০৭ জুলাই ২০২০

রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয়

য়দ মাসুদ মোস্ত - সংগৃহীত

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্ব-অর্থনীতিকেই অশান্ত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যেও সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। জাতিসঙ্ঘের ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব এমন সঙ্কটে কখনো পড়েনি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, করোনা সংশ্লিষ্ট মহামারীর প্রভাবে চলতি বছর সারা বিশ্বে রেমিট্যান্স কমবে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে কমবে ২২ শতাংশ। সম্প্রতি ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত অভিবাসন ও উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টে এমন সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। এতে ‘কোভিড-১৯-এর আয়নায় অভিবাসন’ শিরোনামের রিপোর্টে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ উভয় অভিবাসনের সম্ভাব্য অবস্থারও একটি নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনা করা হয়েছে, যা সত্যিই উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে গত বছর প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বা এক হাজার ৮৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। আগের বছরের চেয়ে যা ১৮ শতাংশ বেশি ছিল। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমে ১৪ বিলিয়ন বা এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে ২০২০ সালে রেমিট্যান্স কমবে উদ্বেগজনকভাবে।

করোনার নেতিবাচক প্রভাবে অতি দ্রুত রেমিট্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল। গত ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ৮০ কোটি ৪০ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। তবে শেষ ১৯ দিনে এসেছে মাত্র ৪৮ কোটি ২৮ লাখ ডলার। সঙ্গত কারণেই মার্চ মাসে মাত্র ১২৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলার প্রাবাসী আয় এসেছে। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ১৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এপ্রিল মাসে এ অবস্থা খুবই প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে।

জানা গেছে, মার্চে প্রবাসী আয় কমেছে ১৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের বছরের এপ্রিলে ১৪৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। এ বছর এপ্রিলে সেই তুলনায় রেমিট্যান্স যে অনেক কম হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে লকডাউনের কারণে অনেকে এখন টাকা পাঠাতে পারছেন না। আবার এ সময়ে অনেকের আয় না থাকায় তারা নিজেরাই সমস্যায় আছেন। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী এ বছর অভিবাসন ও কর্মসংস্থান কমে যাবে। অভিবাসীদের স্বাস্থ্যবীমা সঙ্কুচিত হবে। আরো বলা হয়েছে, করোনার কারণে ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিদেশে থাকা শ্রমিকরা ফেরত এসেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের চলে যেতে বলেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ২০১৯ সালে রেমিট্যান্সের অন্তর্মুখী প্রবাহ ছিল ৭১৪ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছর। এ বছর তা কমে ১০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের মধ্যে ভারতে রেমিট্যান্স কমতে পারে ২৩ শতাংশ। পাকিস্তানেও একই হারে কমার প্রক্ষেপণ করেছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রবাসীদের বড় একটি অংশের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। আর ইতালিতে বৈধ-অবৈধভাবে থাকেন প্রায় আড়াই লাখ। করোনা আতঙ্কে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বেশির ভাগ প্রবাসী। অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার অবস্থাও এখন খুবই প্রান্তিক পর্যায়ে। সেখানে বাংলাদেশী শ্রমিকরা কার্যত গত আড়াই মাস ধরে অবরুদ্ধ।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেসিট্যান্স আসার প্রবৃদ্ধি ছিল ঊর্ধ্বমুখী ও খুবই আশাব্যঞ্জক, যা আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতিশীলতা দিয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে দেশের একমাত্র আশা জাগানো এই সূচকটিও হ্রাস পেতে শুরু করেছে উদ্বেগজনকভাবে। মধ্যপ্রাচ্যেও এই প্রাণঘাতী ভাইরাস হানা দিয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে সেসব দেশের জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। কলকারখানাসহ উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত আমাদের দেশে রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। এসব কারণে ঊর্ধ্বগতির রেমিট্যান্স নিয়ে নতুন শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে এই পারদটা হয়েছে আরও নিম্নমুখী। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া সব সূচকই আগে থেকেই ছিল নি¤œমুখী। এখন করোনার প্রভাবে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির হারও হুমকির মুখে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নগদ প্রণোদনা ও টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে বৈধ পথে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ২৫০ কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। গত বছর একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৪১ কোটি ডলার, একক মাস হিসাবে গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৪৫ কোটি ২০ লাখ ডলার সমমূল্যের অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। কিন্তু সে ইতিবাচক ধারা এখন আর অব্যাহত নেই বরং তা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মূলত দেশের মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এ চার দেশ থেকে আসে ১১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে আসে সোয়া ১২ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে প্রায় ৬০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ। সম্প্রতি এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলোতে করোনার প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে এসব দেশে কর্মরত অনেক প্রবাসীই বাংলাদেশে চলে আসছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবে পড়তে পারে। একই সাথে করোনাভাইরাসের সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদি হলে এ খাতে অবস্থার আরো মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১.৬১ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৭ শতাংশে। পরের দুই অর্থবছরে আবার প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমে আড়াই শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমে সাড়ে ১৪ শতাংশ। এ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মাথায় নিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ হার বাড়ে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগের ঘাটতি সমন্বয় করলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ওই অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স আহরণে রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে প্রবাসীরা এক হাজার ৬৪২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, যা অর্থবছর হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। তারও আগে গত চার বছরের মধ্যে দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল। সে সময় রেমিট্যান্স আসে এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল সাড়ে ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এ কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতি সেই বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছে এবং তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। মূলত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র সচল রাস্তা ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এমনিতেই আমাদের দেশের রফতানি আয় দীর্ঘ দিন ধরে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে আমাদের বাণিজ্যঘাটতি এখন খুবই নাজুক অবস্থায় নেমে এসেছে। এখন রফতানি আয় কমতে কমতে প্রায় ২ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে রেমিট্যান্সই ছিল একমাত্র ও শক্তিশালী অবলম্বন। কিন্তু সৃষ্ট পরিস্থিতিতে এখন রেমিট্যান্স পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের অবনমন ঘটতে শুরু করেছে। সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রেমিট্যান্সও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যসহ সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ অবস্থায় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উল্লেখযোগ্য দু’টি খাতই হচ্ছে তৈরী পোশাক শিল্প ও বৈদেশিক শ্রমবাজার। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ব-অর্থনীতিতে যেমন ছন্দপতন ঘটিয়েছে, ঠিক তেমনি আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও সৃষ্টি করেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। কাঁচামালের অভাবে এক দিকে পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অপর দিকে করোনাভাইরাসের হানায় প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে সৃষ্টি হয়েছে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য রীতিমতো উদ্বেগের। 

ংসসলড়ু@মসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ