২৭ নভেম্বর ২০২০

অস্ত্র নিষেধাজ্ঞামুক্ত ইরান

-

গত ১৮ অক্টোবর ছিল ইরানের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। এ দিন ইরানের ওপর থেকে জাতিসঙ্ঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটেছে। ২০১৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ছয়টি বিশ্বশক্তির সাথে ইরানের যে পরমাণু সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তাতে পাঁচ বছরের জন্য ইরানের অস্ত্র আমদানি ও রফতানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। চুক্তির শর্ত পুরোপুরি পালন করে ইরান বিশ্বশক্তিগুলোর আস্থা অর্জন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও ওই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়াতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো রাজি হয়নি। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই ইরানের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক মাসে ইরানবিরোধী এই দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নবায়নের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটিতে ১৫টি দেশের মধ্যে একটি বাদে আর কোনো দেশই এই মার্কিন প্রস্তাব সমর্থন করেনি। ভোটে হেরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র স্ন্যাপব্যাক ম্যাকানিজম চালুর মাধ্যমে ইরানবিরোধী নিষেধাজ্ঞা বলবত করার চেষ্টা চালায়। এই মেকানিজম হলো এমন একটি ব্যবস্থা যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো যাবে। কিন্তু সেখানেও যুক্তরাষ্ট্র সফল হতে পারেনি। এর কারণ, ছয় জাতির পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরকার আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল। এ জন্য মার্কিন সরকার এ বিষয়ে তৎপরতা চালানোর অধিকার হারায়। আমাদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা এত বড় পরাজয়ের মুখে আর পড়েনি। ইরান বলেছে, নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার দিনটি ‘বিশ্ব সমাজের’ জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক সমাজ ইরানের পরমাণু সমঝোতা এবং জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব রক্ষা করেছে। এই ঘটনা সত্যি শুধু ইরানের জন্য নয়, বিশ্ব সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র গায়ের জোরে বিশ্বের বহু দেশকে দাবিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিষয় ব্যবহার করে আসছে। দেশটির আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে পড়ে অনেক দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে এবং এখনো পড়ছে। কিউবা, রাশিয়া, চীন, ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া, ইরাক, ইরানসহ অনেক দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার। ইরান সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। কারণ ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দেশটির বিরুদ্ধে একের পর এক লাগাতার অবরোধ দিয়ে রেখেছে আমেরিকা।

বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে চায় এমন দেশগুলোকে ঘাড় ধরে বসিয়ে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি মার্কিন ডলারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ডলার অতিরিক্ত শক্তিশালী একটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা হওয়ায় বিশ্বের প্রায় সব দেশ আন্তর্জাতিক লেনদেনে এই মুদ্রার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আর ডলারের নিয়ন্ত্রক যুক্তরাষ্ট্র। তাই কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে সেই দেশটি ডলারে লেনদেন করতে পারে না। এর ফলে দেশটির পক্ষে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয় না। সম্প্রতি ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউরো, পাউন্ড ইত্যাদি জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কোনোটিই ডলারের সমকক্ষ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এই সুযোগটিই নেয় আমেরিকা। এমনকি করোনা মহামারীর মতো ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এতটুকু শিথিল করেনি দেশটি।

এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এমনকি আমেরিকাতেও ট্রাম্প প্রশাসনের বেআইনি ও একতরফা এসব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোট ব্রিক্স অনেক আগেই বিবৃতি দিয়ে বলেছিল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় বিশ্বের সব দেশের উচিত ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়া।

ইরান সর্বোচ্চ কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও টিকে থাকতে শুধু নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে। তার পেছনে মূল কারণ সম্ভবত তাদের বিপ্লবের শক্তি এবং নেতৃত্বের সততা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সবরকম প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে এবং নিজের একটি শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এ অবস্থায় ইরানের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া দেশটির জন্য বিরাট বিজয় নিঃসন্দেহে। কারণ তারা প্রমাণ করেছে, সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে মহাশক্তিধর না হয়েও বিজয় অর্জন করা সম্ভব। এখন থেকে ইরান কোনো বাধা ছাড়াই অস্ত্র আমদানি ও রফতানি করতে পারবে এবং সেই সাথে দেশটির ২৩ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আন্তর্জাতিক সফরের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল। এটা আমেরিকার জন্য একটি শক্ত চপেটাঘাত; তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা। কিন্তু ক্ষমতা এমন এক জিনিস যা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নীতি-নৈতিকতা, আইন-কানুন, চক্ষুলজ্জা সবই জলাঞ্জলি দিতেও পিছপা হয় না ক্ষমতামদমত্ত মানুষ বা দেশ। আমেরিকার জন্যও এটি সত্য যে জন্য দেশটি লজ্জায় চুপ করে যাওয়ার বদলে বরং এখনো তার ‘মাস্তানি’ প্রদর্শন করেই যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যেসব দেশ বা ব্যক্তি এখন থেকে ইরানের সাথে অস্ত্র কেনাবেচা করবে সেসব দেশ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এদিকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির হাতামি বলেছেন, যেসব দেশ বহিঃশক্তির আগ্রাসন থেকে আত্মরক্ষা করতে ইচ্ছুক সেসব দেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি করবে তেহরান। তিনি আরো বলেন, আমেরিকার অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার দেশগুলো চাইলে ইরান তাদের কাছে অস্ত্র রফতানি করবে। এরই মধ্যে বহু দেশ ইরানি অস্ত্র কেনার জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং তারা কিছু দেশের সাথে আলাপ-আলোচনাও করেছেন বলে জানান হাতামি। তিনি বলেন, অস্ত্র বিক্রি এবং সুনির্দিষ্ট কিছু অস্ত্র কেনার সব প্রস্তুতি তারা সম্পন্ন করেছে। হাতামি যেসব কথা বলেছেন তাতে আমেরিকার প্রতি চ্যালেঞ্জটা কিন্তু মোটেই অস্পষ্ট বা প্রচ্ছন্ন নয়। মধ্যপ্রাচ্যে মুক্তিকামী দেশগুলোর মধ্যে এক নম্বরে থাকবে ফিলিস্তিন, সেটা বলা বাহুল্য। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনে ইরানের সামরিক উপস্থিতি কোনো গোপন বিষয় নয়। চ্যালেঞ্জটা এখন আরো বড় আকারে হবে, তাতে সন্দেহ করার কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অস্ত্র রফতানির বিরুদ্ধে যা-ই করতে যাবে সেটিই অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এর পেছনে আর জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন জড়িয়ে থাকবে না।

অস্ত্র শিল্পে ইরান বড় সাফল্য অর্জন করেছে এবং অন্যতম প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ইরান তার প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্রের শতকরা ৯০ ভাগ দেশেই উৎপাদন করেন থাকে। ইরানি সেনাবাহিনীর নৌ ইউনিটের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল হোসেইন খানজাদি বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনী শক্তি ও সামর্থ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অন্য কারো কাছ থেকে অস্ত্র কেনার আর প্রয়োজন নেই। খানজাদি আরো বলেন, আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে, নিষেধাজ্ঞা থাকা বা না থাকাটা আমাদের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। কারণ আমরা গোলাবারুদ, টর্পেডো ও অত্যাধুনিক নৌযানসহ সব কিছু নিজেরাই তৈরি করেছি।’ ইরানের এসব বক্তব্য যে নিছক কথার কথা নয় তা স্বীকার করেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

তবে সামনে ইরানের জন্য আরো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে ট্রাম্পের দিক থেকে, যদি তিনি আগামী ৩ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার জয়ী হন। ট্রাম্পের মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ ব্রায়েন দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের ইরান নীতি কেমন হবে সেটি স্পষ্ট করেছেন। কোনো রাখঢাক না করেই তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হলে ইরানের বিরুদ্ধে এত বেশি কঠোর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে যাতে তেহরান শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি উপড়ে ফেলবে। ও’ ব্রায়েন বলেন, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে সীমিত পরিসরে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে হয়তো আলোচনা হতে পারে।

এসব কথাবার্তা থেকে ইরান বিষয়ে ওয়াশিংটনের মূল টার্গেট হওয়াটা স্পষ্ট হয়ে যায়। তারা চান, শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি থেকে ইরানকে পুরোপুরি বিরত রাখতে, যাতে দেশটি শিল্প, চিকিৎসা, কৃষিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে না পারে। অর্থাৎ ইরানকে পঙ্গু করে রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট।

যে জাতি ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও বৃহত্তর বিপ্লব ঘটিয়ে বিশ্বের বুকে নিজেদের স্বাধীনচেতা অস্তিত্বের প্রবল ঘোষণা ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই ইরানিরা ট্রাম্পের কূটচালে স্বেচ্ছাপঙ্গুত্ব বরণ করে নেবে এমন ভাবনাই আসলে মানসিক পঙ্গুত্বের পরিচায়ক বললে খুব একটা ভুল হবে না মনে হয়।


আরো সংবাদ