২৬ নভেম্বর ২০২০

ছোঁয়াচে রোগে ইবনে সিনার দাওয়াই

-

সময়ে সময়ে মহামারীতে বেশুমার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত শতাব্দীতেই ইউরোপে প্লেগ ও স্প্যানিশ ফ্লুতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ গেছে। কিন্তু সমকালীন বিশ্বের অধিবাসীদের একটি ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী মহামারী থেকে ‘মুক্ত ও নিরাপদ’। এই ধারণা জন্মে বৈশ্বিক পর্যায়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘অভাবনীয়’ উন্নতিতে; দেশে দেশে টেকসই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়। মহামারী থেকে এসবই আমাদের সুরক্ষা দেবে বলে ছিল সবার বদ্ধমূল ধারণা। কিন্তু সমকালও যে মহামারী থেকে রেহাই না-ও পেতে পারে, কারো ভাবনায় ছিল না। মহামারী মুক্ত থাকার চিন্তা যে কত ভ্রান্ত বুঝতে এখন আর কারো বাকি নেই। অত্যাধুনিক যুগের জ্ঞানের অহঙ্কার এক লহমায় চূর্ণ হতে সময় লাগেনি। অদৃশ্য জীবাণু করোনাভাইরাসই এ জন্য যথেষ্ট। মাস ছয়েক আগেও ঘূণাক্ষরেও টের পাইনি, করোনার আঘাতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাজানো বিশ্বব্যবস্থা তছনছ হয়ে একেবারে উদাম অবস্থায় সবার কাছে দৃশ্যমান হবে। অথচ এমন অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতাই এখন অনিবার্য পরিণতি। নিষ্ঠুর এই নিয়তির করালগ্রাসে নিপতিত বিশ্ববাসী। এক বিশ্বব্যবস্থার গালভরা বুলি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে টুকরো টুকরো হয়ে। 

করোনার এই বিশ্ব মহামারী শেষ হতে কত দিন লাগবে কেউ বলতে পারছেন না। এর প্রভাবে কার্যত পৃথিবী এখন অচল। যেসব জায়গা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, সেগুলো দেখলে এখন ভুতুড়ে মনে হবে। প্রতিদিনের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, স্কুল বন্ধ, ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গণজমায়েতে বিধিনিষেধÑ এসব কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একটি রোগ ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুরো বিশ্ব যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সত্যিই নজিরবিহীন। কিন্তু এর শেষ কোথায়, মানুষ কবে নাগাদ ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? এটি পরিষ্কার, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরার ওপর এখনো যে বিধিনিষেধ রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে তা চালিয়ে নেয়া অসম্ভব। এ থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্ববাসী একটি কৌশল খুঁজে বের করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। বিধিনিষেধগুলো প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার উপায় খুঁজছে। তবে জুতসই উপায় বাতলানো যায়নি।

বিশ্বের এই হতশ্রী চেহারা বিশেষ করে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। তর্ক-বিতর্ক। দ্রুত অবস্থার পরিবর্তনে বেশির ভাগ মানুষই সন্দিহান। সাবেক অবস্থায় ফেরা সম্ভব হবে কি না; তা ও সুদূর পরাহত। অবশ্য, অনেকে এ-ও বলছেন, পৃথিবীবাসীকে আগের অবস্থায় ফেরার চেষ্টা কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। তথাকথিত উন্নয়নের ধারায় ফেরার অর্থ চূড়ান্ত আহাম্মকি। করোনাপূর্ব বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মানে নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়। পরিবর্তে প্রকৃতি আর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই হবে আগামীর পৃথিবীর রূপকল্প। তাই ভোগবাদী মানসিকতা ছেড়ে ন্যূনতম চাহিদা মিটিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অর্থাৎ আগামীর সুন্দর পৃথিবীর জন্য সবার একটিই কর্তব্য সর্বনি¤œ ভোগে সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা। জীবনবোধ সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানের চর্চা। সব কিছুর আগে এ মুহূর্তে বিশ্ববাসীর চাওয়া করোনামুক্ত জীবন। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। 

কিন্তু চাইলেই কি পাওয়া যায়? এখনো বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে অতিমারী করোনার গতি-প্রকৃতি বাড়তির দিকে। পৃথিবীর একপ্রান্তে কমছে তো অন্য অঞ্চলে ঝড়ের বেগে আঘাত হানছে। বেশুমার লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দিন যতই গড়াচ্ছে, মৃত্যুর হার ততই বাড়ছে। গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহানে অতি ছোঁয়াছে করোনাভাইরাস কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব। সেখান থেকেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। 

দীর্ঘ ছয় মাস পরও এর প্রতিষেধক উদ্ভাবন করা যায়নি। ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত শুধু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সঙ্গনিরোধই ভরসা। মজার ব্যাপার হলো, ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার দাওয়াই কিন্তু আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে যারা একটু খোঁজখবর রাখেন; তাদের এ তথ্য অজানা নয় যে, এই দাওয়াইয়ের উদ্ভাবন আজ থেকে হাজার বছর আগে। মধ্য এশিয়ার একসময়ের প্রসিদ্ধ নগরী বোখারায় জন্মেছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক, রোগ-ব্যাধি নিয়ে গবেষক, কবি ও দার্শনিক আবু আলী ইবনে সিনা (৯৭০-১০৩৭)। যার চিকিৎসা ও দর্শনসংক্রান্ত বই একসময় পেয়েছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি। যে সময় মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কার হয়নি, রোগজীবাণু সম্পর্কে কোনো ধারণা মানুষের ছিল না, সেই সময় তিনি বলেছিলেনÑ কোনো জনপদে মহামারী আকারে কোনো রোগ দেখা দিলে খাবার পানি ফুটিয়ে খেতে। ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে পৃথক করে রাখতে। যাতে করে রোগ বিস্তার কমে আসতে পারে। ছোঁয়াচে রোগ মহামারী আকারে ধারণ করতে না পারে। ইবনে সিনার দাওয়াই যে এখনো কার্যকর সে কথা আবারো প্রমাণিত হলো। এই ভেবে বিস্মিত হতে হয়, আজকের দুনিয়ায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে এত দিন যেভাবে গর্ব করা হতো; তা কতটা ফাঁকাবুলি। অন্তসারশূন্য। করোনাকালে আমাদের এখনো হাজার বছর আগের জ্ঞানেই চলতে হচ্ছে। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ভোগে নয়, জ্ঞানের ক্ষেত্রে পৃথিবী কি খুব বেশি এগিয়েছে? লাগামহীন ভোগ যে মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সমকালীন দুনিয়ার বাসিন্দারা অনাগত প্রজন্মের কাছে উৎকটভাবে ধরা দেবে; সে হিসাব কি কারো আছে? 

তবে মাহারারী রুখতে ইবনে সিনার বাতলে দেয়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সঙ্গনিরোধের উপায় বাতলে দেয়া পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে পালন করা যে একটু কঠিন তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে টের পাওয়া যাচ্ছে। যেমন- আমাদের দেশ বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। দেশে করোনা সংক্রমণ রোধে ঘোষিত সাধারণ ছুটি কতটা আমরা মেনেছি, সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা যেন নিয়ম ভাঙায় একধরনের বন্য আনন্দ উপভোগ করি। এবার এটিই প্রমাণ করল; আমাদের পুরোপুরি নাগরিক হয়ে উঠতে আরো সময় লাগবে। এ ছাড়া করোনা মোকাবেলায় শুরু থেকেই আমরা সঠিক পরিকল্পনা নিতে পারিনি। আবার যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়, তা-ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। সমস্যাটিকে দূরদৃষ্টিতে না দেখে ক্ষীণদৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে অনেক দেশ করোনা মোকাবেলায় সাফল্য পেয়েছে। যেসব দেশ দ্রুততার সাথে ও যথাযথভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণের কৌশল বাস্তবায়ন করেছে; সেসব দেশ সফল হয়েছে। আর যেসব দেশ আটঘাট বেঁধে নামেনি, সেসব দেশকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইরান উল্লেখযোগ্য। পাশের দেশ ভারতেও সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশেও ঠিক তা-ই হচ্ছে। আগে আমরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারিনি। এখনো যদি সারা দেশের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে একসাথে ও সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারি তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সফল হওয়া যাবে না। কারণ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই যেখানে সারকথা।

মনে রাখতে হবে, করোনা মহামারী জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্বে ঘাটতি থাকায় যে যার মতো করে কাজ করছে, ফলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আগেও যে যার মতো করে কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ), আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ), লকডাউনসহ (অবরুদ্ধ অবস্থা) সব কাজই করেছে, কিন্তু সমন্বিত না হওয়ায় ফল পাওয়া যায়নি। কাজটি করতে না পারলে ব্যাপক সংক্রমণ প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন। এটি করতে না পারলে আমাদের ‘বড় মূল্য’ দিতে হতে পারে। এর ফলে যা হবে তা হচ্ছে, দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন চিকিৎসার চাহিদা এত বেশি বেড়ে যাবে যে তা আর কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। 

[email protected]


আরো সংবাদ