০৯ আগস্ট ২০২০

জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’

জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ - ছবি : নয়া দিগন্ত
24tkt

১৯৭৪-৭৫ সালের কথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর ‘ম্যানেজমেন্ট’ ডিপার্টমেন্ট নতুন চালু করেছে। এলএলবি শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় নতুন ডিপার্টমেন্টে টেস্ট পরীক্ষায় কতকার্য হয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেলাম। কলা ভবনের পূর্বদিকের চতুর্থতলায় ক্লাস রুম। ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক দুর্গাদাস ভট্টাচার্য (পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি) প্রথম ক্লাসে এসে সিলেবাসবহির্ভূত একটি ছোট সূচনা বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটি আমার মনঃপূত হয়েছিল এবং এখনো তা মনে রেখেছি। তিনি বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ একটি ফুলের মতো, এখানে ‘মৌমাছি’ মধু আহরণ করে, প্রজাপতি আরোহণ করে ‘বিষ’ এবং কিছু কীটপতঙ্গ বা পাখি আছে যারা শুধু আসে, আর ঘুরে ফিরে চলে যায়।’ সে সময়ে তার পাতলা গড়ন শরীর ও বক্তব্যটি এখনো আমার চোখে ও মনে পরিষ্কারভাবে পরিস্ফুটিত হয়। তিনি ছাত্রদের ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করে ওই ছোট বক্তব্য রেখে অর্থনীতির ক্লাস শুরু করলেন। অধ্যাপক মহোদয়ের প্রথম ক্লাসের সূচনালগ্নের বক্তব্যে তিনি যা বুঝাতে চেয়েছেন বলে বুঝে নিয়ে ছিলাম, তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ইমারত, বড় লাইব্রেরি, আভিজাত্যের সুনসান, ঠাটবাটের চাকচিক্য কোনো ছাত্রকে কিছু দিতে পারে না, যদি না শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়কালীন ‘সময়’কে কাজে লাগিয়ে নিজ জীবনকে গড়তে পারে। 

এখন তো ‘আর্দশলিপি’ বইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উঠে গেছে। প্রাথমিক স্কুল জীবনে আর্দশলিপিতে বারবার একটি কবিতা পড়েছিলাম, তা হুবহু মনে নেই। তবে মর্মার্থ এটুকু মনে পড়ে যে, সময় চলে গেলে আসবে না ফিরে, অতএব, হেলায় খেলায় সময় নষ্ট করিও না। প্রবাদ রয়েছে যে, ‘সময়’ ও ‘নদীর স্রোত’ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। প্রবাদটি অনেকে জেনেও তা কোনো প্রকার মূল্যায়ন করে না। আমার কাছে ‘সময়ের’ মূল্যায়নটি গোড়া থেকেই অনেক মহামূল্যবান বিবেচিত হতো বলেই অধ্যাপক দুর্গাদাসের ছোট বক্তৃতার ব্যাখ্যাটি অনুরূপভাবে বুঝে ছিলাম, যা এই ‘কলামটির’ প্রারম্ভেই উল্লেখ করেছি। যখন থেকেই আমি ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ বাক্যটি আমার ব্রত হিসেবে নিয়েছি, তখন থেকেই নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারিনি, যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ, ঘটনা-অঘটনা, অযোগ্যতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থান প্রভৃতি। তবুও শত প্রতিকূলতার মধ্যে ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ করেছি। মানুষের দেহ, সুনাম (Good will) অর্থ, জমি, সন্তান, ব্যবসা, বাণিজ্য যেমন একটি সম্পদ, ‘সময়’ (অর্থাৎ সময়ের সঠিক ব্যবহার) এর চেয়ে দামি সম্পদ বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। 

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৭৮ সালের ২৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ গ্রহণকরত আমার পূর্বতম সংগঠন শ্রমিক, মানবাধিকার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করি। সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ পুরাতন কোর্ট মসজিদের উল্টো দিকে আমার একটি সুসজ্জিত মানসম্পন্ন আইন পেশার চেম্বার ছিল। আল্লাহর রহমতে ওই চেম্বারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জের অনেক আইনজীবী এখন প্রতিষ্ঠিত (উল্লেখ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা ১৯৯০ সালে চেম্বারটি জ্বালিয়ে দেয়)। ‘গণডাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা আমার সম্পাদনায় ওই সময় প্রকাশিত হতো। বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি পদে চার বছর দায়িত্ব পালন করে ১৯৮২ সালে অবসর গ্রহণের পর একটি মানবাধিকার সংগঠনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার জন্য নারায়ণগঞ্জ বার লাইব্রেরিতে এলে, অনুষ্ঠান শেষে আপ্যায়নের জন্য আমার চেম্বারে আসার অনুরোধ করলে তিনি সদয় সম্মতি প্রদান করেন। সাথে আরো অনেকেই ছিলেন। তখন আমার চেম্বারে প্রবেশপথে বড় করে লিখা ছিল ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’, কথাটি দেখে অনেকেই টিপন্নি কেটে বিভিন্নভাবে আলোচনা, সমালোচনা করতে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি সাবেক প্রধান বিচারপতি বললেন যে, ‘কথাটি সঠিক এবং কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও কথাটি ধ্রুব সত্য।’ জীবনের প্রারম্ভে অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পূর্ব থেকেই যে কথাটি বেদবাক্য হিসেবে বিশ্বাস করতাম, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক দুর্গাদাসের পর প্রধান বিচারপতির (সাবেক) পক্ষ থেকে স্বীকৃত পেয়ে আশ্বস্ত হয়ে ছিলাম। 

কোথাও থেকে সমর্থন না পেলেও ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ কথাটি আমার পেশাগত প্যাড (রাইটিং লেটার হেড), ভিজিটিং কার্ড, আমার ব্যবহৃত ইনভেলাপ, ছাপানো ফাইল এবং ব্যক্তিগত চেম্বারে লিখে রাখা অব্যাহত রাখি, এতে অনেক অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছি, মনে হয়েছে পৃথিবীতে আমার এ বিশ্বাসকে একমাত্র আমিই বিশ্বাস করি, এমনকি নিকটস্থ লোকজন বিষয়টি নিয়ে এখনো প্রশ্ন করে বলে যে, জীবন না থাকলে ‘সময়’ কোন উপকারে আসবে? জবাবে আমি বলি, নিজ জীবন যদি যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হয়, একটি ‘জীবন’ যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বা জাতির কোনো উপকার বা কাজে না লাগে তবে সার্থকহীন জীবন নিয়ে বেঁচে থেকেই কী লাভ? জিজ্ঞাসা করতে চাই মানুষের ‘জীবন’ বা ‘জীবনকাল’ অর্থাৎ আয়ুষ্কাল বাড়ে, না কমে? একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একজন মানুষের পৃথিবীতে আগমন ও প্রস্থান, যার নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট কোনো মানুষের হাতে নাই। ফলে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে যে, বয়স বাড়ে না, কমে। যে জিনিসটি স্বাভাবিক নিয়মে কমে যায় সে বিষয়টিই তো মূল্যবান? একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি জীবনকে সার্থক করে তুলতে হয় তবে অবসর বা আমোদ আল্লাদে, ফুর্তিতে ‘সময়’ কাটানোর অবকাশ কোথায়? নিবিঢ়ভাবে আত্মদর্শন বা আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই সার্বিক বিষয় আমাদের বোধোদয় হওয়ার কথা। 

এ বিশ্বাসকে বেদবাক্য মনে করে দৃঢ়তার সাথে চলতে থাকি, কিন্তু আমার এ বেদবাক্য ও পেশার সাথে বৈপরীত্ব দেখা দিলো ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান পদে বিএনপি সরকার যখন আমাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দান করে, ২০০৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত একটানা এ দায়িত্বে ছিলাম। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রীয় পরিবহনের অনেক বাস ট্রাক বহর তো বটেই, বিভিন্ন রুটে অনেক প্রাইভেট মালিকানাধীন বাস সার্ভিস আমাকে উদ্বোধন করতে হয়েছে। ঢাকা-আগরতলা আন্তর্জাতিক বাসসার্ভিস আমার তত্ত্বাবধানে, সক্রিয় প্রচেষ্টায় চালু হয়েছে। তখন দেখেছি যে, সরকারি ও বেসরকারি সব পরিবহনের গায়ে লেখা ছিল ‘সময়ের চেয়ে জীবন অনেক মূল্যবান’ যা ছিল আমার ‘বিশ্বাসের’ অর্থাৎ ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ কথাটির ঠিক উল্টো। যা বিশ্বাস করি না, তা মেনে নিয়েই দীর্ঘ পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় পরিবহনের কর্ণধারের দায়িত্ব পালন করাটা মহাত্মা গান্ধীর মাংস খাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিত। ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তার আত্মকথায় লিখেছেন যে, পরম বৈষ্ণব হয়েও নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি কয়েকবার মাংস খেয়েছেন (সূত্র : আত্মকথা অথবা সত্যের সন্ধানে পৃষ্ঠা ৪৬-৪৯)। পরিবহন ব্যবস্থাকে কিভাবে ঢেলে সাজিয়ে যানজট ও দুর্ঘটনা মুক্ত করা যায়, এ মর্মে অধ্যাপক (মরহুম) ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে বিএনপি সরকার উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে, যার একজন সদস্য হিসেবে বিশেষজ্ঞ কমিটির সভায় আমাকে উপস্থিত হতে হয়েছে। 

মিটিংয়ে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে আলোচনা হতো, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার প্রধান হিসেবে আলোচকের পরিবর্তে আসামির কাঠগড়ায় (মানসিক) দাঁড়িয়ে আমাকে জবাব বা নিজের মতামত ব্যক্ত করতে হতো। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের অভাবে দুর্ঘটনা বেশি হয় মর্মে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ দিলে দেশব্যাপী ড্রাইভিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করার জন্য বিআরটিসির ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। যেখানে বিআরটিসির ডিপো, কারখানা স্থাপনা প্রভৃতি ছিল, সেসব জেলায় উদ্যোগ নিয়ে ১৮টি ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল চালু করি। যারা কথিত ‘ওস্তাদ’ ধরে ড্রাইভিং শিখেছে তাদের বিভিন্ন সেন্টারে ট্রেনিং দিয়ে পরীক্ষা নিয়ে সনদপত্র প্রদান করি, মহাব্যবস্থাপক (ট্রেনিং) সার্টিফিকেট স্বাক্ষর করতেন, যাতে চেয়ারম্যান হিসেবে আমি প্রতি স্বাক্ষর দিয়েছি, যাতে কোনো ভুয়া সার্টিফিকেট ইস্যু না হয়। উল্লেখ্য আমাদের দেশে বিআরটিসির ড্রাইভিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ছাড়া সরকারি অন্য কোনো এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না যাতে পর্যাপ্ত ট্রেনিং নিয়ে কারিগরি প্রাথমিক জ্ঞানসম্পন্ন একজন দক্ষ ড্রাইভার, যার অটোমোবাইল জ্ঞানসহ রাস্তায় দায়িত্ব নিয়ে গাড়ি চালানোর সচেতনা ও অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। 

ভাবতে অবাক লাগে যে, আমাদের দেশে বেশির ভাগ ড্রাইভিং লাইসেন্সই দুই নাম্বার। গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থাক বা না থাক টাকা দিলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। সরকারি উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তার ড্রাইভারের লাইসেন্স দু’নম্বর, এমন অনেক তথ্য পেয়েছি। Colour Blind ব্যক্তির গাড়ি চালানো নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনুরূপ অনেক ড্রাইভার পেয়েছি যারা ‘রাতকানা’ রোগ থাকা সত্ত্বে ড্রাইভিং করে যাচ্ছে। প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করার বিধান চালু থাকলেও বাংলাদেশে ড্রাইভারদের শারীরিক ফিটনেস পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। আইএলও বিধান মতে, একটানা ৮ ঘণ্টার বেশি পরিশ্রম করার বিধান নেই। অথচ লং রুটে একটানা ১০-১২ ঘণ্টা, অধিকন্তু যানজট প্রভৃতির কারণে ড্রাইভাররা মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে চলন্ত অবস্থায় গাড়ির ড্রাইভিং সিটেই ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে সংঘটিত হয় মারাত্মক দুর্ঘটনা ও ঘটে প্রাণহানি। মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানো, চলন্তাবস্থায় মোবাইলে কথা বলা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। যা হোক, অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথাগুলো বললেও আমার মূল আলোচনা ‘সময়ের’ মূল্যায়ন নিয়ে। 

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বাংলাদেশ পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে। কোনো সরকারই এ মহামারীকে রোধ করতে পারেনি, বরং দিন দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায়, যাত্রী, পথচারীদের সচেতন রাখার জন্যই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উদ্যোক্তারা ‘সময়ের চেয়ে জীবন অনেক মূল্যবান’ কথাটি প্রতিটি পরিবহনের বডিতে লিখে রেখেছে, যা উদ্দোক্তাদের মতে যথার্থ। কিন্তু আমার বিচার বিশ্লেষণে আমার বিশ্বাস ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ সঠিক বলে পোষণ করতে থাকলেও দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য কোন কথাটি প্রচার করা যায় এবং কোন কথাটি এপ্রোপ্রিয়েট হবে তা নিয়ে চিন্তা করতে থাকি এবং এ কথাও চিন্তা করি যে, আমার নিজস্ব মতবাদ ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ স্লোগানটি পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে যে, ‘দুর্ঘটনা রোধে সাবধানতা অবলম্বন করুন’, ‘তাড়াহুড়া করে মৃত্যুর ঝুঁকি নেবেন না’, ‘গাড়িতে ওঠা নামায় নিজে সচেতন হোন, অপরকে সাবধান করুন’, ‘চলার পথে তাড়াহুড়া আপনার মৃত্যু ডেকে আনবে’ প্রভৃতি বাসের বডিতে লেখার চিন্তা করেও নানা কারণে অগ্রসর হইনি। ঢাকাকে বায়ু দূষণমুক্ত করার জন্য বিএনপি সরকার ডিজেলচালিত বেবিট্র্যাক্সির পরিবর্তে সিএনজি চালিত বেবিট্র্যাক্সি চালু করার সিদ্ধান্ত নিলে সেখানেও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে হয়।

২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগটা শহরে অন্যান্য উচ্চপদস্থ আমলাদের সাথে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য আমাকে উচ্চতর ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। ট্রেনিং থেকে যা বুঝলাম, দুর্ঘটনার জন্য শুধু ড্রাইভার, পথচারী বা যাত্রী দায়ী নয়। এর অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মেশিনারিজ ত্রুটি, রাস্তা শাসন বা সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্ত ম্যানেজমেন্ট সড়ক দুর্ঘটনা রোধে অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে নদী শাসনের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু রাস্তা শাসনের যে প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারাই মাসোহারা গ্রহণ করে সড়কে শৃঙ্খলা আনার পরিবর্তে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিচ্ছে। এ ট্রেনিং থেকে একটি বিষয় আমার বদ্ধমূল ধারণা হলো যে সড়কে দ্রুত যান ও ধীরে চালিত যানবাহন এক সাথে চলে সে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটনার অনেক কারণ রয়েছে। আমাদের দেশে বাস, ট্রাক, নছিমন, করিমন, ভটবটি, বেবিট্যাক্সি এমনকি রিকশা ও ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত একই রাস্তায় চলে। বোগটা ট্রেনিংয়ে মূল সুপারিশ নিম্ন রূপ ছিল : 

ক. প্রত্যেকটি শহরে দু-একটি রাস্তা সংরক্ষিত রাখতে হবে যা শুধু সাইকেল চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। 

খ. সপ্তাহে অন্তত একদিন শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে শুধু সাইকেল আরোহী ও পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে (জরুরি সার্ভিস ব্যতীত)। 

১. এতে একদিকে শহরের বায়ুদূষণ মুক্ত হতে সহায়ক হবে, অন্য দিকে নাগরিকদের শারীরিক ফিটনেস বাড়বে,

২. দ্রুত যান ও ধীরে চালিত যানবাহনের জন্য রাস্তায় আলাদা আলাদা লেইন থাকতে হবে,

৩. সড়ক শাসনের অর্থাৎ সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী ম্যানেজমেন্ট এবং

৪. যানবাহন ও চালকদের শারীরিক ফিটনেস নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

এমনিভাবে বিআরটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার পাঁচ বছর কেটে গেল, ১/১১ সরকার ক্ষমতায় এসে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই নেত্রীসহ অনেক রাজনৈতিক নেতার সাথে আমাকে কারাগারে আবদ্ধ রাখে ২৬ মাস, ১/১১ সরকারের দৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের লোকজনকে বিআরটিসিতে চাকরি দেয়ার অপরাধ, কোনো দুর্নীতি প্রমাণ না হওয়ায় ২০১৮ সালে হাই কোর্ট থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হই। তবে এটাই আমার প্রথম বা শেষ কারাবাস নয়, আগে পরে অনেকবার কারারুদ্ধ হতে হয়েছে, মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়েছি, একই ব্রাশফায়ারে সাথী ইব্রাহিম নিহত হয়, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ হয়েছে, আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছে বহুবার।

আমি দীর্ঘ ৩৪-৪০ বছর যাবৎ প্রতিবন্ধী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা (সভাপতি), বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির (সহ সভাপতি) দায়িত্বে ছিলাম ও আছি। জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির মূল কাজ অন্ধত্ব প্রতিরোধ, অন্ধদের জীবন উন্নয়নে সহযোগিতা ও চক্ষু হাসপাতাল পরিচালনা করা। সমিতির আর্থিক সহযোগিতায় অনেক অন্ধ ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে এবং এখনো করছে। তাদের মধ্যে একজন মোশারফ হোসেন এখন হাইকোর্টের সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী। আমি ১৪/৫/২০০৯ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সুপ্রিম কোর্টে পুনরায় আইন পেশায় যোগদান করি। অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন আমার সুপ্রিম কোর্ট চেম্বারে একটি সমস্যা সমাধানের আইনগত পরামর্শ চাইলে সময় নিয়েই আমি পরামর্শ দেই। তখন সে আমাকে পরামর্শ বাবদ ফি দিতে চাইলে আমি বললাম, ‘লাগবে না, তোমার নিকট রাখো।’ তখন সে আমাকে বলে Sir, Time is Money. তার অনুরোধে আমি ফি না নিলেও অনেক সন্তুষ্ট এবং আত্মতৃপ্তি লাভ করি এই ভেবে যে, ‘সময়’কে মূল্য দেয়ার বিশ্বাস করার মতো মানুষ পৃথিবীতে রয়েছে। 

স্কুল জীবনেই পড়ে ছিলাম ‘Hit the iron when it is hot’। এ প্রবাদটিতে ‘সময়’কে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে মনে করি। ‘সময়’কে মূল্য দিয়ে অত্যধিক পরিশ্রম করে আল্লাহর রহমতে Loosing Concern বিআরটিসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছিলাম। আমি বিআরটিসিতে যোগদানের পূর্বে মীরপুর, যশোর ও চট্টগ্রামের সংস্থার নিজস্ব জমি বিক্রি করে কর্মচারী কর্মকর্তাদের Golden Handshake এর মাধ্যমে চাকরি থেকে বিদায় করতে হয়েছে, কর্মচারীদের ৮ মাসের বেতন বাকি থাকা অবস্থায় চেয়ারম্যান পদে আমার যোগদান। 

১/১১ সরকারের কারাগারে যখন ২৬ মাস ছিলাম তখন আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ়মূল হয়েছে যে, ‘সময়েরই’ মূল্য আছে, কিন্তু জীবনের মূল্য অর্থহীন, যদি সে ‘জীবন’ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের কোনো কাজে না আসে। জেলখানায় তিনবেলা খাওয়া ছাড়া কোনো কাজ নেই, তাই অন্য কোনো কাজ না পেয়ে কুরআনের আয়াত মুখস্থ করা শুরু করি, কিন্তু সমাপ্ত করতে পারিনি, পরবর্তীতে ঢাকা পুরাতন জেলখানার ৭ সেল ও এরশাদ নগরে (এরশাদ যে সেলে কারাবন্দী ছিল) এবং কাশিমপুর-২ কারাগারের ডিভিশন সেলে নামাজে ইমামতি ও আজান দেয়ার দায়িত্ব নেই। তখন মনে হয়েছে আমার এ জেল জীবনটাও কিছুটা হলেও সার্থক। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে ১১/১১/২০০৮ আমার ব্যক্তিগত ডাইরিতে নিম্নলিখিত মন্তব্য লিপিবদ্ধ করি- “আজ ১ মহরম, ১৪২৯ হিজরি। ১৮/৪/২০০৭ ইং তারিখ থেকে জেলখানায় বন্দী।

জীবনের অনেক সময় চলে গেল, কিন্তু নিজ ও নিজ সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কিছুই জানা চিনা হলো না। এ জন্য গভীর মনোনিবেশ করা দরকার। মনোনিবেশের জন্য জেলখানা উৎকৃষ্ট স্থান। তাই ‘সময়’কে কোনো কারণেই অপচয় বা অপব্যবহার করা যাবে না। অনুশীলন আর অনুশীলনের মাধ্যমে বাকি জীবনের সফলতার প্রস্তুতি নিতে হবে। পরম করুণাময় আল্লাহ তৌফিক দিন।” উল্লেখ্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন মৎস্য অফিসার বন্দী হিসেবে এসেছেন শুনে তার নিকট মৎস্য চাষের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে ব্যর্থ হই। কারাগারকে বলা হয় সংশোধনাগার। কারা গেটে লেখা রয়েছে ‘রাখব নিরাপদ, দেখব আলোর পথ’। অথচ টাকা হলে কারাগারে সব ধরনের মাদকসহ বদ নেশার সব সুবিধাই পাওয়া যায়। কারা কর্তৃপক্ষ টাকার জন্য বন্দীদের ওপর নিয়মিত নির্যাতন করেন। সাধারণ কয়েদি থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিভিশন সেলে বন্দী থাকায় আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, এ নিয়ে বিস্তারিত পরে লেখা হবে।

ফকির লালন শাহ বলেছেন যে, ‘সময় গেলে হবে না সাধন।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করে হে প্রভু।’ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের আধার দুই পণ্ডিত ব্যক্তির বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে সর্বক্ষেত্রে ‘সময়ই’ একটি ফ্যাক্টর। অথচ সময়কে যথাযথ মূল্যায়ন করাই আমরা ভুলে গেছি। 

জাতীয় পত্রিকায় ইতঃপূর্বে নিয়মিত আমার লেখা আর্টিকেলগুলোতে রাষ্ট্র কর্তৃক সংবিধান লঙ্ঘন, বিচার বিভাগে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য ছিলাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু আমার মনে কোনো দিন কল্পনাও হয়নি যে, কোনো সময় আমি ছাত্র হিসেবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ওপর আমার একাডেমিক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য (জাতীয় পত্রিকায় তথ্যপূর্ণ আর্টিকেল লেখার স্বার্থে) ৬৭ বছর বয়সে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগে ভর্তি হয়ে নিজ ছেলেমেয়ের বয়সী ছাত্র ছাত্রীদের সাথে নিয়মিত ক্লাস করি, সেমিস্টার ও ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। একটি ক্লাসে লেকচার দেয়ার সময় অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুল আরেফীন বলেন, ‘ইসলাম ধর্ম মতে জিনা (ধর্ষণ) করা যেমন মারাত্মক অপরাধ, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ‘প্রটেসট্যান্ট’ গ্রুপের মতে সময়ের অপচয় একটি মারাত্মক অপরাধ। তবে কি ‘সময়’কে মূল্যায়ন করেই প্রটেসট্যান্ট খ্রিষ্টানরা বিশ্ব শাসন করছে? এ বিষয়গুলোও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেয়া দরকার।

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘মানুষকে আমি শ্রমনির্ভর করেই সৃষ্টি করেছি’ (সূরা-বালাদ, আয়াত-৪), এর অর্থ কী দাঁড়ায়? বিত্তবান বা রাজাবাদশা বা ক্ষমতাবান হলেই আরাম আয়েশে, আমোদ, ফুর্তিতে সময় অপচয় করার জন্য নির্দেশ আল্লাহ পাক দেননি, বরং শ্রমনির্ভর হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ‘অবসর’ সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদতে রত হও, আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ঠ হও।’ (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত-৭/৮) ‘সময়ের’ সদ্ব্যবহারের জন্য আল কুরআনে আরো অনেক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ কথাটি যারা বিশ্বাস করেন তাদের উদ্দেশেই উৎসর্গ করেছি আমার লেখা ‘মীরজাফর যুগে যুগে’ বইটিকে। ‘উৎসর্গে’ আমার বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য লিখেছি যে, ‘জীবনের চেয়ে সময় অনেক মূল্যবান’ এটা শুধু আমার বদ্ধমূল ধারণা নয় বরং দৃঢ়বিশ্বাস, এ বিশ্বাসকে লালন করার প্রয়াসে বারবার ব্যর্থ হয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। যারা এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে নিজে (স্বয়ং), পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজ সত্তাকে নিয়োজিত রেখে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের নিকট নিজ জবাবদিহিতার জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সব ভয়, বাধা, সমালোচনা উপেক্ষা করে অবিচল থেকে প্রতিদানে কণ্টকময় জীবনযাপন করছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশে আমার এই সামান্য প্রচেষ্টা, তাদের জন্যই উৎসর্গকৃত।’ 

‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার সময় তার’ এ দেয়াল লিখনটি আমার চোখে পড়েছে। তবে আমি কোনো বন্দুকযুদ্ধের কথা বলছি না। যুদ্ধ করতে হবে নৈতিকতার জন্য, মানবতার জন্য, সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবিতে, যুদ্ধ করতে হবে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে, ভূমিদস্যু, ব্যাংক লুটেরা, কালোবাজারি, মজুদদার, ত্রাণের চাল চোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু আমাদের যুব সমাজের সে উপলব্ধি কোথায়? তাদের এ মূল্যবান ‘সময়’ জাতির জন্য কি কোনো অবদান রাখবে না? কবি বলেছেন, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনি সকাল হবে?’ জাতির ভাগ্যাকাশে রক্তলাল সূর্যের সোনালি আভাপূর্ণ একটি ‘সকালের’ জন্য জাতিকে জাগতে হবে এবং এ জন্যই প্রয়োজন সময়ের মূল্যায়ন। 

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন) 

[email protected]


আরো সংবাদ