০৭ জুলাই ২০২০

নৈতিকতার ধস এবং পৃথিবীর আর্তনাদ

-

আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষ বাড়ছে কিন্তু সৎ মানুষ বাড়েনি; শিক্ষিতের হার বেড়েছে কিন্তু সুশিক্ষিতের সংখ্যা বাড়েনি; আইন বেড়েছে অপরাধ কমেনি; দেহসুন্দরী বেড়েছে, চরিত্রসুন্দরী বাড়েনি; খাদ্যদ্রব্য বেড়েছে কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের গুণাগুণ বাড়েনি; শিক্ষক বেড়েছে কিন্তু শিক্ষকদের নীতিবোধ বাড়েনি, নেতার সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু নীতিবানের সংখ্যা বাড়েনি- এ রকম একটি সমাজ থেকে রাষ্ট্র কি ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারে? নৈতিকতার মানদণ্ডে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই নিম্নমুখী। আল্লাহ তাঁর পবিত্র কালামের বেশির ভাগ আয়াতে একটি কথা বারবার বলেছেন- ‘তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না, যদি করো তাহলে আমার আজাব হবে ভয়াবহ।’ (সূরা শুআ’রা ১৫০-১৫২, সূরা আরাফ-১৬২, সূরা আলাক ৬-৮) দীর্ঘ ছয় মাস যাবত করোনাভাইরাসের তাণ্ডবলীলা, যার কারণে গোটা বিশ্বে এ পর্যন্ত (২৮ মে ২০২০) করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ এবং মৃত্যুবরণ করেছে তিন লাখ ৬০ হাজার মানুষ। পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত তিনটি সূরায় তার ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে। এ ধরনের মহামারী অতীতেও বিশেষ করে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। ভারতে জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ইমেরিটাস আখতারুল ওয়াসি বলেছেন, আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আর সে কারণেই দেওবন্দের সিদ্ধান্তকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত (ইনকিলাব ২৩ মে ২০২০)।

উল্লেখ্য, মুসলমানরা কয়েক শতাব্দী ধরে এশিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশ (স্পেন মুসিলম সভ্যতা দ্রষ্টব্য) বিচক্ষণতার মাধ্যমে শাসন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ৩০ বছরের খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামল, এরপর অটোমান সাম্রাজ্য, আব্বাসীয় শাসন, উমাইয়া খেলাফত এবং মোগল সম্রাটের শাসন ছিল কয়েক শতাব্দী ধরে। কিন্তু যখনই মুসলিম শাসকরা ঈমানী জজবা থেকে সরে এসে বিজাতীয় শক্তির খপ্পরে পড়ে বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের ঐতিহ্য ভুুলে গিয়েছিল, তখন থেকেই তাদের পতন শুরু হয়। আর এটাই হলো বাস্তবতা। এই মুসলিম জাতিই ছিল ওই সময়ে পরাশক্তি। বড়ই আফসোসের বিষয় হলোÑ দয়াবান আল্লাহ মুসলমানদের দেয়ার সময় কম দেননি। যত দিন তারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেছিলেন, তত দিন তারা পরাজিত হননি। সে সময় তাদের ভূখণ্ড বাড়তেই থাকে। যখনই মুসলমান তাদের নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে বিজাতীয় শক্তির আদর্শকে আঁকড়ে ধরেছে, ঠিক তখনই তাদের পতন শুরু হয়। মুসলিম শাসকরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারেন না। ওয়াশিংটন, মস্কোর ওপর নির্ভর করে তাদের চলতে হয়। মুসলমান এখন শুধু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসনের শিকার নয় এবং নিজেরা নিজেদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এখন আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিজেদের ভূখণ্ড এখন বিজাতীয় শক্তির অঙ্গুলির ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে। অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, ইন্টারনেট এতই বেড়েছে যে, রাস্তাখাট ও হোটেল রেস্তোরাঁয় এবং বাসাবাড়ি এর থেকে পরিত্রাণ পায়নি।

সত্যি কথা বলতে কি সমুদ্রের স্রোতের মতো খুন, রাহাজানি, গুম, নারী ও শিশু ধর্ষণ, উলঙ্গপনা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি এবং বিচারহীনতা এসব অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে সৃষ্টিকর্তা নিজেই রাগান্বিত হয়েছেন, তাই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে করোনাভাইরাস নামে একটি মহামারী রোগ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এ ধরনের মহামারী নতুন নয়। অতীতেও এর বহু নজির রয়েছে। এ ধরনের পাপাচার বিশ্বে যখনই লাগামহীনভাবে বেড়ে যায় তখনই সৃষ্টিকর্তা কঠিন ব্যাধি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে গোটা বিশ্বের মানবজাতিকে শায়েস্তা করেন। এটা শুধু আমার বক্তব্য নয়- ইসলামিক চিন্তাবিধ এবং স্কলাররাও একই কথা বলেছেন। আসুন আমরা সবাই সৃষ্টিকর্তার কাছে পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা চাই এবং ভবিষ্যতে পাপাচারে লিপ্ত হবো না এ কথা বলি। তা হলেই মানবজাতি সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে এই ধরাপৃষ্ঠে। হাদিসে আছে পৃথিবী শেষ হওয়ার আগে একটি রোগ সারা বিশ্বে মহামারী আকার ধারণ করবে। ইসলাম ধর্মের অনেক অনুসারী এ ব্যাপারে তাদের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তারা হাদিসে বর্ণিত একটি অসুখের কথা উল্লেখ করে বলেছেন- পৃথিবী শেষ হওয়ার আগে একটি রোগ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। আবার অনেকে বলেছেন কেয়ামতের আগে কাবায় ‘তাওয়াফ’ বন্ধ হবে।

এ ঘটনার সাথে চলমান করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাবায় ওমরাহ বন্ধের তুলনা করেছেন তারা। আবার অনেকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার আগে অজু করার সাথে মিলিয়েছেন। আমাদের তথাকথিত দ্বীনদার সমাজের অবস্থা অনেকটা এরকমÑ একজন বুয়েটের ছাত্র। ইঞ্জিনিয়ার, খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। বাবা-মা দ্বীনদার। বাবা-মা ছেলেটিকে হিফজখানায় দিয়েছিল ও হাফেজও হয়েছিল। এরপর আলিম পাস করে বুয়েটে গিয়েছে। দাড়ি আছে। ছেলেটি বলছে, এত দিন পাপের ভয় হতো। খুব চেষ্টা করেছি নিজেকে পাপ থেকে রক্ষা করার। এখন পাপ ঘটে যাচ্ছে। বাড়িতে যদি বিয়ের কথা বলি, মনে হয় আসমান ভেঙে পড়েছে। ছেলে বুয়েট থেকে অনার্স পাস করেছে- ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে মা-বাবার প্রশ্ন এখন বিয়ে কেন। আরো দশ বছর যাক। তুই আরো ডিগ্রি কর। পিএইচডি কর, প্রতিষ্ঠিত হও। এরপর ৩৫-৪০ বছরে এসে বিয়েশাদি করবি। তখন বিয়ে করবার আর দরকারই থাকবে না। এখন তাহলে কী হবেÑ সহজ উত্তরÑ যেনা করবি। আপনার ছেলে আপনার মেয়ে বিয়ে করতে চাইলে আপনার কষ্ট লাগে আর ওরা যদি অবৈধ রিলেশন করে তাতে আপনার কষ্ট লাগে না। আপনি নিজেই ইহুদি খ্রিষ্টানদের ষোলোআনাই আধিপত্য মেনে নিয়েছেন। আপনি হয়তো নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন- আপনি শবে কদর করছেন। আপনি হুজুরদের ওয়াজ শুনছেন। এসব করে আপনি ভাবছেন মাশাআল্লাহ আমি কত বড় মুসলমান। কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্বের এই অবহেলায় আপনাকে আল্লাহর কাছে পাকড়াও হতে হবে। কোথায়ও প্রকৃত ঈমান শেখানো হয় না, অর্থাৎ প্রকৃত ঈমান মা শেখায়নি, বাবা শেখায়নি, বোন শেখায়নি, স্কুলে ঈমান শেখানো হয় না, প্রতিষ্ঠানে ঈমান নেই, সমাজে নেই, টিভিতে নেই। বড় আফসোস লাগে সমাজে এমন চিত্র দেখলে। করোনাভাইরাস নিয়ে পৃথিবীর আর্তনাদ- এটা আরো ভয়ঙ্কর।

পৃথিবী আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেÑ হে আল্লাহ মানবজাতি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। সব সীমালঙ্ঘন করে একের পর এক আমার শরীরে আঘাত করেছে, তারা বুঝতে চেষ্টা করেনি আমার ব্যথা, আমার যন্ত্রণাটা। বারবার হাতজোড় করে সবিনয়ে বলেছি গাছ কেটো না, প্লাস্টিক বর্জন করো, অকারণে গাড়ি ঘোড়া চালিও না। শব্দদূষণ করো না, বায়ু ও মাটি দূষণ করো না। কিন্তু তারা আমার আর্তনাদ কানেও নিলো না। বারবার চিৎকার করেছি বিশ্বে উষ্ণায়ন বাড়ছে, ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুমেরু কুমেরুতে বরফ গলতে শুরু করেছে। এত কিছু বলা সত্ত্বেও তারা শুধু শুনে গেছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি। গুরুত্বই দেয়নি আমার কোনো কথার। তারা শুধু ছুটেছে ব্যাংক ব্যালেন্সের পেছনে। তারা শুধু ভেবেছে নিজের স্বার্থের কথা; নিজের ঘরটাতে এসি লাগিয়েছে। এরপর তারা ভাবছে আমার ঘরটাতো ঠাণ্ডা আছে। পৃথিবী উষ্ণ হলে এতে আমার কী? তাদের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গল পুড়েছে। কতনা জানি নিরীহ পশু পাখি মরেছে। তবুও তাদের জ্ঞান হয়নি, তবুও তাদের হুঁশ ফেরেনি। একটাবারও আমার দিকে দেখেনি। আমার শরীরটা যে ক্ষতবিক্ষত একবার ভ্রƒক্ষেপও করেনি। ভ্রƒক্ষেপ তো দূরের কথা একটাবার খোঁজ নেয়ারও সময় হয়নি তাদের। আসলে তারা সবই জানে। জেনেশুনেও আমাকে মিস ইউজ করেছে। সব কিছু বুঝেও আমাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তারা। আজ আমি অসহায়, আমি বড্ড একা হয়ে গেছি। বারবার আমি তাদের কাছে সাহায্য কামনা করে যখন ব্যর্থ, আমার ধ্বংস যখন অবধারিত ঠিক তখনই আমাকে বাঁচাতে এবং আমাকে সাহায্য করতে চলে এলো সেই ভয়ানক মহামারী, যার নাম করোনাভাইরাস। তাদের দেয়া নাম ঈড়ারফ-১৯. এখন তো বেশ চুপটি করে ঘরের কোনায় বসে আছো। কই আর তো গাছ কাটছ না। আর তো গাড়ি চালাচ্ছ না। আর তো শব্দদূষণ শোনা যাচ্ছে না।

বায়ুদূষণটা ছেড়ে দিয়েছ। এখন ভালো ছেলের মতো ঘরে বসে দিন পার করে দিন গুনছ। তোমাদের লাফালাফিটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছিল। বারবার বারণ করা সত্ত্বেও যখন শোননি তখন তোমাদের পায়ে বেড়ি পরাতে এসেছে করোনাভাইরাস। কই আর তো পার্টি করছ না, ক্লাবিং, সিনেমা, হইহুল্লোড় সব কেড়ে নিয়েছি। তোমাদের আসল রহস্যটা আমি আজ বুঝিয়ে দিয়েছি। কই এনআরসি, কেন সব চুপ হয়ে গেল? ধর্মে ধর্মে বিভেদ সব ঘুচে গেল। আজ প্রাণ বাঁচানোর আশায় ছুটছ। বড় বড় দেশের নেতামন্ত্রীরা ভুল-বাল জিনিস করতে বলছে আর তোমরা তাই করে বেড়াচ্ছ। এখন বলছ ‘গো করোনা’। গো বললেও কিছু হবে না। আমি অনেক সহ্য করেছি। এখন তোমরা নিজেরা শোধরাও। আমার সাথে দুর্ব্যবহার করাটা বন্ধ করো। আর যদি আমাকে ‘মিস ইউজ’ করতে থাক, তাহলে নিকটতম ভবিষ্যতে করোনা কেন কত অজানা অচেনা বিপদ তোমাদের পাকড়াও করবে। তোমরা চিন্তা করতে পারবে না। এখনও সময় আছে নিজের পৃথিবীটাকে নিজের ঘর ভাবো। তোমরা মানবজাতি সত্যিই আজব। নিজেদের কুকর্মের ফলে যখন নিজেরা ভুগছ, তখন দোষ দিচ্ছ সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তোমাদের সাহায্য করতে আসবে না- কারণ ‘আমি পৃথিবী’ তাকে বারণ করে দিয়েছি। তোমাদের সুস্থভাবে বসবাসের জন্য সৃষ্টিকর্তা আমাকে সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তোমাদের ব্যবহার এবং আচরণ ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্যতম। তোমাদের স্বার্থের জন্য তোমরা আসল কাজটি বাদ দিয়ে নকল নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছ। এখনো সময় আছে আরেকবার সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাও এবং বলো- যা ভুল করেছি, তা আর করব না। এখন থেকে আমরা সবাই মিলেমিশে নিজের ঘরটা নয় ‘আসল ঘর পৃথিবীটা’কে সুন্দর করে গড়ে তুলব। হয়তো চলমান এই মহামারী একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু নিজেদের শোধরানো দরকার। এই করোনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। একটুখানি ভেবে দেখলে দেখা যাবে- এই করোনা শুধু আমাদের ক্ষতিই করেনি। অনেক উপকারও করেছে। 

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক


আরো সংবাদ