১২ আগস্ট ২০২০

এই যুদ্ধের দামামা কি বন্ধ হবে?

এই যুদ্ধের দামামা কি বন্ধ হবে? - ছবি : সংগৃহীত
24tkt

চীন-ভারত দুই মহাপ্রতিবেশীর মধ্যে রণ-ডঙ্কা যেভাবে বেজে উঠছিল তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় কি না সে আশঙ্কা অনেকেরই ছিল। আর চীন-ভারত যুদ্ধ মানেই এর রেস এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়া। ফলে উত্তেজনা যতই তুঙ্গে যেতে শুরু করে ততই অন্য দেশগুলোর ওপর দুই জায়ান্টের কাছে আসার চাপ বাড়তে থাকে। অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতায় দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অসমাবস্থা থাকলেও কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না ধরনের একটি জাতীয়তাবাদী আবহ দেশ দু’টির নেতারা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। অবশ্য এই যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে যারা পরিণামদর্শী অনুমান করতে পারেন তারা উগ্র যুদ্ধ চিন্তার মানুষগুলোর নানাভাবে রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করছিলেন। সম্ভবত এই প্রচেষ্টায় কিছুটা ফল আসতে শুরু করেছে। ভারত ও চীন দুই পক্ষই বিরোধ কেন্দ্র থেকে নিজেদের কিছুুটা দূরে সরিয়ে নিয়েছে। 

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তির বিরোধ ও সঙ্ঘাতমুখরতা বিদায় নিয়েছে। তবে এই বিবেচনায় আবার সামনে এসেছে যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সঙ্ঘাতকে সহযোগিতায় রূপান্তরের মধ্যেই এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষিত হবে। মূল যে কারণে বারবার যুদ্ধ বাধার উপক্রম হচ্ছে তাকে পাশে সরিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে প্রসারিত করতে পারলে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা উঁকি দিতে পারে। এশিয়া উপমহাদেশের এই প্রান্তের আশাবাদী মানুষগুলো শান্তির সম্ভাবনাকে এই অঞ্চলের নেতারা সামনে এগিয়ে নেবেন বলে প্রত্যাশা রাখতে চান।

বিরোধের বীজ অনেক গভীরে
এ কথা সত্যি যে, চীন ও ভারতের বিরোধের যে উপাদান তা ঐতিহাসিকভাবে গভীরে প্রোথিত। চীন রাষ্ট্রের স্বীকৃত সীমানা কমিউনিস্ট বিপ্লবের আগে নির্ণিত না থাকায় দেশটির ভূ-সীমানার দাবি সুনির্দিষ্ট নয়। যার ফলে সীমানাবিরোধ বিভিন্ন মধ্য এশিয়ান প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, জাপান থেকে ভারত, নেপাল মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় সব প্রতিবেশীর সাথে রয়েছে। অন্য দিকে ভারত রাষ্ট্রের স্থল সীমানায় থাকা সব দেশের সাথেও কম-বেশি বিরোধ রয়েছে দিল্লির। 

ভূমি বিরোধ এতটাই জটিল বিষয় যে, এগুলোর সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে বিরোধের বিষয়গুলোকে স্থিতাবস্থায় রেখে সহযোগিতার বাকি ক্ষেত্রগুলোকে নিয়ে সামনে এগোনো যায়। এ প্রক্রিয়ায় রাশিয়াসহ বেশ ক’টি দেশের সাথে সীমান্ত বিরোধের আপাত অবসান ঘটিয়েছে চীন। ভারতের সাথেও একই পথে হেঁটে বেইজিং অর্থনৈতিক ও অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ধারাতে ছেদ পড়ে ভারতের কৌশলগত নীতি পরিবর্তনের পথে এগোনোর কারণে।

কী সেই পরিবর্তন?
১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন যে চারটি নীতিকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে তার অন্যতম ছিল সমাজতন্ত্র। ভারত অন্য কয়েকটি দেশকে নিয়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তুললেও স্নায়ুযুদ্ধ সময়ে দেশটি জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে সোভিয়েত বলয়ের সাথে যোগসূত্র রক্ষা করে। ভারতের প্রতিরক্ষা সম্ভার ছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এর মিত্র দেশগুলোর। এর বিপরীতে পাকিস্তান ছিল মূলত আমেরিকান বলয়ে। চীন তার নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখে আর ষাটের দশকে সোভিয়েতের সাথে ভৌগোলিক ও আদর্শগত সঙ্ঘাত তৈরি হয় বেইজিংয়ের। এই বাস্তবতায় ’৮০-র দশকের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত ভারত সোভিয়েত ধারায় ছিল।

নতুন মেরুকরণ
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পুরো বিশ্ব ব্যবস্থায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন আসে। সোভিয়েত বলয়ের অনেক দেশই তখনকার একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র্রের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে তোলার প্রচেষ্টা নেয়। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রও সোভিয়েত বলয়ের অনেক দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে। এমনকি রাশিয়ার পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত সোভিয়েত বলয়ে ছিল এমন বেশ কয়েকটি দেশকে ন্যাটোর সদস্য করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। 

১৯৯০ এবং ২০১০-এর দশকের পুরো সময়টা স্নায়ু যুদ্ধোত্তর একটি অবয়ব গ্রহণের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এ সময় চীন বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে সমন্বিত করে ধীরে ধীরে নিজেকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। একই সাথে নিজেকে উন্নত সামরিক-বেসামরিক প্রযুক্তি অর্জনের দিকে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে সীমান্ত বিরোধের অবসান ঘটিয়ে রাশিয়ার সাথে কৌশলগত অক্ষ তৈরি করে। 

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির এর বিপরীত পদক্ষেপটি ছিল উদীয়মান পরাশক্তি চীনকে ঘিরে একটি প্রতিরোধ বলয় নির্মাণ করার, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয় ভারত ও জাপানকে। এশিয়ার নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন সামনে নিয়ে আসা হয়। আর একই সাথে সোভিয়েতকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে পশ্চিমকেন্দ্রিক ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ছিল এ ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সাথে ইসরাইল এবং ফ্রান্স ব্রিটেনের সাথে ভারতের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সমঝোতা হয়। 

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার এ ক্ষেত্রে কিছুটা ধীর পদক্ষেপে এগোচ্ছিল। কিন্তু এর পরে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির সরকার তার নিজস্ব ডকট্রিনের সাথে এই পরিবর্তনকে একাত্ম করে এই পথে দ্রুত ভারতকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। আর এই সমঝোতার অংশ হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে অনেক বড় নেতা এবং বিজেপিকে ভারতের উল্লেখযোগ্য দলে পরিণত করার জন্য সব ধরনের সহায়তা পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দেয়া হয়। 

বিপরীত দিকে রাশিয়ার জন্য ভারত ছিল এক বড় প্রতিরক্ষা বাজার। রাশিয়া এবং চীন দুই দেশই চায় এশিয়ায় ভারত পশ্চিমের টুলস না হয়ে এশীয় সহযোগিতার একটি অংশ হোক। এর অংশ হিসেবে ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কাঠামো নির্মাণও এগিয়ে নেয়া হয়। স্থিতাবস্থাকে ভিত্তি ধরে সীমান্ত বিরোধের বিষয়গুলোর সাময়িক নিষ্পন্ন হয়, এরপর এই সমস্যা আর মাথা ছাড়া দেয়নি।

সঙ্কট চীনবিরোধী অক্ষে যোগদান
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতকে দ্রুত আমেরিকান বলয়ের সাথে একাত্ম করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, বিশেষত চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র জাপান অস্ট্রেলিয়া ভারত ভিয়েতনাম প্রভৃতি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়ার ফলে চীনের সাথে ভারতের পুরনো সমঝোতা ভেঙে পড়তে থাকে। একই সময়ে ভারত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়া এবং পরমাণু প্রযুক্তি রফতানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার প্রচেষ্টা নিলে চীন তার বিরোধিতা করে। ফলে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়তে থাকে। 

সর্বশেষ চীনের কৌশলগত ‘ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের সক্রিয় বিরোধিতার ফলে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরো বেড়ে যায়। ভারত এই প্রকল্পে যোগদানের ব্যাপারে শুধু অস্বীকৃতিই জানায়নি একই সাথে এই প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য গোপন উদ্যোগ গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আফগান সশস্ত্রবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভারতের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আর এর মাধ্যমে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বেলুচিস্তান করাচি এবং খায়বার পাখতুন খোয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতায় ইন্ধন প্রদান আর সর্বশেষ কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা একতরফাভাবে বাতিল করে দেয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখতে থাকে বেইজিং। একই সময়ে ভারতীয় সংসদে আজাদ কাশ্মির এবং বেল্ট ও রোড প্রকল্পের চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর অতিক্রমকারী গিলগিট-বাল্টিস্তান আর আকসাই চীনকে ভারতের ভূমি বলে সংসদে দাবি করা চীনের উৎকণ্ঠা ও সন্দেহকে আরো বাড়িয়ে তুলে। এই সময়টাতে কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখা পার হয়ে ভারতীয় সামরিক তৎপরতা চালানোকে চীন পাকিস্তান উসকানিমূলক ও উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করে। অতি সম্প্রতি করাচি ও বেলুচিস্তানে অন্তর্ঘাতী তৎপরতার সাথে ভারতের গোপন সম্পৃক্ততার তথ্য আসে তাদের কাছে।

ট্রাম্প-শি’র দ্বন্দ্বের প্রভাব
চলমান বৈশ্বিক করোনা সঙ্কটের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প চীনকে কোভিড-১৯ ভাইরাস ছড়ানোর জন্য অভিযুক্ত করে এর নাম দেন চায়না ভাইরাস। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা করোনা নিয়ে বড় ধরনের চীনবিরোধী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দেন। আর এই যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয় যে, পশ্চিমা কর্পোরেট বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ চীন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে তা ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশে নিয়ে যাবে। একই সাথে চীনের বিরুদ্ধে শুরু করা হবে বাণিজ্য লড়াই। এই লড়াইয়ে ভারতের সহায়ক ভূমিকা রাখার বিষয়টি নানা তৎপরতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দিল্লির নীতি প্রণেতারা মনে করছেন, চীনে করা পশ্চিমা বিনিয়োগ ভারতে আসার সাথে সাথে পশ্চিমের বাজার চীনের জন্য অনেকখানি সঙ্কুচিত হয়ে আর তা প্রসারিত হবে ভারতের জন্য। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থানের যে স্বপ্ন দেশটির জনগণকে মোদি সরকার দেখাচ্ছেন সেটি বাস্তবে রূপ লাভ করবে। এর সাথে সাথে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক ফোরামে ভারতের অবস্থান মজবুত হবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গ্লোবাল টাইমসের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটি সুর পাওয়া যায় যে, নয়াদিল্লিকে যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী ভূমিকার অংশ হওয়ার ভাবনা পরিত্যাগ করে এশীয় সহযোগিতার বিষয় চিন্তা করতে হবে। এ দু’টি চীনা সূত্র থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ভারতের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির উন্নতি ঘটুক তা নিয়ে চীনের কোনো চিন্তা বা উদ্বেগ নেই। বেইজিংয়ের আপত্তি দিল্লি যেন চীনবিরোধী তৎপরতার টুলসে পরিণত না হয়।

ডোকলাম সঙ্কট অথবা গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সবটার মূল হলো ভারতের পাশ্চাত্যাশ্রয়ী কৌশলগত নতুন ভূমিকা। দুই দেশের সীমান্তে যেসব উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় তার পেছনে কোনো সময় ভারত থেকে আর কোনো সময় থাকে চীন থেকে মদদ। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় মনস্তত্বে বড় প্রভাব ফেলে। এই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ার হুমকির প্রেক্ষিতে বেইজিং যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে এবং অরুণাচলের দখল করা ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যায়। এ ঘটনার পরে উল্লেখযোগ্য রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত হয় ১৯৭৫ সালে, যেখানে ৫ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী মারা যায়। এর পর দুই দেশের সীমান্তে হাতাহাতি ও মুখোমুখি হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে কিন্তু ২০ জনের বেশি প্রাণহানির যে ঘটনা গালওয়ান উপত্যকায় ঘটেছে তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর পরের উত্তেজনাও তারই ধারাবাহিকতায় ঘটছে।

নতুন উত্তেজনা
ভারত-চীনের মধ্যে নতুন করে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে তার পেছনে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে সমৃদ্ধকরণের দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের এক ধরনের যুদ্ধপ্রস্তুতির বিষয়ও রয়েছে। ভারতে মোদি শাসনের গত কয়েক বছরে সরকার সব স্থল সীমান্তে সড়ক অবকাঠামো তৈরি করেছে যার সাথে সেনা ও বিমান ঘাঁটির প্রত্যক্ষ সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরে গোয়েন্দা তৎপরতার সক্ষমতাও দিল্লি অনেক বাড়িয়েছে। এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির বিষয়টি প্রতিবেশী অনেক দেশের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্ট করেছেÑ ভারত লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা দিয়ে একটি কৌশলগত রাস্তা তৈরি করছে এবং এই অঞ্চলকে একটি আকাশপথের সাথে সংযুক্ত করছে, চীন যার বিরোধিতা করেছে। 
একই ধরনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির তৎপরতা চীনের বা পাকিস্তানের নেই এ কথা বলা যাবে না। 
তবে পাশাপাশি বৈরী মনোভাবের দুই প্রতিবেশীর এক দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি অন্য দেশকেও সমর প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যায়।

যুদ্ধ কেন এখনই নয়
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চীন এবং ভারত কোনো দেশের জন্য পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এখনকার সময় উপযুক্ত পরিবেশ নয়। ভারত এখন সবচেয়ে দ্রুত করোনা সংক্রমণের একটি দেশে পরিণত হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহে ব্যয় করার কারণে সেনাবাহিনীকে যুদ্ধসক্ষম রাখার জন্য যে গোলাবারুদ ও রশদপত্র প্রয়োজন তার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। একান্ত মিত্র দেশ বলতে কোনো রাষ্ট্র ভারতের চার পাশে এখন সেভাবে নেই। পাকিস্তান কৌশলগতভাবেই চীনা মিত্র, নেপাল চীনের অধিক নিকটবর্তী একটি দেশে পরিণত হয়েছে, শ্রীলঙ্কার সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, বাংলাদেশ চীন-ভারত সঙ্ঘাতে নিরপেক্ষ ভূমিকার বিষয়ই বিবেচনায় রেখেছে। এ অবস্থায় কোনো প্রতিবেশী দেশ ভারতের পাশে দাঁড়ানোর মতো নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দিল্লির পাশে দাঁড়াতে পারে। এরপরও এই সময় চীনের মতো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক সঙ্ঘাত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে ভারতের জন্য। 

অন্য দিকে, চীনও এখন করোনার কারণে অর্থনৈতিকভাবে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। হংকং ও তাইওয়ান ইস্যুও বেইজিংয়ের চাপের একটি কারণ হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের করোনাউত্তর সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চীন নিজেকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেই সময় যুদ্ধে জড়ানোর জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়। কিন্তু নিজের দোরগোড়ায় ক্রমবর্ধমান বৈরিতা তৈরি হওয়ার বিষয় মেনে নেয়াও দেশটির পক্ষে কঠিন। ফলে জবাব পাল্টা জবাবের বিষয় এখন ঘটছে। 
এ কারণে ভার্স্ক ম্যাপলোক্রফটের এশিয়া ফর রিস্ক ইনসাইটের প্রধান মিহা রিবার্নিক লিখেছেন, ‘ভুল গণনার ঝুঁঁকি একদিকে সরিয়ে রাখলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে যুদ্ধের দামামাকে এড়িয়ে নেয়ার খুব একটা ক্ষুধা তাদের নেই। এর পরও, মোদি বা শি কেউই অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘকালীন সার্বভৌমত্বের বিরোধের বিষয়টি পুরোপুরি শেষ করতে পারবেন না। আর আমরা আশা করতে পারি যে বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল বরাবর উত্তেজনা বছরের বাকি সময় অব্যাহত থাকবে, উভয় পক্ষই পুরোপুরি পেছনে আসতে রাজি হবে না, তবে এটার আরো বৃদ্ধি করার ব্যাপারেও তারা উৎসাহী হবেন না।’

ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পান্তের বক্তব্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার মতো তুলনামূলকভাবে উচ্চতর মৃতের সংখ্যা খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য, বিশেষত অর্থনৈতিক ফ্রন্টে, ভারত-চীন সম্পর্কের ডিনামিকসকে পরিবর্তন করতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, চীন যদিও ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং চীনা প্রযুক্তির ভারতীয় প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তবুও নয়াদিল্লি তার ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ভারত সম্ভবত জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভিয়েতনামসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য ‘সমমনা’ দেশের সাথে তার সম্পর্ক আরো জোরদার করবে।

অন্য দিকে চীনের প্রভাবশালী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসে প্রতিবেশী অনেক দেশের সাথে ভারতের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ রেখায় পাকিস্তানের সাথে ভারত গুলিবিনিময় করেছে। ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধও বেড়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ভারতের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী এবং এমনকি সাম্প্রতিক দুঃসাহসিক পররাষ্ট্র কৌশলগুলোর একটি অনিবার্য ফলাফল। এই জাতীয় আগ্রাসী মনোভঙ্গি কেবল স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করার কৌশলগত লক্ষ্যেই হচ্ছে তা নয়। বরং এটি দেশের ভেতরে জাতীয়তাবাদী অভ্যুত্থান এবং সুবিধাবাদের কারণেও ঘটেছে। দেশটি তীব্রতর চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা থেকে মুনাফা পেতে চায়।

পত্রিকাটিতে আরো বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে, কিছু ভারতীয় এখনো বিশ্বাস করে যে বিদেশে শক্তি দেখিয়ে তারা ঘরোয়া দ্বন্দ্ব এবং জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে ঘনীভূত করতে পারে। তবে ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, অর্থনৈতিক বিকাশ থেকে সরে এসে শূন্য জাতীয়তাবাদ অবশেষে নিজেকে ক্লান্ত করে তোলে। স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উভয় দেশের অভিন্ন স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি নয়াদিল্লি কৌশলগত আগ্রাসনের পথে অব্যাহতভাবে যেতে থাকে, তবে এটি চূড়ান্তভাবে তার দীর্ঘমেয়াদি বিকাশকে ক্ষুণœ করবে এবং তার প্রাচীন প্রতিবেশী চীনের সাথে একটি স্থিতিশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

শেষ কথা
এবারের উত্তেজনা দুই দেশের জেনারেলদের আলোচনায় প্রাথমিকভাবে মিটেছে। তবে এই উত্তেজনার স্থায়ী নিরসন করতে হলে কৌশলগত সঙ্ঘাতের পথ থেকে উভয় পক্ষকে সরতে হবে। 
চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট প্রকল্প ব্যর্থ করার তৎপরতা অথবা কাশ্মিরের ভূখণ্ডগত যে স্থিতাবস্থা রয়েছে তা ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করা হলে উত্তেজনা আবার সৃষ্টি হবে। বেলুচিস্তান বা খায়বার পাখতুন খোয়া অথবা তিব্বতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে ভারতেরও বিভিন্নœ স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা তৈরি হবে। এতে কোনো দেশই শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে বলে মনে হয় না। 
যুদ্ধোত্তেজনা বা অস্থিরতার কারণে যেসব দেশ তাদের প্রতিরক্ষাসামগ্রী বিক্রি করতে পারবে তাদেরই কেবল লাভ হবে। এই উত্তেজনা জিইয়ে রাখার পেছনে সম্ভবত নেপথ্য তৎপরতা তাদেরই সক্রিয় রয়েছে। 

[email protected]


আরো সংবাদ