২৫ জানুয়ারি ২০২১
`

অদৃশ্য চোখের নজরদারি

অদৃশ্য চোখের নজরদারি - নয়া দিগন্ত

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে মোবাইল ফোন, কমপিউটার ও ইন্টারনেট তথা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের ওপর নজরদারি ভয়ানক আকারে বেড়েছে। এর সঙ্গে জড়িত কখনো বৃহৎ করপোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কখনো প্রযুক্তিসেবার প্রতিষ্ঠান এবং কখনো রাষ্ট্র স্বয়ং। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, কখনো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে। কারণ যা-ই হোক প্রকাশ্যে তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র অজুহাতই সব সময় দেখায়। এসব কারণে বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সেবার প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কিভাবে গুপ্তচরবৃত্তি করছে সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সবসময় আইনগতভাবে বৈধ নয়। কিন্তু তার পরও এটি চলছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার অনৈতিক কাজের বৈধতাও দিয়েছে নতুন আইন তৈরি করে। এই নিবন্ধে আমরা নাগরিকদের তথা বিশ্ববাসীর ওপর কিছু রাষ্ট্রের যৌথ নজরদারির তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির ওপর আগ্রহ আছে বা নজর রাখেন এমন অনেকেই ‘ফাইভ আইজ’ নামটি শুনেছেন। অনেকে ‘নাইন আইজ’ এবং ‘ফর্টিন আইজের’ নামও শুনে থাকবেন। কিন্তু নিশ্চিত করেই বলা যায়, বেশির ভাগ মানুষ জানেন না এসব আসলে কী? আমরা এ বিষয়ে সামান্য হলেও ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষা করে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য কাজ করে এমন গ্রুপ বা সম্প্রদায়গুলো জানে পাঁচ চোখ, নয় চোখ বা ১৪ চোখের রহস্য। কারণ ভিপিএন ‘ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক’ ও অন্যান্য প্রাইভেসি রক্ষা করে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো মূলত এসব চোখের বদনজর এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই তৈরি। ভিপিএন হলো এমন একটি সফটওয়্যার যা আমাদের ‘ওয়ান’ (WAN) বা ‘ল্যান’ (LAN) এর মাধ্যমে নেয়া ইন্টারনেট সংযোগের বাইরেও কারো সাথে সংযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে, যাতে আপনার কথা বা তথ্য চুরি হবে না। আপনি যদি ভিপিএন-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন তাহলে আপনার ওয়াইফাই সংযোগের মাধ্যমে যারা আপনার ওপর নজরদারি করছে বা আপনার তথ্য নিয়ে যাচ্ছে তারা সে কাজটি আর করতে পারবে না। আপনি নিরাপদে কারো সাথে চ্যাটিং বা অন্য তথ্যউপাত্ত বিনিময় করতে পারবেন।

মূল কথায় আসি। ‘পাঁচ চোখ’, ‘নয় চোখ’ বা ‘১৪ চোখ’ আসলে হলো বিশ্ববাসীর ওপর নজরদারি করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের জোট। এসব রাষ্ট্র প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারির মাধ্যমে মানুষের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ এবং তা পরস্পরকে সরবরাহ করে। বছরের পর বছর ধরে তারা এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে চলছে কোনো কোনো দেশের এই কার্যক্রম। আপনার তথ্য সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আপনার ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবহার করে। যেমন আপনার নিজ দেশের এ ধরনের কোনো সেবাদানকারী সংস্থা বিদেশী রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করতে পারে। এসব বিষয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই; কারণ প্রিজম সার্ভিলেন্স ডকুমেন্ট অনেক আগেই বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। টেলিযোগাযোগে আড়িপাতার রুম ৬৪১এ নামের হাতিয়ারটির কথাও বিশ্ববাসীর অজানা নয়। এটি চালাত বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি এটিঅ্যান্ডটি। দুটিই চালানো হতো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ব্যবস্থার আওতায়।

এখন আসা যাক ‘ফাইভ আইজ’ নজরদারি জোটের বিষয়ে। এটি হলো পাঁচটি দেশের একটি জোট যা নিজেদের এবং বাইরের মানুষের ওপর নজরদারি চালায়। দেশগুলো হলো, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সক্রিয়। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে পরস্পরের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময়ের ব্যাপারে সম্মত হয়। তার মানে হলো একটি ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বশক্তি আর একটি নতুন বিশ্বনেতা হয়ে ওঠা শক্তি নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এই চুক্তি করেছে। পুরো ‘শীতল’ যুদ্ধের সময়কালেও এটি সক্রিয় ছিল এবং ২০০০ সালের দিকে যখন আমেরিকা বিশ্বজুড়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করে তখন এটি আরো শক্তি অর্জন করে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন বিপুলসংখ্যক অতিগোপন নথির সাথে আমেরিকা ও তার মিত্রদের এই গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি ফাঁস করে দিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে যেসব সংস্থা নজরদারির কাজ করে তার মধ্যে আছে প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা বিভাগের অন্তত ২০টি বিভিন্ন সংস্থা যেগুলো পরস্পর যোগসাজশে কাজ করে এবং তথ্য শেয়ার করে। উল্লিখিত পাঁচটি দেশের মধ্যে কোনো কোনোটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির কোনো ধার ধারে না যদিও তারা ব্যক্তিস্বাধীনতার দেশ হিসেবে সুবিদিত। যেমন, যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালে ইনভেস্টিগেটরি পাওয়ার্স অ্যাক্ট নামে আইন করা হয়েছে যার আওতায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং টেলিকম বিভাগ তাদের গ্রাহকের প্রায় সব তথ্য সংগ্রহ ও দুই বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে বাধ্য। শুধু তা-ই নয়, সরকারি কোনো সংস্থা যেকোনো সময় চাইলে কোনো রকম আনুষ্ঠানিক পরোয়ানা ছাড়াই ওই সব তথ্য সরবরাহ করতেও বাধ্য প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলো তৃতীয় পক্ষের (মূলত সরকার) কাছে বিক্রি করার অধিকার দিয়েছে। এ ছাড়া দেশটি জর্জ অরওয়েল কথিত (অ্যানিমেল ফার্ম উপন্যাসে) প্রতিটি নাগরিকের ওপর নজরদারির কাজ চালায় বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে, যেমনটি ছিল ‘দ্য প্রিজম প্রোগ্রাম’। এর বাইরেও তাদের আছে প্যাট্রিয়টিক অ্যাক্ট যা দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কারো কাছ থেকে প্রতিটি ব্যক্তির বা গ্রাহকের যেকোনো তথ্য আদায় করে নিতে পারে।

অস্ট্রেলিয়াও ব্রিটেনের মতো একই রকম আইন করেছে তথ্য পাওয়ার জন্য। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ বা যুক্তরাজ্যের গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশন্স হেডকোয়ার্টারের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফাইভ আইজ গুপ্তচরবৃত্তির যে নেটওয়ার্ক চালু রেখেছে তা বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী। অথচ পাঁচটি দেশই মানুষের বাক, ব্যক্তি ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার এক উদার, মুক্তবিশ্ব বলে কথিত।

একইভাবে কাজ করে ‘নাইন আইজ’ জোট। এটি আর কিছু নয়; নিছক পাঁচ চোখের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরো চারটি চোখ। সেগুলো হলো, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে। এই জোটের অস্তিত্বও প্রকাশ করেন এডওয়ার্ড স্নোডেন ২০১৩ সালে। আবার এই নাইন আইজের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরো পাঁচটি চোখ। এরা হলো, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইতালি, সুইডেন ও স্পেন।

১৪ আইজ যা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সিজিন্ট সিনিয়র ইউরোপ’ নামে পরিচিত, আগের ৯টি দেশের জোট সম্প্রসারণ করে এটি গঠন করা হয়। চালু হয় ১৯৮২ সালে শীতল যুদ্ধের সময়। লক্ষ্য ছিল তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু নাইন-ইলেভেনের পর এর লক্ষ্য পাল্টে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর এই জোটের লক্ষ্য হয় সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য সংগ্রহ করা। অর্থাৎ আমেরিকার সাথে প্রায় পুরো ইউরোপ জোট বেঁধেছে নিজেদের এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের তথ্য হাতিয়ে নেয়ার কাজে।

তথ্য লাভের ব্যাপারে দেশগুলো এতটাই মরিয়া যে, এ জন্য তারা আইনসম্মত কিংবা বেআইনি সব উপায়ই ব্যবহার করে। এমনকি তথ্য দিতে অস্বীকার করলে সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া বা তাদের কার্যক্রম চালাতে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দৃষ্টান্তও আছে। দেশগুলো এমন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নানা দেশে স্থাপন করে রেখেছে যে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারো টেলিফোন কল, ফ্যাক্স ও কমপিউটারে আড়ি পাততে, তথ্য সংগ্রহ ও শেয়ার করা যায় । বলা হয়, এই ব্যবস্থা একজন গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যও জেনে ফেলতে সক্ষম। এমনই একটি ইলেকট্রনিক গুপ্তচর ব্যবস্থার নাম ‘ইচেলন’। এ বিষয়ে ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল। এ ছাড়া, ফেসবুক, টুইটারের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও গ্রাহকের তথ্য কোনো রাষ্ট্র বা তৃতীয়পক্ষের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশ সরকারও ফেসবুকের কাছ থেকে গ্রাহকদের তথ্য পায়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

একই অবস্থা কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার খবর সবাই জানেন। প্রতিবেশী ভারতে ক্ষমতাসীন সরকারের একই ধরনের নজরদারি বলবৎ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে আইন-আদালত অনেক কিছু হচ্ছে। কিন্তু সরকার দমেনি। আমাদের এখানেও বিরোধী দলের নেতাদের টেলিফোনে আড়িপাতার খবর পুরনো। ফেসবুকে অনেক কন্টেন্ট প্রায়ই গায়েব হয়ে যায়। নোটিশ আসে, অ্যাটাচমেন্ট আনঅ্যাভেইলেবল। কারণটা কি খুব দুর্বোধ্য? নজরদারি এখানেও চলছে। হয়তো মাত্রাটি ভিন্ন।

এআই বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যেভাবে অগ্রগতি হচ্ছে তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে পুরো বিশ্বের সব মানুষের তথ্য বিশ্বমোড়ল আমেরিকা ইউরোপের হাতে চলে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে এখনো কিছু ভিপিএন ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছে যেগুলো ব্যবহার করা নিরাপদ। সেগুলো আগ্রহীরা সহজেই খুঁজে নিতে পারেন। তবে আমাদের এই নিবন্ধের লক্ষ্য আপনাকে ভিপিএন-এর তথ্য দেয়া নয়। বরং প্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্ব কিভাবে আরো বিভক্ত হয়ে পড়ছে সেটি তুলে ধরা। আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, ১৪টি অদৃশ্য চোখ (আসলে তো অগণিত) আপনার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে কোনো না কোনো জায়গা থেকে। এ এক দুঃসহ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মূল টার্গেট কারা, সেটি পাঠককে নতুন করে বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই। সুতরাং অগণিত অদৃশ্য চোখ কোথায়, কাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে সেটিও নাম দাগিয়ে বলা নিষ্প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি একটি নতুন বিশ্বশক্তির উত্থানের সম্ভাবনার বিষয়ে পাশ্চাত্য উদ্বিগ্ন। তাদের নজরদারির অনেকটাই এখন সে দিকে নিবদ্ধ যে জন্য হংকংয়ের স্বাধীন সত্তার পক্ষের আন্দোলন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত পশ্চিমারা। ক্বচিৎ কদাচিৎ সুর তোলে উইঘুরদের দুর্দশা নিয়ে। কিন্তু এগুলো সাময়িক। মূল ও স্থায়ী টার্গেট নিঃসন্দেহে হান্টিংটনের সভ্যতার দ্বন্দ্বের তত্ত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে বলেই মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে যারা ইন্টারনেটে অদৃশ্য চোখের নজরদারি এড়িয়ে যোগাযোগ এবং স্বস্তির সাথে বিশ্বে মুক্ত জীবনযাপন করতে চান তাদের বিকল্প উপায় খুঁজে নিতেই হবে।



আরো সংবাদ