০৬ মার্চ ২০২১
`

জম্মুর ভুলে যাওয়া সেই গণহত্যা

জম্মুর ভুলে যাওয়া সেই গণহত্যা - ছবি সংগৃহীত

৭৩ বছর আগের ১৯৪৭ সালের প্রধানত এই নভেম্বরে ভারত বিভাগের কয়েক মাস পর অধিকৃত জম্মুর প্রায় সবখানে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করা হয়। ওই দাঙ্গায় জম্মুর হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। এই জম্মু ছিল প্রিন্সলি স্টেট জম্মু-কাশ্মিরের একটি অংশ। পরের বছর ১৯৪৮ সালেও একইভাবে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে হায়দ্রাবাদে নির্বিচারে চলে মুসলিম নিধন। ইতিহাসে এই দু’টি ব্যাপক মুসলিম হত্যাযজ্ঞ যথাক্রমে ‘জম্মু মুসলিম ম্যাসাকার/ জেনোসাইড’ এবং ‘হায়দ্রাবাদ মুসলিম ম্যাসাকার/ জেনোসাইড’ নামে পরিচিত। আজকের দিনে এই গণহত্যা দু’টি সম্ভবত সবচেয়ে কম আলোচিত এবং প্রায় ভুলতে বসা বিয়োগান্ত ঘটনা। সে সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো মুসলিম হত্যার ঘটনাও চলে।

এর পেছনে সে সময়ের ভারত সরকারের সায় ছিল তাদের ‘জাতীয় স্বার্থরক্ষা’র মনোভাব থেকে। ‘জাতীয় স্বার্থেই’ ভারতের শাসকগোষ্ঠীর যোগসাজশ যে ছিল এ ধরনের মুসলিম হত্যাকাণ্ডে, এর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে। ইন্টারনেট সার্চ দিলে সহজেই এসব মুসলিম হত্যার করুণ কাহিনী সহজেই জানা যায়।
উইকিপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, ১৯৪৭ সালের জম্মু গণহত্যায় বহু মুসলমানকে হত্যা করা হয়। অনেককে তাড়িয়ে দেয়া হয় পশ্চিম পাঞ্জাবে। এই গণহত্যা চালায় চরমপন্থী হিন্দু ও শিখরা। আর তাদের সহযোগিতা করে জম্মু-কাশ্মিরের ডোগরা মহারাজা হরি সিংয়ের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন আধা-সামরিক বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ও দাঙ্গা বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক)। এক হিসাব মতে, এ সময় ২০ হাজার থেকে এক লাখ মুসলমানকে হত্যা করা হয়। এই দাঙ্গার হাত থেকে যারা কোনো না কোনো উপায়ে বেঁচে যান, তারা জানিয়েছেন- তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন ওই দাঙ্গার সময় প্রাণ হারিয়েছেন। সেখানে মানবতার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট ছিল না। উচ্ছৃঙ্খল জনতা ও ডোগরা রাজার সেনারা এ কাজে সহযোগিতা করে উগ্র চরমপন্থী হিন্দু ও শিখদের। আরএসএসের অ্যাক্টিভিস্টরা মুসলিম নিধনের লক্ষ্যে ওই দাঙ্গা সৃষ্টির পরিকল্পনা করে।

ডোগরা রাজার সেনাবাহিনী জম্মুতে উগ্র হিন্দু ও শিখদের নিয়েই সূচনা করে এই হত্যাযজ্ঞ। দুই মাস ধরে চলা ওই হত্যাযজ্ঞে হতাহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন। বিভিন্ন সূত্রমতে, নিহতের সংখ্যা সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৩৭ হাজার। বাস্তুচ্যুত হয়ে পাঁচ লাখের মতো মুসলমান বাধ্য হয়ে পালিয়ে যায় নবসৃষ্ট পাকিস্তান ও আজাদ কাশ্মিরে। পরে এরা সেখানেই স্থায়ী বসবাস গড়ে তোলে। এ ঘটনায় অনেক পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুই দেশের অধিবাসী হয়। ওই হত্যাযজ্ঞ অনেক ঘটনার সূচনা করেছিল। এরই প্রভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধও বাধে। দেশ দু’টির মধ্যে কাশ্মির নিয়ে বিরোধও সৃষ্টি হয়। এই বিরোধে উভয় দেশের মুসলমান, হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের লোকরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যায়।

‘এর তাৎক্ষণিক বিরূপ প্রভাব পড়ে জম্মুতে। ডোগরা সেনাবাহিনী অক্টোবর-নভেম্বরে জম্মু প্রদেশের বিভিন্ন অংশের মুসলিম প্রজাদের জোর করে বহিষ্কারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। ওই সময়ে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলে মুসলিম নিধনের কাজও’ -এমনটিই জানান অ্যামস্টারডামের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রির ফেলো ইদ্রিস কান্থ। তিনি ১৯৮০-এর দশকের কাশ্মিরের ইতিহাসের একজন গবেষক।

জানা যায়, মধ্য-অক্টোবরে ডোগরা সেনারা জম্মু প্রদেশের গ্রামগুলো থেকে মুসলমান বহিষ্কারের কাজ শুরু করে। এসব শরণার্থীদের তাড়িয়ে নেয়া হয় পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাব অংশে। এদের বেশির ভাগই আশ্রয় নেয় সিয়ালকোট, ঝিলাম ও রাওয়ালপিন্ডির শরণার্থী শিবিরে। ইদ্রিস কান্থ আরো জানান, ‘৫ নভেম্বর ডোগরা বাহিনী শুরু করে মুসলমানদের বাস্তুচ্যুত করার সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত অভিযান। বলা হয়েছিল, তাদের সিয়ালকোট নেয়া হবে। কিন্তু তাদের সিয়ালকোট নেয়ার পরিবর্তে জম্মুর রাজৌরি জেলার পাহাড়ি বন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেয়ার পর তাদের সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় এবং ডোগরা রাজার বাহিনী ওই হত্যাযজ্ঞের আলামত পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলে। ফলে ভারত বিভাগের সময়ের ওই ঘটনাটি একটি কম জানা ঘটনা হয়েই থেকে যায়।

ইতিহাসবিদরা বলেন, ওই হত্যাযজ্ঞ চালায় হিন্দু জম্মু-কাশ্মিরের মহারাজার সেনাবাহিনী ও শিখ সেনাবাহিনী। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি গণহত্যা। এর মুখ্য লক্ষ্য ছিল জম্মুর জনসংখ্যাচিত্র পাল্টে দেয়া। আসলে জম্মু বরাবরই ছিল একটি উল্লেখযোগ্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। তখন জম্মুর ৬০ শতাংশ মানুষই ছিল মুসলমান। আলোচ্য গণহত্যা ও বহিষ্কারের মাধ্যম জম্মুকে করে তোলা হয় একটি মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ট অঞ্চল।

‘দ্য হিস্ট্রিক্যাল রিয়েলিটি অব কাশ্মির ডিসপুট’ বইয়ের লেখক পি জি রাসুল বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ঘটানো ওই হত্যাযজ্ঞে দুই লাখ মুসলমানকে হত্যা করা হয়। পাঞ্জাবের পাতিয়ালা থেকে সেনবাহিনী ডেকে আনা হয়েছিল। পুরো পরিস্থিতিতে একটি সাম্প্রদায়িক আবহ সৃষ্টি ও মুসলমানদের হত্যার জন্য ডেকে আনা হয় উগ্র ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন আরএসএসকে।’

কান্থ আরো বলেন, ‘তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু ও কাশ্মিরি নেতা শেখ আবদুুল্লøাহর নেতৃত্বে কাশ্মিরের একটি প্রতিনিধি দলের মধ্যে তখন জম্মুতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এই বিয়োগান্ত ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বনকেই অগ্রাধিকার দেন। তারা বিষয়টি কাশ্মিরের জনগণকে জানাতে চাননি। কারণ, শুরুতেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরে জনগণ তা জানলে সেখানে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তাই ভারত রাষ্ট্র সবসময়ই বিষয়টি গোপন রাখতে চেষ্টা করে। এটিকে ‘ম্যাসাকার’ বলব না, বরং বলব এটি রীতিমতো একটি ‘স্টেজড জেনোসাইড’। দুর্ভাগ্য, এ নিয়ে কোনো আলোচনাই চলেনি। ভারত সরকার ভেবেছিল, যদি কাশ্মির অংশ পাকিস্তানের সাথে চলেও যায়, তবে কমপক্ষে যেন জম্মুকে ভারতের সাথে রাখা যায়। আর তা রাখতে হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে জম্মুকে পরিণত করতে হবে একটি হিন্দুগরিষ্ঠ অঞ্চল। সে লক্ষ্যেই চালানো হয় এই মুসলিম গণহত্যা।’

উইকিপিডিয়া ওই গণহত্যার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছে- ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার সময় ব্রিটিশ সরকার প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব প্রত্যাহার করে নেয়। সেই সাথে এগুলোর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়- এগুলো স্বাধীন থাকবে, না পকিস্তান বা ভারতের সাথে যোগ দেবে। জম্মু ও কাশ্মিরের তৎকালীন মহারাজা হরি সিং প্রথমে স্বাধীন থাকার ইঙ্গিত দিলেও একপর্যায়ে ভারতের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পক্ষে সক্রিয় হন। তখন কাশ্মিরের ‘মুসলিম কনফারেন্স’ জম্মু ও কাশ্মির পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়। সেই থেকে জম্মু ও কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি, যা আজো চলমান।

উইকিপিডিয়ার জম্মুর গণহত্যা বর্ণনা করেছে এভাবে- ১৪ অক্টোবর আরএসএস ও আকালি দলের শিখরা জম্মুর বিভিন্ন জেলার গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়ে মুসলমানদের হত্যা করে। তাদের সম্পদ লুট করে ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। জম্মু নগরীর আশপাশেও ব্যাপক মুসলমান হত্যা চলে। ওই হামলায় নেতৃত্ব দেয় রাজ্যের সেনাবাহিনী। রাজ্যের কর্মকর্তারা দাঙ্গাবাজদের জোগান দেয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। প্রশাসন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর অনেক মুসলিম সেনাকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। অনেক মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে। মুসলিম প্রাধান্যহীন বেশির ভাগ এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলমানদের হত্যা করা হয়।

দাঙ্গাকারীরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে গাড়িতে করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চলাফেরা করে। সেই সাথে নগরীতে সরকার কারফিউ বলবৎ করে। গুজ্জার সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ জম্মু নগরীতে দুধ সরবরাহ করত। তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। বলা হয়, রামনগরের আবর্জনা স্তূপে ফেলা হয় গুজ্জার নারী-পুরুষ-শিশুর লাশ। জম্মু শহরের অনেক মুসলমান এলাকা ঘেরাও করে রেখে বন্ধ করে দেয়া হয় পানি ও খাদ্য সরবরাহ। তালাব খাতিকান এলাকার মুসলমানরা তাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। পরে প্রশাসন ঘোষণা দেয়- আত্মসমর্পণ করলে তাদের নিরাপদে পাকিস্তানে চলে যেতে দেয়া হবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এরাসহ আরো হাজার হাজার মুসলমানকে সেনারা অসংখ্য বড় বড় ট্রাকভর্তি করে সিয়ালকোট নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। যখন এরা নগরীর বাইরে পৌঁছে, তখনই তাদের ট্রাক থেকে টেনে নামিয়ে এনে সশস্ত্র শিখ ও আরএসএস অ্যাক্টিভিস্টরা তাদের হত্যা করে। সে সময় অনেক নারীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানোর খবর আসে উধামপুর জেলা, রামনগর, চেন্নাই, ভদ্রেওয়া ও অন্যান্য এলাকা থেকেও। ব্যাপক মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চলে চাম্ব, দেব বাটালা, মনেশ্বর ও আখনুরের বিভিন্ন এলাকায়। তবে বহু লোক পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যেতে সক্ষম হয়। ১৯৪৭ সালের ১৬ নভেম্বর শেখ আবদুল্লাহ জম্মুতে যান এবং মহল্লা ওস্তাদে স্থাপন করা হয় শরণার্থী শিবির।

কাশ্মিরের সুপরিচিত মানবাধিকারকর্মী খুররম পারভেজের মতে- ‘আজকের কাশ্মিরে যে অন্তহীন দ্বন্দ্ব চলছে তার শেকড় নিহিত জম্মুর ১৯৪৭ সালের সেই গণহত্যার ঘটনার মধ্যে। ওই ঘটনা ভুলিয়ে রাখা হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। আসলে ১৯৪৭ সালের সেই হত্যাযজ্ঞ অন্তহীন। আজো তা অব্যাহত রয়েছে। থেমে থেমে জম্মু-কাশ্মিরের মুসলমানদের এই হত্যা-প্রক্রিয়া চলছে। সেদিন যারা এই হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল তাদের আর কখনো জম্মু ও কাশ্মিরে ফিরে যেতে দেয়া হয়নি’।

জম্মুর মুসলিম হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতি মিলিশিয়ারা কাশ্মিরে ঢুকে পড়ে। তখন ডোগরা রাজার সেনাবাহিনী কাশ্মির থেকে পিছু হটে পালিয়ে যায় জম্মু এলাকায় এবং রাজা হরি সিং তখন নয়া দিল্লির সাথে জম্মু ও কাশ্মিরের ভারতভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারত সেনাবাহিনী পাঠায় ওই উপজাতি মিলিশিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। পাকিস্তানের এই উপজাতি মিলিশিয়া ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যকার কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে। ১৯৪৮ সালে দেশ দু’টি যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজি হয়। এর মাধ্যমে সাবেক প্রিন্সলি স্টেট জম্মু ও কাশ্মির দুই ভাগ হয়ে এক অংশ ভারত ও অপর অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যায়। কার্যকর করা হয় বিভাজন রেখা ‘লাইন অব কন্ট্রোল’। ১৯৪৭ সালে সূচিত এই দ্বন্দ্বসূত্রে দেশ দুটির মধ্যে তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ১৯৮৯ সালে কাশ্মিরে সূচিত হয় সশস্ত্র বিদ্রোহ তথা স্বাধীন কাশ্মির গড়ার সশস্ত্র সংগ্রাম।

কাশ্মিরিদের কাছে এটি ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’, অপর দিকে ভারতীয়দের কাছে তা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’। এর ফলে ভারতের দখলে থাকা কাশ্মিরে পরবর্তী তিন দশকে কমপক্ষে ৭০ হাজার লোক নিহত হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে হাজার হাজার যুবককে গুম করা হয়, যাদের লাশ জমা হচ্ছে অনেক জানা-অজানা গণকবরে। এর আগে ১৯৪৭ সালে ডোগরা মহারাজার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন মিলিশিয়া এবং শিখ ও হিন্দু উগ্রপন্থীদের হাতে গণহত্যার শিকার হয়েছিল জম্মু-কাশ্মিরের বহু মুসলমান। বাস্তুচ্যুত হয় লাখ লাখ মুসলমান।

ঐতিহাসিক রেকর্ড মতে, ১৯৪৭ সালে জওয়াহেরলাল নেহরু পাকিস্তানি নেতাদের কাছে পাঠানো তারবার্তায় বারবার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে বলেন, ডোগরা রাজার অনুরোধে জম্মু-কাশ্মিরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই জম্মু-কাশ্মিরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তখন সেখানে জনগণ ওই গণভোটের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, জম্মু-কাশ্মির স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, না ভারত বা পাকিস্তানের সাথে থাকবে।

কিন্তু ভারত আজ পর্যন্ত নানা অজুহাতে কাশ্মিরে গণভোট দেয়ার সে প্রতিশ্রুতি পালন করেনি। বরং অব্যাহতভাবে কাশ্মিরকে গিলে খাওয়ার নানা পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদাসম্পর্কিত সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা বাতিল করে এর ‘রাজ্য’ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। একে পরিণত করা হয়েছে ‘কেন্দ্রশাসিত একটি অঞ্চলে’। এখন ভারত বলছে, জম্মু-কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনটি বলাই স্বাভাবিক- কারণ, ভারতীয় প্রতিটি শাসক আসলে মহারাজা হরি সিংয়ের সাক্ষাৎ ভাবশিষ্য।

ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণে স্বীকৃত সত্য হচ্ছে- জম্মুর মানবিক বিয়োগান্ত ঘটনা হিসেবে খ্যাত আলোচ্য গণহত্যার সাথে ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ছিল মহারাজা হরি সিংয়ের। তার পরিকল্পনাতেই আরএসএস এবং হিন্দু ও শিখ দাঙ্গাবাজরা জম্মুর উধামপুর, চেন্নাই, রামনগর, রিয়াসি, ভদ্রেওয়াহ, চাম্ব, দেব বাটালা, মনেশ্বর, আখনুর, কাঠুয়া, তালাব খাতিকান, যোগি গেট ও অন্যান্য এলাকায় ওই গণহত্যা চালায়। ডোগরা সেনাবাহিনী, পুলিশ, বেসামরিক কর্মকর্তা ও সমগ্র প্রশাসন এতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। তাই এরা ইতিহাসের ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে বিবেচিত বিবেকবান মানুষের কাছে। ইতিহাস তাদের ও তাদের উত্তরসূরিদের কখনোই ক্ষমা করবে না।



আরো সংবাদ