১০ জুলাই ২০২০

ট্রাম্প-মোদি দু’জনই কি সব হারাবে

মোদি ও ট্রাম্প - সংগৃহীত

চীন-ভারত সীমান্তের পূর্ব-লাদাখে উভয়পক্ষের সামরিক তৎপরতার কথা আমরা গত ২২ মে থেকে শুনে আসছি, যা গত সপ্তাহে একধরনের শঙ্কার চরমে উঠেছিল। এরপর গত ২৮ মে কানাঘুষা ব্যক্তিগত টুইট থেকে জানা যাচ্ছিল যে, মোদি সরকার নিজ মিডিয়াকে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের খবর কম গুরুত্ব দিয়ে ছাপতে গোপন প্রচার চালিয়েছে যাতে পাবলিক এই ইস্যুটাকে বিশেষ গুরুত্ব না দেয়। এরপর গত ২ জুন নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা জানায়, সামরিক নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের আজকের লেখার ইস্যু এ ঘটনায় সর্বশেষ অবস্থান প্রসঙ্গে যে এটা এখন কোথায় কোন দিকে গেছে বা যাচ্ছে।

এর আগের সপ্তাহে বলেছিলাম সীমান্তে চীন-ভারত সৈন্য মুখোমুখি এই অবস্থার পেছনের যতগুলো ঘটনা আছে এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাম্প-মোদির ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ যেটা তাদের দুই সরকার বা প্রশাসনের অফিসিয়াল কোনো স্বার্থ বা ইস্যুই নয়। ট্রাম্পের প্রয়োজন আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে নিজেকে আবার জিতিয়ে আনা। তাই ট্রাম্প তার সম্ভাব্য ভোটারদের দেখাতে চান যে তিনি চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থ নিয়ে লড়াকু এক বেস্ট ক্যান্ডিডেট। যেহেতু চীনের উত্থানেই আমেরিকার গৌরব সব ধূসর ও ম্লান হয়ে গেছে। কাজেই সেই চীন-ধোলাই করতে সক্ষম একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই আমেরিকার জন্য বেস্ট ক্যান্ডিডেট। এই হলো তার প্রপাগান্ডা মেসেজ। আর এই ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে মোদি ট্রাম্পের প্রধান সহযোগী হতে গেছেন। কারণ এতে বিনিময়ে তারও ব্যক্তি লাভ-স্বার্থ আছে। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে করোনার আগে থেকেই ভারতের মোদি সরকার খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। এর ওপর এখন করোনার কারণে অবস্থা আরো খারাপ। কাজেই তার সরকারের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স এখন পাবলিকের কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক। অতএব সরকারের পারফরম্যান্স ও যোগ্যতা থেকে পাবলিকের অভিযোগ অসন্তোষের মন ও চোখ সরাতে, হয় পাকিস্তান অথবা চীনের সাথে কোনো সীমান্ত টেনশন তৈরি করা আর সেখান থেকে অবাস্তব হলেও, মোদি কোনোভাবে নিজেকে অন্তত একবার বিজয় অর্জনকারী বীরের ভূমিকায় হাজির করতে পারলে তিনি মনে করেন সেটি এক ‘বিরাট অর্জন’ ও সব অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ফেলার চাদর-কাভার হতে পারে। মোদির তাই লক্ষ্য হচ্ছে, ট্রাম্পের ‘খেপ মেরে’ দেয়ার বিনিময়ে নিজের জন্য এই অর্জন নিশ্চিত করা। তাই তিনি চীন-ভারত সীমান্ত টেনশনে ইতোমধ্যে ‘ট্রাম্প মধ্যস্থতা করতে চান’- এই প্রস্তাব বাজারে ট্রাম্পকে দিয়েই হাজির করাতে পেরেছেন।

এসব মিলিয়ে পরিকল্পনা মতে, গত ২ জুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতের ‘নিউজ১৮’ টিভিকেই এক একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে বসেন। কেন নিউজ১৮ টিভি? ব্যাপারটাকে আমরা এভাবে পাঠ করতে পারি যে, ওই সাক্ষাৎকারটার মানে হলো, ইতোমধ্যে চীন-ভারত সীমান্ত টেনশন ইস্যুতে ভারত-আমেরিকান কূটনৈতিক আলোচনা ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে পরস্পরের অসুবিধা আর প্রয়োজনগুলো নিয়ে জানা-জানানো ও পরস্পরের পছন্দ হয় এমন অবস্থানও সাব্যস্ত হয়ে গেছে। এখন ওই আলোচনায় কী সাব্যস্ত হয়েছে মোদি সরকার কী মেনেছেন এর পরোক্ষ অফিসিয়াল স্বীকৃতি বা রেকর্ড তৈরি করে রাখতেই ওই সাক্ষাৎকার দেয়া। কিন্তু তাহলে সেটা কেবল নিউজ১৮ টিভিকে দেয়া কেন? কারণ নিউজ১৮ আর সিএনএন কোনো কোনো প্রোগ্রাম জয়েন্ট ভেঞ্চারে সম্পর্কে চলে। অর্থাৎ সিএনএনের ভারতে কোনো স্বার্থ থাকলে সেটা নিউজ১৮-ই দেখাশুনা করে থাকে। এই অর্থে রাজনাথের ওই সাক্ষাৎকারটা দেয়া হয়েছে পরোক্ষে আমেরিকান সিএনএনকে। যেখান থেকে যেন ট্রাম্প প্রশাসন অফিসিয়াল ভার্সন সংগ্রহ করে নিতে পারে। অর্থাৎ এটা একটা সাক্ষাৎকারের পাবলিক ভার্সনই কিন্তু সেই ভার্সনটাই আবার ট্রাম্প প্রশাসনের সংগৃহীত অফিসিয়াল ভার্সন।

ওই সাক্ষাৎকারে রাজনাথ মূল যে কথাটা বলেন তা হলো, দু’পক্ষের সিনিয়র মিলিটারি অফিসারেরা বৈঠকে বসে ‘মতপার্থক্য’ দূর করে ফেলবে। বেশির ভাগ পত্রিকার শিরোনাম কথিত এই মতপার্থক্য নিয়েই। কিন্তু ‘কী নিয়ে’ মতপার্থক্য যার জন্য তিন ডিভিশন করে সেনাসামন্তের সমাবেশ ঘটাতে হলো? মিডিয়া লিখেছে ‘সীমান্ত বিতর্ক’ বা বর্ডার ডিস্পুট নিয়ে মতপার্থক্য। যারা রাজনাথকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছে তাদের লেখায় রাজনাথ কিভাবে সীমান্ত উত্তেজনাকে মোলায়েম করে কথা বলেছেন তা লক্ষণীয়। প্রথমত, তিনি এটিকে সীমানা বিষয়ে দু’দেশের দু’রকম ধারণাজাত একেবারেই এক তুচ্ছ সমস্যা বলে দাবি ও চিহ্নিত করে সব উত্তেজনায় ক্রমাগত পানি ঢেলে গেছেন। বলেছেন, এলএসি (খঅঈ) বা ‘দু’দেশের দখলে থাকা ভূমির সীমানা নিয়ে আমাদের দু’দেশের যে পারসেপশন; এই পারসেপশনে ভিন্নতার কারণে আমাদের মতপার্থ্যক্য। আরো মোলায়েম ভাষ্য এরপরেও আছে। রাজনাথ বলছেন, ‘এতে চীনারা বেশ ভালো সংখ্যায় (গুড নাম্বার) সৈন্য সমাবেশ করেছিল। আর ভারতও তাতে ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক’ (হোয়াট-এভার ইজ রিকোয়ার্ড) সৈন্য জমায়েত করেছিল।’ কেন তিনি এত মোলায়েম ভাষায় কথা বলছেন সেই সাফাই গাইতে গিয়ে বলছেন, ‘এমনকি আগেও যখনই সীমানা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে যেমন ওই ডোকলামে (ভুটানে চীনা সীমান্ত নিয়ে) তখনো আমরা সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা বলেই মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলেছিলাম।’ সারকথায় এখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কেবল বলতে বাকি রেখেছেন কিন্তু যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ‘আমরা দুই রাষ্ট্র আসলে খুব ভালো। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। ট্রাম্প-মোদির যে ব্যক্তি লাভালাভ এ থেকে তুলে আনার কথা ছিল তা এখন উঠে গেছে। তাই আপনারা আর খামোখা চিন্তা করবেন না।’

কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ভারতের মিডিয়াগুলো ক্রমশ অসন্তোষে ভরে উঠতে শুরু করেছে। আর তা ভরে তুলতে শুরু করেছে মূলত অবসরে যাওয়া সিনিয়র জেনারেল, লেফটেন্যান্ট-জেনারেলদের অসন্তোষ। তাদের মধ্যে অন্তত দু’জন প্রকাশ্যেই তাদের অসন্তোষ, আপত্তি ও সরকারি ব্যাখ্যায় গরমিল নিয়ে প্রশ্ন আর সর্বোপরি চীন আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছে- এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ দু’জন ব্যক্তিত্ব হলেন-এক সাবেক উত্তরের আর্মি কমান্ডার লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড)। আর অপরজন হলেন লে. জে এইচএস পানাগ (রিটায়ার্ড)।
লে. জে পানাগ ক্ষুব্ধভাবে লিখছেন, ‘অফিসিয়ালি দু’পক্ষই বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ও কূটনীতিক আলোচনায় বিবাদ মিটানোর ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কূটনীতিক ও মিলিটারি পর্যায়ে আলাপ আগাচ্ছে। কেবল এলএসি’র ‘পারসেপশনে মতপার্থক্য’ শব্দটাকে কুপিয়েছেন। আবার ‘আচ্ছা সংখ্যক’ চীনা সৈন্যের উপস্থিতির কথাও বলেছেন। ইতোমধ্যেই মেজর জেলারেল পর্যায়ে ২ জুনই আলোচনা হয়ে গেছে। এখন ৬ জুন অসমাপ্ত আলোচনা আবার হবে। তবে এবার তা হবে লে. জে. অফিসার পর্যায়ে। আর এতেই তিনি অসন্তুষ্ট।
এ ছাড়া আরেক লে. জে-এর বক্তব্য হলো, গত জুনের শুরুতে চীনারা বিভিন্ন জায়গায় ৪০-৬০ বর্গকিমির মতো এলাকা যা আগে ভারতের দখলে ছিল তা দখল করে নিয়ে গেছে। ফলে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে এখন আলোচনার টেবিলে তারা কথা বলবে আপারহ্যান্ডে থেকে, গলা চড়িয়ে। ফলে হারানো ভূমি ফেরত পাওয়া ভারতের জন্য মুশকিল হবে। এটাই এই লে. জে-এর বিরাট আপত্তির জায়গা।

কারণ এখন আলোচনা যদি একেবারে ফেল করে যায় তবে চীন প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে বলে সীমিত যুদ্ধ লাগিয়ে এখন সব দখল করে সেসব দখল স্থায়ী করে ফেলতে পারে। এ কারণে এবার মোদির বিরুদ্ধে তিনি নামধরে সরাসরি অভিযোগ এনে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে ‘মোদি সরকার ও তার সামরিক বাহিনী এই সব অভিযোগ (ভূমি হারানোর অভিযোগ) ‘অস্বীকার’ (ডিনায়েল) করে আর ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ বলে পার পেতে চাইছে। তিনি আরো অভিযোগ এনেছেন যে, কিছু সাংবাদিককে সরকার নামিয়েছে ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। তার সারকথা ভারত এখন চীনাদের হাতে নাচা পুতুল হয়ে যাবে। এমনকি ওই লেখাটা তিনি নিজের নামে দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছেন, যার শিরোনামে আরো ভরপুর ক্ষোভ ও উসকানিমূলক শব্দ আছে। ভারত যে ভূমি হারিয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, তার স্যাটেলাইট ম্যাপের ছবি জোগাড় করে তা পত্রিকায় ছাপিয়ে দাবি করে লিখেছেন যে, ওই হারানো ভূমির ছবি দেখতে হাতের আঙুলের মতোন। তাই নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “ভারতের আঙুল চীনের বুটের নিচে চাপা পড়েছে, ‘অস্বীকার’ করে লাভ হবে না।”

ওই একই দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় স্নেহেশ এলেক্স ফিলিপ নামে আরেকজন রিপোর্টার বিভিন্ন সেনা কমান্ডারের মতামত সংগ্রহ করে আরেক রিপোর্ট লিখেছেন প্রায় একই ধরনের সব অভিযোগে। তিনি ওই নজিরবহীন শব্দটা ব্যবহার করে বলছেন, এই শব্দটা জেনারেলদের বেশির ভাগই ব্যবহার করে তার সাথে কথা বলেছেন। তাদের দাবি চীন-ভারত সীমান্তবিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের চুক্তিতে দু’দেশের সেনাদের মধ্যে ডায়লগের যেসব প্রটোকল সাব্যস্ত হয়ে আছে সে অনুযায়ী লে. জে পর্যায়ের অফিসারেরা বৈঠকে বসলে সেটি প্রতিষ্ঠিত প্রটোকল ভঙ্গ করা হবে। কারণ প্রটোকলে লোকাল ট্যাকটিক্যাল কমান্ডার (পদবি মে. জে মর্যাদার) লেভেলে ডায়লগের করার কথা বলা হয়েছে। ফলে এখন ভারতের ১৪ কোর কমান্ডারকে চীনের মেলিটারি ডিস্ট্রিক কমান্ডারের সাথে বসতে হবে। এ জন্য তারা এটাকে নজিরবিহীন বলছেন। এই প্রসঙ্গে আরেকজন লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড) গত দিন এক অনলাইন সেমিনারে মন্তব্য করেছেন, তিনিও এমনটা জীবনে কখনো দেখেননি। স্নেনেশ লিখেছে। এই প্রটোকল মানা না মানা নিয়ে গত দিনের অনলাইন সেমিনারে অন্য রিটায়ার্ড অফিসারদের মধ্যে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে আমাদের ব্যাখ্যা ও অনুমান সঠিক যে মোদি-ট্রাম্প তাদের ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ মিটাতে সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটানোর পক্ষে উসকানি তৈরি করেছে। কিন্তু এখন ঘটনাচক্রে লাভের পাল্লা চীনের দিকে চলে যাওয়া এই হাতছুট ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সামরিক অফিসার আর সাংবাদিকদের পর্যায়ে প্রবল হারু-পার্টি হয়ে যাওয়ার হাহাকার উঠে আসছে। আর মোদির পক্ষের লোকেরা ততই ডিনাইয়াল মানে অস্বীকার করে ফসল ঘরে তুলতে চাইছেÑ বিরোধ বেধেছে এখানেই। লক্ষণীয় যে, কোনো সিভিল কূটনীতিক লোক মোদি-রাজনাথের এখনকার পরিকল্পিত আলাপের কোনো পর্যায়ে যুক্ত থাকছেন না। মানে হারানো ভূমি উদ্ধারের দায় এখন পুরাটাই সামরিক অফিসারদের ওপর। আর ভূমি উদ্ধার না হলে বা সীমিত যুদ্ধে তা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেললে সে দায়ও হবে সামরিক অফিসারদের। এখন মোদি ব্যক্তিগত লাভালাভ তার ঘরে তুলে নেয়ার বিনিময়ে ভারত রাষ্ট্রকে এর কাফফারা দিতে হতে যাচ্ছে, খুব সম্ভবত। এটাই উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি করছে।

শেষ পর্যন্ত কী ঘটে সেটি দেখতে আর দু’দিন অপেক্ষা করতে হবে!

মোদির মতোই ট্রাম্পও সম্ভবত আরো বড় বিপদেই পড়ে গেছেন
ওদিকে ট্রাম্পও প্রায় একই অবস্থায় ইতোমধ্যে পড়ে গেছেন। মোদি-ট্রাম্পের সখ্যের ভিত্তি হলো দু’জনই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন কোন সমাধান করার জন্য নয় বরং নিজেদের ব্যক্তি ইমেজ গড়তে কাজে লাগাতে চান বলে। হংকংয়ের স্বাধীনতা নিয়ে চীনের সমস্যা আছে তা বেশ পুরানা। কিন্তু তা নিয়ে এই সময়ে চীনের বড় কোনো গোলযোগে পড়ার কথা নয়। কেবল, গত ৪ জুন ছিল ১৯৮৯ সালের তিয়েনানমেন স্কয়ার ম্যাসাকারের বার্ষিকী। সেটি পালন করতে চেয়ে কিছু উত্তেজনা তৈরি হবে আর স্বভাবতই হংকং সরকার ওই বার্ষিকী পালনে অনুমতি দেবে না। কিন্তু ট্রাম্প এটাকে নিয়েই তার ব্যক্তি পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। তিনি তাইওয়ানকে দিয়ে হংকংয়ের স্বাধীনতার দাবি সমর্থন করিয়ে দেন। আর তাতেই উত্তেজনা তৈরি হয় যেটাকে আরো বড় করে দেখাতে মার্কিন নৌবহর তাইওয়ানের দিকে টহলের আয়োজন শুরু করান ট্রাম্প। ব্যাপারটা হলো, আজ হয়তো এই ভাষায় এই বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে বসতে হতো না যদি ট্রাম্প এই কাজগুলো সিরিয়াস হয়ে করতেন, অধিকারের প্রশ্নে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি হিসেবে করতেন। কিন্তু না, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য এসব উত্তেজনাকে আমেরিকান নির্বাচনের আগে তিনি ‘চীন-ব্যাসিং লড়াকু প্রার্থী’ নিজের এই নির্বাচনী ইমেজ গড়তে কাজে লাগানো- সবই দেখানোর একেকটা শো মাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান!

কিন্তু অলক্ষ্যে ন্যায়ের ঘণ্টা সম্ভবত হেসে বেজে উঠেছিল। কে জানত ঠিক এ সময়েই কালো আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের নৃশংসতায় খুন হয়ে যাবেন। আর সারা পশ্চিমা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়বে! এই লেখার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত আলজাজিরার একটা খবরের শিরোনাম পাঠ করে আগাই, তাহলে কম কথায় ব্যাপারটা বলা যাবে। পেছনের ঘটনা হলো, ফ্লয়েড মারা যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার রাস্তায় রাস্তায় কালো-সাদা নির্বিশেষে বিক্ষোভ শুরু হলে এতে ট্রাম্প খুবই খারাপভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। এতেই তিনি ধরা পড়ে গেলেন যে তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কেমন!

একজন প্রেসিডেন্ট আর পাবলিকের মধ্যে সম্পর্কটাই বা কী তা তিনি আজীবন বুঝতেই পারলেন না, বুঝতেও চাননি, খেয়াল করে দু’দণ্ড বুঝবার চেষ্টাও করেননি। অথচ পাবলিক সমর্থন বা ভোট দিয়েছে বলেইও তো তিনি প্রেসিডেন্ট এবং তিনি পাবলিকের সাক্ষাৎ রিপ্রেজেন্টেটিভ। ফলে পাবলিকলি তিনি আর যা খুশি করার ব্যক্তি ইচ্ছাধীন নন, যা মনে চায় তিনি বলে ফেলতে পারেন না, করতে পারেন না! কারণ তিনি পাবলিকের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি। অর্থাৎ যিনি রিপ্রেজেন্টেশন শব্দটার মর্মই সারা জীবনে বুঝতে পারলেন না তিনিই হয়ে গেছেন এক প্রেসিডেন্ট। আর সেই তিনিই হলেন ব্যবসায় টাকাপয়সা খোয়ানো হতাশ এক দেউলিয়া ব্যবসায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের শেখেরা কোনোকালে যাকে দয়া করে তাদের পকেটমানি দিয়ে দানখয়রাত করে দেউলিয়ামুক্ত করে রেখেছিল। অতএব ফ্লয়েডের খুন হওয়ার প্রতিবাদ মিছিলকে তিনি খামোখাই যেচে গিয়ে দেখলেন তার বিরোধী সব মানুষের তৎপরতা ও কাণ্ডকারখানা হিসেবে ।

অথচ দরকার ছিল সিম্পল একটু সহানুভূতি আর পাশে দাঁড়ানো! আপন করে নিয়ে দুটো কথা বলা। তিনি ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে, এই কথাটাই নতুন করে নাগরিকের মনে সাহস জোগায় এমন কিছু শব্দে আবার ঘোষণা করা। কিন্তু উল্টো তিনি হম্বিতম্বি করা শুরু করলেন হাভাতে লোকের মতো। ইনি ঘোষণা করলেন সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তিনি এই প্রতিবাদ ভেঙে দেবেন, ব্যবস্থা নেবেন ইত্যাদি। হাভাতে বললাম এজন্য যে প্রায় সময়ই তিনি এমন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা এসবই যেন তার ব্যক্তিগত, তার ব্যক্তি সম্পদের মতো। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই যেন এসব ক্ষমতা তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারেন।

এখন আলজাজিরার প্রকাশিত শিরোনাম হলো- ‘জেনারেলেরা বিদ্রোহে: মার্কিন মিলিটারি নেতাদের ঝাঁজালো তাপ কেমন ট্রাম্প তা বুঝছেন।’ সেই সাথে এই আলজাজিরা রিপোর্ট আরো বলছে যে, প্রেসিডেন্টের ডিফেন্স সেক্রেটারি (মন্ত্রী) মার্ক এসপার কনস্টিটিউশন মোতাবেক ঘোষণা করতে প্রেসিডেন্টকে পাবলিকলি মনে করিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন যে একটিভ-ডিউটিতে আছে যেসব মিলিটারি ফোর্স তাদের কাউকেই প্রেসিডেন্ট গণ-প্রতিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন না। সোজা কথায় মিলিটারি ডাকার হুমকি প্রেসিডেন্ট দিতে পারেন না। আর এই কথা শুনে এবার পেন্টাগনের বাকি জেনারেলরা ডিফেন্স সেক্রেটারির পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে এটা প্রেসিডেন্ট করতে পারেন একেবারেই অন্য উপায়হীন হয়ে পড়লে, খুবই শোচনীয় পরিস্থিতিতেই একমাত্র, এসপার যোগ করেন।

আর তাতেই এখনকার প্রশাসনের টপ জেনারেল মার্ক মিলি একই দিনে একটা পাবলিক ঘোষণা দেন। তাতে তিনি লেখেন যে, তিনি আমেরিকান মিলিটারি লিডারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কনস্টিটিউশনাল শপথ নেয়া বাক্য অনুসারে তারা জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর সোজা মানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাপড় খুলে নেয়া হয়েছে সকলে মিলে। আলজাজিরার ভাষায়, এটা বিরলদৃষ্ট এক দুর্ঘটনা!

এর মানে ট্রাম্পও মোদির মতোই নির্বাচনী বা ব্যক্তিগত লাভালাভ ঘরে তুলতে পারলেন না বা ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন! হ
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 


আরো সংবাদ