০৬ ডিসেম্বর ২০২০

যুগপৎ করোনা ও বন্যার হানা

যুগপৎ করোনা ও বন্যার হানা - ছবি : সংগৃহীত

এতদিন ছিল কোভিড-১৯ মহামারীর আতঙ্ক। লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিইন ইত্যাদি নানা কারণে মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছে। এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমেছে এমন নয়। বরং গত রোববার ২৪ ঘণ্টায় অর্ধশতাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে, যা রীতিমতো আতঙ্কজনক। তার পরও মানুষ কিভাবে যেন করোনায় ভয় কাটিয়ে উঠেছে। শহরে বন্দরে রাস্তাঘাটে মানুষের নিঃশঙ্ক চলাচল দেখলে মনেই হয় না আমরা মহামারীর মধ্যেই আছি। তবু করোনার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিন্তু কমেনি। চাকরি হারানো বা কাজ খোয়ানো মানুষ অর্থসঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে সেই দুশ্চিন্তায় অনেকেরই রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভোগ যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। এখন নতুন করে যোগ হয়েছে বন্যার ভয়াবহতা। সেই আষাঢ় মাসের শুরু থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। এরপর সেটি একের পর এক জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু যে একবার বন্যা এসে চলে যাবে এমন নয়, অনেক জায়গায় উপর্যুপরি তিনবার বন্যা ছোবল হেনেছে। ভাসিয়ে নিয়েছে ফসলের খেত, খামার, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সব। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানির তোড়ে ডুবে গেছে শহর, বন্দর, গ্রাম, জনপদ। সেইসাথে বেড়েছে মানুষের দুর্ভোগ।

আজ ১৪ শ্রাবণ। এবার আষাঢ় মাসেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। সেই পানি নেমে এসে প্লাবিত হয়েছে একের পর এক জনপদ। মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে প্রায় বিরতিহীন বর্ষণে দেশের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে। নদীর তীব্র স্রোতে পাড় ভেঙে ভেসে গেছে ফসলের খেত, বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা। এখন পর্যন্ত ৩১টি জেলার প্রায় ৪০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং আরো অবনতি ঘটছে এবং ভাদ্র পর্যন্ত বন্যার প্রকোপ থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দৃষ্টান্ত আছে খুব কাছেই। গত বছর ২০১৯ সালে দীর্ঘ ৬০ বছরের রেকর্ড ভেঙে অক্টোবর মাসেও বন্যা হয়েছিল।

সর্বশেষ যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। বরং উল্টো বিপদের লক্ষণই ফুটে উঠছে। গত সোমবার পর্যন্ত দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। অনেক এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে। শহরাঞ্চলে সরকারি বিভিন্ন অফিসেও ঢুকেছে পানি। কোথাও কোথাও রেলপথ প্লাবিত হয়ে রেল চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি ঢুকেছে বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে।

বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো আভাস দিতে পারেনি বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটির হালনাগাদ তথ্যে রোববার বলা হয়, সোমবার ঢাকার চার পাশের নদ-নদীগুলোর পানি আরো বাড়তে পারে। ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে জানানো হয়।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি পানির স্টেশনের মধ্যে ৪৪টিতেই সোমবার পর্যন্ত পানি বাড়ছিল। কমেছে ৫৪টির। অপরিবর্তিত ছিল তিনটি স্টেশনের পানি। বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছিল ১৮টি নদীর পানি। পদ্মা, যমুনার পানি বাড়ছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল থেকে কমতে শুরু করেছে। সোমবার থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পানি আরো কমার কথা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে কমছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর ও নওগাঁর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। আবহাওয়া অফিস বলছে, এই বন্যা আগস্টেও ভোগাবে।

গত সোমবার পর্যন্ত নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিস্থিতির খবর এসেছে। রোববারও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার অবনতি হওয়ায় ফরিদপুর-চরভদ্রাসন সড়ক আবারো ডুবে গেছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ১০ গ্রাম। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় দু’টি আশ্রয়ণ প্রকল্প তলিয়ে যাওয়ায় অর্ধশত পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বানভাসিদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

জামালপুরের সরিষাবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ফের পানিতে ডুবে যাওয়ায় রোগীরাও পড়েছে দুর্ভোগে। উপজেলার আটটি ইউনিয়নে তৃতীয় দফা বন্যায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। পাঁচটি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও পৌর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পানিবন্দী ইউনিয়নগুলো হলো- সাতপোয়া, পোগলদিঘা, আওনা, পিংনা ও কামরাবাদ। এর মধ্যে ভাটারা ও মহাদান ইউনিয়ন নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলা সদরের বিভিন্ন দফতর, দু’টি বাজার, সরিষাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এবং রেললাইন ডুবে গেছে।
পুরো জামালপুরে বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়ে চরম দুর্দশায় পড়েছেন ১০ লাখ মানুষ। গত দু’দিনে বন্যার পানি তোড়ে ভেঙে গেছে মাদারগঞ্জের বালিজুড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা। এতে বাঁধ ও আশপাশের কয়েক শ’ ঘরবাড়ি, অসংখ্য গাছপালা পানির স্রোতে ভেসে গেছে। পানির স্রোতে রাস্তা ও ব্রিজ বিধ্বস্ত হওয়ায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বন্ধ হয়ে গেছে যোগাযোগব্যবস্থা।

দেশের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, জনদুর্ভোগ হ্রাসে সরকার ও প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। সারা দেশ থেকে অভিযোগ আসছে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণসহায়তা পাচ্ছে না দুর্গত মানুষ। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে বন্যার্ত মানুষের মধ্যে। দেড় মাস পর এসে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানাচ্ছেন, ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য ছয়টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা, ইউনিয়ন ও মাঠপর্যায়ে এসব কমিটি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম মনিটরিং করবে।

প্রতিমন্ত্রী গত শনিবার জানান, বন্যাকবলিত ৩১টি জেলায় এ পর্যন্ত ১২ হাজার ১০ মেট্রিক টন চাল, তিন কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার নগদ টাকা, এক লাখ ২১ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট, গো-খাদ্য কেনার জন্য কোটি ৪৮ লাখ টাকা, শিশুখাদ্য কেনার জন্য ৭০ লাখ টাকা, ৩০০ বান্ডেল ঢেউটিন এবং গৃহ-মঞ্জুরি বাবদ ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ত্রাণসহায়তার এই চিত্র যে কতটা অপ্রতুল তা বোঝা যাবে বন্যাদুর্গত ৩১ জেলার মানুষের সংখ্যা হিসাব করলে।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্ষায় বাংলাদেশে বন্যা হবে এ এক ঐতিহাসিক সত্য। কারণ, প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশ ভাটির দেশ। এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির উৎস হলো ভারত, নেপাল ও চীন। এসব দেশ থেকে বয়ে আসা পানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। উজানের দেশগুলো থেকে নেমে আসা পানির প্রধান নিগর্মন পথ হলো গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা বা জিএমবি বেসিন। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বার্ষিক সম্মিলিত বন্যার প্রবাহ একটিই নিগর্মন পথ অর্থাৎ লোয়ার মেঘনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। এ কারণে লোয়ার মেঘনার ঢাল ও নিষ্ক্রমণ ক্ষমতা কমতে থাকে। এতে পলি পড়ে প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়া ছোট নদীগুলোর প্রবাহ কমে যায়। পানি সহজে নামতে না পারায় বন্যার মেয়াদ দীর্ঘতর হয়।

আমাদের এটা জানা যে, নদীবাহিত পলি জমে এই বাংলাদেশ নামের বদ্বীপের জন্ম। বন্যায় এই পলি সমতলে ছড়িয়ে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। তাই বন্যা এ দেশের জন্য একই সঙ্গে অভিশাপ ও আশীর্বাদ। তবে, এবারের বন্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রায় দেড় মাস ধরে বন্যা চলছে। ১৯৯৮ সালের পর এটাই বন্যার দীর্ঘস্থায়ী রূপ। ১৯৮৮ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল। তাতে প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় (দেশের ৬০ শতাংশ এর বেশি)। এ ধরনের বন্যা ৫০ থেকে ১০০ বছরে একবার ঘটে। বৃষ্টিপাত এবং একই সময়ে (তিন দিনের মধ্যে) দেশের তিনটি প্রধান নদীর প্রবাহ একই সময় মিলিত হওয়ার ফলে বন্যার এই প্রলয়ঙ্করী রূপ দেখা দেয়। সেবার রাজধানী ঢাকা শহরও প্লাবিত হয়। সেই বন্যার স্থায়িত্বকাল ছিল ১৫ থেকে ২০ দিন। ১৯৯৮ সালেও বন্যায় দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা দুই মাসের বেশি সময় ধরে বন্যাকবলিত থাকে। বন্যার ব্যাপ্তি অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা এটিকে ১৯৮৮ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনা করেন।


এ বছর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সারা দেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। সে কারণে পানি মেঘনা অববাহিকা দিয়ে দ্রুত নেমে যেতে পারছে না। এ জন্য বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত কমলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে বন্যার পানি কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার পরও সমুদ্রে যদি জোয়ার থাকে তাহলে মধ্যাঞ্চলের পানি কমা আরো বিলম্বিত হতে পারে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বন্যার সাথে ফসলহানির একটা সম্পর্ক আছে। বন্যার পানি না কমা পর্যন্ত ফসলহানির হিসাব হয়তো পাওয়া যাবে না। তবে আমন আবাদ যে বিপর্যস্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে পুনর্বাসন কার্যক্রম হাতে নেয়া এ মুহূর্তে জরুরি। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি দেখে আশান্বিত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করতে পারছি না। এক করোনা মোকাবেলায় প্রশাসন যেভাবে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, এখন বন্যা ও করোনার যুগপৎ হানায় তা রীতিমতো ধরাশায়ী হয়ে পড়ে কি না সেটিই দেখার অপেক্ষা।

 


আরো সংবাদ

'হিন্দুরা গাদ্দার', যুবরাজের বাবার বক্তব্যে উত্তাল ভারত (৮৮১৩)মানুষের মতো দেখলেও তাকে যে কারণে জঙ্গলে ফল-ঘাস খেয়ে থাকতে হয় (৮৬৭১)আদালতেই গ্রেফতার বিয়ে করতে আসা মুসলিম যুবক, মেয়েটির করুণ চিৎকারে হতবাক কোর্ট চত্বর (৭৬৩৬)ইরানের পরমাণু কর্মসূচির রিপোর্ট ফাঁসের নিন্দা রাশিয়ার (৭১৩০)আমারও একটি ধর্ম আছে (৭০৬৭)ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে বিবৃতিতে যা বলছেন দেশবরেণ্য আলেমগণ (৫৭৬৯)চীন মালয়েশিয়ার চেয়ে খরচ বেশি বাংলাদেশে (৫০২৭)ফ্রান্স শিগগিরই ম্যাক্রোঁ থেকে মুক্তি পাবে : এরদোগান (৪৮৪৯)নতুন পরমাণু কেন্দ্রে জ্বালানী ঢোকানোর কাজ শুরু করেছে পাকিস্তান (৪৭০৮)ভাস্কর্য বিতর্কের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী হ্যান্ডেল করছেন : কাদের (৪৪৯২)