২৮ অক্টোবর ২০২০

করোনা চিকিৎসায় বাংলাদেশে উন্নতি হচ্ছে

করোনা চিকিৎসায় বাংলাদেশে উন্নতি হচ্ছে - ছবি সংগৃহীত

করোনা রোগে মৃত্যু ও সংক্রমণ এখন অনেকটা কমে এলেও বাংলাদেশ পুরোপুরি বিপদমুক্ত হয়েছে, এ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। বিভিন্ন দেশে করোনা রোগের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে তা এখনো আসেনি। তবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের আলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণের আশঙ্কা করেছেন। তিনি বলেছেন, সেকেন্ড ওয়েভ সংক্রমণ শুরু হলে তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে শীত এসে গেলে করোনাভাইরাস জেঁকে বসতে পারে।

বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং ১৮ মার্চ করোনায় প্রথম মৃত্যু রেকর্ড হয়। সেই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ছয় মাসে পাঁচ হাজার ৪৪ জন মানুষ করোনায় মারা গেছেন। এ মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ৫০ বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তি। এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি। মৃত্যু হার ১.৩৯ এবং সুস্থতার হার ৭৩-৭২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা আক্রমণ শুরু হয় অন্যান্য দেশের চেয়ে দুই-আড়াই মাস পর। চীনে ৩১ ডিসেম্বর করোনার প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হওয়ার পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদস্য দেশগুলোকে সতর্ক করে। বাংলাদেশ তখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না।

মার্চ থেকে করোনা মহামারী দেখা দেয়ায় দেশব্যাপী আতঙ্ক ও ভয় ছড়িয়ে পড়ে। এ আতঙ্ক চিকিৎসকদের মধ্যেও দেখা দেয়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনিতেই নাজুক। করোনায় তাকে আরো অসহায় করে তোলে। হাসপাতালের অবস্থা কতটা ভঙ্গুর তখন টের পাওয়া যায়। দেশে করোনা চিকিৎসা প্রথম দিকে ছিলই না। লকডাউন কোয়ারেন্টিন মানুষ না মানায় সংক্রমণও হু হু করে বাড়তে থাকে। চিকিৎসাবিহীন এ অবস্থায় বিদেশী দূতাবাসের লোকেরাও ভয়ে বিশেষ বিমান বোঝাই হয়ে নিজ নিজ দেশে চলে যান।
গত দুই মাসে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে দেশকে ৬৬ দিনের জন্য একরকম লকডাউন করায় করোনাভাইরাসের বিস্তার কিছুটা ঠেকানো গেছে।

করোনা চিকিৎসায় আশার আলো
বাংলাদেশে করোনা চিকিৎসা এখন অনেকটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করেই বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উন্নত দেশে যেসব ওষুধ করোনা রোগীদের দেয়া হয়েছে এখানেও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা চিকিৎসায় শুরু হয়েছে প্লাজমা থেরাপি। চিকিৎসকরা নিজেদের ওপর এখন আস্থাশীল এবং করোনা চিকিৎসায় তাদের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেছে। করোনার কোন উপসর্গে কী চিকিৎসা দিতে হবে, কী ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে সেটি এখন তাদের জানা। কিছু দিন আগেও হাসপাতালগুলো এ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। চিকিৎসার সেই বেহালদশা অনেকটাই কেটে গেছে। করোনার ভ্যাকসিন আগে আনার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এখন শুধু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচ নয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালেও ভালো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

করোনা মহামারীর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরাই সম্মুখ সারির যোদ্ধা। তাদের অনেক ত্যাগ রয়েছে। করোনা চিকিৎসা করতে গিয়ে বাংলাদেশে ৮৮ জন চিকিৎসক মারা গেছেন বিএমএর হিসাবে।
দেশের চরম বিশৃঙ্খলা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন ভাইরাস করোনা মহামারী মোকাবেলায় চিকিৎসা পদ্ধতি কী হবে তা চিকিৎসকদের বুঝে উঠতে সময় লাগে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (এনএইচএস) কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশী চিকিৎসকদের ৩০-৪০ জনের একটি দল। তারা আমেরিকায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশী চিকিৎসক এবং দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করে একটি করোনাভাইরাস চিকিৎসা পদ্ধতি ডেভেলপ করেছেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল, ইংল্যান্ডের চিকিৎসক ডা: শাকিল ফরিদ বলেন, আমরা সম্মিলিত চিন্তায় ‘ফাইটিং কোভিড-১৯ অন দ্য ফ্রন্টলাইন’ শিরোনামে একটি চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরি করেছি, যা চিকিৎসায় কাজে দিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বিএসএমএমইউ হাসপাতালে এখন কোভিড-১৯ চিকিৎসা খুবই উন্নতমানের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, গত জুলাইয়ে ৩৭০ শয্যার ‘করোনা সেন্টার’ চালু করা হয়। এর মধ্যে ২১ শয্যার একটি উন্নতমানের কোভিড-১৯ আইসিইউ রয়েছে। এখন চালু হয়েছে ‘পোস্ট কোভিড ফলোআপ ক্লিনিক’। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন বসাতে দেড় মাস সময় লেগেছে। প্রতিটি কেবিনে অক্সিজেন লাইন দেয়া সম্ভব হয়েছে। অক্সিজেন হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলায় ব্যবহার করা যেত না। প্রকৃত সেবা দিতে হলে হাসপাতালকে উপযুক্ত চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে সুসজ্জিত করতে হয় এবং তা করা গেছে।

তিনি জানান, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৮০ ভাগ রোগী সুস্থ হতে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ লাগে। রোগীরা যদি দ্রুত সুস্থ হতেন তা হলে আরো বেশি মুমূর্ষু রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব হতো। প্রতিদিন বেড ও ওষুধসহ একজন আইসিইউ করোনা রোগীর খরচ ১৫ হাজার টাকা।

বিএসএমইউএর আইসিইউ প্রধান অধ্যাপক এ কে এম আখতারুজ্জামান বলেন, বিএসএমএমইউর আইসিইউ খালি থাকে না। প্রতিদিন গড়ে চার-ছয়জন রোগী মারা যায়। বয়স্ক জটিল রোগীরা অনেক দেরি করে হাসপাতালে আসায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। সারা দেশে এখন করোনা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোতে শয্যা রয়েছে ১৪ হাজার ২৫৫টি। আর নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ রয়েছে ৫৪৭টি। করোনা রোগী কমে যাওয়ায় অনেক হাসপাতালের বেড এখন খালি।

যে ওষুধে হচ্ছে করোনা চিকিৎসা
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তবে সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা পুরনো কিছু ওষুধই রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে তাদের সুস্থ করে তুলতে ভূমিকা রাখেন। অনেক ক্ষেত্রেই এর সফলতা পাওয়া যায়। বেশ কয়েকটি ওষুধ পরীক্ষামূলক প্রয়োগে কার্যকর হওয়ায় এসব ওষুধে জরুরি চিকিৎসা শুরু হয়। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে এসব ওষুধ ব্যবহার করে ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও এসব ব্যবহার করে রোগী সুস্থ করে তোলা হচ্ছে। এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে আইভারমেকটিন, ডক্সিসাইক্লিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, রেমডেসিভির, ফেভিপিরাভির, টসিলিজুমার, ডেক্সামেথাসন, হাইড্রোক্লোরোকুইন, ক্লেক্সেইন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন, মন্টেলুকাস্ট, জিংক ও ভিটামিন-ডি। করোনা রোগের চিকিৎসায় অস্ট্রেলীয় ওষুধ আইভারমেকটিন বিস্ময়কর একটি ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একসাথে ডক্সিসাইক্লিন ও জিংক যোগ করে রোগীদের দেয়া হয়। মৃদু থেকে মধ্যম পর্যায়ের করোনা রোগীরা এ ওষুধ সেবনে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। ফলে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব হাসপাতালে এ ওষুধ দেয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, অ্যান্টিপ্রটোজোয়াল ক্যাটাগরির জেনেরিক আইভারমেকটিনের সাথে ডক্সিসাইক্লিন ওষুধ দেশে এখন করোনা চিকিৎসায় সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তালিকায় করোনা রোগীদের জন্য এটি রয়েছে শীর্ষে। বাংলাদেশে যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে বাসাবাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তাদের এই ওষুধ ব্যবহারের প্রথম পরামর্শ দেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: তারেক আলম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, অস্ট্রেলিয়ান মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সূত্রে এ ওষুধ সম্পর্কে অবহিত হই। আমার এক বন্ধু করোনায় আক্রান্ত হলে প্রথমে আমি তাকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহার করতে বলি। কিন্তু তিনি বলেন, এ ওষুধ নেবেন না। তারপর তাকে আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন খেতে বলেছি। এ ওষুধ খাওয়ার চার দিন পর তার করোনা নেগেটিভ হয়। তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান। এরপর বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের মধ্যে আইভারমেকটিন সিঙ্গল ডোজের সাথে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগ করে দেখতে পাই, তিন দিনে ৫০ শতাংশ লক্ষণ কমে গেছে এবং চার দিনে করোনাভাইরাস টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে। সেখান থেকে ভরসা পেয়ে আত্মীয়স্বজন যারা করোনা আক্রান্ত তাদের ওষুধটি ব্যবহারের পরামর্শ দেই। দেড় মাসে ৬০ জন রোগী এ ওষুধ খেয়ে ভালো হয়েছেন। করোনায় মৃদু ও মধ্যম আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালগুলোতে এটি অপরিহার্য ওষুধ।

অধ্যাপক ডা: এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, আইভারমেকটিন এখন সবাই ব্যবহার করছেন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ বলেন, করোনা উপসর্গ থাকলেই আমরা হাসপাতালে রোগীদের আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন দিয়ে থাকি। যেহেতু করোনার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত ওষুধ নেই, যতটুকু ভরসা এটাই পাওয়া যাচ্ছে। স্কয়ার হাসপাতালের অধ্যাপক ডা: সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, ক্যান্সারের নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি যারা করোনায় আক্রান্ত তাদের আইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন খেতে দিয়ে করোনা নেগেটিভ করতে পেরেছি। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: মো: রাশিদুল হাসান বলেন, আইভারমেকটিন, রেমডেসিভির ও ফেভিপিরাভির করোনা চিকিৎসায় বেশ কাজ দিচ্ছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ডেক্সামেথাসন ওষুধটিও ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা চিকিৎসায় জাতীয় নির্দেশিকাতেও এ ওষুধটি রয়েছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক ২০০ করোনা রোগীর ওপর এ ওষুধ প্রয়োগ করে ৪০ থেকে ২৮ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমিয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটির মহাসচিব ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বলেন, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ডেক্সামেথাসন দেয়া হচ্ছে। এ গোত্রভুক্ত ওষুধ ওরাডেক্সন ও মিথাইল প্রেডনিসোলোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন প্রথম দিকে করোনার জন্য ব্যবহার করা হলেও এর কার্যকারিতা না পাওয়ায় এটা আর দেয়া হচ্ছে না।

রেমডেসিভিবের জাদু
করোনাভাইরাস চিকিৎসায় মুমূর্ষু রোগীদের জন্য এখন বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে ‘রেমডেসিভির ইনজেকশন’। যেসব করোনা রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা ৯৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং যাদের আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেটরে রাখা হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে রেমডেসিভির ব্যবহার করে চিকিৎসকরা দেখতে পান, অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এটি রোগীর শিরায় ইনজেকশন হিসেবে দেয়া হয়। রেমডেসিভির ইনজেকশন বাংলাদেশই শুধু নয়, সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছে।

রেমডেসিভির অ্যান্টিভাইরাল বা ভাইরাস প্রতিরোধী একটি ওষুধ। ইবোলা রোগের চিকিৎসার জন্য ওষুধটি তৈরি হয়েছিল। ২০১৬ সালে ইবোলা ও ২০১৭ সালে সার্স কোভিড টু ভাইরাস প্রতিরোধে এটি কার্যকর ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গিলিয়েড সায়েন্সের এই ওষুধটি তাই এবার করোনা চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেসের উদ্যোগে করোনা রোগীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে আশাপ্রদ ফল পাওয়া যায়। দেশটির সংক্রামক রোগবিষয়ক শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউসি করোনা চিকিৎসায় রেমডেসিভিরের কার্যকর ও ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা ঘোষণা করার পরপরই এর ব্যবহার শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এফডিএ জরুরি ভিত্তিতে রেমডেসিভির ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। এরপর বিশ্বের প্রায় সব দেশেই রেমডেসিভির ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখা গেছে, করোনার জটিল রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধটি যত আগে দেয়া হয়েছে, ততটাই সুফল পাওয়া গেছে। আগেভাগে ওষুধটি প্রয়োগের ফলে ৬২ ভাগ রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। যেসব রোগীকে কিছু দেরিতে দেয়া হয়েছে, তাদের ৪৯ ভাগ হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। ওষুধটি ভালো ফল দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার গিলিয়েডের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উৎপাদিত সব ওষুধ কিনে ফেলেছে।

বাংলাদেশের প্রায় সব হাসপাতালের আইসিইউতে রোগীদের জন্য এ ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধটি অনুমোদনের পরপরই বাংলাদেশে এটি উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং এসকেএফ, বেক্সিমকোসহ বাংলাদেশের আটটি কোম্পানি সরকারি অনুমোদন নিয়ে রেমডেসিভির উৎপাদন শুরু করে। এসকেএফের ওষুধটির বাণিজ্যিক নাম ‘রেমিভির’ এবং বেক্সিমকোরটির নাম ‘বেমসিভির’। গুরুতর রোগীদের জন্য পাঁচ অথবা ১০ দিনের রেমডেসিভির ডোজ প্রয়োজন হয়। ভারতেও ‘রেমডিসিভির’ এবং ‘টসিলিজুমাব’ ওষুধ দু’টির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। টসিলিজুমাব নাভীতে ইনজেকশন আকারে দেয়া হয়।

প্লাজমা থেরাপি ও ভ্যাকসিন
ওষুধ প্রয়োগে করোনা চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের প্লাজমা থেরাপিও দেয়া হচ্ছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে যারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের শরীরে একধরনের অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরি হয়। এমন ব্যক্তির রক্ত থেকে সংগ্রহ করা হয় প্লাজমা। করোনা রোগীর শরীরে সেই অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করলে তার শরীরেও অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এতে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ঢাকা মেডিক্যালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্লাজমা থেরাপি করোনা রোগীদের দেয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা সংগ্রহের ব্যাপারেও বাংলাদেশ উদ্যোগী হচ্ছে। এ ব্যাপারে ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এরই মধ্যে বলেছেন, যে দেশে প্রথম টিকা তৈরি হবে, সেখান থেকেই কিনতে আমরা প্রস্তুত। টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছে। করোনার টিকা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ চাইবেন বলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। ১৭ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি কমিটির সভায় ভ্যাকসিন দ্রুত পেতে অগ্রিম টাকা জমা দিতে সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ভ্যাকসিনের জন্য দেশে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার একটি কোল্ড চেইনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেয়া হয়। দেশে এ ব্যবস্থা এখন নেই। তা ছাড়া সরকারকে কোনো একটা ভ্যাকসিনের দিকে না থাকিয়ে একাধিক উৎসের সাথে যোগাযোগ ও ভ্যাকসিন সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালাতে বলা হয়। একই সাথে দেশে আরো বেশি করোনা টেস্ট এবং অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন টেস্ট করারও পরামর্শ দেয়া হয়। এ ছাড়া সংক্রমণ ৫ শতাংশের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যা এখন ১২ শতাংশে রয়েছে। একই সাথে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, কোয়ারেন্টিন, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ও বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব


আরো সংবাদ