২৯ নভেম্বর ২০২০

বর্ডার কিলিং : উদ্ভট তথ্য

সীমান্তে বিএসএফ - ছবি : সংগৃহীত

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চলছে প্রতিনিয়ত, তা কি দিল্লির প্রতি আমাদের নতজানু রাজনীতির ‘উপহার’? এ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রীয় শক্তি বিগত ৪৯ বছরে কয়েক হাজার মানুষ সীমান্তে হত্যা করেছে নির্মমভাবে। এরা সবাই বাংলাদেশী। সরকারি হিসাবে এক বছরে সীমান্ত হত্যা ১২ গুণ বেড়েছে। নানা প্রতিশ্রুতির পরও এটা কমছে না। গত তিন বছরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা হয়েছে গত বছর (২০১৯)। সর্বশেষ, দিল্লিতে গত ডিসেম্বরে (২০১৯) বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বৈঠকের পরও এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) প্রধান কিরিটি রায় বলেছেন, ‘আগে বিএসএফ বলত আমাদের ওপর আক্রমণ করতে এলে আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছি। লাশ ফেরত দিতো।


এখন আর তাও বলে না। গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়। ফেরতও দেয় না।’

তিনি বলেন, ‘ভারত একটা হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারা তো সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবে না। সীমান্তে মুসলমানদের মারছে। আর ঠেলে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। আমরা প্রতিটি ঘটনার প্রতিবাদ করেছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাবো। কিন্তু ভারত হত্যা করবেই; সে থামবে না। তারা মারছে তো মারছেই। কিন্তু বাংলাদেশের দিক দিয়ে শক্ত কোনো প্রতিবাদ দেখতে পাচ্ছি না। মেরে দিচ্ছে, কোনো বিচার নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সীমান্তে গরু ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ হত্যার শিকার হন, মাদক ব্যবসায়ীরা কিন্তু তত নন। কিন্তু মাদক চোরাচালানই বেশি হচ্ছে।’

কথা হলো, সরাসরি কিলিং কেন? অপরাধ করলে তার বিচার হবে। বিচারহীনতার তীব্র সঙ্কট চলছে সীমান্তে। নানা প্রতিশ্রুতিতেও থামেনি সীমান্ত হত্যা। বিএসএফ বলছে, ‘আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাই, আমরা কখনো কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালাই না,’ কিংবা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়।’ আছে ‘চোরাকারবারিদের প্রতিহত করা’র তত্ত্বও। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গুলি চালানো এবং হত্যার বিষয়টি ধোপে টেকে না। এর সমাধান না হলে বাংলাদেশ এমনকি আইনি পদক্ষেপও নিতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকা সফরে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধণ শ্রিংলাকে উদ্দেশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘আপনারা আমাদের বন্ধু মানুষ। এই বন্ধুদের মধ্যে কিলিং হওয়া ঠিক নয়।’ জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ‘সীমান্ত হত্যা বন্ধে চেষ্টা চালাবেন’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এ আশ্বাসটি তারা গত এক দশক ধরেই দিয়ে আসছে। এবারে দেখা যাবে আন্তরিকতা কতটা। তার জবাবও মিলছে শ্রিংলার বক্তব্য থেকে। ঢাকার এক অনুষ্ঠানে অবাক করা তথ্য হাজির করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘সীমান্তে মৃত্যু কেবল বাংলাদেশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, একই সংখ্যায় ভারতীয়েরও মৃত্যু হয়। সেই পরিসংখ্যান আপনাদের এখানে প্রতিফলিত হয় না। আমার হাতে থাকা পরিসংখ্যান বলছে, সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ফিফটি-ফিফটি।

শ্রিংলা তার হাতে থাকা পরিসংখ্যানটির সূত্র অবশ্য প্রকাশ করেননি। এই ‘পরিসংখ্যান’ তিনি কোথা থেকে হাজির করেছেন সে এক বিরাট বিস্ময়। কোনো ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবির হাতে নিহত হয়েছেন, আর সে বিষয়ে ভারতের সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, প্রতিবাদ করেনি, এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও কি কোনো সংবাদ প্রকাশ করেছে? কেন করেনি? বাংলাদেশের বিজিবির হাতে ভারতের নাগরিক নিহত হলে সে দেশের মানুষও কোনো না কোনোভাবে প্রতিক্রিয়া জানাত। ভারতের গণমাধ্যম ঘেঁটেও তো তেমন কোনো তথ্য পাওয়া গেল না।

শ্রিংলা সীমান্ত হত্যা বন্ধে কিছু ‘কিন্তু’ এবং ‘যদি’ সূচক বাক্যও ব্যয় করেছেন একই অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছেন, সীমান্তে একজন মানুষও যদি মারা যায়, সে জন্য ভারত ‘সত্যি অনুতপ্ত’। এই ‘যদি’র সাথে তিনি টেনেছেন আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। তা হয়ে থাকলে তার জন্য কি শুধু বাংলাদেশ দায়ী? সীমান্তের অপর পারে অপরাধটা কে করেছে? ভারতের দিক থেকে যারা অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তাদের কেন থামানো হচ্ছে না? সেখান থেকে যেসব অপরাধী বাংলাদেশে অবৈধভাবে পণ্য পাচার করছে, বিএসএফ তাদের থামাতে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব ছিল না ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যে। তিনি এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় মোদির সফরের বিষয় নিশ্চিত করতে। মোদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর বাতিল করা কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে, ‘যদি’, ‘কিন্তু’ বাদ দিয়ে মোদির কাছ থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের একটি ঘোষণা কি অন্তত বাংলাদেশ এই আয়োজন থেকে পেতে পারে (সূত্র-ডয়চে ভেলে, ডি, ডব্লিউডটকম)।

ভারতের বিশাল সীমানায় রয়েছে মাত্র ছয়টি রাষ্ট্র। এর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রের সাথেই ভারতের রয়েছে সীমান্তবিরোধ। এই চারটি দেশ হলো চীন, পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশ। সীমান্তে হত্যা বন্ধের ঘটনায় ‘আইন ও সালিস কেন্দ্র’ (আসক) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ১৬ জুন এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ১৫ জুন নওগাঁর পোরশা নীতপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সুভাষ রায় নামে এক রাখালের মৃত্যু হয়। সীমান্তের ২২৭ নম্বর পিলারের কাছে ভারতের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে। আসকের তথ্যানুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৭ জন নিহত ও ১২ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে, বিএসএফ দুইজন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে যশোরের বেনাপোল এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায়।

২০১৯ সালে সীমান্তে ৩৭ জন গুলিতে ও ছয়জন নির্যাতনে মারা গেছে। বছরের পর বছর ধরে এমন হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ভারত সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে বিভিন্ন সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ ধরনের নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বৈরিতা আর অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে। এমন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। বাংলাদেশ সরকার এসব বন্ধে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সরকারের সাথে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাবে এটা আমাদের প্রত্যাশা।

২৫ জুন দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, গত ১৭ জুন নওগাঁর সাপাহার, ২৩ জুন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং ২৫ জুন লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএসএফ নিরীহ তিনজন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। কিন্তু অতীতের মতো সীমান্তে এসব খুনের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে কার্যকর পদক্ষেপ তো দূরের কথা, মৌখিক কড়া প্রতিবাদও আমরা দেখছি না। এটা গভীর বেদনাদায়ক, লজ্জাকর ও নিন্দনীয়। সরকারের দুর্বল জনসমর্থন এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই বিএসএফ এমন দুঃসাহস দেখাতে পারছে। অতীতে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ গৌরবময় ভূমিকা। অথচ বর্তমান সরকারের লাগাতার তিন মেয়াদে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ যে হারে নির্বিঘেœ নিরীহ মানুষ খুন করে চলেছে, বিশ্বে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এমনকি ভারতের সাথে চীন, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তান সীমান্ত থাকলেও এমন নির্বিচার হত্যাকাণ্ড নেই সেখানে। কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের চিরদিনের শত্রুতা। আমরা মিডিয়ার বদৌলতে দেখেছি, দুই দেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর হাতে একজন পাকিস্তানি নিহত হলে পরের দিনই পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষীরা হয়তো দু’জন ভারতীয়কে হত্যা করে বদলা নেয়।

কয়েক দিন আগে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীনের সৈন্যদের হাতে ভারতের একজন সিনিয়র সেনা অফিসারসহ ২৩ জন সেনাসদস্যকে প্রাণ দিতে হলো। ১০ জন ভারতীয় সেনা সদস্যকে চীনের সেনারা ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ভারতীয় সীমান্তে সৈন্য বৃদ্ধিসহ যুদ্ধের হম্বিতম্বি^ করলেও শেষমেশ সমঝোতা করতে বাধ্য হয় দিল্লি। দীর্ঘ দিন ধরে নেপাল প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী নীতির শিকার হয়েছে। এখন নেপাল কঠোর নীতি অবলম্বন করছে। ভারতকে সে আর ভয় পাচ্ছে না। ভারতীয় পণ্য বর্জন এবং ভারতের টিভি চ্যানেল নিষিদ্ধ করেছে। সীমান্তে নেপাল ভারতের ভূমি নিজেদের দাবি করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। মোদি সরকার নিজ দেশের বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে গেছে। হিন্দুত্ববাদী সরকারচালিত ভারত প্রতিবেশী সব দেশের সীমান্তে যখন বিপদে, তখন একমাত্র বাংলাদেশের সীমান্তে দাপট দেখাচ্ছে। দুর্বল রাজনীতির কারণে এটা আমাদের হজম করতে হচ্ছে।


মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৬৪ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ভারত ৩১২ বার হামলা চালায়। এতে ১২৪ বাংলাদেশী নিহত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩, ১৯৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১, ১৯৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩, ১৯৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩, ২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতেই সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহতের সংখ্যা ১৯ জনে পৌঁছেছে।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে মোট ২৭ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। ২০১৪ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জন বাংলাদেশীকে। আহত ৬৮ জন। ২০১৫ সালে বিএসএফ হত্যা করেছে ৪৫, ২০১৭ সালে ২৪, ২০১৮ সালে ১৪ এবং ২০১৯ সালে ৪৩ জন বাংলাদেশী। তাদের মধ্যে গুলিতে ৩৭ এবং নির্যাতনে ছয়জন নিহত হয়েছেন। অপহৃত হয়েছেন ৩৪ জন (সূত্র জাতীয় দৈনিক ২৬-০৬-২০২০) হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, ‘সীমান্তে মানুষের ওপর অত্যধিক বল প্রয়োগ ও নির্বিচারে প্রহার অসমর্থনীয়। এসব নির্যাতনের ঘটনা ভারতের আইনের শাসনের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিগত ১০ বছরে ১০০০ এর অধিক মানুষকে ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী হত্যা করেছে, যাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী। বন্ধুত্বের বদলা শত্রুতার মাধ্যমে দেয়া অসহনীয়। ফেলানী হত্যাসহ সীমান্তে বিভিন্ন হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আইনি সহযোগিতা দিয়ে আসছে কলকাতার বেসরকারি সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ।

এ সংগঠনের সম্পাদক বলেছেন, ফেলানীসহ আলোচিত সীমান্ত হত্যাগুলোর একটিরও বিচার হয়নি। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ফেলানী খাতুনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, সেটা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মানেনি। তিনি বলেছেন দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিজ দেশের নাগরিক হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের যতটা জোরালোভাবে প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিল, ততটা হয়নি। সংসদে এ নিয়ে আলোচনাও হয়, কিন্তু সরকার বলেছে এ ব্যাপার নিয়ে আমরা ‘চিন্তিত নই’। বিষয়টি নিয়ে নাকি বেশি বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। তাহলে কি আমরা মরতে এবং লাঞ্ছিত ও শোষিত হতে থাকব?

শোষিত হয়েছি বলে আমরা ইংরেজ তাড়ালাম। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল পূর্ববাংলার মানুষ। ২৩ বছর পর পুনরায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করলাম। প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলনে পূর্ববাংলার মানুষের রক্ত ঝরেছিল। নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল অজস্র। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ৪৯ বছর ধরে বন্ধুত্বের নামে নানা কায়দায় আমাদের শোষণ করছে। সীমান্তে ঘন ঘন মানুষ হত্যা করছে। ভারত সফরে গিয়ে আমাদের সরকারপ্রধান তিস্তার পানি আনতে পারেননি। উপরন্তু ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের জন্য ফেনী নদীর পানি দিয়ে আসা হয়েছে। শেখ মুজিবের আমল থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার দেশ শাসন করেছে কমবেশি সবাই ভারতের স্বার্থটাই বেশি দেখেছে। কারণ ক্ষমতায় থাকতে হলে তাদের খুশি রাখতে হবে। মূলত তোষামোদির রাজনীতি করে জনগণের স্বার্থ আদায় করা যায় না। পত্রিকায় উঠেছে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর মতো। এই লজ্জাকর উক্তি রাজনীতিকদের।

কিছু দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করলে দেশ ভারতের পেটে ঢুকে যাবে জানলে মুক্তিযুদ্ধ করতাম না। এখন আর জামায়াতকে দোষ দেবো না, কারণ জামায়াত ৪৫ বছর আগে যেটা বুঝেছে সেটা বুঝতে আমাদের ৪৫ বছর সময় লেগেছে (ইন্টারনেট ২৪-০৬-২০২০)। পাকিস্তানের অবকাঠামোকে দুর্বল করে পুরো ফায়দা তোলার জন্য ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের সাহায্য করেছিল। অনেকের মুখে এখন শুনি, পিন্ডি এখন দিল্লি। নতুন প্রজন্মের এক তরুণ যুবক-নাসির আবদুল্লাহ- হাতে ব্যানার সজ্জিত একটি কাগজ, তাতে লেখা- সীমান্তে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাই। এই দাবি নিয়ে কয়েকজন যুবককে নিয়ে বসে ছিল টিএসসিসংলগ্ন রাজুভাস্কর্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেব্রুয়ারি বইমেলার (২০২০) সময়ে। তাদের সাথে কথা বলেছিলাম। তাদের বক্তব্যে ন্যায়বিচার, শোষণ এবং দখলমুক্ত একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের চিত্র ফুটে ওঠে। আমরা সীমান্তে সব হত্যার প্রতিবাদ করতে চাই।

জনগণের মনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে শিখা তা জ্বালিয়ে রাখতে চাই। আমাদের বুকে যে ক্ষত তা ক্ষোভে পরিণত করতে চাই। আমাদের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ পেলেও তাদের মুক্তি তো আসেইনি। বরং আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অনেকটা কেড়ে নেয়া হয়েছে। পিন্ডিকে আমরা যেভাবে রুখে দিয়েছি, তেমনি দিল্লিকেও রুখে দিতে হবে। জনগণকে আবার রাষ্ট্রের মালিকানা প্রদান করতে হবে। আমরা চাই বাংলাদেশের মানুষ বহিঃরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী মনস্তত্ত্বকে উপলব্ধি করুক। ঘরে বাইরে লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে জনগণ অনুধাবন করুক, মুক্তির লড়াইটা আরো অনেক দিন চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের এ অবস্থান সীমান্তে এবং দেশের ভিতরে নির্বিচার খুন, ধর্ষণ আর সিস্টেম্যাটিক কিলিংয়ের শিকার হাজারো মানুষের মধ্যে সম্পর্কের নয়া সেতু তৈরি করবে।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের অসম বাণিজ্য চলছে সেই ’৭১ সালের পর থেকে। কয়েক লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে চাকরি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান হয়নি। এখন পর্যন্ত তিস্তা নদীর ন্যায্য পানি আমরা পাইনি। এভাবে কোনো দেশের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক 
E.m: [email protected]


আরো সংবাদ