২৯ নভেম্বর ২০২০

নোবেলজয়ী কবি লুইস গ্লুক

নোবেলজয়ী কবি লুইস গ্লুক - ছবি সংগৃহীত

সাহিত্যে যাদের আগ্রহ তারা এরই মধ্যে জেনেছেন, ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আমেরিকান কবি লুইস এলিসাবেথ গ্লুক (Louise Elisabeth Gluck)। গত বৃহস্পতিবার নোবেল কমিটির ঘোষণার পর আমরা খবরটি জেনেছি। কিন্তু অনেক পাঠকের মতোই আমাদেরও এই মহিলা কবির বিন্দু-বিসর্গ জানা ছিল না। জানার জন্য অন্তর্জালের সাহায্য নিই। অনুসন্ধানে যেটুকু জানা গেল, পাঠকদের জন্য সেটুকুই তুলে ধরছি। কবি লুইস এলিসাবেথ গ্লুকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল, নিউ ইয়র্কে। সেখানেই বেড়ে উঠেছেন এবং লেখাপড়া করেছেন। তার পূর্বপুরুষ হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি। তার দাদা হাঙ্গেরি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে মুদি দোকান করেছিলেন। সেখান থেকেই তাদের অভিবাসী জীবনের সূচনা।

কবির জীবন, কর্ম ও প্রকাশনা বিষয়ক যেসব তথ্য প্রাথমিকভাবে জানা দরকার সেটা আগেই বলে নিই। নিউ ইয়র্কের ব্রংক্সভিলিতে সারাহ লরেন্স কলেজ এবং পরে নগরীর কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেন গ্লুক। কর্মজীবনে বেছে নেন শিক্ষকতার কাজ। হার্ভার্ড, ইয়েল ইউনিভার্সিটিসহ অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করেছেন। এখন থাকেন ক্যামব্রিজে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুবার বিয়ে করেছেন। ১৯৬৭ সালে চার্লস হার্টজ জুনিয়রকে প্রথম বিয়ে করেন। সে বিয়ে টেকেনি, ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরে একজন লেখক জন ড্রানোর সাথে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে তার সন্তান নুহের জন্ম হয়। এরও পাঁচ বছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি জনকে বিয়ে করেন।

কবিতার জন্য পুলিৎজারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন কবি লুইস এলিসাবেথ গ্লুক। নোবেল পাবেন এমন জল্পনা নাকি বেশ আগে থেকেই বাতাসে ভাসছিল। ১৯৯৩ সালে পুলিৎজারজয়ী বইটির নাম দ্য ওয়াইল্ড আইরিস (ঞযব ডরষফ ওৎরং-১৯৯২)। ২০১৪ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া তার বই ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট। ২০০৩ সালে তিনি মার্কিন লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের কবিতা বিষয়ক ‘পয়েট লরিয়েট কনসালট্যান্ট’ নির্বাচিত হন। এটি হলো অনেকটা রাজকীয় কবির মতো একটি স্বীকৃতি। এখন রাজা নেই। তাই এটিকে সম্ভবত সরকারি কবি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বলা যেতে পারে। এই দায়িত্বে থাকাকালে কবিতার পঠন-পাঠন এবং চর্চার বিকাশ ঘটানোর দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট কবির ওপর।

২৫ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে প্রথম কাব্য ফার্স্টবর্ন বের হয়। দ্য হাউজ অন মার্শল্যান্ড (১৯৭৫), দ্য গার্ডেন (১৯৭৬), ডিসেন্ডিং ফিগার (১৯৮০), দ্য ট্রায়াম্ফ অব অ্যাকিলিস (১৯৮৫), আরারাত (১৯৯০), মঙ্ক অরেঞ্জ (১৯৯৩), দ্য ফার্স্ট ফোর বুকস অব পয়েমস (১৯৯৫), মিডোল্যান্ডস (১৯৯৭), ভাইটা নোভা (১৯৯৯), দ্য সেভেন এজেস (২০০১), আভেরনো (২০০৬), অ্যা ভিলেজ লাইফ (২০০৯) ইত্যাদি তার প্রকাশিত কাব্য।

কবিতা বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধের বইও লিখেছেন গ্লুক। ১৯৯৪ সালে প্রকাশ পায় প্রুফস অ্যান্ড থিওরিজ : অ্যাসেজ অন পোয়েট্রি। এরপর ২০১৭ সালে বেরিয়েছে আমেরিকান অরিজিনালিটি। এর বাইরে তিনি ১৯৯৩ সালে সম্পাদনা করেন দ্য বেস্ট অ্যামেরিকান পোয়েট্রি ১৯৯৩।

ব্যক্তিগত তথ্য জানার পর আমাদের জানার আগ্রহ তার কবিতা বিষয়ে। কারণ একজন কবিকে জানার মূল সূত্র তার কবিতা। কেমন লিখেন তিনি? কী তার কবিতার চরিত্র? কী তার জীবনদৃষ্টি? কোন নতুন দর্শন তিনি বিশ্বের সামনে উপস্থিত করেছেন? এগুলো না জানলে আসলে কিছুই জানা হয় না। এই কাজটা করতে হয় কবির কবিতা পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু কবিতা পড়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। মন্তব্য করাও সমুচিত মনে করি না। যেটা সম্ভব সেটা হলো অনলাইনে তার কবিতার ওপর বোদ্ধাদের কিছু মন্তব্য একনজরে দেখে নেয়া। চলুন সেই চেষ্টাটুকু করি। প্রথমেই দেখে নিই, কবি লুইস এলিসাবেথ গ্লুককে পুরস্কৃত করার কী কারণ নোবেল কমিটি দেখিয়েছে। এই পুরস্কারটি কেন সংশ্লিষ্ট লেখককে দেয়া হচ্ছে? কারণটি সব সময়ই বলা হয় সাইটেশনে বা প্রশংসাপত্রে। গ্লুকের প্রশংসা করে কমিটি লিখেছে, “for her unmistakable poetic voice that with austere beauty makes individual existence universal.” মানে হলো, কবির অসামান্য কাব্যভাষা ও তার নিরাভরণ সৌন্দর্য ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্বকে সর্বজনীনতায় উত্তীর্ণ করেছে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান এন্ড্রু ওলসন (অহফৎবি ঙষংংড়হ) আরো বলেন, বিশ্ব যখন আগ্রাসী লোকরঞ্জনবাদের বিষাক্ত থাবা ও বীভৎস চিৎকারের মধ্যে খাবি খাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে গ্লুকের আন্তরিক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর যা আমাদের যুদ্ধ পরিহারের এবং নিজেদের এবং অন্যদের অন্তরের বাণী শোনার আহ্বান জানায়, সেটি জরুরি এবং সময়োচিত।

একজন কবির কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? কবিতায় বিশ্বজনীন চেতনার প্রতিফলন ঘটানো একজন কবির সারা জীবনের আরাধ্য। ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা, আবেগ, অনুভূতির সুতীব্র জারকে নিজ ভূখ- বা স্বদেশের মানুষের আবেগ, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, জীবনবোধ, তাদের দর্শন, ইতিহাস, পুরান সব কিছুকে আত্মস্থ করে বিশ্বমানবের অন্তরের নিবিড় আকুতি কবিতায় ছুঁতে পারার একনিষ্ঠ চেষ্টা সচেতন বা অবচেতনে সব কবির মনেই সক্রিয় থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। গ্লুক সেই কাজটি করতে পেরেছেন বলে মনে করেছে নোবেল কমিটি। কিন্তু নোবেল কমিটির এক লাইনের এই মন্তব্যে মন ভরার কোনো কারণ নেই। আমরা আরো কিছু খোঁজ-খবর করতেই পারি। জানার চেষ্টা করতে পারি, তার কবিতা নিয়ে অন্য আর কে কী বলেছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র পেলাম। সেটি ব্রিটানিকা ডটকম।

ব্রিটানিকা ডটকম বলছে, গ্লুক হলেন সেই কবি যিনি ভয়ঙ্কর, কঠিন ও বেদনার অনুষঙ্গগুলোর মোকাবেলা করতে চান। আর এক্ষেত্রে তার হাতিয়ার কেবল কবিতা। সেই কবিতার চরিত্র হলো অন্তর্দৃষ্টির স্ফুরণ ও ঝাঁঝালো ভাবোচ্ছ্বাসসমৃদ্ধ। তার প্রথম কাব্য ফার্স্টবর্নে কবি উত্তম পুরুষের নানা বিচিত্র ভঙ্গিমায় কথা বলেন। সেসব কথা অর্থাৎ কবিতার পুরোটাই ছিল বিরাগ, অসন্তোষ বা ক্রোধের অভিব্যক্তিতে ভরপুর। এসব কবিতার সুর বা মনোভঙ্গি অনেক সমালোচকের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়েছে। তবে তার চমৎকার নিয়ন্ত্রিত ভাষা এবং ছন্দ ও মাত্রার উদ্ভাবনী ব্যবহার দেখে অনেকেই আনন্দিত হন। পরের কাব্যগ্রন্থ হাউস অন মার্শল্যান্ডেও কবির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একইরকম কঠোর ও নৈরাশ্যব্যঞ্জক তবু এতে কবিকণ্ঠে অধিকতর মুন্সিয়ানার প্রতিফলন ঘটে। এর পরের বইগুলোতে গ্লুক পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটান তার কবিতায়। উদাহরণ হিসেবে গ্রেটেল এবং জোয়ান অব আর্কের নাম এসেছে। গ্রেটেল পৌরাণিক কাহিনীর অধিকারসচেতন এক নারীবাদী চরিত্র। আর জোয়ান অব আর্ক হলেন একসময় ফ্রান্সের রক্ষাকর্ত্রী এক ঐতিহাসিক তরুণী, যিনি সম্পূর্ণ অসম এক যুদ্ধে ফরাসিদের অবিশ্বাস্য বিজয় এনে দিয়েছিলেন। অনেকে তাকে জাদুকরি বলেছে, কেউ বলেছে ডাইনি। কিন্তু ইতিহাস তাকে যথার্থ বীরের মর্যাদা দেয়।

একেবারে তরুণ বয়সে প্রথম কাব্যে একটু ঝাঁকুনি দেয়ার লোভ বোধ হয় সব দেশের সব তরুণ কবিরই থাকে। আমাদের দেশের তরুণ কবিরাও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত এমন নয়। তাই গ্লুকের ক্ষেত্রেও এটা দোষের মনে করি না। বরং আশার কথা যে, ২৫ বছর বয়সে প্রকাশিত ওই প্রথম বইতেও গ্লুকের কাব্যভাষা ছিল চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং তিনি ছন্দ ও মাত্রার ব্যবহারে কল্পনাশক্তির প্রকাশ ঘটাতে পেরেছিলেন।
লুইসকে নিয়ে ব্রিটানিকা ডটকমের অতিশয় খর্বকায় নিবন্ধটি লিখেছেন এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সম্পাদকম-লী। তাদের মূল্যায়নের যথার্থতা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সে জন্যই তাদের মূল্যায়ন নিবিষ্ট চিত্তে অনুসরণ করা যেতেই পারে। নিবন্ধে বলা হচ্ছে, গ্লুক তার পরের বইগুলোতে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের যে অভিযোজনা করেছেন তা ক্রমেই অধিকতর কল্পনাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে; উদাহরণ, দ্য সিক চাইল্ড কাব্য। কবিতার সঙ্কলন ডিসেন্ডিং ফিগার থেকে তার কবিতায় এমন একজন মায়ের কণ্ঠস্বর ফুটে উঠতে শুরু করেছে যে মা একটি মিউজিয়ামের উজ্জ্বল গ্যালারিতে টাঙ্গানো ছবি দেখছেন। কবিতায় ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী কাব্যগ্রন্থ দ্য ট্রায়াম্ফ অব অ্যাকিলিসের কবিতাগুলোতে বিশুদ্ধ পুরাণ, রূপকথা এবং বাইবেলের মতো অনির্বচনীয় বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জায়গা করে নিয়েছে আরারাত কাব্যেও। ওই কাব্যে পরিবার ও নিজেকে নিয়ে কবির যে অনুসন্ধানী নিরীক্ষা তাতে তিনি পরম সততার পরিচয় দিয়েছেন এবং এই সততা সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছে। বলা হয়েছে, আত্মানুসন্ধানে তিনি যে সততার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন সেটাই প্রশংসিত হয়েছে। অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি কোথায় পৌঁছলেন, কী উদঘাটন করলেন বা সেই আবিষ্কার তার কাব্যবোধে কোন গূঢ়ার্থ যোগ করল সেসব বিষয়ে এক বর্ণও খরচ করেননি সমালোচকরা। আরো লক্ষ্য করার মতো যে, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সম্পাদকরা গ্লুকের কাব্যে কোনো নতুন অন্তর্দৃষ্টি, কোনো বিশেষ জীবনদর্শন বা জীবনের গভীরতম উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে কি না সে প্রসঙ্গে যাননি। একটি লাইনও যোগ করেননি এ বিষয়ে। কেন? ব্যাপারটি ভাববার মতো।

যাই হোক, কবির দর্শন জানতে এরপর আমাদের অপেক্ষা কবির কবিতা পড়ার। কবিতা থেকেই আরো স্পষ্ট করে কবিকে বোঝা যাবে বলে মনে করি। আগ্রহী পাঠক গুগলে সার্চ দিলে এই কবির অনেক কবিতা পেয়ে যাবেন। অনেকে অনুবাদও করছেন তার নোবেল প্রাপ্তির পর। আমরা আপাতত সেদিকে যাচ্ছি না। সব শেষে যে কথাটি না বললে নয় সেটি একটু অপ্রীতিকর। কিন্তু কিছু করার নেই। লুইসের নোবেল পাওয়ার বিষয়টি অনেক সাহিত্যবোদ্ধাকে হতাশ করেছে। অনেকে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও এনেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, আগে এমন অনেক লেখকই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যাদের নাম আমরা পুরস্কার পাওয়ার আগে শুনিনি। কিন্তু নাম না শুনলেও একজন নোবেলবিজয়ী কবি বা সাহিত্যিকের লেখা পড়ার পর তার রচনার ঔৎকর্ষ ঠিকই টের পাওয়া যেত। পাঠক মুগ্ধ আবেশে থমকে গিয়ে ওই লেখার গভীর তাৎপর্য উপলব্ধির চেষ্টা করত। বুঝতে পারত তিনি কেন সেরা এবং যথার্থই নোবেল পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু লুইসের লেখায় তার ছিটেফোঁটাও মেলে না। এমনকি তাকে বাংলা ভাষার বর্তমান সময়ের কোনো দ্বিতীয় শ্রেণীর কবির চেয়ে বেশি কিছু মনে করেননি কোনো কোনো বোদ্ধা পাঠক।

নোবেল প্রাপ্তির খবর গ্লুক পেয়েছেন সকাল পৌনে ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠেই। নোবেল কমিটির সেক্রেটারি ফোন করে তাকে এ খবর জানান। আর এতে কবির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়ের। শুধু তা-ই নয়, তার আচরণ ছিলো অনেকটাই রূঢ়। এর কিছু সময় পরই বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে তিনি বলেন, তিনি এই পুরস্কারের জন্য একরকম অপ্রস্তুতই ছিলেন। বলেছেন, এই বিশেষ ঘটনা কখনো আমার জীবনেও ঘটতে পারে এটা একেবারেই অসম্ভব মনে হতো। এটি যে একজন বড় লেখকের বিনয় এমন কিন্তু মনে হয় না। এখানেও তিনি পরম সততার সাথেই সত্য তুলে ধরেছেন বলে ধারণা করি।

e-mail: [email protected]

 


আরো সংবাদ