২৯ নভেম্বর ২০২০

বিচারবহির্ভূত হত্যা

বিচারবহির্ভূত হত্যা - ছবি : নয়া দিগন্ত

দেশে ‘ক্রসফায়ার’ আর ‘এনকাউন্টার’ এখন বহুল প্রচলিত। বিশ্বের আর কোনো দেশে শব্দগুলোর এমন অতিব্যবহার বা অপব্যবহার কমই দেখা গেছে। শব্দ দু’টির অর্থ যাই হোক, সাম্প্রতিক সময়ে তা বিচারবহির্ভূত হত্যা হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে ব্যাপকভাবে। এ বিষয়ে একজন রাজনীতিকের আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে। তিনি ২০১৭ সালে দৈনিক মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘... অনেক ক্যাডার আর মাস্তান ছিল। এখন সব পানি হয়ে গেছে। কারো ‘টুঁ’ শব্দ করার সাহস নেই। পাঁচজনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি, আরো ১৪ জনের লিস্ট করেছি। এখন সব ঠাণ্ডা...।’ তার এ বক্তব্য থেকে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ এর স্বরূপ খুবই স্পষ্ট; অপ্রকাশ্য থাকেনি কোনো কিছুই।

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এমনকি তিনি দায়ীদের ‘অ্যাকাউন্টেবল করতে হবে’ বলে দাবিও করেছেন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) গত ১৮ মাসের বিচারবহির্ভূত হত্যার যে পরিসংখ্যান দিয়েছে এ বিষয়ে মন্ত্রীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি এই ফোরাম জানিয়েছে, গত বছরের (২০১৯) জানুয়ারি থেকে এ বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ৫৩৫ জন। এতে বলা হয়, সঙ্ঘটিত হত্যাগুলোর মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে ৪৮১ জনের, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের এবং অন্যান্য (গুলি, অসুস্থ ও গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার) ৩১ জনের। এর মধ্যে গত সাড়ে পাঁচ মাসেই ১১ জন নির্যাতনে নিহত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রায় দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে। কিন্তু সরকার এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে নিজেদের দায়সারার চেষ্টা করেছে। ফলে সভ্যতার কলঙ্কজনক অনুষঙ্গের ইতি টানা যায়নি বরং এর পরিসর আরো বেড়েছে। সম্প্রতি সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খানের নৃশংস হত্যার ঘটনা সে দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এই হত্যার ঘটনায় পুলিশের অবিশ্বাস্য ও অতিরঞ্জিত ভাষ্য নিয়ে যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, তা বিচারবহির্ভূত হত্যার বিতর্ক নতুন করে উস্কে দিয়েছে; যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের জন্য মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র হয় যে, আর্মি চিফ ও পুলিশের আইজিকে এ বিষয়ে যৌথভাবে একটি সংবাদ সম্মেলনও করতে হয়েছে। এমনকি ঘটনা যে খুবই উদ্বেগের তাও তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, ‘এ ঘটনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ এমন কোনো আচরণ করবে না, যার মাধ্যমে দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরে।’

রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক ও অপরাধ দমন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণেই এনকাউন্টারের নামে আমাদের দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর কথিত বন্দুকযুদ্ধের তকমা ও নিহত ব্যক্তিকে ভয়ঙ্কর অপরাধী ও সমাজবিরোধী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা লক্ষ করা যায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই। সিনহা রাশেদের হত্যার ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়নি।

এই হত্যা নিয়ে সেনাপ্রধান ও পুলিশপ্রধানের যৌথ বক্তব্যে বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধের দায় ব্যক্তির; প্রতিষ্ঠানের নয়। তাদের এ বক্তব্য যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ অপরাধ দমনের নামে এই বেআইনি তৎপরতা যেহেতু একটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা প্রবণতা, সেহেতু এর দায় শুধুই ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান দায়মুক্ত থাকতে পারে না। যেসব ব্যক্তি এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তাদের নিয়ন্ত্রণ বা নিবৃত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয় না পেলে এ ধরনের অপরাধ ঘটা সম্ভব না। তাই এসব অপরাধের জন্য ব্যক্তির ওপর দায় চাপিয়ে প্রতিষ্ঠানের দায়মুক্ত থাকার সুযোগ নেই। কারণ অপরাধীরা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করেই এসব ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হয়।

মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য অপরাধ দমনের নামেই ক্রসফায়ারের মতো নিন্দনীয় ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকারের উদাসীনতা ও আশকারা পেয়েই তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। যার জ্বলন্ত প্রমাণ মেজর সিনহা রাশেদ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি টেকনাফ থানার সদ্য বরখাস্তকৃত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ। ‘টাকা দাও, না হয় বাড়িতে অগ্নিসংযোগ কিংবা গায়েবি হামলা হবে। যদি এতে কাজ না হয় তা হলে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে’ এমন ঘোষণা দিয়েই তিনি টেকনাফে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছরে কক্সবাজারে কথিত ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮৭ জনের। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলাতেই মারা গেছেন ১৬১ জন। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এখন যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা আরো ভয়াবহ।

মূলত গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি এবং আইনের শাসনের অভাবেই এমন অসাংবিধানিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব এলেও তা বাস্তবসম্মত মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন আলাদা তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে শীর্ষ পদে থাকা সব সদস্যই অবগত আছেন যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত করবেন তাদেরই কোনো সহকর্মী। তাই তদন্ত প্রতিবেদন তাদের বিরুদ্ধে যাবে না ধরে নিয়েই তারা অতিউৎসাহী হয়ে অপরাধ চালিয়ে যান। এ ছাড়া পরোক্ষ প্রশ্রয়ের আরেকটি বহুল প্রচলিত ব্যবস্থা হচ্ছে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সাময়িক প্রত্যাহার। সঙ্গতকারণেই তারা অপরাধকর্মে শঙ্কিত হন না।

মেজর সিনহা হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছেন, স্বল্পতম সময়ে সত্য উদঘাটনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তাদের এমন তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। প্রতিটি ঘটনায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি একই রকম তৎপরতা বা প্রতিক্রিয়া দেখাত তা হলে এসবের পুনরাবৃত্তি ঘটত না। জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির দেয়া তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সময়কালে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৮৮ জন। কিন্তু এসব ঘটনার কারণ কখনোই ক্ষতিয়ে দেখা হয়নি বা অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের মৃত্যু আর কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রেই না ঘটে, তা নিশ্চিত করার একটাই উপায়, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিষিদ্ধ করা। কিন্তু তা করা হয়নি বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে।

মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন; যা প্রাথমিকভাবে ইতিবাচকই বলতে হবে। তবে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার বিষয়টি নিয়ে কোনো রকম কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার যে ঐতিহ্য বহু যুগ ধরে চলে আসছে, এ ঘটনায় তা অবশ্যই ক্ষুণœ হয়েছে। অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই উদ্ভূত পরিস্থিতির অবসান হওয়া সম্ভব। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

সেনাপ্রধান বিষয়টিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু টিআইবি বলছে, এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই, বরং তা বিচারবহির্ভূত হত্যার অপসংস্কৃতিকে স্বাভাবিকতায় রূপান্তরের একটি নজির মাত্র। এ বক্তব্যের পক্ষে টিআইবি গণমাধ্যমের খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সাথে শতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৭ জন। দেশের সব নাগরিকের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার যে অধিকার সংবিধান দিয়েছে, নিহতরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নিহতদের সবাই মাদকের ব্যবসায় জড়িত ছিলেন না। চাঁদা না দেয়ায় মানুষকে ‘ক্রসফায়ারে দেয়ার’ ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। মেজর সিনহার হত্যার ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র।

এ ঘটনায় আদালতে হত্যা মামলা করেছে মেজর সিনহার পরিবার। মামলার এজাহারে ঘটনার যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তাতে মনে হবে, পুরো ঘটনাটি পুলিশের শক্তি প্রদর্শনের একটি মহড়া ছিল। সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে তারা কোনোভাবেই গুরুত্ব দেয়নি। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ যে সেখানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তা তার অতীতের কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট। গত দুই বছরে দেড় শতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ঘটেছে এ থানা এলাকায়। এমনকি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসে বন্দুকযুদ্ধের কাহিনী সাজিয়ে রাজনৈতিক কর্মীকে মেরে ফেলার গুরুতর অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। মেজর সিনহা হত্যা নিয়ে সারা দেশেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই মেজর সিনহা হত্যা মামলার যথাযথ তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যমান দায়হীনতা ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি রোধে সরকারের পক্ষ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সংবিধান ও মানবাধিকারের মানদণ্ড এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্দেশ দেয়াটা জরুরি; অন্যথায় কিছু সদস্যের অপরাধপ্রবণতা ও স্বেচ্ছাচারিতা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ক্রমেই জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। আর তা রাষ্ট্রের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়।

[email protected]


আরো সংবাদ