২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনা হবে কি ‘চেঞ্জ মেকার’

করোনা হবে কি ‘চেঞ্জ মেকার’ - ছবি : নয়া দিগন্ত

পরিবর্তনশীল এই পৃথিবী। পরিবর্তনশীল সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার। সব সময় সব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি অবশ্য এক নয়। রাষ্ট্রে পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। সরকার পরিবর্তনের সময় নির্দিষ্ট। সমাজ পরিবর্তন সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসার মনে করেন, সমাজ পরিবর্তন একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। মার্কসবাদীরা মনে করেন, অর্থনীতি হচ্ছে পরিবর্তনের নিয়ামক। তারা আরো মনে করেন, অর্থব্যবস্থায় তথা মৌল কাঠামোতে পরিবর্তন, সমাজের অন্য কিছুতে পরিবর্তন সূচিত করে। অর্থনৈতিক কারণই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই তত্ত্বের কেতাবি নাম- ‘অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ’।

মার্কস আরো উল্লেখ করেন যে, দ্বন্দ্ব বা বিরোধই পরিবর্তনের অনিবার্য কারক। সমাজবিকাশের একটি স্তরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে পরবর্তী পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একে বলে ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’। সমাজ পরিবর্তনের আর একজন তাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার। তার মতে, ধর্মীয় আদর্শ বা মূল্যবোধ সমাজ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। ধর্মীয় বা নৈতিক মূল্যবোধ সমাজের অর্থ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে। এর ফলে সমাজ ও সরকারে পরিবর্তন অনুভব প্রমাণ্য হয়ে ওঠে। ওয়েবার মনে করেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ সমগ্র সমাজের জন্য পরিবর্তন নিশ্চিত করে। তিনি দেখিয়েছেন, কেমন করে প্রটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধ ইউরোপীয় সামন্ত সমাজকে পুঁজিবাদে রূপান্তরে সাহায্য করেছিল। আমরা এ ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের কথাও উল্লেখ করতে পারি। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশেও ইসলামী বিপ্লবের পদধ্বনি শোনা গেছে। কোনো কোনো বিপ্লব গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়েছে। অথবা অবদমিত হয়েছে। লাতিন আমেরিকায় ক্যাথলিক ধর্ম এবং যাজকদের রাজনীতিতে প্রাধান্য রয়েছে। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম কোনো কোনো রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রবল প্রভাব ফেলছে। সুতরাং বলা যায়, সাম্প্রতিককালেও ম্যাক্স ওয়েবারের মতবাদ কার্যকর রয়েছে। পরিবর্তন-এর প্রেক্ষাপটে আরো একটি মতবাদ রয়েছে।


এটিকে এলিটদের চক্রাকার ঘূর্ণন বা ‘সার্কুলেশন অব এলিট’ বলা হয়। অবশ্য এই তত্ত্বকে সমাজতাত্ত্বিক পরিবর্তন না বলে সরকার পরিবর্তনের মতামত বলাই শ্রেয়। এই মতের প্রবক্তা ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী পেরোটে। তিনি মনে করেন, সভ্যতার ইতিহাসই হচ্ছে উত্থান আর পতনের। এর মূলে রয়েছে এলিট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ। প্রতিটি সংঘর্ষ শাসক এলিটদের নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে ধাবিত করে। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই শাসক এলিটদের ওপর ক্ষুব্ধ থাকে। তার কারণ এলিট বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইলেকশন মেনিফেস্টো অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তাই প্রতিটি শাসক এলিট শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলন অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাদের পতনও অনিবার্য- সময়ের হেরফের মাত্র। আর একজন সমাজবিজ্ঞানী স্পেংগলার নিশ্চিত করেন যে, প্রতিটি এলিট শ্রেণী বা রাজনৈতিক শক্তি বা সরকারকে তিনটি স্তর- উৎপত্তি, বিকাশ এবং পতন অবশ্যই অতিক্রম করতে হয়। পরিবর্তনের তিনটি- অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও চক্রাকার পরিপ্রেক্ষিত আলোচিত হলো।

যেকোনো সমাজ ও সরকারের পরিবর্তনের জন্য এটি প্রযোজ্য। সমাজ বা সরকার পরিবর্তনের উপর্যুক্ত তিনটি বিষয় মনে রাখলে আমাদের আজকের রাজনীতির পরিবর্তন প্রক্রিয়া বা প্রত্যাশা স্পষ্টতর হবে। এটা দৃশ্যমান ওই তত্ত্বে সমাজ ও সরকার পরিবর্তনের কারক হিসেবে দুর্যোগ, মহামারী বা প্লাবনের কথা বলা নেই। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় পরিবর্তনের কারকগুলো সক্রিয় রয়েছে মহামারী সৃষ্ট সমাজের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করোনাকালে অর্থনীতির ধস নেমেছে। গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা হিসাব-নিকাশ করে বলছেন যে, প্রতিটি দেশে অর্থনৈতিক কাঠামো, কার্যক্রম ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস দারুণভাবে অনুভূত হয়েছে। সুতরাং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এর প্রভাব অসম্ভব পরিবর্তনকামী। অন্য দিকে পরিবর্তনের কারক হিসেবে যে ধর্মীয় প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে তাও উপেক্ষা করার মতো নয়। ইতালির প্রধানমন্ত্রী যখন অবশেষে আকাশের দিকে তাকাতে বলেন, তখন গোটা পশ্চিমা বিশ্বে ‘ব্যাক টু দ্য বাইবেল’ স্লোগানের প্রামাণ্য প্রয়োগ প্রবল হয়ে ওঠে।

অন্য দিকে উত্থান-পতন বা সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি স্বাভাবিক চর্চার মধ্যেই রয়েছে। যেসব দেশে করোনাকালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে সরকারের পতন হয়েছে। অথবা করোনা দ্বারা ভয়ানকভাবে প্রভাবিত হয়েছে নির্বাচন। সম্ভাব্য মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবির ব্যাপারে গেলো পোলগুলো আগাম বার্তা দিচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে ওই তিনটি প্রত্যয়ের প্রয়োগ অনিবার্যভাবে অনুভূত হচ্ছে।

সমাজ পরিবর্তনের কারণগুলো যারা কার্যকর করে, তাদের বলা যায়, পরিবর্তনের অনুঘটক। এই অনুঘটকগুলোর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন একেক সময়ে একেক দেশে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এ ধরনের অনুঘটকরা ১. রাজনৈতিক দল ২. বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ৩. ছাত্রসমাজ ৪. আমলাতন্ত্র ৫. সামরিক বাহিনী।
সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তনের নিয়মতান্ত্রিক বাহন হলো রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক নেতাদেরই এলিট বলা হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে শুধু যে সমাজের ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে তা নয়। এলিটদের পরিকল্পনা অনুযায়ী উল্টে যাচ্ছে খোলনলচে। অর্থাৎ সমাজের সামগ্রিক পরিবর্তন অনুভূত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেরল্ড ডি ল্যাসওয়েল বলেন, রাজনৈতিক এলিটরা হচ্ছেন রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষ স্থানীয় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এই ক্ষমতাবলেই তারা উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম হয়। সমাজের বুদ্ধিজীবীরা এলিটদের কার্যক্ষেত্র তৈরি করে।

যেকোনো রাজনৈতিক বিপ্লব ও পরিবর্তনের পেছনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা রয়েছে। ফরাসি বিপ্লব এ পর্যায়ে বড় ধরনের উদাহরণ বলে গণ্য করা হয়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব সাধনে সেখানকার ধর্মীয় নেতা বা আয়াতুল্লাহদের দীর্ঘ দিনের ভূমিকা লক্ষণীয়। তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোর মুক্তি সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা আন্দোলন-সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের একটি অধ্যায় ‘৬ দফা’কেন্দ্রিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছে। আর ৬ দফা পর্দার অন্তরাল থেকে তৈরি করেছে এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা। এটি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং অবশেষে মুক্তিযুদ্ধে এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণী আন্দোলনের ভিত তৈরি করেছে, জনমত তৈরি করেছে, উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে ও দেশপ্রেমের ফল্গুধারা তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত নদীকে বেগবান করেছে। আর ছাত্রসমাজের ত্যাগ ও তিতিক্ষাই ছিল আমাদের মুক্তি-সংগ্রামের মূল ধারা।

যখনই এ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, উন্নয়ন ও মুক্তির কথা বলা হয় তখনই বারবার করে ছাত্রসমাজের অগ্রগণ্য ভূমিকার ওপর আলোকপাত করতে হয়। আমলাতন্ত্র নিরবে নিভৃতে এলিটদেরকে তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে প্রকারান্তরে পরিবর্তনকে অনিবার্য করে তোলে। ১৯৭১ সালের অসহযোগের দিনগুলোতে একজন শফিউল আজম বা মুখ্য সচিব পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করেন। প্রধান বিচারপতি পাকিস্তান নিযুক্ত গভর্নরকে শপথবাক্য উচ্চারণে অস্বীকার করেন। একটি জনতার মঞ্চ নিয়মতান্ত্রিক সরকার পতনে অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী একটি অনিবার্য অনুঘটক। বিগত অর্ধ শতাব্দীর বেশ খানিকটা সময়ে তাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। এখনো যখন সব আইন ও শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয় তখন করোনাকালে তাদের হাতে তুলে দিতে হয় কর্তৃত্ব। অনেক বাঁক পরিবর্তনের পরও সেনাবাহিনী জনগণের কাছে পেতে পারে সম্মান-মর্যাদা ও আস্থা-বিশ্বাস। বেসামরিক সরকারের পূর্ণ আস্থায় থেকে তারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় পালন করে প্রেশার গ্রুপ বা চাপ সৃষ্টিকারী ভূমিকা। করোনাকালে সবার জন্য- রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, ছাত্রসমাজ, আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর জন্য ভূমিকা পালনের নতুন নতুন কারণ ও প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের টকশোতে কিংবা সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয় বা মতামত কলাম পড়লে ওই সব অনুঘটকের সরব উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে।

রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে যাই করে থাকুক করোনাকালে তারা একাত্ম হয়েছে জনগণের পাশে। সরকারকে তারা বারবার আহ্বান জানাচ্ছে তাদের সহযোগিতা নেয়ার জন্য। কিন্তু সরকার নীরব। সরকার জনগণের সেবার চেয়ে ক্ষমতার বিষয়টি বেশি করে বিবেচনা করছে। ক্ষমতাসীন দলের কিছু অংশের প্রকাশ্য দুর্নীতি, দলীয়করণ ও অবাধ লুটপাট জনগণকে ক্রমে একটি প্রান্তিক পর্যায়ের দিকে ধাবিত করছে। সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতায় আতঙ্কিত, আশঙ্কিত রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতির বাঁক বদলের আশা-আশঙ্কা প্রকাশ করছে। করোনাকালে সরকারের অবাধ কর্তৃত্ব প্রয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তারা এখন শাসন ও অশাসনে আরো বেপরোয়া। দেশের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখন করোনার মারাত্মক বিরূপ প্রভাবের শিকার।

শাসকদলের দুর্নীতি ও বেপরোয়া মনোভাবে ভেতরে ভেতরে সাধারণ মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। এই অসন্তোষের সুযোগ নিতে পারে রাজনৈতিক বিরোধীরা। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় বিরোধীদের আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার শেষ ভরসা নির্বাচন ব্যবস্থার সর্বনাশ করা হয়েছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলগুলোর কাছে গণ-আন্দোলন বা গণবিস্ফোরণ ঘটানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। করোনাকালের রাজনীতি, সরকারের ব্যর্থতা ও নির্মমতা জনগণকে ধাবিত করতে পারে বিরোধী দলের নির্দেশিত পথে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রকৃতই বিরোধী দলগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে করোনা। সমাজ, সরকার ও রাজনীতির অনেক ক্ষত ও দুর্বল দিক উন্মোচন করে দিয়েছে অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস। জীবন ও জীবিকা নিয়ে সারা দেশে যে অসহায়ত্ব সৃষ্টি করেছে তা আগামী দিনে চেঞ্জ মেকার বা ক্ষমতা বদলের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।

করোনাকাল মানুষের স্বভাব, সংস্কৃতি ও জীবনাচারে অনেক পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। এই মহামারী থমকে দিয়েছে অর্থনীতি। সংক্রমণ পরিস্থিতি দেশ ও বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা আরো কঠিন করে তুলছে। এর সাথে উন্নয়ন সহযোগী বড় বড় দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমীকরণ সরকারের জন্য জটিল ও কুটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সঞ্চয়। কল-কারখানা তথা উৎপাদনের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার হওয়ার পথে। স্বল্প আয়ের মানুষের পিঠ ঠেকেছে দেয়ালে। দেয়ালের পরে তো আর জায়গা নেই। সুতরাং ঘুরে দাঁড়াতে হবে তাদের। সরকার আর কতকাল বইতে পারবে এই ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির বোঝা? সুতরাং একসময়ে করোনার কাছে হয়তো আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে সরকারের। সুতরাং মার্কসবাদীরা ‘অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ’-এর মাধ্যমে যে তত্ত্ব তালাশ করেছে তা অবশেষে খুঁজে পেতে পারে তার গন্তব্য।

শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়। সব খাতে সর্বত্র ব্যর্থতা ও দুর্নীতির খতিয়ান সবারই জানা কথা; কিন্তু যা মানুষকে আপাত ক্ষুব্ধ করে তুলেছে তা হচ্ছে মহামারী মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা। মহামারী নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় সরকার নিদারুণ হতাশার সৃষ্টি করেছে। একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দুর্নীতি অনিয়মের ঘটনায় নীতিনির্ধারক গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি মহামারী থেকে অন্য দিকে সরে গেছে’। আর এই অন্য দিক হচ্ছে পরিবর্তন। সত্য কথা বলার অপরাধে ডিজিটাল আইন-২০১৯-এর মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। নামী সাংবাদিক গুম হয়েছে। ধরা হয়েছে ১৪ বছরের কিশোরকেও। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো যদি জোটবদ্ধ হয়ে একটা আস্থার জায়গা নিতে পারে তাহলে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে’। কিন্তু কোটি টাকার সেই পুরনো প্রশ্ন- বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?


পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত ও অনুঘটকদের সম্পর্কে প্রথমেই আমরা কিছু তত্ত্ব কথা বলেছি। এই তত্ত্ব কথার সাথে বাস্তবতার মিল রেখে যদি সদয় পাঠক চিন্তা করেন তাহলে একটি সমীকরণ পাওয়া যেতেও পারে। সমাজবিজ্ঞানী লিস্টার ফ্রাংক ওয়ার্ড মনে করেন যে, ‘উদ্দেশ্যমূলক এবং যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দেয়া যায় এবং পরিবর্তনের গতিকে নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করা যায়’। করোনাকাল আমাদের জন্য সে সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’। জনগণের ভেতর থেকেই আত্মপ্রকাশ ঘটবে ‘চেঞ্জ মেকার’-এর উদ্দিষ্ট পরিবর্তনের ভাবুক, কর্র্মী তথা নেতৃত্ব।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]


আরো সংবাদ