২৯ নভেম্বর ২০২০

স্বেচ্ছাসেবী খাতের পুঁজিবাজার, ক্যাশ ওয়াক্ফ আন্দোলন

স্বেচ্ছাসেবী খাতের পুঁজিবাজার, ক্যাশ ওয়াক্ফ আন্দোলন - ছবি : নয়া দিগন্ত

আমাদের অর্থনীতিতে স্বেচ্ছাসেবক খাত সবসময় উপেক্ষিত থেকেছে। বার্ষিক বাজেটে তো বটেই। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভে এই খাতের যে বিপুল সম্ভাবনা সেদিকে কোনো সরকারই নজর দেয়নি। ইসলামে ওয়াকফ, জাকাত, সাদাকাহ ইত্যাদি যেসব বিষয় রয়েছে সেটাই স্বেচ্ছাসেবক খাত। পশ্চিমা দেশগুলোতেও এ ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনকল্যাণমূলক খাত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিএনপির ১০% আসে স্বেচ্ছাসেবক খাত থেকে। তাহলে আমাদের বাজেটে কেন এটা উপেক্ষিত আমার বুঝে আসে না। অর্থ সংস্থানের এত বিশাল ক্ষেত্র থাকার পরও আমরা সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকি ঋণের আশায়। এ জন্য যে সুদ দিতে হয় সে কথা বাদ দিলেও ঋণের অর্থ তো ফেরত দিতে হয়। অথচ ঘরের সম্পদকেই আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। মুসলিম সমাজের অবহেলিত সামাজিক সম্পদ কাজে লাগানোর প্রেরণা থেকেই ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট’ ধারণাটি সামনে এসেছে। ওয়াক্ফ, ক্যাশ ওয়াক্ফ ও ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রথম দুটি বায়বীয় ধারণা মাত্র। ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট’ হলো একটি ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’।

অর্থনীতির ছাত্রমাত্রই জানে যে, এটা হলো অর্থের একটি অন্যতম কাজ। এভাবে কোনো কিছুর মূল্য সুনির্দিষ্ট মুদ্রায় নিরূপণ করা হয়। ফলে বিভিন্ন জিনিস যেমন পণ্য, সেবা, সম্পদ, দায়, শ্রম, আয়, ব্যয়, ইত্যাদিকে আমরা একটির সঙ্গে আরেকটিকে তুলনা করতে পারি। ক্যাশ ওয়াক্ফের সাথে ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেটের পার্থক্যটি এখানে। ক্যাশ ওয়াক্ফকে আর্থিকীকরণ (Monetize) করে ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট। আর্থিকীকরণ মানে রাজস্ব আয় হয় না এমন কোন জিনিসকে নগদ অর্থে রূপান্তরিত করা। মূলত কোনো সম্পদ বা বস্তুকে বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর করা। আমি যখন আমার বাড়ির একজন কাজের লোককে ক্যাশ ওয়াক্ফ করতে বলব তখন তাকে আমি কি বুঝাব? তাকে একটি সার্টিফিকেট দিতে হবে। এর মানে হলো তাকে একটি ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ দিতে হবে।

ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর সেগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছিল না। আইডিবি প্রতিষ্ঠার পর শেয়ারবাজার নিয়ে গবেষণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমার সৌভাগ্য যে, ওই গবেষণা করার দায়িত্বটি আমাকে দেয়া হয়েছিল। সেই সুবাদে সম্ভবত ইসলামিক বিশ্বে আমিই প্রথম ইসামিক ফ্রেমওয়ার্কে শেয়ার মার্কেটের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। এটা ১৯৮১-৮২ সালের দিকে। আধুনিক ইতিহাসে এটাই ছিল ইসলামিক শেয়ার মার্কেটের বিষয়ে প্রথম গবেষণা। তখনো কিন্তু ক্যাশ ওয়াক্ফ ধারণাটি আসেনি। প্রায় ৫০০ বছর আগে অটোম্যানরা ক্যাশ ওয়াক্ফের কথা চিন্তা করলেও সেটাকে তারা প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে প্রথম আমি একে ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ করার চিন্তা করি। আজ বাংলাদেশের ছয়টি ইসলামিক ব্যাংক তো বটেই মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্কসহ বিশ্বের বহু মুসলিম রাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো এই ক্যাশ ওয়াক্ফ নিয়ে কাজ করছে।

আমরা এলোমেলোভাবে দান, সাদাকাহ, ওয়াক্ফ অনেক কিছু করছি। আমাদের দেশে হাজার হাজার মসজিদ যে ওয়াক্ফ সম্পত্তির ওপর গড়ে উঠেছে সেটা এভাবে হয়েছে। ইসলামে দান-সাদাকাহ ও জনকল্যাণ করার যে মূল্যবোধ রয়েছে তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ এগুলো করেছে। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে যুগে যুগে এটা হয়ে আসছে। আমি জমিদার, আমি ১০ বিঘা জমি ওয়াক্ফ করে দিলাম। তুমি বড়লোক তুমিও তোমার ভূসম্পত্তি ওয়াক্ফ করে দিলে। যখন সমাজে ভূসম্পত্তির আধিক্য থাকে তখন এ ধরনের ওয়াক্ফ বেশি হয়। কিন্তু আমি বলছি এভাবে না করে এটাকে একটি সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে আসতে যাতে আমরা ওয়াক্ফের সত্যিকারের সুফল লাভ করতে পারি। যাতে মানবকল্যাণে আরো ঘনিষ্ঠভাবে একে কাজে লাগানো যায়। আর দেশের প্রত্যেক নাগরিক যাতে এই মানবকল্যাণের ভাগিদার হতে পারে। যাতে একে আন্দোলনে পরিণত করা যায়। কিন্তু গতানুগতিক ওয়াক্ফ কোনো আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারবে না। ক্যাশ ওয়াক্ফও ঠিক তাই। তোমার টাকা আছে তুমি ক্যাশ ওয়াক্ফ করেছে। আমার টাকা আছে আমিও দিলাম। কিন্তু এটাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ‘মনিটাইজ’ করার প্রক্রিয়াটিই হলো ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট। যাকে ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ বলা হচ্ছে।

ইসলামের ইতিহাসে এই প্রথম ক্যাশ ওয়াক্ফকে ‘মনিটাইজ’ করা হয়েছে। ইউনিট করা হয়েছে। এই ইউনিট টাকার যেকোনো অঙ্ক হতে পারে। সামাজিক সম্পদ সমাবেশের জন্য এটাকে আন্দোলন (Movement) হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। এখানে একসময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য বিভিন্ন অঙ্কের ছিল। আমাদের সোস্যাল ইসলামিক ব্যাংকে প্রথমে শেয়ারের মূল্য ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে বলা হলো এই অঙ্ক বেশি। তখন একে ভেঙে ১০০ টাকা করা হলো। কিন্তু দেখা গেল এটাও গণ-আন্দোলনের রূপ দেয়া কঠিন। এই ১০০ টাকা করেও অনেকে দেবে না। অর্থাৎ ব্যাংকের মালিকানাকে আরো বিস্তৃত পরিসরে কিভাবে ছড়িয়ে দেয়া যায় সেই চিন্তা থেকে তখন প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হলো ১০ টাকা। এখন বাংলাদেশের শেয়াবাজারে তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের একক শেয়ারের মূল্য ১০ টাকা। লক্ষ্য একটাই মালিকানাকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়া।

এই ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ করার কারণে ক্যাশ ওয়াক্ফকেও গণআন্দোলনে রূপ দেয়া যেতে পারে। বাড়ির একজন গৃহকর্মীকে যদি বলা হয়, তুমি ১০ টাকা দিয়ে ক্যাশ ওয়াক্ফের একটি শেয়ার কেন, সে কিনবে। কারণ সে জানে ওয়াক্ফ মানে সওয়াবের বিষয়। কিন্তু এটা না করে তাকে যদি বলা হয় তুমি ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ’ করো। তাহলে সে বলবে এটা কি জিনিস। তখন তাকে বুঝাতেই দিন পার হয়ে যাবে। দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে এটা কে বুঝাবে?

ওয়াক্ফে যে সামাজিক দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে সেটা কিন্তু আমাদের কর্পোরেট সেক্টরে স্বীকৃত হয়েছে। যাকে আমরা বলছি করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)। কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যখন তার লাভের একটি অংশ সমাজকল্যাণে ব্যয় করে তাকে আমরা সিএসআর বলি। ব্যাংক, বীমা, শিল্পকারখানা, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সিএসআর পালন করার পেছনে প্রায়ই একটি উদ্দেশ্য থাকে। সেটা হলো করা ফাঁকি দেয়া। আয়ের কিছু অংশ সিএসআর খাতে দিয়ে পুুরো আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়। পশ্চিমা বিশ্বের এই ধারণা এখন আমাদের সবাই বোঝে। আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সিএসআর পালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একরমক তোষণই করে। অথচ এই সামাজিক দায়িত্ব পালনের ধারণা ইসলামের একেবারে শুরু থেকেই আছে। দান, সাদাকাহ, ওয়াক্ফ নামে পরিচিত এই বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের কোনো উদ্যোগ আমাদের নেই। না আমলাদের মধ্যে না বাংলাদেশ ব্যাংকের।
ক্যাশ ওয়াক্ফের আন্দোলনকে গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এটা একটি বিশাল সম্ভাবনা।

বিশ্বের মুসলমানদের কাছ থেকে যদি মাত্র এক ডলার করে ক্যাশওয়াকফ সংগ্রহ করা যায় তাহলে কত বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা যাবে তা কি কেউ কল্পনা করতে পারে? একইভাবে বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের কাছ থেকে যদি ১০০ টাকা করে সংগ্রহ করা যায় তাহলে কী দাঁড়াবে? যদি দুই ঈদে বলা হয় ১০০ টাকা করে ক্যাশ ওয়াক্ফ করতে তাহলে ২৪০০ কোটি টাকা। আর যদি বলা হয় প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে ক্যাশ ওয়াক্ফ করতে তাহলে তো অগণিত টাকা।

আর এভাবে সামাজিক পুঁজির সমাবেশ ঘটিয়ে আমাদের দেশের অবহেলিত খাতগুলোর উন্নয়নে ক্যাশ ওয়াক্ফকে কাজে লাগানো যায়, যেমন : শিশুশ্রম বিলোপে। আমাদের কারাগারগুলোতে বন্দীদের প্রশিক্ষণের কথা আমি বলেছিলাম। আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকছে। তাদের এমনভাবে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা যাতে তারা জেলখানা থেকে বেরিয়ে নতুন করে অপরাধে জরিয়ে না পড়ে এবং পরিবারের জন্য বোঝা না হয়ে বরং শ্রমসম্পদ হয়। গবেষণা খাতকে সহায়তার কথাও বলেছি। এটা এমন একটি খাত যার ফলাফল রাতারতি দেখা যায় না। ফলে এ খাতে অর্থ দিতে রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত কার্পণ্য দেখায়। কিন্তু ক্যাশ ওয়াক্ফ ব্যবস্থা থাকলে গবেষণার অর্থ জোগান ব্যাহত হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা মুসলিম দেশগুলো এই গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি।

আমাদের অদ্ভুত এক জাতিগত প্রবণতা রয়েছে। আমরা মুখে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কথা বলছি কিন্তু আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথগুলো অনুসন্ধান করছি না। চীনের থেকে ঋণ, আমেরিকার থেকে ঋণ নেয়ার পেছনে ছুটতেই বেশি পছন্দ করি। অথচ ঋণের অর্থ হাতে পাওয়ার আগেই যে খরচ হয় সেটা অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। পরে ঋণের বোঝা বহনের দুর্ভোগ তো আছেই। এই অপচয় রোধের বিরাট সুযোগ থাকলেও সেদিকে নজর দিই না। আমাদের সুপ্ত শক্তি সম্পর্কে আমরা কেন বেখবর বুঝি না। এই সুপ্ত শক্তি জাগিয়ে তোলার আহ্বানেই আমি স্বেচ্ছাসেবক খাতের পুঁজিবাজারের কথা বলছি। যা হবে বাজার অর্থনীতির শেয়ারবাজার থেকে সম্পূর্ণ। আমাদের স্বেচ্ছাসেবক পুঁজিবাজার গঠন করতে হবে। যেমন এক লাখ টাকা করে ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ করা হলো। ধনী ব্যক্তিরা ইচ্ছেমতো যার যা খুশি এই ‘ইউনিট অব অ্যাকাউন্ট’ কিনল। ব্যাস পুঁজিবাজার হয়ে গেল। এটা এখন নেই কারণ আমাদের কোনো আইন নেই। তাই একে আইনি কাঠামোর আওতায় এটা আনা যেতে পারে। এজন্য আরো যারা জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি আছেন তাদের প্রতি আহ্বান জানাব এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের ইসলামিক ব্যাংকগুলো চিন্তা করেনি। এটা কিভাবে চলবে সেটা আমি এখনো ভেবে পাইনি। তবে আমার ভাবনা শেষ হয়নি।

ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেটের বিষয়ে আমি বলছি, দেশের সরকার পছন্দ করুক বা না করুক এটা একটি বৈশ্বিক ঘটনা। বিশ্বের অনেক দেশ এটা গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশের ছয়টি ব্যাংকও ক্যাশওয়াক্ফ সার্টিফিকেট প্রবর্তন করলেও কোন পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে পারেনি। আমাদের আরো দুর্ভাগ্য হলো, এখানে ইসলামিক ব্যাংক থাকলেও আলাদা কোনো ইসলামিক ব্যাংকিং আইন নেই। ফলে ইসলামিক ব্যাংকিংও পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হতে পারছে না। কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। একমাত্র ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট পৌঁছানো সম্ভব। এটাকে তৃণমূল পর্যায়ে নেয়া যেতে পারে। কারণ দেশের ৯০% মানুষ এটা বোঝে। সাদাকায়ে জারিয়াহ কাকে বলে এ বিষয়ে প্রত্যেক মুসলমানের একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে। তারা ইহকাল ও পরকালের কণ্যাণ নিয়ে ভাবে। এই অনুভূতিকে আমরা জাগিয়ে তুলতে পারি। একটি মানবদরদি, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারি।

লেখক : ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ; এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক অর্থনৈতিক পরামর্শক


আরো সংবাদ