০৭ জুলাই ২০২০

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ - সংগৃহীত

করোনাভাইরাস সংক্রমণ একটি বিশ্বজনীন সঙ্কট। পৃথিবীজুড়েই এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। গতকাল ২ জুন মঙ্গলবার পর্যন্ত বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬২ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ জন। আর মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ ৭৫ হাজার ৫২৬জন। বাংলাদেশে করোনা রোগী বা সন্দেহভাজনদের টেস্ট যে হারে করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে তাতে আক্রান্ত বা মৃতের প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনই জানা সম্ভব হবে না। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২ জুন দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা ৬৭২।
এর শেষ কোথায় তা এখনও কেউ অনুমান করতে পারছে না। অনেকে মনে করছেন করোনাভাইরাস সাথে নিয়েই বিশ্ববাসীকে চলতে হবে। তার মানে হলো, বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ফি-বছর কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব ঘটবে এবং কিছু করে মানুষ মারা যাবে, যত দিন না এর কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার করা যায়।

সভ্যতার ইতিহাসে যুগে যুগে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এবং অনুন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সেই যুগে একেকটি মহামারীতে কোটি কোটি মানুষের জীবনহানি ঘটেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে স্পার্টানদের সাথে গ্রিকদের যুদ্ধ চলা অবস্থায় ‘দ্য প্লেগ অব এথেন্স’ নামে পৃথিবীর প্রথম মহামারী, ২৫০ সালে সাইপ্রিয়ানের মহামারী, ৫৪১ সালে শুরু হয়ে প্রায় ৫০ বছর স্থায়ী হওয়া ‘দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান, রাসূলুল্লাহ সা:-এর যুগে প্লেগ ও কুষ্ঠরোগ, ৬৩৯ সালে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর রা:-এর শাসনামলে সিরিয়া, মিসর ও ইরাকে ছড়িয়ে পড়া ‘তাউন আমওয়াস’ নামক মহামারী, ১৩৪৬-৫৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও এশিয়ার অংশজুড়ে ত্রাস সৃষ্টিকারী ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারী, ১৭৯৩ সালে ‘ইয়েলো ফিভার এপিডেমিক অব আমেরিকা’, ১৯১৮ সালে ‘দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা পেনডেমিক’ বা ‘দ্য স্পেনিশ ফ্লু’, ১৯৭০ সালে ভারতে শুরু হওয়া ‘দ্য স্মলপক্স এপিডেমিক অব ইন্ডিয়া’, ১৯৮৪ সালে আমেরিকায় শুরু হওয়া ‘এইচআইভি ভাইরাস’ এবং ২০০৯ সালে ‘সোয়াইন ফ্লু’ মহামারীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানির প্রমাণ পাওয়া যায়। মাত্র ১০০ বছর আগের স্পেনিশ ফ্লুতে বিশ্বে মারা যায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। আর ১৩৪৬-৫৩ সালের ছয় বছর স্থায়ী ব্ল্যাক ডেথ মহামারীতে এশিয়া-ইউরোপজুড়ে মৃতের সংখ্যা ধারণা করা হয় সাড়ে সাত কোটি থেকে ২০ কোটি।

এসব মহামারীর সময় মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে, আক্রান্ত স্বজনকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে হাজারও মানুষ, এমন অমানবিকতার ইতিহাস পাওয়া যায়। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে, যখন বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে, চিকিৎসা শাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি করেছে, মানবিক বোধের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে বলে আমরা আত্মশ্লাঘার সাথে দাবি করি, সেই সময়েও আমাদের একই অমানবিক দৃশ্য দেখতে হবে, এটা অকল্পনীয় বলতেই হবে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমে চীনে এবং পরে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ শুধু মানুষের জীবনহানি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দেয়নি বরং মানবিক বোধও যেন লুপ্ত করে দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, সেই মহাপ্রলয়ের দিন মানুষ তার ভাই, বাবা-মা, ও স্ত্রী-সন্তানকে ফেলে পালিয়ে যাবে। রোজ কেয়ামত এখনও আসেনি, কিন্তু করোনাভাইরাসই প্রমাণ করে দিয়েছে, আমরা জোর গলায় ভূপেনের গান, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গাইতে কিংবা এর সাথে সুর মেলাতে যতই পছন্দ করি না কেন, আমাদের মধ্যে মানুষোচিত স্নেহ-মায়া-মমতা, মানুষের প্রতি দরদ অর্থাৎ মানবিকতার বোধ কতটা ক্ষীণ! বরং বলা যায়, প্রমাণ হয়ে গেছে আমরা কতটা পশু, কতটা বর্বর।

দুনিয়ার এই জীবনে প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো নিজের স্ত্রী ও সন্তানরা। সেই প্রিয়জনদের থেকে প্রত্যক্ষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যদি ন্যূনতম সাহায্য, সহানুভূতি, ভালোবাসাও না মেলে তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে! অথচ প্রিয়জন, স্বজনের কাছে একজন মানুষের শেষ চাওয়া তো সম্ভবত ওইটুকুই! তাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যই তো জীবনের শেষ সামর্থ্যটুকু দিয়েও মানুষ কাজকর্ম করে, অর্থ উপার্জন ও সঞ্চয় করে। প্রিয় মানুষদের নিয়ে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে! করোনায় আক্রান্ত মানুষের সেই শেষ চাওয়াটুকুও পূরণ হচ্ছে না তার স্বজনের কাছ থেকে। নিজের গর্ভধারিণী মাকে গভীর রাতে বনের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে যায় যে পেটের সন্তান, জন্মদাতা বাবার জানাজায় শরিক না হয়ে, তার দাফনের দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যায় যে ছেলে এবং নিজ স্বামীকে গভীর রাতে ঘরে জায়গা না দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বলে যে স্ত্রী, তাদের হৃদয় কী দিয়ে তৈরি আমরা জানি না। কিন্তু তারা প্রমাণ করেছেন, এ সমাজে এমন মানুষও আছে ‘যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই।’ করোনাভাইরাস সেই প্রিয়জনদের তথাকথিত ভালোবাসার প্রকৃত বীভৎস ও কুৎসিত স্বরূপটি উন্মোচন করে দিয়েছে।

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’ এখানে সন্তান তার বাবা-মাকে চিনছে না। বাবা-মা সন্তানকে চিনছে না। স্বামী চিনছে না স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে। মৃত স্বজনের লাশ কেউ গ্রহণ করতে চাইছে না। গত ২৮ মে নরসিংদী হাসপাতালে মারা যান এক প্রবাসীর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম। তার মৃত্যুর খবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার বাবার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়িতে জানানো হয়; কিন্তু করোনা আক্রান্ত সন্দেহে দুই বাড়ির লোকজনই লাশ নিতে অস্বীকার করে। পরে পুলিশ সে লাশ দাফন করে।

একক শহর হিসাবে সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী মারা গেছে সম্ভবত নারায়ণগঞ্জে। সেখানে করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হন জেলা সিভিল সার্জন অফিসের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: শিল্পী আক্তার। এলাকায় গুজব রটে ডা: শিল্পীর পরিবারের অন্য সদস্যরাও করোনায় আক্রান্ত। এলাকাবাসী দলবলে গিয়ে ওই বাড়িতে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করা হয় বাড়ির লোকজনকে। বাধা দেয়া হয় করোনার নমুনা সংগ্রহ করতে আসা টিমকেও। একই জেলায় ৭ এপ্রিল জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর পর এক তরুণ গিটারিস্টের লাশ ৯ ঘণ্টা বাড়ির সামনে পড়েছিল। কেউ কাছে আসেনি। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে করোনা সংক্রমণের শীর্ষ জেলাগুলোর অন্যতম নারায়ণগঞ্জে। শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, এমন চিত্র দেশের প্রায় সব খানে।

আক্রান্ত অথবা আক্রান্ত সন্দেহে আমরা মানুষের প্রতি কতটা অমানবিক আচরণ করেছি তা বুঝতে সাহায্য করবে ক’দিন আগের এই সংবাদ শিরোনামগুলো। দেশের প্রথমসারির সংবাদমাধ্যমগুলোতে কয়েক দিনে ছাপা হওয়া নিউজ হেডলাইনের কয়েকটি ছিল এরকম : ‘তীব্র জ্বরে আক্রান্ত তরুণের মৃত্যু’, ‘শিবগঞ্জে সেই ব্যক্তির লাশ দাফনেও বাধা!’, ‘করোনা সন্দেহে ফেলে গেল বাসস্ট্যান্ডে’, ‘দেখেও কাছে ঘেঁষলেন না কেউ’, ‘করোনা সন্দেহে চিকিৎসা দেয়নি পাঁচ হাসপাতাল’, ‘ধুঁকে ধুঁকে যুবকের মৃত্যু’, ‘অ্যাম্বুলেন্সে ১৬ ঘণ্টায় ৬ হাসপাতালে ছোটাছুটি, অতঃপর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু’, ‘করোনার আতঙ্ক আকুতি পেছনে ফেলে মারা গেলেন মানুষটি’, ‘প্রবাসী সন্দেহে বৃদ্ধকে গ্রামবাসীর গণধোলাই’, ‘করোনার লক্ষণ, তাই এমন দাফন’, ‘এক ঘণ্টায় মেলেনি অক্সিজেন, শ্বাসকষ্টে মারা গেলেন স্কুলশিক্ষিকা’। এর মধ্যে সরকারের উচ্চপদস্থ আমলাও রয়েছেন, যার মেয়ে ডাক্তার। ছয় হাসপাতাল ঘুরেও তিনি তার পদস্থ আমলা বাবার জন্য চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা করতে পারেননি। পাননি কারও কোনও সাহায্য সহযোগিতা।

করোনা রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা ঘনিষ্ঠজন এবং করোনায় মৃতদের প্রতি এই যে বিবেকবর্জিত অমানবিক আচরণ করছে আমাদের সমাজেরই কিছু মানুষ, এর কারণ কী? বলা হচ্ছে, আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির লাশ থেকে অন্যদের দেহে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটতে পারে। সেই শঙ্কা থেকেই সমাজের মানুষের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। তাই যদি হবে, তাহলে দলে দলে মানুষ হাটে বাটে মাঠে ঘুরছে কী করে? কী করে মার্কেটে গিয়ে ঈদের কেনাকাটা করছে? অনেকেই তো মাস্কও পরছেন না ঠিকমতো। তারা মার্কেটে যাচ্ছেন, শপিং করছেন, ত্রাণের অর্থ-চাল চুরি করছেন। এসব ক্ষেত্রে সেই শঙ্কা বা ভীতি কোথায় থাকে? মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, আমরা ধীরে ধীরে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছি। আগে কেউ একজন মারা গেলে গ্রামসুদ্ধ মানুষ ছুটে আসত। আর এখন স্বজন মারা গেলেও লাশ নিতে অস্বীকার করি।

তাদের মতে, এমন অমানবিকতা ছড়িয়ে পড়লে মানবসমাজ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মধ্যে পড়বে। মানুষ তার মানবিকতা হারাবে। তারা নৈতিক শিক্ষার অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কেও এ জন্য দায়ী করতে চান।
সমাজবিজ্ঞানীরাও বলছেন প্রায় একই কথা। নিজেদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং মানবিক বোধের অভাবের কথা। আমাদের সমাজের মানুষ যে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে সেটিও এক রূঢ় বাস্তবতা, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এমনটি ঘটা উচিত নয়। যদি আপনার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়, আর আপনার সাথে এমন অমানবিক আচরণ করা হয়, তাহলে আপনার কেমন লাগবে? আপনি কি আক্রান্ত স্বজনকে ছেড়ে চলে যাবেন? বিষয়টি এভাবে ভাবুন। আশা করা যায় আপনার বিবেক ঠিক জবাবটিই দেবে।

আমরা জানি, যেকোনো রোগে বিশেষ করে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাকে সাহস জোগানো। এটি রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন যে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনায় আক্রান্ত অথবা সন্দেহভাজনদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে কোনো সমস্যা নেই। করোনায় আক্রান্ত হওয়া মানেই যে অবধারিত মৃত্যু এমনও নয়। বরং বেশির ভাগ রোগীই সুস্থ হয়ে উঠছেন। সবাইকে এ বিষয়টি উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের প্রতি মানবিক হতে হবে।

গোটা বিশ্বের কথা বাদ দিই। দেশের মানুষের জীবনে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহতম এই বিপদের সময় ক্ষমতাসীন সরকার কী ভূমিকা পালন করেছে সে বিষয়টি একেবারেই উল্লেখ না করা মানে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া। কিন্তু করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে এ যাবৎকালের ঘটনাবলি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আমার যে ধারণা হয়েছে, তাতে বলতে পারি, মানুষ বাঁচানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যা কিছু করা হয়েছে তার উল্লেখ না থাকলে আমার এই নিবন্ধে কোনই অসম্পূর্ণতা থাকবে না। সরকারের গাছাড়া আয়েশী ভূমিকা, সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ে লুকোচুরি তাদের প্রতি মানুষের অনাস্থাই আরও জোরালো করেছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস।


আরো সংবাদ