০১ ডিসেম্বর ২০২০

ধর্ষকের পরিণতি

ধর্ষকের পরিণতি - ছবি : নয়া দিগন্ত

দেশে যেন ধর্ষণের কালপর্ব চলছে। যৌনবিকারে আক্রান্ত কিছু মানুষের বিকৃত যৌনলালসার কাছে রেহাই পাচ্ছেন না প্রতিবন্ধী থেকে শিশুকন্যা, বাদ যাচ্ছেন না কোনো বয়সী নারী। সমকালে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- কোনো নারীর অসম্মতিতে জোর করে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনই ধর্ষণ। যে নরপশু এমন কাজ করে তাকে বলা হয় ধর্ষক। যদিও বাহ্যিকভাবে ধর্ষণের ভয়াবহতা যেমন প্রকাশ পায় না, ভুক্তভোগী নারী বা তার পরিবার বিষয়টি অপমানকর মনে করে গোপন রাখাই শ্রেয় মনে করে। যারা ধর্ষণে জড়াচ্ছে; তাদের অনেকে শাসকদলের নেতাকর্মী। তারা মনে করছে, ক্ষমতার ছায়া রয়েছে তাদের মাথায়, কে কী করবে? তাদের হৃদয় আজ পাশবিকতায় আচ্ছন্ন। ফলে বিকৃত যৌনতাকে ক্ষমতার বিকার ছাড়া আর কি-ই বা বলা যায়?

সেই প্রাচীনকাল থেকে হাল-আমলেও ধর্ষণ ক্ষমতারই বিকার। যদিও ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব বোঝার উপায় কী হবে, এ প্রশ্নে বিভক্ত গবেষকরা। সমাজতাত্ত্বিক, মনোবিদরা ধর্ষণকে যৌনতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে একে নিছক ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের গবেষক র‌্যান্ডি থর্নহিল ও ক্রেগ পামারের মতে, ‘ধর্ষণের মূল উদ্দেশ্য যৌনসুখ’। সাইকোলজি অব ভায়োলেন্স জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শেরি হামবির মতে, ‘ধর্ষণ যৌনসুখের উদ্দেশ্যে নয়, বরং অপরপক্ষকে দমিয়ে রাখতে ক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে করা হয়।’

সুদূর অতীতে রাজা-বাদশাহরা নিজেদের মনোরঞ্জনে নারীদের হেরেমে বন্দী করে যৌনখায়েশ মেটাতেন। ওই সব হতভাগী রঙমহলে ছিলেন শুধুই যৌনদাসী। এমন নয় যে, কেউ স্বেচ্ছায় রঙমহলে বাইজি হয়েছেন; সাধ করে অপমানকর পেশা বেছে নিয়েছেন। আসলে তারা বাধ্য হয়ে গ্লানিকর বাইজির জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। ভাগ্যবিড়ম্বিত ওই সব নারীর কান্না চার দেয়ালের মাঝে চাপা থাকত। নিকট অতীতে ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে ইংরেজরা ক্ষমতার দাপটে দেশীয় নারীদের ইজ্জত লুটেছে। নীল দর্পণ গ্রন্থে সেই বর্বরতা লিপিবদ্ধ আছে। আর ইংরেজদের মদদে তাঁবেদার জমিদারশ্রেণীর লাম্পট্য নিয়ে লেখা হয়েছে বহু গল্প-উপন্যাস। জমিদার দর্পণ বইয়ে লাম্পট্যের সে কাহিনী আঁকা আছে। সাদা চামড়ার দালালরা নিজেদের যৌনলালসা পূরণে জমিদারি এলাকায় প্রজার সুন্দরী বউ-মেয়ে কিভাবে তুলে নিয়ে গেছে, বীভৎস ও হৃদয়বিদারক সেসব ঘটনার রেশ এখনো গ্রামীণসমাজে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। যা শুনলে গা শিউরে ওঠে।

তবে বিশ্ব সভ্যতার চার হাজার বছরের ঘটনাপ্রবাহে ক্ষমতার যৌনবিকারের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে স্বৈরশাসকের প্রতীক ফেরাউনের কালপর্বে প্রাচীন মিসরে। নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বনি ইসরাইলের ওপর নির্যাতনের যে স্টিমরোলার চালিয়েছে অভিশপ্ত ফেরাউন; মানবসভ্যতায় এর আর নজির দ্বিতীয়টি নেই। বনি ইসরাইলের পুত্রসন্তানদের হত্যা করে কন্যসন্তানদের জীবিত রাখত ফেরাউন।

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, নিজের তখতে তাউস উল্টে যাওয়ার ভয়ে, ফেরাউনের মানবতাবিরোধী অপরাধ পৌঁছে পর্বতশিখরে। ফারাওদের অর্থনীতি ছিল ‘দাশ অর্থনীতি’। দাশদের শ্রম-ঘামে গড়ে উঠেছিল। অমানবিক সে অর্থব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ঘৃণ্য পথ অবলম্বন করে ফেরাউন। বনি ইসরাইলিদের পরিণত করা হয় দাসে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ফেরাউন বনি-ইসরাইলের পুত্রসন্তানদের হত্যা করে কন্যসন্তানদের জীবিত রাখত? একটি ব্যাখ্যা এমনÑ বনি ইসরাইলের কন্যসন্তান জীবিত রাখার মূলে ছিল বড় হয়ে তারা দাসীর প্রয়োজনীয়তা মেটাবে। পূর্বকালে মনিবের সব ধরনের মনোরঞ্জনে বাধ্য করা হতো দাসীদের। বলে রাখা ভালো, এর মধ্যে যৌনসুখ ছিল মুখ্য। ভদ্র ভাষায় যাকে বলা হয় ‘যৌনসেবা’ বা যৌনবিনোদন।

বাস্তবে সব কালেই ধর্ষণ একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। তাই ধর্ষণ দমনে কাঠগড়ায় স্রেফ ধর্ষককে একা ওঠালে হবে না! বুঝতে ভুল করলে চলবে না যে, এর পেছনের হাত অনেক লম্বা এবং অদৃশ্য। এখন পদ্ধতিগত অপরাধের রূপ পাল্টে গেছে। ধর্ষণের মূল উৎপাটন করতে হলে পদ্ধতিগত স্বরূপটা জানা জরুরি। শুধু কঠোর আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা দুরাশা বৈ কিছু নয়। পদ্ধতিগত অপরাধের একটা উদাহরণ হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের নামে এমন কিছু বিপণন, যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেখা যায়, অনেক বিজ্ঞাপনে বাধ্যতামূলক থাকবে লাস্যময়ী এক নারী। গাড়ি প্রদর্শনীতেও শরীরের সব ভাঁজ প্রকাশ করে দাঁড়ানো থাকে স্বল্পবসনা নারী। স্টেডিয়ামে খেলার ফাঁকে ফাঁকে নারীকেই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিয়ারআপ করতে হবে, নতুবা খেলাটা ঠিক জমে না। বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনচিত্রে নারীকে যৌন আবেদনময়ী করে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু কেন? পুরো প্রক্রিয়ায় পুরুষকে তো ততটা যৌন নিশানা করা হয় না! কৌতূহলোদ্দীপক হলো, যাদের হাতে বিনোদন শিল্পের নিয়ন্ত্রণ, তাদের অনেকে ‘নারী স্বাধীনতা’ নিয়ে হয়রান। নারীর অধিকার বলে মুখে ফেনা তোলেন। মায়াকান্না করেন! যেন এ প্রদর্শনীর পণ্য হওয়া ছাড়া নারী স্বাধীনতার ভিন্ন মানে থাকতে নেই! ‘নারী স্বাধীনতা’ আর ‘নারীর শরীরের ভোগবাদী ব্যবচ্ছেদ’ কিভাবে সমান্তরালে হাত ধরাধরি করে চলতে পারে- আমাদের স্বল্প বুদ্ধিতে বিষয়টি বোধগম্য নয়। শিল্পের নামে যে অখাদ্য-কুখাদ্য গিলিয়ে পুরুষদের যৌন বিষয়ে কল্পনাপ্রবণ করে বিকৃত আকাক্সক্ষা জাগায় এবং বিশাল ভূমিকা রাখে, দিব্যি সে কথা চেপে যাওয়া হয়।

সমাজে নানা স্তরে বিশ্বাস আর আস্থার ভিত নড়িয়ে দেয়া এত প্রতারণা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, হত্যার ঘটনা কেন? গবেষণা বলে, পর্নো থেকে আমরা শিখি, নারী শরীরের সাথে যা ইচ্ছা করা যায়! শিখি পুরুষের প্রাধান্য। শিখি যৌন নির্যাতন কিভাবে করতে হয়। শিখি যৌনবিকৃতি। মাত্র একটা ক্লিক! ব্যাস কেল্লাফতে। পুরুষ শেখে, নারী ভোগের সামগ্রী মাত্র। ঘরে ঘরে কখন যে মানবিকবোধসম্পন্ন কিশোর ধীরে ধীরে ভোগবাদী পুরুষ হয়ে উঠছে; কেউ তা ঠাহরই করতে পারি না। নারীর শরীরকে শুধু যৌন বিষয়বস্তু হিসেবে যারা উপস্থাপন করেন, তারা আসলে প্রত্যেকে ধর্ষকের মদদদাতা।

নারী হই বা পুরুষ, সমাজিক দায় রয়েছে সবার। সে দায় কে কতটুকু অনুভব করে, নিজের করণীয় নিয়ে ভাবে? দেশে আইনের শাসন দুর্বল। চার দিকে যৌনতার অবাধ সুড়সুড়ি। দিন যত যাচ্ছে নারীকে সস্তা ভোগ্যপণ্যের জায়গায় দ্রুত ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তাই ধর্ষকের একার ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে নিজেকে কিছুটা শান্ত রাখা যাবে, মনকে প্রবোধ দেয়া যাবে, আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারব বটে। তবে নিষ্ঠুর পদ্ধতি পেছনে মুচকি হাসবে। কিছু কান্নার শব্দ প্রতিদিন পৃথিবীকে অভিশাপ দিয়ে যাবে!

বাংলাদেশে নারীরা যখন মেধা, মনন ও সৃজনশীলতায়

এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ক্রমবর্ধমান হারে ধর্ষণ-সহিংসতা তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষণবিরোধী তীব্র গণপ্রতিবাদের চাপে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। এতে শাসকরা এমনভাবে সাড়া দিয়েছে; যেন তারা জনগণের সব কথাই শোনেন-রাখেন। কথা হচ্ছে- মৃত্যুদণ্ডের বিধান করলেই যে ধর্ষণ বন্ধ হবে, এটা কি হলফ করে কেউ বলতে পারবেন? এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়তো কিছু সময়ের জন্য জনমনে স্বস্তি দিতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই লোকরঞ্জনবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভ স্তিমিত হলেও ধর্ষণের প্রবণতার যখন কোনো পরিবর্তন ঘটবে না, তখন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। মৃত্যুদণ্ড যদি ধর্ষণ বন্ধ করতে পারত, তাহলে ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দুই দশকে ধর্ষণ করে হত্যার যে অজস্র ঘটনা ঘটেছে, তা ক্রমান্বয়ে কমে আসতো। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ করে হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তাই ক্ষণস্থায়ী সমাধানের দিকে না গিয়ে সত্যিকার অর্থেই সমস্যার কার্যকর সমাধানের দিকে রাষ্ট্রের মনোযোগ দেয়া কর্তব্য। রাষ্ট্রের উচিত ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে গণপ্রতিরোধ জেগেছে, তাকে পুঁজি করে ধর্ষণ দমনে আর ধর্ষকের বিচারে একটি অর্থপূর্ণ আর কার্যকর স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করা। ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করতে একটি আন্তরিক এবং দায়িত্ব¡শীল প্রয়াস রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে পরিষ্কার করা হলে সরকারি নীতির প্রতি নাগরিকদের আস্থা দৃঢ় হবে। আইন করে অপরাধ দমন করা যায় না, কখনো যায়নি। এ জন্য সংস্কৃতি বদলাতে হবে, বৈষম্য দূর করতে হবে। একটা মানবিক, নিরাপদ সমাজ গঠন করতে হবে।

অন্য দিকে ধর্ষকদের মনে রাখা উচিত, কোনোকালেই ধর্ষকের পরিণতি ভালো হয়নি। একালে যেমন আইনের প্রয়োগ হোক না হোক ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, কেউ পাকেচক্রে ধরা খেলে আখেরে তার বিপর্যয় অনিবার্য। কারণ, ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- কাউকে সময়ে ব্যবহার করা; বোঝা হলে ছুড়ে ফেলা। আর ইতিহাসের দিকে তাকালে ধর্ষকের পরিণতি বড়ই মর্মান্তিক। পদ্ধতিগত ধর্ষণের কারিগর ফেরাউনের পরিণতি দলবলসহ সাগরে সলিল সমাধি। অতএব সাধু সাবধান!


আরো সংবাদ