২৯ নভেম্বর ২০২০

চামড়ার বাজারে বিপর্যয়

চামড়ার বাজারে বিপর্যয় - ছবি : সংগৃহীত

পাদুকাশিল্পে আমাদের দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান ও স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে জুতা রফতানিতে বেশ সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল’ (অটেক্সা)-এর দেয়া তথ্য মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়েছিল ছয় কোটি ১৪ লাখ ডলারের পাদুকাসম্ভার। চার বছরের মাথায় ২০১৮ সালে রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

সে বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ কোটি ৩২ লাখ মার্কিন ডলারের জুতা রফতানি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেও বাংলাদেশের জুতা রফতানি আগের তুলনায় বেশ বেড়েছে। এরপরও চামড়াশিল্পের মোট রফতানি আয় আগের তুলনায় অনেকটাই নিম্নগামী। এশিয়া ফাউন্ডেশন ও পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে- ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া খাতের মোট রফতানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে ১০৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে এবং পরের অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানি আয় হয়েছে মাত্র ৭৭ কোটি ডলার।
চামড়া শিল্পে ধস কাটিয়ে ওঠার জন্য এই শিল্পের আধুনিকীকরণ ও রফতানি বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হলো চামড়াশিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ঘাটতি। দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই বলে বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আমরা এখনো লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের এক বৈশ্বিক সংস্থার মানসনদ অর্জন করতে পারিনি।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য সাভারে চামড়া শিল্পনগর প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০০৩ সালে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি (৬৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা) অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইপিটি) নির্মাণের জন্য। ২০১২ সালে কাজটি দেড় বছরের মধ্যে সমাপ্ত করার শর্তে নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সে কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাইওয়ানের একটি কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের ‘বে গ্রুপ’ নামে একটি কোম্পানি যৌথ বিনিয়োগে ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করতে এসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে সিইপিটি নেই বলে।

আমাদের দেশ থেকে কাঁচাচামড়া রফতানি প্রায় তিন দশক ধরে বন্ধ রয়েছে। চামড়াশিল্পের অবনমনের ক্ষেত্রে এটিও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। সম্প্রতি কাঁচাচামড়া রফতানির ক্ষেত্রে বাধা তুলে নেয়া হয়েছে। একই সাথে সরকার এবারের ঈদে চামড়ার দামও নির্ধারণ করে দিয়েছে। সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম পড়ার কথা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। মাঝারি গরুর চামড়ার দাম ৮০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা এবং ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু এতেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। বরং এবারের চামড়ার বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে তিন-চার গুণ কমমূল্যে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। ট্যানারি সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছর চামড়াজাত পণ্যের অর্ডার কম আসায় এবং রফতানি বন্ধ থাকায় প্রচুর কাঁচাচামড়া পড়ে রয়েছে। এ জন্য তারা বেশি দাম দিতে চাইছেন না।

গত বছরের ঈদুল আজহার চামড়া বাজারের তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে আমাদের। কারণ গত বছর দেশের চামড়ার একটি অংশ পচে গেছে। দেশের চামড়া প্রক্রিয়াকারী ট্যানারি মালিকরা গত বছর চামড়া কেনার জন্য বাজারে পর্যাপ্ত টাকা ছাড়েননি বলে অভিযোগ রয়েছে। চাহিদা কম থাকায় দামও একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে আসে। বিষয়টি একেবারে বিরক্তিকর পর্যায়ে পৌঁছার কারণে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এবারো সে অবস্থার তেমন কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমাদের দেশে চামড়ার বাজার ও চামড়াশিল্প ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

দেশে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় এক কোটি ১০ লাখের মতো পশু জবাই হয়। এগুলোর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ গরু-মহিষ। ঈদুল আজহায় জবাই হওয়া পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। সঙ্গতকারণেই চামড়ার মান খুব ভালো হয়। তাই ট্যানারিগুলো মোট চামড়ার ৫০ শতাংশই সংগ্রহ করে ঈদুল আজহায়। প্রতি বছরই ঈদুল আজহার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীরা বৈঠক করে চামড়ার একটি দাম নির্ধারণ করেন।
১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশী প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত পশম ছাড়ানো (ওয়েট ব্লু) চামড়া রফতানি বন্ধ রয়েছে। ওই সময় দেশে মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপরই ব্যবসায়ীরা আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের দ্বিতীয় ধাপ ‘ক্রাস্ট’ ও তৃতীয় ধাপ ‘ফিনিশড লেদার’ উৎপাদন শুরু করেন। অবশ্য ১৯৯০ সালে কাঁচাচামড়া রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রাথমিকভাবে সুফলও পাওয়া গিয়েছিল। ধীরে ধীরে প্রক্রিয়া করা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়তে থাকে। এ খাতে প্রচুর বিনিয়োগও আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান ও স্পেনের মতো দেশে ‘ক্রাস্ট’ ও ‘ফিনিশড লেদার’ রফতানি হতো। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে সে ধারাবাহিকতাও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আর এই ধসটা শুরু হয়েছিল চীনকে দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর শুল্ক বাড়ানোয় তারা বাংলাদেশী চামড়া আমদানি করা হ্রাস করেছে। দামও একেবারে প্রান্তিকতায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪০ কোটি ডলারের চামড়া রফতানি হয়েছিল। তা চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১১ মাসে নেমেছে ৯ কোটি ডলারে।

এখন ফিনিশড লেদার বা প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানিতে ভরসা একমাত্র চীন। দেশটিতে মোট ফিনিশড লেদারের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ রফতানি হয়। এ ছাড়া ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, জাপান এসব দেশেও কিছু কিছু রফতানি হয়। করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পুরো শিল্পকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আর এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা খুব একটা সহজসাধ্য হবে বলে মনে হচ্ছে না। মূলত আমাদের প্রধান বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা। এসব দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাবের কারণে আমাদের রফতানি গত আট মাসে ১১ শতাংশের মতো কমেছে। করোনার কারণে অর্থনীতি আরো খারাপ অবস্থায় গেলে বাজার ঠিক কোন দিকে যাবে তা বলা মুশকিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমরা যেসব দেশে পণ্য রফতানি করি, সেসব দেশের রিটেইলারদের ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। ফলে তারা পণ্য আমদানিও বন্ধ রেখেছে। কিছু ক্ষেত্রে বাতিলও হয়েছে। তবে যেগুলো বাতিল হয়নি, সেগুলোর ব্যাপারে কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। গত ডিসেম্বর থেকে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার চামড়ার তৈরি পণ্য ও পাদুকা রফতানির আদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এ ছাড়া কারখানা বন্ধ থাকায় ব্যবসা করতে না পেরে ক্ষতি হয়েছে আরো অনেক।

২০২১ সালের মধ্যে চামড়া খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০১৭ সালে চামড়াকে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল সরকার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ১১৬০.৯৫ মিলিয়ন ডলার। পরের বছর (২০১৬-১৭) রফতানি আয় দাঁড়ায় ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.২৯ শতাংশ। পরের বছর এই খাত থেকে রফতানি আয় কমে যায় ১২.০৩ শতাংশ। সে বছর (২০১৭-১৮) রফতানি হয় ১০৮৫.৫১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় আরো ৬.০৬ শতাংশ কমে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার।
২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-মার্চ) আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি হয়েছে ৬৩ কোটি ১৮ লাখ ডলারের সমপরিমাণ। আগের অর্থবছরে একই সময়ের চেয়ে যা ৯ শতাংশ কম। আর এই আট মাসের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি হয়েছিল ৬৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। বিদায়ী অর্থবছরের শেষ আট মাসে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭২ কোটি ২২ লাখ ডলার।

জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য ঈদে আসা চামড়াভাণ্ডারকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারি না। মূলত সরকারের যথাযথ উদ্যোগের অভাব ও সিন্ডিকেটের কারণে আমাদের এই সম্ভাবনাময় শিল্প এখন ক্রমেই প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে। তাই এই শিল্পের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
[email protected]


আরো সংবাদ