১৯ অক্টোবর ২০২০

সিনহা হত্যাকাণ্ডের কিনারা হবে তো?

সিনহা হত্যাকাণ্ডের কিনারা হবে তো? - ছবি : নয়া দিগন্ত

গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর অব. মেজর ও সাবেক এসএসএফ কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় রাশেদ খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণবিষয়ক ফিল্ম নির্মাণ করছিলেন। প্রায় এক মাস ধরে তারা ছিলেন কক্সবাজারের হিমছড়ির এক রিসোর্টে। ঘটনার দিন সিনহা ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত গিয়েছিলেন টেকনাফ। বাকি দু’জন রিসোর্টেই রয়ে গিয়েছিলেন। পথে তাদের একটি বিজিবি চেকপোস্টে থামানো হয়। সেখানে সিনহার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তারা তাদের ছেড়ে দেন।

এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে যত দূর জানা গেছে, তা হলোÑ রাত ৯টার দিকে মেজর অব. সিনহা শামলাপুর চেকপোস্টে আসেন। তখন তাকে গাড়ি থামানোর সঙ্কেত দেন এর ইনচার্জ লিয়াকত আলী। সিনহা তার পরিচয় দিলে প্রথমে তাকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়। কিন্তু পরক্ষণেই গাড়িটিকে আবার থামানোর জন্য হাত তোলেন লিয়াকত। মেজর সিনহার সঙ্গী সিফাত নেমে গাড়ির পেছন দিকে যান। তখন লিয়াকত সিনহাকে হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসতে বলেন। সিনহা গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসতেই লিয়াকত তার শরীরে পরপর চার রাউন্ড গুলি চালান। এর আগে সিনহা নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর হিসেবে পরিচয় দিলে ইন্সপেক্টর লিয়াকত টিটকারি দিয়ে বলেন, ‘তোমার মতো বহুত মেজর হিসেবে আমার দেখা আছে। এখন আমি তোমাকে দেখাব কিভাবে খেলা হয়।’ তার পরপরই তিনি সিনহার শরীরে চারটি গুলি করেন। কিন্তু পুলিশেরই সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, সিনহার শরীরে ছয়টি গুলির চিহ্ন আছে। তার চারটি সামনের দিকে। বাকি দু’টি পেছনের দিকে। তবে কি সিনহা মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য, তিনি উপুড় হয়ে পড়ে গেলে পুলিশ তার পিছে আরো দুই রাউন্ড গুলি চালিয়েছে?

এ ঘটনায় পুলিশ পক্ষ গৎবাঁধা অবস্থানই নিয়েছে। তারা বরং উল্টো মেজর সিনহা, সিফাত এবং রেস্টহাউজে থাকা আরো দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক মামলা করেছেন। এতে তারা তিন ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে দেখায়। তাদের একজন আবার পুলিশের সোর্স। কিন্তু এলাকায় গিয়ে ওই তিনজনের একজনকেও পাওয়া যায়নি। তারা সবাই বাড়িতে তালা দিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন। সাক্ষী ১০ গজ দূরের এক মসজিদের মুয়াজ্জিনও। তিনিও এলাকা ছেড়েছেন। পুলিশের অভিযোগে বলা হয়নি, মেজর সিনহা গুলি করেছিলেন। বলা হয়েছে, তিনি আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেছিলেন। পুলিশ ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছে’। অভিযোগে পুলিশ বলেছে, তাদের সাথে ৫০ পিস ইয়াবা ও গাঁজাও ছিল।

এ ঘটনায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রাথমিক তদন্তের পর যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে এসে মেরিন ড্রাইভ সড়কের নীলিমা রিসোর্টে দলসহ ওঠেন রাশেদ খান। প্রায় এক মাস তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেছেন। ৩১ জুলাই বিকেলে সঙ্গী সিফাতকে নিয়ে রাশেদ খান কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে যান। রাশেদের পরনে ছিল কমব্যাট টি-শার্ট, কমব্যাট ট্রাউজার ও ডেজার্ট বুট। ওই সন্ধ্যায় তারা শুটিং শেষ করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পাহাড় থেকে নেমে আসার সময় স্থানীয় কয়েকজন লোক তাদের ডাকাত সন্দেহ করে চিৎকার এবং শ্যামপুর পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। পাহাড় থেকে নেমে রাশেদ সিফাতকে নিয়ে নিজের গাড়িতে করে কক্সবাজারের দিকে রওনা দেন। রাত ৯টার দিকে তারা শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই ডাকাত প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিলেন লিয়াকতসহ পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের সঙ্কেত পেয়ে রাশেদ খান গাড়ি থামান এবং নিজের পরিচয় দিলে প্রথমে তাদের চলে যাওয়ার সঙ্কেত দেয়া হয়। পরে লিয়াকত পুনরায় তাদের থামান এবং তাদের দিকে পিস্তল তাক করে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। সিফাত হাত উঁচু করে নেমে গাড়ির পেছন দিকে চলে যান। এরপর মেজর সিনহা নেমে এলে লিয়াকত আলী তাকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি করেন। মরদেহের শরীরের উপরের অংশ রক্তাক্ত এবং বুক ও গলায় গুলিবিদ্ধ ছিল। হাতকড়া লাগানোর দাগও ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রকাশ, মেজর সিনহাকে গুলি করার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে এসে হাজির হন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি তীব্র আক্রোশে প্রথমে মেজর সাহেদের পড়ে থাকা দেহের ওপর কয়েকটি লাথি মারেন। পরে তার বুট জুতা দিয়ে রাশেদের মুখ পিষে দেন। পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ওসি প্রদীপের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন ওই এলাকার ইয়াবা চোরাচালান নিয়ে। তাতে প্রদীপ যে এই কারবারে জড়িত, তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ফলে প্রদীপ মেজর রাশেদকে হত্যার জন্য নিশ্চিদ্র ফাঁদ পাতেন এবং শেষ পর্যন্ত রাশেদকে খুন করেছেন।

এ দিকে মেজর রাশেদকে গুলি করার পর ইনচার্জ লিয়াকত রাত সাড়ে ৯টায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে ওসি প্রদীপের অফিসিয়াল নম্বরে ফোন করেন। তারা তিন মিনিট কথা বলেন। এরপর ৯টা ৩৩ মিনিটে মালখানা ইনচার্জ কনস্টেবল আরিফের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করেন। তার সাথে এক মিনিট কথা বলেন। এরপর লিয়াকত ৯টা ৩৪ মিনিটে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করেন। তারা তিন মিনিট কথা বলেন। কথোপকথনে লিয়াকত ঘটনা সম্পর্কে এসপিকে জানান। কিন্তু সেখানে মাদক ও অস্ত্র পাওয়ার কথা ফোনে উল্লেখ করেননি। ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাথেও কথা হয় এসপি এ বি এম মাসুদ হোসেনের। তাদের কথোপকথনের বিবরণ দৈনিক ইত্তেফাক থেকে তুলে দেয়া হলো-

প্রদীপ : আদাব স্যার।
মাসুদ : কী আপনি। এমন কী হইছে বলেন?
প্রদীপ : স্যার লিয়াকতরে গুলি করছে নাকি স্যার। আমি যাচ্ছি ওখানে।
মাসুদ : কে?
প্রদীপ : ওই যে স্যার লিয়াকত। স্যার ইয়াতে, চেকপোস্টে একটা গাড়িকে সিগনাল দিছে। সিগনাল দেয়ার পর গাড়ি থেকে তাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করছে। ওই সময় আমিও তাকে বললাম, তুমি তাড়াতাড়ি ওকে গুলি করো। সেও নাকি তাকে গুলি করছে স্যার। আমি যাচ্ছি স্যার। ওখানে স্যার।
মাসুদ : যান, যান।

যদিও ওসির বক্তব্যের সাথে মিল নেই লিয়াকতের। লিয়াকত বলেন, মেজর সিনহা পিস্তল তাক করায় তাকে গুলি করেন। এসপি মাসুদের সাথে লিয়াকতের কথোপকথন নিম্নরূপ-
লিয়াকত : আসসালামু আলাইকুম স্যার, স্যার।
মাসুদ : বলো।
লিয়াকত : এখানে একটা প্রাইভেট কার আসে স্যার, ‘ঢাকা মেট্রো’ লেখা। আর্মির পোশাক টোশাক পরা। সে ওই বোরখা খুলে ফেলছে। পরে যখন তাকে চার্জ করছি, সে মেজর পরিচয় দিয়ে গাড়িতে চলে যেতে চাইছিল। পরে অস্ত্র তাক করছিল। আমি গুলি করছি স্যার। একজন ডাউন করছি। আর একজনকে ধরে ফেলছি স্যার। স্যার, আমি কী করব স্যার। আমাকে পিস্তল তাক করছে। পিস্তল পাইছি তো স্যার।
মাসুদ : আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাকে গুলি করছে, তোমার গায়ে লাগে নাই। তুই যেইটা করছ, সেটা তার লাগছে।
লিয়াকত : লাগছে স্যার, লাগছে স্যার।
মাসুদ : হ্যাঁ।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ঘটনাটির তদন্ত হচ্ছে। ঘটনায় এসপির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
ইতোমধ্যে ওসি প্রদীপের নরহত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, জিম্মি করার লোমহর্ষক সব ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। রহস্যজনক কারণে প্রদীপ কুমারের ২৫ বছরের চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলে। দুর্নীতি, নির্যাতন, চাঁদাবাজি প্রভৃতি অভিযোগে ওসি প্রদীপ চাকরি জীবনে কমপক্ষে বারোবার সাসপেন্ড, প্রত্যাহার ও স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছেন। কিন্তু কোনো অদৃশ্য শক্তির বলে তিনি সেসব কাটিয়ে সমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে প্রদীপ আয় করেছেন শত শত কোটি টাকা। দেশ-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ থানা থেকে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশের চাকরিজীবনের পুরোটাই সমালোচনা ও বিতর্কে ভরা। বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে চাকরি জীবনে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হয়েছেন কমপক্ষে পাঁচবার। প্রতিবার অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ফিরেছেন স্বপদে। পদে ফিরেই ধারণ করেছেন দানবীয় রূপ। প্রভাবশালী প্রদীপের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, প্রদীপ কুমার দাশ তিন বছর ধরে ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন। তার কাছে সবাই অসহায় ছিল।

বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা লিখেছে, একাধিক সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের এক শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ওঠে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে। অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় তিনি বরখাস্ত হন। তবে তাকে বহাল করার জন্য দেশের অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ফোন করেছেন পুলিশের নীতিনির্ধারকদের কাছে। অল্প দিনের মধ্যেই প্রদীপ চাকরি ফিরে পেয়ে পুনরায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তবে এর আগে ২০১৩ সালে একটি মামলার বিরোধিতা করায় এক আইনজীবীকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রদীপসহ আট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই আইনজীবী। একই বছরের ২৪ মে পাঁচলাইশ থানার পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টার থেকে শিবির আখ্যা দিয়ে ৪০ ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকে আটক করেন প্রদীপ। ওই সময় তিনি ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিতও হন। পাঁচলাইশে ওসি থাকাকালে বাদুড়তলায় বোরকা পরা এক বৃদ্ধাকে রাজপথে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ব্যাপক সমালোচিত হন প্রদীপ। এ ঘটনার পর সারা দেশে তোলপাড় হয়। এরপর পাঁচলাইশ থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয় ওসি প্রদীপকে।

২০১২ সালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পতেঙ্গা থানার ওসির দায়িত্ব পালনকালে আদালতের অনুমতি ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিদেশী জাহাজকে তেল সরবরাহে বাধা দেয়া, বার্জ আটক এবং বার্জ মালিকসহ ১২ ব্যক্তিকে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনা ফাঁস হলে প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় হয়। পুলিশ সদর দফতর গঠিত তদন্ত কমিটি প্রদীপকে অভিযুক্ত করলে পতেঙ্গা থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। সিএমপির কোতোয়ালির উপপরিদর্শক (এসআই) থাকাকালে নগরের পাথরঘাটার এক হিন্দু বিধবা মহিলার জমি দখলের অভিযোগ ওঠে প্রদীপের বিরুদ্ধে। একই সময়ে প্রদীপ কুমারের রোষানল থেকে রেহাই পাননি তার নিজের পরিবারের সদস্যও। নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকায় এক বোনের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সর্বশেষ, কক্সবাজারের টেকনাফ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কাউকে পাত্তাই দিতেন না প্রদীপ। গত তিন বছরে মাদকবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চলতি মাস পর্যন্ত ১৪৪টি বন্দুকযুদ্ধে ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু প্রদীপের নেতৃত্বেই দেড় শ’ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘প্রদীপ কুমার দাশ চাকরি জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছেন চট্টগ্রামে। মানুষকে হয়রানি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন।

আমাদের দাবি থাকবে, প্রদীপের অবৈধ আয়ের তদন্ত যেন দুদক ও এনবিআর করে।’ ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থেকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয় ফারুক ও আজাদ নামে দুই ভাইকে। তাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় দুই ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত দুই যুবকের বোন আইরিন আকতার বলেন, ‘আমার দুই ভাইকে ধরে নিয়ে ওসি প্রদীপ আট লাখ টাকা দাবি করেন। তার চাহিদা মতো টাকা না দেয়ায় ক্রসফায়ারে ভাইদের হত্যা করা হয়। আমি আমার দুই ভাই হত্যার বিচার চাই।’ সূত্র বলছে, নব্বইয়ের দশকে এসআই হিসেবে পুলিশে যোগদানের পর থেকে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে একের পর এক ঘটনার জন্ম দেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে প্রদীপ অনেক প্রভাবশালীর কাছের লোক হয়ে ওঠেন।

২০১৭ সালে মহেশখালী থানায় ওসি হিসেবে যোগ দিয়ে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণের নামে নিত্যনতুন কৌশলে অপকর্ম করতে থাকেন তিনি। দুই বছর আগে টেকনাফ থানায় যোগদানের পর আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন প্রদীপ। ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে নিয়মিতভাবে টাকা আদায়, লুটপাট, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাতসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় অনেক দালালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার আমিনুল ইসলাম। তার মাধ্যমে মাদক কারবারিসহ স্থানীয় বিত্তশালীদের টার্গেট করতেন প্রদীপ। ক্রসফায়ার ও মামলার ভয় দেখিয়ে ধনাঢ্য পরিবারগুলোর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঝিমংখালীর ৭০ বছরের এক প্রাথমিক শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। হোয়াইক্যংয়ের আনোয়ার নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। এর প্রতিকার চাইতে তার স্ত্রী ও বোন আদালতে গেলে তাদের উঠিয়ে নিয়ে পাঁচ দিন আটকে রাখার বিষয়টিও এলাকায় সবার মুখে মুখে। তবে প্রদীপের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি।

কিন্তু প্রায় ২০০ মানুষ হত্যাকারী এই প্রদীপ কুমার দাশকেই দেয়া হয়েছে ‘শ্রেষ্ঠ পুলিশের পদক।’ তার ‘সাফল্য’ বন্দুকযুদ্ধ তথা বিনা বিচারে মানুষ হত্যার রেকর্ড। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দফতরে তার ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। সব ক’টি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়। তিনি বলেছেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীদের শায়েস্তা করার জন্য তিনি টেকনাফে মানুষের বাড়িঘরে চালাবেন গায়েবি হামলা ও অগ্নিসংযোগ।’ এর পরও তিনি চাকরিতে আছেন।

আমরা দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছি যে, অপরাধী নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অপরাধীর গডফাদারদের ধরতে হবে। দুই শতাধিক নরহত্যার কৃতিত্বের দাবিদার ওসি প্রদীপ কোন শক্তির বলে, কার মদদে প্রায় পুরো চাকরি জীবন চট্টগ্রামেই থাকতে পারলেন, তাকে বা তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। নইলে এই ঘাতক প্রদীপদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সে দিল্লি কি অনেক দূর?

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

[email protected]


আরো সংবাদ