২৭ অক্টোবর ২০২০

একটি বড় জাতীয় সমস্যা

-

আয়তন অনুপাতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা খুবই বেশি। অস্ট্রেলিয়া আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে ৬৫ গুণ বড়। লোকসংখ্যা আমাদের আট ভাগের এক ভাগ মাত্র। আমাদের দেশটা একটা মৌচাকের মতো। এখানে যেন মানুষের ওপরে বসে আছে মানুষ।

বিশ্বের সর্বোচ্চ জনঘনত্বের এই দেশে সময় এবং জন্ম কোনোটাই থেমে নেই। দেশে নেই কার্যকর জনসংখ্যা নীতি ও জনসচেতনতা অভিযান; নেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ, লোকবল ও অবকাঠামো। এত ‘নেই’ এর মধ্যে স্থবির হয়ে আছে জনসংখ্যার ভার সহনীয় করার সরকারি কর্মসূচি। বলা হয় জনসংখ্যাই নাকি এক নম্বর জাতীয় সমস্যা। কিশোরী বিয়ে এবং কিশোরীদের মা হওয়াই অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। চিন্তার বিষয়, এখনো বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ নারীর বিয়ে হয় কিশোরী বয়সে। ওইটুকু বয়সে যে মেয়েটির দৌড়ঝাঁপ করে খেলার কথা, বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সেই মেয়েটিকে নিতে হচ্ছে সংসার ও প্রজননের মতো গুরুদায়িত্ব। এসব মেয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়, বড় অংশেরই স্বাস্থ্য হয়ে পড়ে নাজুক, জীবনের স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় তারা। এর কারণ সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রচারণা ও সুযোগের বাইরে রয়ে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ। নিরক্ষর ও হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে এর কোনো আবেদনই নেই। অথচ দেশে গণমাধ্যমের বিপুল বিস্তার হয়েছে। রেডিও-টেলিভিশন, মুদ্রণ মাধ্যম ও বিল বোর্ডের মাধ্যমেই সাধারণ জনসংখ্যা সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রচার চালানো হয়। কিন্তু এসব প্রচারণা এতই অকার্যকর ও অপ্রতুল যে, তা অজস্র বিজ্ঞাপন ও বিল বোর্ডের ভিড়ে হারিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কথাটি সত্য। বিশ্বের কয়েকটি ধনী দেশে জন্মহার কমে যাওয়ায় জনসম্পদের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় জনসম্পদের প্রাচুর্য, সুবিধার বদলে অসুবিধাই বহু ক্ষেত্রে তৈরি করছে বেশি। দেশের আয়তন যেহেতু বাড়ছে না, সেহেতু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতেই হবে। জনসংখ্যা কমানো বা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রাকৃতিক হোক বা পরিবার পরিকল্পনা হোক- একটি ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো দেশের জনসংখ্যা সে দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের চেয়ে বেশি হলে যে অবস্থায় সৃষ্টি হয় তাকেই ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ বলে। জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বলা হয়। জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে আর্থ ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

পাশ্চাত্য দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একেবারে কম। তাদের থাকার মতো আবাসস্থল আছে, অর্থনৈতিক উন্নতির কমতি নেই; কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে, তার পরও পপুলেশন গ্রোথ তারা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। তাদের সম্পদ আছে অনেক, বিপুল ভূমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু সেই তুলনায় তাদের জনসংখ্যা নেই। তাদের জনসংখ্যা বাড়ালে অসুবিধা নেই। তার পরও অনেক উন্নত দেশ তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনছে। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে তথা গোটা বিশ্বের মধ্যে কাতারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা সম্পদশালী রাষ্ট্র; জনসংখ্যাও কম। সুতরাং জনসংখ্যা বাড়লে অসুবিধা নেই এসব দেশে।

আমাদের দেশে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় আদমশুমারি হচ্ছে না বহুদিন ধরে। তাই কোথায় সমস্যা তা খুঁজে বের করা অত্যন্ত জটিল। আমাদের জনসংখ্যা বেশি, আয় কম; অর্থাৎ সম্পদ সীমিত; আমাদের ভূমিও কম। তাই বাস্তব পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হবে। সেটা হচ্ছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ (৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ রাত ২টা) মোট জনসংখ্যার আট কোটি ২৪ লাখ পুরুষ এবং নারী আট কোটি ২২ লাখ। গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর তিন মাস। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৭২ বছর। এর মধ্যে পুরুষের আয়ু ৭০ দশমিক আট বছর আর নারীর আয়ু হয়েছে ৭৩ দশমিক আট বছর (তথ্য সূত্র : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরো হালনাগাদ)।

বাংলাদেশের আয়তন সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। এর সাথে ছিটমহল ১৬০০ বর্গকিলোমিটার যোগ করলে আয়তন দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ৪৯ হাজার ২১০ বর্গকিলোমিটার। তবে সরকারিভাবে সঠিক আয়তন গেজেট আকারে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি বিধায় তা এখনো এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার বা ৫৬ হাজার ৯৭৭ বর্গমাইল হিসেবে গণনা করা হচ্ছে।

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের একটি ছোট জনপদ। স্বাধীনতার পর মুহুরীর চরসহ কিছু ভূমি আমাদের হাতছাড়া হয়েছে। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের আয়তন অদূর ভবিষ্যতে বাড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রপিষ্ঠে জেগে উঠতে পারে আরেকটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ যার আয়তন প্রায় এক লাখ বর্গকিলোমিটার। নিকট ভবিষ্যতে জেগে ওঠার এই ভূমির প্রতি লোভ রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের। আমরা উন্নতি করি এবং ভালো থাকি- এটি তারা চায় না, তাদের আচরণে তা স্পষ্ট। ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় বাস করা মানুষের সবচেয়ে মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। বায়ুদূষণ, ট্রাফিক জ্যাম, জেন্ডার বৈষম্য, বেকারত্ব, অপুষ্টি, মানসিক প্রতিবন্ধী এসব সমস্যা জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে ঘটে। আরো অসংখ্য সমস্যার উৎপত্তি এখান থেকে শুরু হয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে বেশি। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ কী, তার ব্যাপকতার কারণ, এর ফলে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে। সৃষ্ট সমস্যা কিভাবে লাঘব করা যায়, সে ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করা জরুরি।

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গত কয়েক দশকের চেয়ে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাকে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বললে যথার্থ হবে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি ৫০ লাখ। ১৯৬১ সালে জনসংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি ৮০ লাখ, ১৯৭৪ সালে ৭ কোটি ৬৪ লাখ, ১৯৮১ সালে ছিল ৯ কোটি, ১৯৯১ সালে ১১ কোটি ১৪ লাখ এবং ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৩ লাখ। জনসংখ্যার হার দিন দিন যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটিতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। জনসংখ্যার চলমান এই বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত দরকার।

বিশ্বে ১৫০টি শহরের তালিকায় সবচেয়ে মানসিক চাপের শহর এখন ঢাকা। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ দেশ বাংলাদেশ। ১০ কোটির ওপর জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ দেশ। এ দেশ জনসংখ্যার হিসেবে বিশ্বে অষ্টম বৃহৎ রাষ্ট্র। রাজধানী ঢাকা শহরের আয়তন ১১৮ দশমিক ২৯ বর্গমাইল বা ৩০৬ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার। ঢাকা মহানগর এলাকার জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখ (২০২০)।

জাপানের টোকিও শহরে বাস করে ৯০ লাখ মানুষ (২০১৫)। ঢাকা শহর টোকিও শহরকে ছাড়িয়েছে জনসংখ্যার দিক থেকে। এ মুহূর্তে ঢাকাকে বাঁচাতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানিং সময়ের দাবি। গ্রামমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যর্থ হলে ঢাকায় মানুষের চাপ আরো বাড়বে। বিশ্বের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি সর্বপ্রথম আঠারো শতকের শেষ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম জনসংখ্যা বিস্ফোরণ যখন শিল্প বিপ্লবে প্রধানত ইউরোপ উন্নত। তার পর থেকে বিশ্বের জনসংখ্যার দ্রুততর হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষত ১৯৫০ সাল থেকে দ্রুত বৃদ্ধি (১৮০০ সালের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯০০ : ০.৫ শতাংশ, ১৯৫০-১৯৬০ : ১.৮ শতাংশ, ১৯৬৫ : ২.০ শতাংশ), বিশ্ব জনসংখ্যা যা ১৯৫০ সালে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ছিল, ১৯৭০ সালে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন, ২০ বছরের মধ্যে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন, এটি দ্বিতীয় ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’। এই উচ্চ উর্বরতা হার প্রধানত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসার বিস্তারের কারণে মৃত্যুর হারের বিরুদ্ধে অব্যাহত রয়েছে। প্রথম জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বাণিজ্য ও শিল্পের উন্নয়নে এবং উপনিবেশের জনসংখ্যার প্রবাহের কারণে জনগোষ্ঠীর অবাধ জনসংখ্যা ‘শোষণ’ করতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় জনসংখ্যার বিস্ফোরণটি শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্য, খাদ্য সমস্যা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি করে এবং একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা হয়ে উঠেছে। (তথ্যসূত্র : বিশ্ব জনসংখ্যা পরিষদ ওয়ার্ল্ড ওয়াচ ইনস্টিটিউট, উৎস এনসাইক্লোপেডিয়া মাইপেডিন (Encyclopelia mypedin)।

বাংলাদেশের সতেরো কোটি মানুষের যে বাড়তি চাপ, তার অভিঘাত প্রতিফলিত হচ্ছে অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে বেকার মানুষের সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। চাকরির খোঁজে গেলে চাকরি নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে আসন নেই, রেল বাসে টিকিট নেই, হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, বিদ্যুৎ গ্যাস পানি পৌর কর সব কিছুই অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। মাত্র দুই রুমের বাসা ২০ হাজার টাকা, কমিউনিটি সার্ভিস চার্জ দিন দিন বেড়েই চলছে। রেমিট্যান্স নিয়ে অতি উৎসাহিত হওয়ার কারণ নেই। সেখানে চাকরি হারানোর ভয় আছে। শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রতি মিনিটে জন্ম নিচ্ছে ৯ শিশু। যে দিন থেকে পাঁচটি মৌলিক চাহিদার স্বপ্ন পূরণ হবে- সে দিনই জনসংখ্যার ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় জীবনে দেখা যাবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা শিক্ষা এসবের যখন নিয়মতান্ত্রিক সমাধান হয়ে যাবে- সে দিন থেকে উপলব্ধি করা যাবে, বাংলাদেশ জনসংখ্যা সমস্যা থেকে উত্তরণের পথে হাঁটছে।

আমাদের বসবাসের ভূমি, খাদ্যসমস্যা থেকে উত্তরণ, নিরাপদ চিকিৎসা, পর্যাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থা- জনসংখ্যাকে ইতিবাচক দিকে ধাবিত করবে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বলে মনে হয় না। মানুষকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ে সম্যক ধারণা দেয়া অতীব জরুরি। একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিয়ামক হলো- ১. শিক্ষার অভাব; ২. বাল্যবিয়ে; ৩. বহু বিয়ে; ৪. জলবায়ু; ৫; খাদ্যাভ্যাস; ৬. দারিদ্র্য; ৭. মৃত্যুহার কমে যাওয়া; ৮. চিত্তবিনোদনের অভাব; ৯. জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত ধারণা; ১০ বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তা।

আসুন, জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করি। তা হলেই দেশে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক


আরো সংবাদ