১৯ অক্টোবর ২০২০

সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসন : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসন : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ - ছবি : সংগৃহীত

সারা বছরের সঞ্চিত পুঞ্জীভূত হাহাকার, হতাশা, দুঃখ-বেদনা আর অতি ক্ষীণ আশা বুকে তারা একবারই আসেন, ৩০ আগস্ট ‘বিশ্ব গুম দিবসে।’ ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা তার আশপাশে অশ্রুভারাক্রান্ত হৃদয়ে সমবেত হন। তাতে দেখা যায়, কোনো ছোট্ট শিশু তার পিতার ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে আছে মায়ের কোলে। মা ও শিশু স্তব্ধ পাষাণ। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। আমার পিতাকে, আমার স্বামীকে ফিরে পেতে চাই। একই রকম ছবি দেখা যায় কোনো কোনো অশীতিপর প্রবীণের হাতে। চোখে অশ্রু।

আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। কোনো বোনের হাতে ভাইয়ের ছবি। অশ্রুভেজা চোখ : আমার ভাইকে ফিরে পেতে চাই। জীবিত না পাই, তবু তার লাশটা ফিরে পেতে চাই। শেষবার তাকে দেখে নিজেরাই তার দাফন সম্পন্ন করতে চাই। আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দাও। যাদের ছবি হাতে তারা আসেন, সেসব ছবির মানুষ সবই গুম হয়ে গেছেন। কোনো একদিন গভীর রাতে পোশাকে বা সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা এসে তাদের জোর-জবরদস্তি করে তুলে নিয়ে গেছে নিরুদ্দেশের দিকে। তার পর থেকে পরিবারের অধীর অপেক্ষা। কিন্তু তারা আর ফেরেননি। গুম হয়ে গেছেন। ফেরেননি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ইলিয়াস আলী, ফেরেননি ঢাকার কমিশনার চৌধুরী আলমসহ গুম হওয়া শত শত মানুষ। গুম হয়ে গেছেন বিএনপির সাদেকুল ইসলাম, গুম হয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। যদি বা কেউ ফিরে এসে থাকেন, তবে তাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে সারা জীবনের জন্য। ফিরে এসে কেউ আর মুখ খোলেননি। সরকার সংবাদপত্রগুলোকেও থামিয়ে দিয়েছে। তারা যেতে পারেননি ভুক্তভোগী অপহৃতের কাছে। বের হয়নি কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ফিরে এসেও যেন ফের গুম হয়ে গেছেন তারা। এখন সরকারি ভাষ্যই প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করে কি? গুম হওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে মনে হয় না তাদের ভেতরে মানবিকতা আছে। মনে হয় তারা হৃদয়হীন, নিরেট পাষাণ। পৃথিবীর যেসব দেশে নিরেট স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু আছে, তার প্রায় সবখানেই একই চিত্র। ভিন্নমতের মানুষজনকে গুম করে দেয়া, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জিম্মি করে অর্থ আদায়, ধর্ষণ, অঙ্গহানি ইত্যাদি নৈমিত্তিক ঘটনা। স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী এসব কাজে প্রধানত ব্যবহার করে তাদের পেটোয়া আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে। এভাবে ব্যবহৃত হতে হতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত অর্থবিত্তের লোভে কিংবা তাদের অপকীর্তি ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় নিজেরাই গুম-খুনের সাথে জড়িয়ে পড়ে।

এর বড় উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। আর সর্বশেষ, সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যার ঘটনা। এসব ঘটেছে সরকারি সরাসরি নির্দেশনার বাইরে; আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নিজস্ব উদ্যোগে। অর্থবিত্তের লোভে। তবে আগে যেহেতু তারা সরকারের নির্দেশে নানা অপকর্ম করেছে, ফলে তাদের প্রতি সরকারের সুর নরম। তাদের কেউ কেউ জেলে নয়, হাসপাতালে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। মামলা চলছে। কিন্তু এ দেশে সংবিধান আছে। সে সংবিধানে মানুষের বেঁচে থাকার, জীবন-জীবিকার মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি আছে। বিচার বিভাগ আছে। আমরা সাধারণত বলি, বিচার বিভাগ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু নিম্ন আদালতে প্রশাসনের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ আছে, পদ বা চাকরি হারানোর ভয় আছে। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ফলে আইনের শাসন অবিরাম পরাভূত হতে থাকে। মানুষের আর কোনো অবলম্বন থাকে কি? বাংলাদেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সংগঠনের নাম ‘মায়ের ডাক’। তারা জানিয়েছেন, ২০১৩ সাল থেকে পাঁচ বছরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭২৭ জন। আর গুম হওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ ফিরে এলেও বেশির ভাগই নিখোঁজ। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাবে, গত ৯ বছরে গুম হয়েছেন ৪৩২ জন। এর মধ্যে সন্ধান মিলেছে ২৫০ জনের। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৩১২ জন। এ সময় ক্রসফায়ারে প্রাণ গেছে এক হাজার ৮৩৪ জনের। ধর্ষণের শিকার ১৫৪ জন। ক’জন বিচার পেয়েছেন! ক’জনইবা পাবেন। এসব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নানা সময় নানা কথা বলেছেন। কখনো বলেছেন, ‘পারিবারিক কলহের জেরে (গুম ব্যক্তি) আত্মগোপন করে আছেন’। এখানে পাওনাদারের দাবি না মেটাতে পেরে ব্যবসায়ী নিখোঁজ হয়।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক করে কেউ কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়। গুম কাকে বলবেন, বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক টাইমস গত ৩০ জুলাই এক সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের অব্যাহত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্তে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের তদন্তকারীদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘকে সম্মান করে থাকলে তার সরকারের তরফ থেকে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানানো উচিত। জুলাইতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে গুমের ঘটনার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে। সে রিপোর্ট সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় নেমেছে।’ তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ এই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। তিনি স্থানীয় একটি সংবাদপত্রকে বলেন, বিএনপির একটি গোষ্ঠীই রয়েছে, যারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সম্মান নষ্ট করতে এসব তথ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে বিভ্রান্ত করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা আছে সেগুলো তারই অংশ। সবাই যে, নিখোঁজ হয়নি সে বিষয় আমাদের কাছে তথ্য আছে। বাংলাদেশ সরকার সবসময় সততার সাথে কাজ করে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস আরো বলেছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশে ৩২০ জনেরও বেশি মানুষ আইনবহির্ভূতভাবে আটক বা গুম হয়েছে। নিজ বাড়ি বা সড়ক থেকে সাদা পোশাকে র‌্যাব বা গোয়েন্দা বিভাগের সাদা পোশাকের সদস্যদের তুলে নেয়া এসব ভিকটিমের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্যরা যেমন আছেন, তেমনি আছে সন্দেহভাজন অপরাধী ও ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গুম হওয়া ৯০ জনের মধ্যে একজন হলেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মীর আহমদ বিন কাসেম। তারও আগে গুম হয়েছেন, সাবেক ব্রি. জে. আবদুুল্লøাহিল আমান আযমি। তারও কোনো সন্ধান মেলেনি। চার বছর আগে মীর আহমদ বিন কাসেমকে তার বাড়ি থেকে স্ত্রী, বোন ও দুই মেয়ের সামনে দিয়ে কিছু লোক তুলে নিয়ে যায়। তারা এ সময় নিজেদের পরিচয় দিতে
অস্বীকার করেন। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ৯০ জনের মধ্যে ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে আর ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এই প্রবণতায় উদ্বিগ্ন জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে ক্রমবর্ধমান গুমের ঘটনা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে গুমের ঘটনা আরো বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। সরকার এ ধরনের অভিযোগের জবাবে অভিযোগকারীদের নিন্দা জানায়, যা আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের আইনের প্রতি পরিহাস হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

তাহলে মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উপায় কী? জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বিধান কিভাবে নিশ্চিত করা যায়? এখন সম্ভবত দরকার সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধ আর ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য। আজ বিএনপি বা জামায়াত নেতাকর্মীরা বিপন্ন; কিন্তু কাল যে সাদা পোশাকে কেউ আপনার ঘরে হানা দিয়ে কাউকে তুলে নিয়ে যাবে না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যি

[email protected]


আরো সংবাদ