১৩ জুলাই ২০২০

ভারতের পতনমুখী ধর্মীয় স্বাধীনতা

ভারতের পতনমুখী ধর্মীয় স্বাধীনতা - ছবি : নয়া দিগন্ত

গত জানুয়ারির শেষ দিকে ‘অ্যালায়েন্স ডিফেন্ডিং ফ্রিডম (এডিএফ)-ইন্ডিয়া’ এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৯ সালে ভারতে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে হিন্দুরা কমপক্ষে ৩২৮টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। এর মধ্যে ২৩০টিই ছিল সঙ্ঘবদ্ধ হামলা। এসব ধর্মীয় সাম্প্র্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে উপজাতীয় সম্প্র্রদায়ের ২৭৫ জন, ৫৫ জন দলিত, ১৬৪ জন নারী ও ১১৭ জন শিশু। ‘এডিএফ-ইন্ডিয়া’ এই প্রতিবেদন তৈরিতে ‘ইউনাইডে খ্রিশ্চিয়ান ফোরাম’-এর তথ্য-সহায়তা নিয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এর বাইরে আরো অনেক হামলার ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর কোনো রেকর্ড রাখা হয়নি। ২০১৯ সালে সংঘটিত এ ধরনের হামলার সংখ্যা এর আগের বছরের চেয়ে ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেশি। এসব ঘটনার ১৩১টিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। এতগুলো হামলার ঘটনার মধ্যে হামলাকরীদের বিরুদ্ধে মাত্র ৩৬টির এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) নিবন্ধন করা হয়েছে। অপর দিকে ১১০টি ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেয়নি। 

একইভাবে ভারতে মুসলমানদের ওপরও আমরা প্রায়ই বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নানা ধরনের হামলা ঘটতে দেখি। ভারতীয় গণমাধ্যমে এসব ঘটনার খবরের ছিটেফোঁটা ছাপা হয়। বেশির ভাগ ঘটনাই থেকে যায় আমাদের জানার বাইরে। তবে এসব হামলার ঘটনা ভারতে যে পরিব্যাপক, তা সহজেই অনুমেয়। এ ধরনের হামলার মধ্যে সর্বশেষ উল্লেখয্যো হামলাটি ঘটে দিল্লিতে, শাসক দলের পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতায়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে এই হামলা একটানা চলে আরো কয়েক দিন। এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের পরিচালিত এ বছরের জঘন্যতম ধর্মীয় সন্ত্রাসী হামলা। এই হামলার সময় প্রায় প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদীদের সহায়তা করে দিল্লি পুলিশ। হামলাকারীদের সাথে সুর মিলিয়ে পুলিশ সদস্যরাও সাম্প্রদায়িক স্লোগান উচ্চারণ করে। পুলিশ সদস্যদের আগুন লাগাতে দেখা গেছে মুসলমানদের দোকানপাট আর বাড়িঘরে। এ ঘটনায় নিহত হয় ৪৬ জন, যার বেশির ভাগই মুসলমান। এর আগে আমরা মুসলিমবিরোধী অনেক বড় বড় দাঙ্গা দেখেছি। ২০০২ সালে গুজরাটে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সৃষ্ট তিন দিনব্যাপী ভয়াবহ মুসলিম নিধনযজ্ঞ চলতে দেখেছি। সরকারি তথ্যমতেÑ বহুল আলোচিত এই দাঙ্গায় নিহত হয় এক হাজার ৪৪ জন, নিখোঁজ হয় ২২৩ জন, আর আহত হয় ২৫০০ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জনই ছিল মুসলমান, আর হিন্দু ২৫৪ জন। তবে সংশ্লিষ্ট সিটিজেনস ট্রাইব্যুনালের রিপোর্ট মতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৯২৬। কোনো কোনো সূত্র মতে, নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের উপরে। এরপর বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংসের পরিমাণও ছিল ব্যাপক।

ভারতে ১৯৮৪ সালের হিন্দুদের সৃষ্ট শিখবিরোধী দাঙ্গা এখন ইতিহাসের পাতায়। এটি ১৯৮৪ সালে শিখ হত্যাযজ্ঞ নামেও পরিচিত। ইন্দিরা গান্ধী তার এক শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর এই দাঙ্গা শুরু হয়। ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস এ দাঙ্গায় দাঙ্গাবাজদের পক্ষ নেয়। সরকারি তথ্যমতে, এ দাঙ্গায় শুধু দিল্লিতেই নিহত হয় দুই হাজার ৮০০ শিখ। সারা দেশে তিন হাজার ৩৫০ জন। তবে স্বাধীন সূত্র মতে, সারা দেশে নিহত শিখদের সংখ্যা আট হাজার থেকে ১৭ হাজার। শুধু ধর্মাবলম্বনের কারণে ভারতে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা এ ধরনের নানা হামলার শিকার হচ্ছে। 

এ তো গেল বড় ধরনের ধর্মীয় সন্ত্রাসের কয়েকটি ঘটনা। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অহরহ কত শত সন্ত্রাসী হামলা ঘটিয়ে চলেছে, তার ইয়ত্তা নেই। কখনো এসব সস্ত্রাস চলছে গো-রক্ষা, কখনো ঘরওয়াপসি আবার কখনো জোর করে ধর্মান্তরিত করার নামে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার তাণ্ডব ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে দেশটিতে বসবাসরত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা।
আসলে ভারত বহু ধর্মমতের মানুষের দেশ। ইংরেজিতে এ ধরনের দেশকে বলা হয় ‘প্লুরাল কান্ট্রি’। এখানে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। প্রধান দুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হচ্ছে মুসলমান ও খ্রিষ্টান। এ ছাড়াও আছে শিখ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষ। দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলন সব ধর্মমতের মানুষকে সমমর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা বহিরাগত, ‘এলিয়েন’। ভারতের সব হিন্দু আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে এক ধরনের কথা বলে না। সরসঙ্ঘচালক এমএস গোলওয়ালকার এদের দেখেছেন হিন্দু জাতির ‘ইন্টারনাল থ্রেট’ হিসেবে। পরবর্তী সময়ে হিন্দু আইডিওলগেরা চেষ্টা করেছেন ‘হিন্দু’ শব্দটিকে ভৌগোলিকভাবে ব্যবহার করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ‘হিন্দু’ হিসেবে চিহ্নিত করতে। বিজেপির মুরলি মোহন যোশী মুসলমানদের ব্যাপারে ব্যবহার করেছেন ‘আহমদিয়া হিন্দু’ এবং খ্রিষ্টানদের বেলায় ব্যবহার করেছেন ‘ক্রিস্টি হিন্দু’ নামটি। বর্তমান আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত এক সময় বলেনÑ যেহেতু এটি হিন্দুস্তান, অতএব এখানে যারা বসবাস করবে তারা সবাই হিন্দু।

এসবই বলা শুধু মুখ রক্ষার খাতিরে। কিন্তু সাধারণভাবে হিন্দুরা বিশেষ করে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মনে করে ভিনদেশী ধর্মাবলম্বী। নানা অপপ্রচার চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এই সময়ে এটি দেশটিতে চালু করা হয়েছে ‘হেইট কালচার’ বা ‘ঘৃণার সংস্কৃতি’ নামে অপসংস্কৃতি। এর ফলে এখন ভারতজুড়ে পথেঘাটে চলছে সংখ্যালঘু-বিরোধী ‘ঘৃণার সংস্কৃতি’ চর্চার প্রবণতা। যখন-তখন যেখানে-সেখানে যাকে-তাকে আটকে মারধর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর এক উদ্ভট প্রবণতা জারি রেখেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে যেসব ঘটনার খবর মিলে তা বিবেকবান ভারতীয়সহ অন্যান্য দেশের মানুষকেও উদ্বিগ্ন করে।

ভারতীয় সংবিধানের ভিত রচিত হয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ বেয়ে। সংবিধান হচ্ছে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। সেই সাথে সংবিধান হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের রক্ষাকবচ। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ ও ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান রয়েছে। সে বিধান মতে, সে দেশের প্রত্যেক নাগরিক যেকোনো ধর্ম গ্রহণ, ধর্মাচার, প্রচার ও বিকাশ ঘটাতে পারবে অবাধে স্বাধীনভাবে। যারা ধর্ম মানে এবং যারা কোনো ধর্ম না মেনে নাস্তিক, তারাও তাদের নিজ নিজ মূল্যবোধ নিয়ে সমভাবে সমাজে বসবাস করার অধিকার রাখে। ভারতীয় সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিগত কয়েক দশক ধরে দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পারদমাত্রা ক্রমেই পতনমুখী হতে দেখা গেছে। এই পতনের তীব্রতা সময়ের সাথে কেবলই বাড়ছে। ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে প্রায় ডজনখানেক রাজ্যে ধর্মান্তর-বিরোধী আইন প্রণীত হয়েছে। আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধর্মীয় সন্ত্রাসের জায়মান উদাহরণ হিসেবে মুম্বাই, গুজরাট, মুজাফ্ফর নগরের হত্যাযজ্ঞের ঘটনার স্মৃতি, যাজক গ্রাহাম স্টেইনের হত্যার ঘটনা, কান্দামাল সন্ত্রাসের ঘটনার মতো এই সময়ের কিছু বেদনাদায়ক বিষয়। সর্ব সাম্প্রতিকের দিল্লির সন্ত্রাসের ঘটনার কথা তো আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের বিশিষ্ট মানবাধিকারবাদী সক্রিয় ব্যক্তিত্ব ও লেখিকা অরুন্ধতী রায় একটি সত্যি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন : প্রায়োগিক দিক থেকে ভারত কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা সমাজবাদী দেশ ছিল না। এটি সব সময় কার্যকর ছিল একটি ‘আপার কাস্ট হিন্দু স্টেট’ তথা ‘উচ্চবর্ণের হিন্দুরাজ্য’ হিসেবে।

আসলে আজকের এই সময়ে ভারতজুড়ে সে দেশের মানুষ যে প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসছে তা হলো : ‘সত্যিকার অর্থে আজকের এই ভারতে কি সংবিধান-স্বীকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিগুলো অনুশীলিত হচ্ছে?’ এর সহজ উত্তর নেতিবাচক। বড় হরফে লেখা ‘না’। চার পাশের যে পরিস্থিতি, তা-ই আমাদের এই ‘না’ উচ্চারণ করতে বাধ্য করে। কিন্তু সংবিধানের দাবি ছিল : ভারত হবে এক চরম ধর্মীয় সম্প্রীতির ও বহু ধর্মমতের মানুষের সহাবস্থানের অনন্য দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়দের সেই আশা পূরণের পথে স্থায়ী বাধা হয়ে উঠেছে কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী। এরা আজ পর্যন্ত ভারতে যে ধর্মীয় সন্ত্রাস জারি রেখেছে, এরা স্বাধীন ভারতে এর সূচনাটি করেছিল ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর। সেদিন এরা রাতের আঁধারে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত অযোধ্যার বাবরি মসজিদে রেখে আসে একটি রামমূর্তি। নতুনভাবে শুরু করে বাবরি মসজিদ বিতর্ক। এর পর থেকে স্বাধীন ভারতে বর্ণপ্রথা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ হয়ে উঠল ভারতীয় সমাজের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীও হয়ে উঠল কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে এসব অপচর্চার পৃষ্ঠপোষক।

এভাবে দেশটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে ঠেলে দেয়া হলো এক চ্যালেঞ্জের মুখে, আটকে দিলো নিরাপত্তাহীনতার অদৃশ্য জালকে। এই প্রবণতা ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। স্বীকার করতেই হবে, ভারত কোনো মতেই সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ মাতৃভূমি নয়। সে জন্যই হয়তো অরুন্ধতী রায় বলেছেন : সবাইকে হিন্দু বানানো, আর অহিন্দুদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার জন্য যে সন্ত্রাস আজ ভারতে চলছে, সেটি হচ্ছে বিধ্বংসী আলোড়নের এক পূর্বলক্ষণ। আর সে পূর্বলক্ষণটি হচ্ছে- ভারতের ভিত্তি ও এর অর্থ পাল্টে যেতে পারে এবং পাল্টাতে পারে বিশ্বে ভারতের মর্যাদার অবস্থানও। কিন্তু দেরিতে হলে আরো এমনি বেনাদায়ক নানা ঘটনার খবর এখন আমরা জানতে পারছি। ভারতে ঘটে চলা এ ধরনের ধর্মীয় সন্ত্রাসী ঘটনার ওপর নিয়মিত নজর রাখছে নানা সংগঠন। এসব সংগঠনের মধ্যে বেশির ভাগই বৈশ্বিকপর্যায়ের। শুরুতেই উল্লিখিত ‘এডিএফ-ইন্ডিয়া’সহ আরো কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বর্তমান চিত্রটা আমাদের সামনে হাজির করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এ সম্পর্কিত যেসব উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনের কথা জানতে পেরেছি, এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ভারতের মানবাধিকার সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট। এই রিপোর্টের বিষয়বস্তুতে যাওয়ার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাইÑ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরো বিভিন্ন সংগঠন যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেগুলো রাষ্ট্রীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকার প্রধানেরা বরাবর বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে থাকেন, তবে লঙ্ঘনকারী দেশের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। যদিও কোনো দেশের বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা মুখ রক্ষার খাতিরে দেশটির বিরুদ্ধে ছোটখাটো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। যেমন ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আমলে নিয়ে অনেক ভারতীয়র ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে কানাডা। তবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো অবস্থান না নেয়ার একটি কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যাপকভাবে নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে। আবু গ্রাইব কারাগার গুয়ান্তানামো বে-তে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ সবার জানা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা’-বিয়য়ক অফিস গত ১০ জুন প্রকাশ করেছে ধর্মীয় স্বাধীনত লঙ্ঘন-সম্পর্কিত ২০১৯ সালের রিপোর্ট। এ রিপোর্টে ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হয়। আজকের সংখ্যালঘুরাÑ বিশেষত মুসলমান, খ্রিষ্টান ও নি¤œবর্ণের দলিত হিন্দুরা যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশটিতে বসবাস করছে, তার বিবরণ রয়েছে। ধর্মীয় উন্মাদনা তাড়িত হামলায় সংখ্যালঘুদের হত্যা, নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, বৈষম্যকরণ, সম্পদ ধ্বংস করার ওপর এ রিপোর্টে আলোকপাত করা হয়। এই রিপোর্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্তও তুলে ধরা হয়। সে মতে, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৭৪৮৪টি হামলার ঘটনা ঘটে। আর এসব হামলায় নিহত হয় এক হাজার ১০০ লোক।

রিপোর্টে মুসলমাান, খ্রিষ্টান দলিত সম্প্রদায়ের লোকদের পথে-ঘাটে বিনা বিচারে পিটিয়ে হত্যা বা লাঞ্ছিত করার ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সমাজ থেকে চাপ না এলে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ভারতে থামবে না। ‘ওপেন ডোরস’-এর মতো অন্যান্য সংগঠনও এ ধরনের ঘটনার ওপর নজর রাখছে। এসব সংগঠন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে তাদের প্রতিবেদনে। এরা বলছে- বর্তমন শাসক দল ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিন্দু র্যাডিকেলদের খ্রিষ্টানবিরোধী সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা বেড়ে চলেছে। এ ধরনের আচরণের মাধ্যমে দেশটি সংখ্যালঘুদের প্রতি নোংরা ব্যবহার লুকিয়ে রাখতে পারবে না। সেই নোংরা আচরণ বিশ্বসমাজ থেকে আড়াল করে রাখার প্রয়াসেই ভারতের এ ধরনের আচরণ। 

সর্বোপরি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন ভারতীয় সংবিধান-স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা নীতির চরম লঙ্ঘন। তা ছাড়া, ভারতীয় বিবেকবান মানুষ বলছে, জাতি হিসেবে ভারতীয়দের হতে হবে মানবিক। ছাড়তে হবে সংখ্যালঘু নিধনের যাবতীয় অমানবিক কর্মযজ্ঞ। নইলে বিশ্ব সমাজে ভারত কোনো দিন দাঁড়াতে পারবে না কোনো মর্যাদার আসনে। তা ছাড়া ভারতকে উন্নয়নের মহাসড়কে দঁাঁড় করাতেও অপরিহার্য এক ‘প্লুরাল ইন্ডিয়া’। 


আরো সংবাদ