২৯ নভেম্বর ২০২০

মহাবিলুপ্তির প্রক্রিয়ায় বিশ্ববাস্তবতা

মহাবিলুপ্তির প্রক্রিয়ায় বিশ্ববাস্তবতা - ছবি সংগৃহীত

চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। করাল মৃত্যু হানা দেয় বিশ্বের দেশে দেশে। অবিরাম মানুষের মৃত্যু হতে থাকলে ছোঁয়াচে এই রোগ থেকে বাঁচতে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়। মানুষ ঢুকে যায় ঘরের ভেতর। বন্ধ হয়ে যায় মানুষের সব কর্মকাণ্ড। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সবই বন্ধ হয়ে যায়। নৌ, বিমান, সড়ক যোগাযোগসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নেয় চার দেয়ালের আশ্রয়ে। এর ফলে বিশ্বের পরিবেশের অনেকটা উন্নতি হয় বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

কার্বন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যাওয়া, ধুলাবালুমুক্ত পরিবেশ ফিরে আসায় ইউরোপের মানুষ রাতে উজ্জ্বল তারকাখচিত আকাশ দেখতে পাচ্ছে এমন পুলক জাগানো খবরও এসেছে। জানা গেছে, মানুষ ঘরে ঢুকে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা নিরাপদে বিচরণ করতে পারছে। অনেক শহরে বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণের ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তখন কথা উঠেছিল, মানুষ তাদের একমাত্র বাসস্থান এই পৃথিবী নামের গ্রহটির সাথে যে অসংযত আচরণ করেছে, যেভাবে এর পরিবেশ-প্রতিবেশ তথা বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করেছে তাতে এই গ্রহের নাভিশ্বাস উঠেছে। পৃথিবীর দম বন্ধ হয়ে এসেছে। সে জন্যই পৃথিবী তথা প্রকৃতি নিজের মতো করে ব্যবস্থা নিয়েছে। একটি ভয়ঙ্কর ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটিয়ে মানুষকে ধ্বংসপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত করেছে এবং আত্মরক্ষার উপায় খুঁজে নিয়েছে।

অস্তিত্ববাদী মানুষ এটিকে নিয়েছেন খোদায়ি প্রতিশোধ হিসেবে, গজব হিসেবে। একমাত্র স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়ার কারণে, ধর্মকর্ম ভুলে গিয়ে আত্মপূজায় লিপ্ত হওয়া মানুষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য স্বয়ং খোদার পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে এই গজব, বলেন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ।
আমাদের এই নিবন্ধ করোনাভাইরাসের বীভৎসতা বা এর কারণ নিয়ে নয়। আমরা পৃথিবী গ্রহের প্রতি অসংযত আচরণের কারণে মানব প্রজাতিসহ সার্বিকভাবে প্রাণিজগতের ওপর কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেই বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। আর সে চেষ্টা করব বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেই।

বছর পাঁচেক আগে বিশ্বের সেরা গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, পৃথিবী এখন মহাবিলুপ্তির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। বলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রাণী। ধ্বংসের মুখোমুখি হবে মানবপ্রজাতি। এটিকে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির কাল। এর আগে আরো পাঁচটি মহাবিলুপ্তির কাল পেরিয়ে এসেছে পৃথিবী। সেগুলোর প্রতিটিই ঘটেছে নিছক প্রাকৃতিক কারণে। যেমন, বলা হয়ে থাকে, সর্বশেষ মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এবং তাতে অতিকায় ডাইনোসরসহ অনেক প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তখন অতিকায় গ্রহাণুপুঞ্জের আঘাতে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছিল ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ বা পারমাণবিক শৈত্য। তার মানে হলো- বিপুল সংখ্যক গ্রহাণুপুঞ্জের আঘাতে পৃথিবীপৃষ্ঠের চারপাশে ঘন ধুলিমেঘের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সূর্যের আলো পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছতে বাধা পায়। ফলে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে বিশ্বে এক দীর্ঘস্থায়ী শৈত্য বিরাজ করতে থাকে। এ কারণে খাদ্যাভাবে বিলুপ্তি ঘটে ডাইনোসর ও অন্যান্য প্রাণীর।

এভাবে আগের আরো চারটি মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে মূলত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে। কখনো বৃহৎ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বড় আকারের ভৌগোলিক পরিবর্তন (মহীসোপানের চ্যুতি), জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা ব্যাপক আকারের উল্কাপাত ইত্যাদি। (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, পৃথিবীতে এখনো এমন চারটি বিশালাকারের আগ্নেয়গিরি আছে যেগুলোর একটিও যদি পূর্ণ শক্তিতে বিস্ফোরিত হয় তাহলে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে। এ চারটি আগ্নেয়গিরির তিনটিই আবার এশিয়ায়- জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও নিউজিল্যান্ডে)।
যাই হোক, চলমান ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির প্রক্রিয়া কিন্তু নিছক প্রাকৃতিক কারণে ঘটছে না। বরং এতে মুখ্য ভূমিকা মানুষেরই। কথিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে প্রকৃতিকে যেভাবে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে, প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলা হচ্ছে তারই করুণ পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে আজকের এই মহাবিলুপ্তির প্রক্রিয়া।

আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে একদল গবেষক দেখতে পেয়েছেন, পৃথিবীর প্রাণিজগত এত দ্রুত গতিতে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে যে, অচিরেই বিশ্বের উদ্ভিদ ও জীবজগতে ম্যাস এক্সটিংশন বা মহাবিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, এবারের মহাবিলুপ্তির অন্যতম প্রথম শিকার হতে চলেছে মানুষই। এই সাড়াজাগানো গবেষণাপত্র ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় সায়েন্স অ্যাডভান্সেস নামের বিজ্ঞানপত্রিকায়।

তখন থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীবাসী মানুষ প্রকৃতি ধ্বংসের কার্যক্রম থেকে সরে আসার উপায় বের করতে পারেনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে, বিজ্ঞানীরা বলছেন- এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছরেই ৫০০ প্রজাতিরও বেশি স্থলচর প্রাণী লুপ্ত হয়ে যেতে পারে। উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের সুরক্ষায় এখনই বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া না হলে পরিবেশে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০০ বছরে ৪০০ প্রজাতির বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক নিয়মে প্রাণীদের স্বাভাবিক বিলুপ্তির হার খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। তাতেই উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি ১০০ বছরে ১০ হাজার মেরুদণ্ডী প্রাণী প্রজাতির মধ্যে মাত্র দুটি বিলুপ্ত হয়। অথচ গত এক শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের বিলুপ্তির হার প্রাকৃতিক হারের তুলনায় ১১৪ শতাংশ বেশি। গবেষণাপত্রে স্পষ্টই বলা হয়েছে, মানুষের হস্তক্ষেপের কারণেই এমন অস্বাভাবিক হারে প্রাণিজগতের বিলুপ্তি ঘটছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ওশেনিয়া দ্বীপপুঞ্জের প্রায় এক হাজার ৮০০ প্রজাতির পাখি গত দুই হাজার বছরে হারিয়ে গেছে। আদিম মানুষ এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাস করা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী যেমন- দৈত্যাকার ভাল্লুক, থলিবিশিষ্ট সিংহ ও মাংসাশী ক্যাঙ্গারু বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে পৃথিবীর চারটি প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও ৪১ শতাংশ উভচর প্রাণী বিলুপ্তির পথে।

পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ নিজের বুদ্ধিমত্তা ও কর্মপ্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে এর ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। দখল নিতে শুরু করে গোটা পৃথিবীর। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ একের পর এক জয় করে নিয়েছে বিশ্বের সমস্ত জল, স্থল, অন্তরীক্ষ। বনভূমি, জীবজগৎ, প্রাকৃতিক পরিবেশ সবকিছু তিলে তিলে ধ্বংস করে মানুষ নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে গড়ে তোলে নগরসভ্যতা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে তোলে বিশাল শিল্প-কারখানা এবং সহায়ক উপকরণ। এক জাতির ওপর আরেক জাতির এবং এক দেশের ওপর আরেক দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদগ্র মানসিকতায় গড়ে তোলে বিশাল ধ্বংসাত্মক অস্ত্রসম্ভার। বাড়তি খাদ্যের যোগান দিতে নির্বিচারে ব্যবহার করতে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক। বিষ আর বর্জ্যে ভরে ওঠে মাটি, পানি আর আকাশ। নষ্ট হয়ে যায় পরিবেশের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা, ব্যাহত হয় প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এরই অবশ্যম্ভাবী শিকার হয়ে বিলুপ্ত হতে থাকে একের পর এক প্রাণী প্রজাতি। বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ আরো বাড়বে। পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। প্রথম শিল্পবিপ্লবের শুরুতে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ কোটি। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছর পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি। এর ফলে পৃথিবীর মোট সম্পদের মানুষের ভোগের মাথাপিছু হার আরো বাড়বে।

পৃথিবীর সম্পদ ভোগের দিক থেকে এগিয়ে আছে শিল্পোন্নত ‘প্রথম’ বিশ্বের দেশগুলো। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর প্রতিটি মানুষ ভোগ করে মোটামুটি ২৭ মেট্রিক টন বস্তুগত সম্পদ। আর নি¤œ-আয়ের দেশগুলোর একজন মানুষ ভোগ করতে পারেন মাত্র দুই টন। এই ভোগের পরিমাণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ১৯৯০ সালে যেখানে বিশ্বের মানুষ মাথাপিছু গড়ে আট টন করে সম্পদ ভোগ করত, ২০১৭ সালের মধ্যে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২ টনে। জাতিসঙ্ঘ এটিকে বলেছে, উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি। কে না জানে, উন্নত বিশ্ব তাদের সৃষ্ট নানা বৈধ-অবৈধ প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর সম্পদ নানাভাবে শোষণ করে নিচ্ছে সারা দুনিয়া থেকে। কখনো উপনিবেশ সৃষ্টি করে, কখনো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, কখনো গায়ের জোরে দেশ দখল করে! এতে করে বিশ্বের পরিবেশের এবং এর ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জনজীবনে যে ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে তার দায় কিন্তু উন্নত বিশ্ব নিচ্ছে না। কখনো নেবে বলেও মনে হয় না। গোটা পৃথিবীকে চুষে খেয়ে ছিবড়ে করে দিয়ে তারা এখন ভিনগ্রহে পাড়ি জমানোর পাঁয়তারা করছে। এলন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’ রকেট মিশন তারই প্রাথমিক প্রস্তুতি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এখন মঙ্গলগ্রহে মানববসতি গড়ার স্বপ্ন ফেরি করছেন। অপরিমেয় সম্পদের মালিক কিছু মানুষ হয়তো মঙ্গলে তার তৈরি কৃত্রিম শহরের বাসিন্দা হতে পারবেন। কিন্তু উন্নত বিশ্বেরও সব মানুষকে সেই স্বপ্নের শহরে নিয়ে যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব হবে বলে এখন পর্যন্ত প্রতীয়মান হয় না।

আমাদের এই বিশ্বের জীবজগতের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে হবে এবং পৃথিবীর ধ্বংসসাধনের প্রক্রিয়া থেকে উন্নত বিশ্বকে যেকোনো মূল্যে ফেরাতে হবে। সেটা সম্ভব যদি স্বল্পোন্নত বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কখনো কোনোভাবে জেগে উঠতে এবং নিজেদের ভেতর থেকে যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে। আমাদের তো আশায় বসতি গড়ার কোনো বিকল্প আদৌ নেই!

 

 


আরো সংবাদ