২৭ অক্টোবর ২০২০

বিস্ময়কর সফল এক মোনাফেকের আত্মকথা

বিস্ময়কর সফল এক মোনাফেকের আত্মকথা - ছবি : নয়া দিগন্ত

নিজের মোনাফেকির ধরন ও প্রকৃতি দেখে আমি প্রায়ই রীতিমতো চমকে উঠি। মাঝে মধ্যে একটু সময় পেলে আয়নার সামনে দাঁড়াই। তারপর নিজেকে দেখি এবং ভাবি, কী করে মোনাফেকির জগতে কিংবদন্তির বাদশাহে পরিণত হলাম। আমার সফলতা, ক্ষমতা-অর্থবিত্ত, ভোগ-বিলাস ইত্যাদি সবকিছুর মূলেই মোনাফেকিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছি। ফলে যখন সফলতা পেতে থাকলাম তখন আর আমাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এই পৃথিবীর তাবৎ মোহময় বস্তুসামগ্রী আমার হস্তগত হওয়ার পর এখন রীতিমতো দানবে পরিণত হয়েছি। ইচ্ছেমতো সবকিছু দানবের রাহুগ্রাসে গলাধকরণ করি; আবার পরক্ষণে তাণ্ডব ঘটিয়ে সেগুলোকে বমন আকারে উদগীরণ করে আমার মানস পুত্র-কন্যাদের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেই। ওরা ওগুলো গ্রহণ করে এবং আনন্দের আতিশয্যে সাধু সাধু শব্দে চার দিক বিভোর করে তোলে।

মোনাফেকি করতে করতে আজ আমি বার্ধক্যের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছি। এই বয়সে সাধারণত মানুষের মনে মৃত্যুভয় জাগে এবং অতীতের মন্দকর্মের জন্য অনুশোচনা হয়। কিন্তু আমার হয়েছে উল্টোটা। আমার মধ্যে মৃত্যুভয় কাজ করে না এবং যাতে নিত্যনতুন উপায়ে মোনাফেকি করে কোটি কোটি মানুষকে ঠকিয়ে বিশ্বাসীদের রব বলে পরিচিত আল্লাহকে রাগিয়ে দিতে পারি সেই চেষ্টায় দিনরাত ফন্দিফিকির করতে থাকি। ইতোমধ্যেই লাখ লাখ মানুষকে মোনাফেক বানিয়ে ফেলেছি এবং আমার মৃত্যুর পরও যেন আমার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে লোকজন আমারই মতো মোনাফেক হতে পারে সেজন্য আজকের আত্মকথনে আমি মোনাফেক হিসেবে সফলতা লাভের গোপন রহস্যসমূহ প্রকাশ করার চেষ্টা করছি।

আলোচনার শুরুতেই বলব- কেনো আমি মোনাফেক হলাম। আমার অতিরিক্ত লোভ এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতার কারণে একটা সময় দিশেহারা। হয়ে পড়েছিলাম। অনেক কিছু পেতে চাইতাম। ভোগের নেশায় পাগলপারা ছিলাম এবং আমার সাথে যাদের মতের মিল হতো না, তাদের মেরে হাত পা ভেঙে দিতে চাইতাম। কিন্তু আমার এমন কোনো যোগ্যতা ছিল না যা দিয়ে আমি কাক্সিক্ষত বস্তু হাসিল করতে পারি অথবা ভিন্নমতের লোকদের ঠ্যাঙ্গাতে পারি। আমার শিক্ষা-দীক্ষা বুদ্ধিশুদ্ধি ও বিবেক খুই নিম্নমানের ছিল। ফলে পরিবারের লোকজন খুব ছোটবেলা থেকেই আমাকে হিংসুটে ক্ষ্যাপাটে এবং ছোট মনের ইতর প্রাণী মনে করত। তারা কেউ আমার সাথে মিশত না। এমনকি আমাকে দেখলে তারা ভয়ে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে পড়ত।

যখন অনুধাবন করলাম যে, আমার যোগ্যতা দ্বারা কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয় তখনই আমি বাঁকা পথের অনুসন্ধান শুরু করলাম। যেসব বিকৃত ইন্দ্রিয় সুখের কথা কল্পনা করি ওসব যে কোনো সাধারণ অবস্থায় সম্ভব নয় তা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারলাম। বিভিন্ন অত্যাচারী রাজা বাদশাহ এবং কামাতুর রাজা-রানীদের অন্ধকার জীবনের কাহিনীগুলো পড়তে আরম্ভ করলাম। বুঝলাম যে, কোনো মানুষ যদি ক্ষমতার শীর্ষপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তবে তার সব কুকর্মের জন্য প্রশংসাকারীর অভাব হয় না। সুতরাং অর্থ, বিত্ত ও ক্ষমতা লাভের জন্য আমি শয়তানের দাসত্ব করার বিষয়ে মনকে দৃঢ়তর করলাম। বিষয়টি নিয়ে কিছু শয়তান প্রকৃতির মানুষের সাথে কথা বললাম। তারা আমার কথা শুনে আহলাদে ফেটে পড়ল এবং নিজেদের শয়তানি বুদ্ধির ভণ্ডার আমার নিকট ঢেলে দিলো। তারা তাদের অপরাধ পাপকর্ম এবং বিকৃত ইন্দ্রিয় সুখের অনাচারের কাহিনীগুলো যখন আমার নিকট বলল, তখন লোভ আর লালসার তাড়নায় আমার জিহবা লক লক করে উঠল।

যখন শয়তানের দোসরদের কাছে আমার অভিলাষের সফলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তারা বলল, মোনাফেকি ছাড়া তুমি কোনো দিন তোমার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না। তারা আরো বলল যে, একজন সফল মোনাফেক হতে হলে দুটো বিষয়ে নিদারুণ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রথমটি হলো মিথ্যা বলা এবং মিথ্যাবাদীদের সাথে বন্ধুত্ব করা। দ্বিতীয়টি হলো, একজন যাত্রাদলের অভিনয় শিল্পীর মতো শত সহস্র লোকের সামনে মিথ্যা রাজা, মিথা রানী বা মিথ্যা উজির, নাজির, কোতোয়াল সেজে নিখুঁতভাবে অভিনয় করার সাহস শক্তি ও কৌশল অর্জন করা। লজ্জা-শরম ভয়-দ্বিধা সঙ্কোচ ইত্যাদি ত্যাগ করে সময়ের প্রয়োজনে সাধু সাজা আবার পরক্ষণে সাধু বেশ ত্যাগ করে শয়তানরূপে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করার সাহস ছাড়া নাকি সফল মোনাফেক হওয়া সম্ভব নয়। তারা মোনাফেকের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় দিতে গিয়ে বলল যে, মোনাফেক কারো সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব করে না, কাউকে বিশ্বাস করে না এবং সে চায় না যে, কেউ তাকে বিশ্বাস করুক।

খুব মনোযোগ দিয়ে উল্লিখিত কথাগুলো শুনলাম এবং বুঝলাম, মোনাফেকি করা বা মোনাফেক হওয়া আমি যতটা সহজ মনে করেছিলাম সেটা আসলে অত সহজ নয়। তাদের সব কথাই আমি বুঝলাম, কেবল একটি বাক্য ছাড়া। অর্থাৎ মোনাফেক কেন চায় না যে, লোকজন তাকে বিশ্বাস করুক? আমার প্রশ্নকে তারা বালসুলভ মনে করে একদফা হাসল। তারপর স্নেহভরে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, বাছা! তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। কিন্তু তার আগে আমাদের বুঝতে হবে যে, তুমি সত্যিকার অর্থে মোনাফেক হতে চাও কিনা এবং তোমার শরীর-মন মোনাফেকির উপযুক্ত কিনা। বেশ দৃঢ়তার সাথে জানালাম, মোনাফেক হওয়ার জন্য আমি যেকোনো পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত। তারা সদলবলে আমার সর্বাঙ্গ দেখতে চাইল এবং আমি যখন সেগুলো দর্শন ও ভোগের জন্য উন্মুক্ত করতে সম্মতি দিলাম তখন তারা আনন্দে হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠল।

শয়তানের দোসরদের সঙ্গ এবং সহযোগিতায় আমি মোনাফেকির পথে খুব দ্রুত উন্নতি করতে লাগলাম। মোনাফেকিকে রীতিমতো শিল্পের মর্যাদায় প্রণীত করার জন্য ইসলামের নবী হজরত মোহাম্মদ সা:-এর জমানার কুখ্যাত মুসাইলামাতুল কাজ্জাব, আবদুল্লাহ বিন উবাই এবং আবু জেহেলের চরিত্র অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বারবার অধ্যয়ন করতে থাকি। শুধু মিথ্যা কথা বলে কিভাবে লাখ লাখ লোককে রীতিমতো মানসিক বিকারগ্রস্ত বানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসা যায় প্রাণ বিসর্জনের জন্য, তা যদি কেউ শিখতে চায় তবে তাকে অবশ্যই মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের জীবনী পাঠ করতে হবে। অন্য দিকে, পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ যার ওপর সর্বদা ঐশী সাহায্য অবারিত ছিল সেই নবী করিম সা:-এর সামনে দাঁড়িয়ে ভণ্ডামি করা, প্রতারণা করা, বেঈমানী করা, অভিনয় করা এবং বিশ্বাসঘাতকতার পর আবার মাথা উঁচু করে হাসিমুখে সদলবলে তার সামনে এমন ভাব দেখানো যে, কিছুই হয়নি ইত্যাদি অপকর্মের মাধ্যমে মোনাফেকির যে নজির আবদুল্লাহ বিন উবাই স্থাপন করেছেন তা আজ অবধি কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। অন্য দিকে, অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন যুগশ্রেষ্ঠ আধুনিক মানুষ শুধু স্বার্থ অহমিকা এবং হিংসার কারণে সব জ্ঞান-গরিমা ময়লার স্তূপে নিক্ষেপ করে কিভাবে দুনিয়ার নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত হতে পারে তা জানার জন্য আবু জেহেলের চরিত্র পাঠের বিকল্প নেই।

আমি দিন-রাত চেষ্টা তদদির করে মোনাফেকি সম্পর্কে তত্ত্বগত জ্ঞান এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জন করলাম। তারপর শুরু করলাম সেগুলোর প্রয়োগ। মানুষ যাতে বিভ্রান্ত হয় এবং আমার ব্যাপারে তাদের দিল নরম হয়ে যায় এ জন্য প্রথমত, ধর্মীয় লেবাস এবং দ্বিতীয়ত কথায় কথায় কান্না করে দু’চোখ ভাসিয়ে দেয়ার কৌশল অবলম্বন করলাম। সকাল-বিকাল-দুপুর এই তিন বেলায় তিন শ্রেণীর মানুষের মজমা মেলাতে শুরু করলাম। সন্ধ্যা থেকে রাতের প্রথম প্রহরে আমি কিছু লোক জড়ো করতাম এবং বাকি সময়টা অন্য কাজ করতাম। আমি সাধু বেশে ভণিতা করতাম এবং বহু ভণ্ড সাধু জোগাড় করে ফেললাম আমার সাগরেদ হিসেবে। এসব সাধুরূপী শয়তানদের দিয়ে আমি চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি-খুন-ধর্ষণ ইত্যাদি এ হেন অপকর্ম নেই যা করাইনি। কিন্তু হাঁদারাম পাবলিক বহুদিন পর্যন্ত আমার এবিসিডিও জানতে পারল না। তারা যখন জানল, তখন আর টুঁ শব্দটি করার ক্ষমতা ছিল না। কারণ ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত এবং সুসংঘবদ্ধ পেটোয়া বাহিনী দিয়ে আমার মোনাফেকি সাম্রাজ্য এতটাই শক্তিশালী করে ফেলেছি যে, ওদিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো সাহস কারো ছিল না।

একজন সফল মোনাফেক হিসেবে যখন আমার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন দেশ বিদেশের অনেকে আমার দরবারে ধর্না দিতে আসা শুরু করল। তারা আমার সফলতার মূলমন্ত্রগুলো জানতে চাইল। আমার জীবনের উল্লিখিত কাহিনীগুলো বলার পাশাপাশি আরো যেসব কথা তাদের বলি তা হলো- আমার মনে আমি সাধারণত কোনো মানবতাকে স্থান দেই না। নিষ্ঠুরতা এবং ছলনা এই দুটো কৌশলকে একত্র করে আমি মোনাফেকি করার জন্য যে অব্যর্থ হাতিয়ার তৈরি করেছি, যা বহু লোককে কবরে নিয়ে গেছে, বহু লোক সর্বস্ব খুইয়ে উন্মাদ বা অর্ধ উন্মাদে পরিণত হয়েছে, বহু সংসার তছনছ হয়ে গেছে এবং বহু সমাজ ধ্বংস হয়ে চোর-ডাকাতে পরিপূর্ণ একটি নরকে পরিণত হয়েছে।

আমার ছলনার রাজ্যে নিরপরাধ সরল বিশ্বাসী লোকদের ফাঁদে ফেলার জন্য কখনো অকাতরে অর্থ বিলাই; কখনো মদ-নারী-জুয়ার মোহসহ হেরেম তৈরি করি, আবার কখনো ভণ্ড সাধুদের নিয়ে সাধু সমাবেশের আয়োজন করি। এর বাইরে নিপাট সঙ্গীত-খেলাধুলা-সাহিত্যে সমাবেশ ইত্যাদির মাধ্যমেও শিকার ধরার ফাঁদ পাতি। এত কিছুর পরও যখন কাক্সিক্ষত ফল পাই না তখন ভাড়া করা বুদ্ধিজীবীদের লেলিয়ে দেই এবং যুগপৎভাবে রাক্ষসরূপী পেটোয়া বাহিনী দিয়েও অব্যাহতভাবে ভয়ভীতি সৃষ্টি করি যাতে নির্ধারিত শিকারটি বা শিকারগুলো ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের দুষ্টবুদ্ধির খপ্পরে পড়ে।

মোনাফেকিতে আমি যত সফল হয়েছি ততই বুঝেছি যে, মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি বা বিবেকবোধের চেয়ে মানুষের কণ্ঠই আমার জন্য বিপজ্জনক। এ কারণে কেউ যাতে আমার মোনাফেকির বিরুদ্ধে একটি টুঁ শব্দ উচ্চারণ করতে না পারে সে জন্য বোকা পাবলিকের কণ্ঠরোধের জন্য আমি বাহারি সব পন্থা অবলম্বন করেছি। এমনকি কেউ যদি আমার অতি প্রশংসাও করে তবে আমি লোকটি সম্পর্কে আতঙ্কিত বোধ করি এবং তার কণ্ঠরোধেও আমার টনিকসমূহ প্রয়োগ করে থাকি। আমি কুখ্যাত হাল্লা রাজার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কিছু মানুষের জিহ্বার ওপর অস্ত্রোপচার করি এবং বাকিদের কণ্ঠ দিয়ে যাতে শব্দ বের না হয় সে জন্য তাদের কলিজার ওপর বিষধর গোখরা সাপের বিষভর্তি ডিব্বা স্থাপন করে দেই।

আরেকটি বিষয় বলেই আজকের নিবন্ধ শেষ করব। কারণ আমার বার্ধক্যের সুযোগ নিয়ে ইবলিস এবং তার দলবলেরা প্রতি সন্ধ্যায় আমার নিকট হিসাব নিতে আসে। আমার সব উপার্জনের ওপর তাদের যে কমিশন দেয়ার রীতি চালু করেছিলাম সেটা এখন এত ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে পড়ছে যে, প্রতিদিন মোনাফেকির মুনাফা বণ্টন করতেই গভীর রাত হয়ে যায়। অধিকন্তু বয়সের ভারে, আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক কিছু ভুলে যাই- অনেক কিছু খুঁজে পাই না এবং অনেক হিসাব মেলাতে পারি না। তাই শয়তানেরা প্রতি সন্ধ্যায় ওঁৎ পেতে থাকে আমার দুর্বলতার সুযাগ নেয়ার জন্য। কিন্তু আমার শেষ বয়সের পরিপক্ব শয়তানির সাথে তারা পেরে ওঠে না। আমি প্রায়ই ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়ার ভান করি আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া আড়াল করার জন্য। কোনো শয়তান যদি আমার ভণিতার কবলে পড়ে অমনি তাকে এমন শাস্তি দেই যা দেখে বাকিরা এতই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, যখন সত্যিই ভুলে যাই তখন ওরা সেটাকে ভণিতা মনে করে আমাকে আসল ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

 


আরো সংবাদ