিক। সমন্বয়মূলক। আইজিপি বেনজীর আহমেদ এর প্রতিকার হিসেবে যে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। আজকাল অনেক অভিভাবককেই আসলে ‘বেখবর’ দেখতে পাওয়া যায়। তারা অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতার মোহে অনেকসময় এতই ব্যস্ত থাকেন যে, ‘দেখা হয়নি চক্ষু মেলে নিজের সন্তানদের, নিজের পরিবারকে।’ অনেকসময় প্রদীপের নিচে অন্ধকার দেখেছি। এই অন্ধকার দূর করতে হলে সরকার, সমাজ ও অভিভাবকের সমভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অভিভাবকদের এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, চারাগাছটিতে কেবল সার ও পানি দিলে তা তরতর করে বেড়ে উঠবে। আপনাকে অবশ্যই শিশুরূপ চারাগাছটিকে অন্তত ১৬ বছর পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যায় রাখতে হবে। আমাদের কারো সামনে আলাদিনের চেরাগ নেই যে, সন্তানটি সোনালি আভায় বেড়ে উঠবে। এ জন্য তাকে প্রথম যে শিক্ষাটি দিতে হবে তা নিজ ধর্মের। তার ধর্মীয় নীতিশাস্ত্রের আলোকে যদি জীবনের সূচনা ঘটে, মনকে যদি পবিত্রভাবে গড়ে তোলা যায় তা শরীর ও স্বভাবে প্রভাব ফেলবে। মুসলমান শিশুর চার-পাঁচ বছর বয়স হলেই কুরআনের কাছে নিয়ে যেতে হবে তাকে। সে যে শিক্ষাই গ্রহণ করুক ভবিষ্যতে- ইংরেজি মাধ্যম, সাধারণ মাধ্যম কিংবা মাদরাসায়, তার জন্য কুরআনের শিক্ষা তথা নৈতিকতা শিক্ষা অপরিহার্য। না হলে সে মানুষের পরিবর্তে ‘দানব’ হবে। মুসলমানের পরিবর্তে মাস্তান হবে। বাংলাদেশের সব অভিভাবকের কাছে নিবেদন, অতীতে যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, এখন থেকে সতর্ক হোন এবং আপনার সন্তানকে এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে সযত্নে রক্ষা করুন।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



আরো সংবাদ