২৯ নভেম্বর ২০২০

‘বাজেট পর্যালোচনা’-২০২০-২০২১


২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় হচ্ছে তিন লাখ ১১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এ আবর্তক ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে পাঁচ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া সম্পদ সংগ্রহ, ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ ও পূর্ব কাজ শেয়ার ও ইকুইটিতে বিনিয়োগসহ মূলধনী ব্যয় হবে ৩৬ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ঋণ ও অগ্রিম বাবদ ব্যয় চার হাজার ২১০ কোটি টাকা। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের ব্যয় মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কর রাজস্ব আহরণ করতে হবে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি করবহির্ভূত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তির পরিমাণ হচ্ছে ৩৩ হাজার তিন কোটি টাকা।

আয়ের দিক থেকে আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার পরিমাণ ধরা হয়েছে চার হাজার ১৩ কোটি টাকা। বাজেটে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। আগামী ২০ বছরে কিভাবে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে তা মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেয়া যায়, কিভাবে স্বাস্থ্য খাতকে আরো গতিশীল করা যায় তা নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা থাকছে বাজেটে। বাজেটে কৃষি খাতকেও অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করার ব্যবস্থা থাকছে এবারের বাজেটে।

আগামী বাজেট সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সবার মুখে এক কথা ‘অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় নতুন ঘোষিত বাজেট জনজীবনে সহায়ক হবে বলে মনে করেন না’ তারা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, এই বাজেট বাস্তবতার নিরিখে করা হয়নি। রফতানি খাত, প্রবাসীদের আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সবই নেতিবাচক। সে ক্ষেত্রে কিভাবে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। তিনি মনে করেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

বরাদ্দ যা দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করা হলে ঘাটতির মাত্রা আরো বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে উল্লেখ করেন। কোনোভাবেই ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরে চার মাস হারিয়ে গেছে। ভবিষ্যতের কথাও বলা যাচ্ছে না। ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশ হতে হবে। সেটা অসম্ভব এবং কঠিন। কয়েক বছর ধরে ব্যাংকিং খাতে চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে। আমরা আশা করেছিলাম অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় এই সঙ্কট নিয়ে কিছু বলবেন, কিন্তু সেটি বলেননি। ভঙ্গুর পুঁজিবাজার নিয়ে আমরা কিছুই পাইনি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, সেটি পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু প্রয়োজন ছিল আরো বেশি। যে পরিমাণ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে এর পুরোটাই যাবে বেতনভাতাতেই। স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি, নতুন চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দক্ষ লোকের ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগের কথা বাজেট বক্তৃতায় নেই। এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ করা প্রয়োজন ছিল। কর্মসংস্থান এবং কারিগরি শিক্ষাসহ বিভিন্ন জনকল্যাণ খাতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল। কৃষিতে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতের আমল থেকে শুনে আসছি শস্য বীমার কথা। এখন উচিত ছিল এ ব্যাপারে তারা কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বিস্তারিতভাবে তা উল্লেখ করা। এসব ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি।

আগামী বাজেটে ব্যাংকে টাকা রাখার কর বাড়ছে, এতে সীমিত আয়ের মানুষদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে। এমনিতেই আমানতকরীরা স্বল্প সুদে ব্যাংকে টাকা রাখছেন। অধিকন্তু তারা লভ্যাংশের উপর ১০% থেকে ১৫% হারে কর দিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রতি বছর মোটা অঙ্কের আবগারি শুল্ক এবং এর সাথে প্রতি বছর নানা ধরনের সার্ভিস সার্জসহ মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেটে রাখেন। বিনিয়োগের ওপর যদি পুনরায় অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়, তাহলে সীমিত আয়ের মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী বাজেটে অতিরিক্ত টাকা কর্তন করার যে বিধান রাখা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত না করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় জনগণ তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দেশে চাকরির বাজার খারাপ। করোনার কারণে প্রায় এক কোটি মানুষ চাকরি হারাবেন। মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ খুব কষ্ট করে দিন যাপন করে। তাদের প্রতি সরকারের শুভবুদ্ধি উদয় হোক এটা জনগণ প্রত্যাশা করে। বাজেটে ছিন্নমূল মানুষ যারা বস্তিতে বসবাস করে, তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এ বাজেট মূলত গরিবের পকেট কাটা এবং ধনীদের আরো ধনী বানানোর বাজেট বলে সাধারণ মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ১৭ কোটি মানুষের রুজিরোজগারের দিকে সরকার না তাকিয়ে উল্টো তাদের গচ্ছিত টাকার ওপর হাত দিয়েছে।

এই মুহূর্তে উচিত ছিল রাজস্ব আয় তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা কিভাবে আহরণ করা যাবে- এ ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অর্থনীতির রাজস্ব আয়ের এই সংস্কৃতি চালু করা দরকার। জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতকারীর টাকার ওপর নানা ধরনের ট্যাক্স ও আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। প্রতি বছরই সরকার বাজেটে ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্রের টাকার ওপর হস্তক্ষেপ করে। আগামী বাজেটেও তাই করা হয়েছে অর্থাৎ বিশাল অঙ্কের ঘাটতি যার পরিমাণ এক কোটি ৯০ হাজার কোটি টাকা, সাধারণ মানুষকেই এর ভার বহন করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ জোগান দেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর তরাই বেশি দিচ্ছেন। ভোক্তা সাধারণ বাজার থেকে কোনো জিনিস কিনতে গেলে ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ কিনতে হয়। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ও করের বোঝা বহন করতে হয় না। বাজেট মানেই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এক দিকে ক্ষমতাসীন দলের উল্লাস- অন্য দিকে বিরোধী দলের মানুষ মারার বাজেট- এ স্লোগানই জনগণ প্রতি বছর শুনে আসছে। দেশ নাকি সিঙ্গাপুরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে, মিডিয়া এ সব খবর প্রচার করছে। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু গড় আয় ৩০ হাজার ইউএস ডলার আয় বাংলাদেশের মাত্র দুই হাজার ইউএস ডলার। দিবাস্বপ্ননির্ভর এসব কথা জনগণ আর শুনতে চায় না। সিঙ্গাপুরে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা কত প্রকার এবং কী কী তা নিজের চোখে দেখে এসেছি।

শুধু বয়স্কভাতাই নয়, মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার ব্যয়ভার তারা বহন করে। বিদায়ী অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও কোভিড-১৯ দুর্যোগের মধ্যে তা সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে (২০২০-২০২১) এই প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আর মল্যূস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এনবিআর যদি তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আহরণ করতে ব্যর্থ হয় তা হলে ব্যাংক থেকে ঋণের মাত্রা লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে ৮০% মানুষের আয় কমেছে। কর্ম হারিয়েছে ৫০ শতাংশ মানুষ। এদের কথা বাজেটে নেই। স্বপ্ন দেখা ভালো কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা কঠিন। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী একটি ভালো কথা বলেছেনÑ আগে আমরা টাকা ব্যয় করব, তারপর আয় করব। বিগত বাজেটের দর্শন ছিল- আগে আয় তারপর ব্যয়। তিনি এ কথাও বলেছেন, অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা পরে দেখা যাবে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে।

অর্থমন্ত্রী সংসদে সম্পূরক বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাজেট বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাত, স্বাস্থ্য চিকিৎসা বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে অতিরিক্ত তিন হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাজেট না দেয়া হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ তোলার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই এটা শুধু অর্থনৈতিক বাজেট নয় পাশাপাশি মানবিক বাজেটও।
বাংলাদেশ প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে। প্রবাসী আয়ে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা খুবই আশাব্যঞ্জক ছিল। করোনা সঙ্কটের কারণে প্রবাসী আয়ও অনেক কমে যাবে। যেসব দেশে আমাদের শ্রমিকেরা কাজ করছেন,সেসব দেশে বেতন কমে যাবে। অনেকে চাকরি হারাবেন। তারা দেশে ফিরলে সেটিও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

ইতোমধ্যে সেই চাপ আমরা লক্ষ করছি। বিদেশে প্রায় এক কোটি শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমবাজার যদি সঙ্কুচিত হয় তাহলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। বাংলাদেশ এখন একটি কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে সরকারি এবং বিরোধী দল সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে যদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায় তা হলে দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও আমরা আকাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবো। দুই সিটি করপোরেশন যদি তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে, বিশেষ করে মশক নিধন এবং জলাশয়গুলো আবর্জনাবিহীন করতে পারে তাহলে অর্থনৈতিক সাশ্রয় ঘটবে। সব কিছুতেই যদি প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করা হয় তাহলে এত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের লালন-পালন করাও অযৌক্তিক। আমরা লক্ষ করে দেখেছি, বাজেটে সীমিত আয়ের দরিদ্রদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে। এরপরও বাজেটে দারিদ্র্যদূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করার যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে তা পূরণ করতে পারলে আগামী বাজেট আলোর মুখ দেখবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। 

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক


আরো সংবাদ