২৯ নভেম্বর ২০২০

ই-জিপিতেও থামছে না হরিলুট

ই-জিপিতেও থামছে না হরিলুট - ছবি : সংগৃহীত

দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম এখন যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে চলেছে। পুরো প্রশাসন বিভাগই যেন রীতিমতো দুর্নীতির অভয়ারণ্য এখন। প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার কারণে পুরো আমলাতন্ত্রই এখন আসামির কাঠগড়ায়। এ অবস্থায় সব ধরনের সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, এ ব্যবস্থার ফলে সরকারি কেনাকাটায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বরং ক্ষেত্রবিশেষে অবনতিই হয়েছে। মূলত আইনের শাসন ও গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতির কারণেই এমনটা ঘটছে।

দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে, তারা কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করেন না। সাক্ষ্য-প্রমাণ রেখেই তারা এখন দুর্নীতি করে যাচ্ছেন অবলীলায়। তাদের বদ্ধমূল ধারণা যে, প্রচলিত ব্যবস্থায় তাদের কার্যকর শাস্তি দেয়া মোটেই সহজসাধ্য নয়। সঙ্গত কারণেই শুধু কেনাকাটা নয়, যেখানেই সরকারি অর্থসম্পদ রয়েছে, সেখানেই এর অপব্যবহার বা স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বা অপরাধীদের শাস্তি বিধান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণেই এখন তা প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। গরু-ছাগলের উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫ হাজার টাকার চেয়ার ছয় লাখ টাকায় কেনার ঘটনা সে দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। গাভীর ভ্রুণ পরীক্ষার জন্য এক হাজার পিস বাক্সের কিটের দাম বাজারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা, সেখানে তা দেখানো হয়েছে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি। কিন্তু এসব অভিযোগে অভিযুক্তদের কোনো দিনই শাস্তি পেতে হয়নি। যদিও সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করলে কাজের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিষয়টি এখনো কথা মালায় সীমাবদ্ধ। সরকারি কেনাকাটার কাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

সরকারি ক্রয়ে গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরকার তা বন্ধে ই-জিপির (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) কার্যক্রম গ্রহণ করলেও তা কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। কারণ প্রযুক্তিও এসব অপরাধীর কাছে হার মেনেছে। এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, সিন্ডিকেট এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ক্রয়াদেশ পর্যন্ত এর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, সব ধরনের ক্রয়ে ই-জিপির ব্যবহার না হওয়া এবং ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে ম্যানুয়াল থেকে কারিগরি পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের উত্তরণ হলেও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একাংশ দুর্নীতির নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। ‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন : বাংলাদেশে ই-জিপির কার্যকরতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্যই দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ গবেষণায় বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় খাতে সুশাসনের আঙ্গিকে ই-জিপির প্রয়োগ ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্যে ২০১৯ এর জুলাই থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ই-জিপি বাস্তবায়নকারী প্রথম দিকের চারটি প্রতিষ্ঠান-স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) বাছাই করা হয়। দেশের চারটি প্রশাসনিক বিভাগের একটি করে জেলা এবং সে জেলার একটি উপজেলাপর্যায়ে অবস্থিত কার্যালয় ও ঢাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গুণগত ও সংখ্যাগত উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করে চারটি প্রতিষ্ঠানের ৫২টি কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ই-জিপি প্রক্রিয়া, ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতাÑ এ পাঁচটি ক্ষেত্রের অধীনে ২০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন কতটুকু কার্যকর তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি নির্দেশককে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন স্কোর দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। স্কোরের গ্রেডগুলো হচ্ছে ‘ভালো’ (৮১ শতাংশ বা তার বেশি); ‘সন্তোষজনক’ (৬১ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ); ‘ভালো নয়’ (৪১ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ); ‘উদ্বেগজনক’ (৪০ শতাংশ বা তার নিচে)।

অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫০ শতাংশ স্কোর পেয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ)। ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে পল্লীবিদ্যুৎ (আরইবি), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪৩ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) পেয়েছে ৪২ শতাংশ অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থানই ‘ভালো নয়’ গ্রেডে। সব প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়ে মোটামুটি ভালো ও প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে। তবে সওজ ও আরইবির সক্ষমতা অন্য দুটো প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলকভাবে ভালো। ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ৫৮ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ স্কোর পেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকরতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো স্কোর পায়নি। আবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের স্কোর ১৯ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ তথা হতাশাব্যঞ্জক। প্রাপ্য গ্রেড অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সার্বিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং কার্যকরতায় অবস্থান উদ্বেগজনক। যেসব নির্দেশকে অবস্থান উদ্বেগজনক সেগুলো হচ্ছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, প্রাক-দরপত্র সভা, ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনা, কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি, নিরীক্ষা, কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং কাজের মান।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৭৫ শতাংশ); এর পরই রয়েছে পাউবো (৬৩ শতাংশ)। সবগুলো প্রতিষ্ঠানেই ই-জিপি পরিচালনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে এবং ই-জিপি পরিচালনার জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দেরও দরকার নেই। ভৌত ও কারিগরি সক্ষমতার দিক থেকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সওজ এবং আরইবির সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। এলজিইডি ও পাউবোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের ঘাটতি রয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ই-জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী ই-জিপি পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানভেদে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয় ই-জিপিতে হয় না। উপজেলা পরিষদের ক্রয়ে অনেক জায়গায়ই ই-জিপি পুরোপুরি চালু হয়নি। সামরিক বাহিনীর দ্বারা সম্পাদিত কাজের ক্ষেত্রে ই-জিপি অনুসরণ করা হয় না। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা দেয়া হয় না।

গবেষণায় প্রকাশিত উপাত্ত থেকে জানা যায়, ই-জিপি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে সওজ (৬৪ শতাংশ); এর পরই রয়েছে পাউবো (৬০ শতাংশ)। ই-জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী সব ই-জিপি ব্যবহারকারীদের ই-জিপি ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান ই-জিপিতে নিবন্ধিত-ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও ব্যাংক। ই-জিপি চালুর প্রথম দিকে বেশির ভাগ ঠিকাদারই সংশ্লিষ্ট অফিসের সহায়তায় ই-জিপিতে নিবন্ধিত হয়েছে, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে ই-জিপি আইডি খোলা ও নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। তবে কোনো কোনো ঠিকাদার নিজেই নিবন্ধন করেছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটি (টিইসি) গঠন ও দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। সওজ ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয় না। কোনো কোনো সময় টিইসির সদস্যদের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটররা তাদের পক্ষে লগ-ইন করে দরপত্র খোলেন। দরপত্র খোলার আগে ঠিকাদারদের পরিচয় গোপন থাকার নিয়ম থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই এটি গোপন থাকে না। উপরন্তু কোনো কোনো কার্যালয়ের অফিসের কম্পিউটার অপারেটররাই টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারদের হয়ে দরপত্র দাখিল করে। কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রাক-টেন্ডার মিটিং করে না।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনায় ঠিকাদারদের কর্ম-পরিকল্পনা দাখিল করতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে ই-জিপি চুক্তি ব্যবস্থাপনা টুলস ব্যবহার করতে হয়। তবে ই-চুক্তি ব্যবস্থাপনা কোনো প্রতিষ্ঠানেই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্য দিকে কার্যাদেশ বাস্তবায়ন তদারকি প্রক্রিয়াও এখনো ই-জিপি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ ছাড়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রের অধীনে দেখা যায় যে, এলজিইডি ও সওজ কার্যালয়গুলোতে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বিদ্যমান। অন্য দিকে পাউবো ও আরইবিতে অভিযোগ করলেও সমাধান না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি ১৯৭৯’ অনুযায়ী সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক পাঁচবছর অন্তর সম্পদের বিবরণী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাখিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেরই কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেন না।

মূলত ই-জিপির প্রবর্তনের ফলে সার্বিকভাবে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শিডিউল ছাপাতে ও নথি সংগ্রহ করতে হয় না বিধায় শিডিউল কেনা ও জমা দেয়া এবং যাচাই এর কাজ দ্রুততম হয়েছে; সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর; তৃণমূল পর্যায়ের কার্যালয়ে ক্রয়ের সুবিধা; দেশের যেকোনো জায়গা থেকে দরপত্র জমা দেয়ার সুযোগ; দরপত্র জমা নিয়ে সব ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, বোমা হামলা, বাক্স ছিনতাই ও চুরি, জমায় বাধা দেয়া, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি দূর হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

তবে ই-জিপি প্রবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজতর হলেও দুর্নীতি কমার সাথে ই-জিপির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই মতপ্রকাশ করেছেন। ই-জিপি প্রবর্তন সত্ত্বেও নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান। রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কোনো বিশেষ কাজে কারা টেন্ডার সাবমিট করবে সেটা রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। ফলে সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে ই-জিপি কোনো সুফল বয়ে আনছে না, বরং ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বৃত্তেই আবদ্ধ রয়েছে সব কিছু।

সরকারি ক্রয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় দুর্নীতি হ্রাস এবং কাজের মানোন্নয়নে ই-জিপির সুফল মিলছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই সীমাবদ্ধতা উত্তরণে ১৩ দফা সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। ই-জিপির কার্যকর সুফল পেতে টিআইবির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, ই-জিপিকে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে; সেই লক্ষ্যে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির রাষ্ট্রের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে; প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয় ই-জিপির মাধ্যমে করতে হবে; কাজের চাপ ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে জনবল বাড়াতে হবে; সব অংশীজনকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; প্রাক-দরপত্র মিটিং নিশ্চিত করতে হবে; ঠিকাদারদের অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে; সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় দরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে; দরপত্রসংক্রান্ত সব তথ্য ও সিদ্ধান্ত স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে; ই-জিপির সাথে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিজস্ব ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রতি বছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে ও তা প্রকাশ করতে হবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম বন্ধ ও ই-জিপি পদ্ধতি কার্যকর ফল পেতে টিআইবির সুপারিশমালা অনেকটাই কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

[email protected]


আরো সংবাদ